Home » বিশেষ নিবন্ধ » বাঙালির সংস্কৃতি

বাঙালির সংস্কৃতি

আহমদ শরীফ

bangali-cultureঅন্যান্য প্রাণী ও মানুষের মধ্যে পার্থক্য এই যে, অন্য প্রাণী প্রকৃতির অনুগত জীবন ধারণ করে আর মানুষ নিজের জীবন রচনা করে। প্রকৃতিকে জয় করে, বশীভূত করে প্রকৃতির প্রভু হয়ে সে কৃত্রিম জীবনযাপন করে ই তার সংস্কৃতি ও সভ্যতা। অতএব, এইভাবে জীবন রচনা করার নৈপুণ্যই সংস্কৃতি। স্বল্প কথায় সুন্দর ও সামগ্রিক জীবনচেতনাই সংস্কৃতি। চলনেবলনে, মনেমেজাজে, কথায়কাজে, ভাবেভাবনায়, আচারেঅচারণে অনবরত সুন্দরের অনুশীলন ও অভিব্যক্তিই সংস্কৃতিবানতা। সংস্কৃতিবান ব্যক্তি অসুন্দর, অকল্যাণ ও অপ্রেমের অরি। সুরুচি ও সৌজন্যেই তাই সংস্কৃতিবানতার প্রকাশ। সংস্কৃতিবান মানুষ কখনো জ্ঞাতসারে অন্যায় করে না, অকল্যাণ কিছুকে প্রশ্রয় দেয়না, অপ্রীতিতে বেদনাবোধ করে এবং কৌৎসিত্যকে সহ্য করে না। অন্য কথায়, যেখানে কথার শেষ সেখানেই সুরের আরম্ভ, যেখানে photographyর শেষ সেখান থেকেই শিল্পের শুরু, নক্সার ঊর্ধ্বেই সাহিত্যের স্থিতি, তেমনি যেখানে স্থূল জৈব প্রয়োজনের শেষ, সেখান থেকেই সংস্কৃতি শুরু। সংস্কৃতিবান মানুষ জ্ঞানেপ্রজ্ঞায়, অভিজ্ঞায়, প্রয়োজনবোধে চালিত হয়ে অনবরত জীবনকে রচনা করতে থাকে এবং পরিবেশকে স্নিগ্ধ ও সুন্দর করবার প্রয়াসী হয়। এ জন্য সংস্কৃতিবান ব্যক্তিমাত্রেই কেবল নিজের প্রতি নয়, প্রতিবেশীর প্রতিও নিজের দায়িত্ব ও কর্তব্য স্বীকার করে। এবং সচেতনভাবে ও সযত্নে নিজেকে সুন্দর করে, সৃষ্টি করে এবং নিজের আচারআচরণে, মনেমননে, কথায়কাজে অপরের পক্ষে স্মরণীয়, বরণীয়, অনুকরণীয়, অনুসরণীয় ও আকর্ষণীয় লাবণ্য ছড়িয়ে তৈরি করে প্রতিবেশীদের সুষ্ঠু জীবনের ভিত।

বীজের আত্মবিকাশের জন্যে যেমন কর্ষিত ক্ষেত্র প্রয়োজন, সংস্কৃতির উদ্ভব ও বিকাশের জন্যেও তেমনি সুকর্ষিত মনোভূমি তথা প্রতিশ্রুত চেতনা আবশ্যক। তাই সংস্কৃতির স্রষ্টামাত্রেই বিজ্ঞ ও বিবেকবান, সুন্দরের ধ্যানী ও আনন্দের অন্বেষ্টা, বুদ্ধি ও বৃদ্ধির সাধক, মঙ্গল ও মমতার বাণীবাহক এবং প্রীতি ও প্রফুল্লতার উদ্ভাবক। চরিত্রবল, মুক্তবুদ্ধি ও উদারতার ঐশ্বর্যই এমন মানুষের সম্বল ও সম্পদ।

বেদনামুক্তি ও আনন্দঅন্বেষাই মানুষের জীবনসত্য। এক্ষেত্রে সিদ্ধির জন্যে প্রয়োজন সুন্দর ও কল্যাণের প্রতিষ্ঠা। আর এই সৌন্দর্যঅন্বেষা কল্যাণকামিতাই সংস্কৃতি।

মানুষের জীবনে সম্পদ ও সমস্যা, আনন্দ ও যন্ত্রণা পাশাপাশি চলে, বলা যায় একটি অপরটির সহচর। কিন্তু এগুলো যখন আনুপাতিক ভারসাম্য হারায়, তখন সুখ কিংবা দুঃখ বাড়ে। সুখ বৃদ্ধি পেল তো ভালোই, কিন্তু সমস্যা ও যন্ত্রণার চাপে যখন জীবনজ্বালা আত্যন্তিক হয়ে ওঠে, তখনই বিচলিতবিপর্যস্ত মানুষ স্বস্তিকামনায় সমাধান খোঁজে। এ সমাধান দিতে পারেন এবং দেনও কেবল সংস্কৃতিবান মানুষই।

মানুষ মাত্রই সচেতন কিংবা অবচেতনভাবে সংস্কৃতিকামী। কিন্তু সাধনার মাত্রা ও পথ পদ্ধতি সবার এক রকম নয়। তাই সংস্কৃতিতে আসে গৌত্রিক, আঞ্চলিক, সামাজিক, আর্থিক ও আত্মিক বৈষম্য ও বিভিন্নতা। এবং স্তরভেদে তা হয় নিন্দনীয় কিংবা বন্দনীয়, অনুকরণীয় কিংবা পরিহার্য।

আগের কথা জানিনে, কিন্তু ইতিহাসান্তর্গত যুগে দেখতে পাই বাঙালি মনোভূমি কর্ষণ করেছে সযত্নে। এবং এই কর্ষিত ভূমে মানবিক সমস্যার বীজ বপন করে সমাধানের ফল ফসল পেতে হয়েছে উৎসুক। এই এলাকায় বাঙালি অনন্য। এ যেন তার নিজের এলাকা, সে এই মাটিকে ভালোবেসেছে, সে এজীবনকে সত্য বলে জেনেছে। তাই সে দেহতাাত্ত্বিক, তাই সে প্রাণবাদী, তাই সে যোগী ও অমরত্নের পিপাসু। এ জন্যেই নির্বাণবাদী বুদ্ধের ধর্মগ্রহণ করেও সে কায়াসাধনায় নিষ্ঠ। তার কাছে এই মর্ত্যজীবনই সত্য, পারত্রিক জীবন মায়া। মর্ত্যজীবনের মাধুর্যে সে আকুল, তাই সে মর্ত্যে অমৃতসন্ধানী। সে বিদ্রোহী, সে বলে,

কিংতো দীবে কিংতো নিবেজ্জে

কিংতো কিজ্জই মন্তহ সেব্ব।

কিংতো তিত্থতপোবন জাই

মোখক কি লবভই পানী হ্নাই।

কী হবে তোর দীপে আর নৈবেদ্যে? মন্ত্রের সেবাতেই বা কী হবে তোর,

তীর্থতপোবনই বা তোকে কী দেবে? পানিতে স্নান করলেই কি মুক্তি মেলে?

অনেককাল পরে এই ধারারই সাধকবাউলের মুখে শুনতে পাই;

সখিগো, জন্ম মৃতু যাঁহার নাই

তাঁহার সনে প্রেমগো চাই।

উপাসনা নাই গো তাঁর

দেহের সাধন সর্বসার।

তীর্থব্রত যার জন্য

এ দেহে তার সব মিলে।

জীবনবাদী বাঙালি তাই বৌদ্ধ হয়েও মর্ত্যরে জীবন ও জীবিকার নিরাপত্তার বাঞ্ছায় অসংখ্য উপ ও অপদেবতার সৃষ্টি ও পূজা করেছে। সাংখ্যকেই সে তার দর্শনরূপে এবং যোগকেই তার সাধনা পদ্ধতি রূপে গ্রহণ করেছে। তন্ত্রকেই সার বলে মেনেছে। দেহেমনে আত্মঅধিকার প্রতিষ্ঠাকেই জীবনকাঠি বলে জেনেছে। আর যোগতান্ত্রিক কায়সাধনার মাধ্যমে সে কামনা করেছে দীর্ঘ জীবন ও অমরত্ম। এ জীবনকে সে প্রত্যক্ষ করেছে চলচঞ্চল ও তরঙ্গভঙ্গে লীলামহ মনপবনের নৌকা রূপে। বৌদ্ধ যুগে তার সাধনা ছিল নির্বাণের নয় বাঁচার, কেবল মাটি আঁকড়ে বাঁচার। মন ভুলানো ভুবনের বনে বনে, ছায়ায় ছায়ায়, জলেডাঙ্গায় ভালোবেসে, প্রীতি পেয়ে মমতার মধুর অনূভূতির মধ্যে বেঁচে থাকার আকুলতাই প্রকাশ করেছে সে জীবনব্যাপী। হরগৌরীর মহাজ্ঞান, মীননাথ, গোরক্ষনাথ, হাড়িফাকানুফা, ময়নামতীগোপীচাঁদ প্রভৃতির কাহিনীর মধ্যে আমরা এ তত্ত্বই পাই। অবশ্য এ বাঁচা স্থূল ও জৈবিক ভোগের মধ্যে নয়, ত্যাগের মধ্যে সূক্ষ্ম, সুন্দর ও সহজ মানসাপভোগের মধ্যে বাঁচা। কিন্তু এই জীবন সত্যে সে কি নিঃসংশয় ছিল? – মনে হয় না। তাই বিলুপ্ত যোগীপাল, ভোগীপাল, মহীপাল গীতে তার দ্বিধা ও মানস দ্বন্দ্বের আবাস পাই। পাল আমলের গীতে মনে হয়, সে মধ্যপন্থা (Golden mean) অবলম্বন করেছে। যোগেও নয়, ভোগেও নয়, মর্ত্যকে ভালোবেসে দায়িত্ব ও কর্তব্যের মধ্যেই যেন সে বাঁচতে চেয়েছে। চেয়েছে জীবনকে উপলব্ধি ও উপভোগ করতে। তার সেই জানা বোঝার সাধনায় আজও ছেদ পড়েনি। বাউলেরা তাই গৃহী, যোগীরা তাই অমরত্নের সাধক, বৈষ্ণব বৈরাগীরা তাই ঘর করে, আর ফকিরেরা বাধে ঘর।

সেন আমলে এখানে ব্রাহ্মণ্যবাদ প্রবল হয়। লুপ্তপ্রায় বৌদ্ধ সমাজ বর্ণে বিন্যস্ত হয়ে বল্লালসেনের নেতৃত্বে উগ্র ব্রাহ্মণ্যসমাজ গড়ে ওঠে। কিন্তু তা স্থায়ী হয়নি। গীতাস্মৃতিউপনিষদের মতো সে মুখেগ্রহণ করলেও মনে মানেনি। তার ঠোঁটের স্বীকৃতি বুকের বাণী হয়ে ওঠেনি। কেননা সে ধার করে বটে, কিন্তু জীবনের অনুকূল না হলে অনুকরণ কিংবা অনুসরণ করে না। তাই সে তার প্রয়োজন মতো জীবন ও জীবিকার নিরাপত্তার প্রতীক দেবতা সৃষ্টি করে পূজো করেছে, আশ্বস্ত হতে চেয়েছে ঘরোয়া ও মানস জীবনে। তার মনসা, চন্ডী, শীতলা ষষ্ঠী, শনি তার স্বসৃষ্ট দেবতা। জীবনের সামাজিক সমস্যার সমাধানে ও অধ্যাত্মজীবনের বিকাশ সাধনে সে আরো এগিয়ে এসেছে। জীমূতবাহন ও বল্লালসেন, রঘুনাথ, রামনাথ প্রভৃতির স্মৃতি ও ন্যায় দৈবকীধ্রুবানন্দপঞ্চাননের মেলপটি প্রভৃতি গোত্র ও বর্ণবিন্যাস প্রয়াস, চৈতন্যের ভগবৎপ্রেম ও মানব প্রীতিবাদ বাঙালি জীবনে রেনেসাঁস আনে। এবং তার প্রসাদে আপামর বাঙালির দেহমনআত্মা গ্লানিমুক্ত হয়। এ নতুন কিছু ছিল না, গৌতমের করুণা ও মৈত্রীতত্ত্বের ঐতিহ্যে সুফিমতের প্রভাবেই মানবমহিমাবাঙালিচিত্তে নতুন মূল্যে ও ঔজ্জ্বল্যে প্রতিভাত হয়। বাঙালি নতুন করে ‘জীবে ব্রহ্ম’ এবং ‘নরে নারায়ণ’ দর্শন করে। তখন বাঙালির মুখে উচ্চারিত হয় মানুষের মর্যাদা ও মনুষ্যত্বের মহিমা ‘চন্ডালোহপি দ্বিজশ্রেষ্ঠ হরিভক্তি পরায়ণঃ’। মানবিক সম্ভাবনার এ স্বীকৃতি সেদিন জীবনবিকাশের নিঃসীম দিগন্তের সন্ধান দিয়েছে। তাই বাঙালির কণ্ঠে আমরা সেদিন শুনতে পেয়েছিলাম চরম সত্য ও পরম কাম্য বাণী – ‘শুনহ মানুষ ভাই, সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই।’

বাঙালি এই ঐতিহ্য আজও হারায়নি। আজও হাটেঘাটেপ্রান্তরে বাউলকণ্ঠে সেই বাণী শুনতে পাই। মানববাদী বাউলেরা আজও উদাত্তকণ্ঠে মানুষকে মিলনময়দানে আহ্বান জানায়, আজও তারা মানবতার শ্রেষ্ঠ সাধক ও চিন্তানায়কের কণ্ঠের সঙ্গে কন্ঠ মিলিয়ে সাম্য, সহঅবস্থান ও সম্প্রীতির বাণী শোনায়। তারা বলে,

নানা বরণ গাভীরে ভাই

একই বরণ দুধ

জগৎ ভরমিয়া দেখিলাম

একই মায়ের পুত।

কাজেই কাকেইবা দূরে ঠেলবি আর কাকেই বা কাছে টানবি! তোরা তো ভাই ফুল কুড়োতে কেবল ভুলই কুড়োচ্ছিস। কৃত্রিম বাছবিচারের ধাঁধায় কেবল নিজেকেই ঠকাচ্ছিস। গোত্রীয়, ধর্মীয় ও দেশীয় চেতনা বিভেদের প্রাচীরই কেবল তৈরি করেছে, বিদ্বেষ ও বিবাদ সৃষ্টি করেছে, হানাহানির প্রেরণাই কেবল দিয়েছে, তাই বাউল বলেন:

যদি ‘সুন্নত দিলে হয় মুসলমান

নারী লোকে কি হয় বিধান?

বামুন চিনি পৈতার প্রমাণ

বামনী চিনি কী ধরে?

একালে ইংরেজি শিক্ষিত কবি যখন বলেন.

সবারে বাসরে ভাল, নইলে তোর মনের কালি ঘুচবে না রে।’

কিংবা

কালো আর ধলো বাহিরে কেবল

ভিতরে সবার সমান রাঙা।’

অথবা

গাহি সাম্যের গান

মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই

নহে কিছু মহীয়ান’

তখন তো আমাদের নতুন ঠেকে না। কেননা প্রাকৃত বাঙালির অন্তরের বাণী স্বতঃস্ফূর্তভাবে উচ্চারিত হতে দেখেছি আমরা কত কত কাল আগে।

ওহাবিফরায়েজি আন্দোলনের পূর্বে এখানে শরিয়তি ইসলামও তেমন আমল পায়নি। একপ্রকার লৌকিক তথা দেশজ ইসলাম লোকের অবলম্বন হয়েছিল। তখন পার্থিব জীবনের স্বস্তির ও জীবিকার নিরাপত্তার জন্যে কল্পিত হয়েছিলেন দেবপ্রতীম পাঁচগাজী ও পাঁচপীর। নিবেদিত চিত্তের ভক্তি লুটেছে খানকা, অর্ঘ পেয়েছে দরগাহ আর শিরনি পেয়েছেন দেশের সেনানীশাসক জাফরইসমাইলখানজাহান, গাজীরা এবং বিদেশাগত বদরআদমজালালসুলতান প্রভৃতি সুফিরা; তারপরেও প্রয়োজন হয়েছিল সত্যপীরখিজিরবড়খাঁগাজী কালুবনবিবিওলাবিবি প্রভৃতি দেবকল্প কাল্পনিক পীরের। এরা বাঙালির ঐহিক জীবনের নিয়ন্তা দেবতা। জীবনবাদী বাঙালি এদের উপর ভরসা করেই সংসারসমুদ্র ভাসাত জীবননৌকা। এখানেই শেষ নয়। চিন্তাজগতে বাঙালি চিরবিদ্রোহী। বৌদ্ধ, ব্রাহ্মণ্য ও মুসলিম ধর্ম সে নিজের মতো করে গড়তে গিয়ে যুগে যুগে সে চিন্তাজগতে বিপ্লব ঘটিয়েছে। বাহ্যত সে ভাববাদী হলেও উপযোগ তত্ত্বেই তার আস্থা ও আগ্রহ অধিক।

বৌদ্ধযুগে বৌদ্ধ বজ যানসহজযানকালচক্রযান, থেরবাদ, অবলোকিতেশ্বর ও তারা দেবতার প্রতিষ্ঠা এবং যোগতান্ত্রিক সাধনায় বিকাশ সাধন করে সে তার স্বকীয়তার, সৃষ্টিশীলতার মননবৈচিত্র্যের ও স্বাতন্ত্র্যের স্বাক্ষর রেখে গেছে।

ব্রাহ্মণ্যযুগে জীমূতবাহন, বল্লালসেন, রামনাথ, রঘুনাথ, রঘুনন্দন প্রভৃতি নবস্মৃতি ও নবন্যায় সৃষ্টি করে তাদের চিন্তার ঐশ্বর্যে ও প্রজ্ঞার প্রভায় জ্ঞানলোক সমৃদ্ধ ও উজ্জ্বল করেছেন।

মুসলিম আমলে চৈতন্যদেবের নবপ্রেমবাদ, সত্যপীরকেন্দ্রী নবপীরবাদ, চাঁদ সদাগরের আত্মসম্মানবোধ ও তেজস্বিতা, বেহুলার বিদ্রোহ ও কৃচ্ছ্রসাধনা, গীতিকায় পরিব্যক্ত জীবনবাদ আমাদের সাংস্কৃতিক ও অনন্যতা ও বিশিষ্ট জীবনচেতনার সাক্ষ্য।

তার পরেও কি আমরা থেমেছি! রামমোহনের ব্রাহ্মমত, বিদ্যাসাগরের শ্রেয়বোধ, ওহাবিফরায়েজি মতবাদ, রবীন্দ্রনাথের মানবতা, নজরুল ইসলামের মানববাদ কি সংস্কৃতি ক্ষেত্রে আমাদের এগিয়ে দেয়নি?

মনীষা ও দর্শনের জগতে বাঙালি মীননাথ, কানফা, তিলপা, শীলভদ্র, দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান অতীশ, জীমূতবাহন, রঘুনাথ, রঘুনন্দন, রামনাথ, চৈতন্যদেব, রূপসনাতনজীবরুঘুনাথাদি গোস্বামী, সৈয়দ সুলতান, আলাউল, হাজী মুহম্মদ, আলিরজা, চন্ডিদাস, জ্ঞানদাস, গোবিন্দদাস, কৃত্তিবাসকাশীদাসরামমোহনবিদ্যাসাগরমধুসূদন, তীতুমীরশরীয়তুল্লাহদুদুমিয়া, বঙ্কিমরবীন্দ্রপ্রমথনজরুল নির্মাণ করেছেন বাঙালি মনীষার ও সংস্কৃতির গৌরব মিনার। এদের কেউ বলেছেন ঘরের ও ঘাটের কথা, কেউ জানিয়েছেন জগৎ ও জীবন রহস্য, কারো মুখে শুনেছি প্রেম, সাম্য ও করুণার বাণী, কারো কাছে পেয়েছি মুক্তবুদ্ধি ও উদারতায় দীক্ষা, কেউ বা শিখিয়েছেন ঘর বাধা ও ঘর রাখার কৌশল, কেউ শুনিয়েছেন ভোগের বাণী, কেউ জানিয়েছেন ত্যাগের মহিমা, আবার কেউ দেখিয়েছেন মধ্যপন্থার ঔজ্জ্বল্য। আত্মিক, আর্থিক, সামাজিক, পারমার্থিক সব চিন্তা, সব মন্ত্রই আমরা নানাভাবে পেয়েছি এদের কাছে।

বাঙালির বীর্য হানাহানির জন্যে নয়, তার প্রয়াস ও লক্ষ্য নিজের মতো করে স্বচ্ছন্দে বেঁচে থাকার। স্বকীয় বোধবুদ্ধির প্রয়োগে তত্ত্ব ও তথ্যকে, প্রতিবেশ ও পরিস্থিতিকে নিজের জীবনের ও জীবিকার অনুকূল ও উপযোগী করে গড়ে তোলার সাধনাতেই বাঙালি চিরকাল নিষ্ঠ ও নিরত। এই জন্যেই রাজনীতি তত্ত্বের (Theory) দিকটিই তাকে আকৃষ্ট করেছে বেশি বাস্তব প্রয়োজনে সে অবহেলাপরায়ণ, কেননা তাতে বাহুবল, ক্রুরতা ও হিংস্রতা প্রয়োজন। এ জন্যেই কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ বাঙালির মানসসন্তান হলেও নেতৃত্ব থাকেনি বাঙালির। বিদেশাগত ভূইয়াদের নেতৃত্বে সুদীর্ঘ বিয়াল্লিশ বছর ধরে মুঘল বাহিনীর সঙ্গে সংগ্রামে জানমাল উৎসর্গ করতে বাঙালিরা দ্বিধা করেনি বটে, কিন্তু নিজেদের জন্য স্বাধীনতা কিংবা সম্পদ কামনা করেনি। কিন্তু মননের ক্ষেত্রে সে অনন্য। নতুন কিছু করার আগ্রহ ও যোগ্যতা তার চিরকালের। প্রজারা যেদিন গোপালকে রাজা নির্বাচিত করেছিল, ইতিহাসের এলাকায় সেদিন ভারতের মাটিতে প্রথম গণতান্ত্রিক চিন্তার বীজ উপ্ত হল। সেদিন এ বিস্ময়কর পদ্ধতির উদ্ভাবন ও প্রয়োগ কেবল বাঙালির পক্ষেই সম্ভব ছিল।

ওহাবি, ফরায়েজি ও সশস্ত্র বিপ্লবকালে বাঙালির বল ও বীর্য, ত্যাগ ও অধ্যবসায় বাঙালির গৌরবের বিষয়।

স্বাতন্ত্র্য আসে উৎকর্ষে, অনন্যতায় ও অনুপমতায় বৈপরীত্যে ও বিভিন্নতায় নয়। বাঙালির সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্যও তার উৎকর্ষে, নতুনত্বে ও অনন্যতায়। আমাদের দুর্ভাগ্য ও লজ্জার কথা এই যে, ইংরেজ আমলে ইংরেজি শিক্ষিত অধিকাংশ বাঙালি লেখাপড়া করে কেবল হিন্দু হয়েছে কিংবা মুসলমান হয়েছে, বাঙালি হতে চায়নি। হিন্দুরা ছিল আর্যগৌরবের ও রাজপুতমারাঠা বীর্যের মহিমায় মুগ্ধ ও তৃপ্ত এবং মুসলমান ছিল দূর অতীতের আরবইরানের কৃতিত্ব স্বপ্নে বিভোর। এরা স্বাদেশিক স্বাজাত্য ভুলেছিল, বিদেশীর জ্ঞাতিত্বগৌরবে ছিল তৃপ্তমন্য। এদের কেউ স্বস্থ ও সুস্থ ছিল না। তাই বাঙলা সাহিত্যে আমরা কেবল হিন্দু কিংবা মুসলমানই দেখেছি। বাঙালি দেখেছি ক্বচিৎ। এ জন্যই আমাদের সংস্কৃতি আশানুরূপ বিস্তার ও বিকাশ পায়নি। আজ বাঙালি পায়ের তলার মাটির সন্ধান নিচ্ছে। এই মাটিকে সে আপনার করে নিচ্ছে। এর মানুষকে ভাই বলে জেনেছে। আজ আর কেবল ধর্মীয় পরিচয়ে সে চলে না। স্বদেশের ও স্বভাষার নামে পরিচিত হতে সে উৎসুক। দুর্যোগের তমসা অপগতপ্রায় প্রভাত হতে দেরি নেই সামনে নতুন দিন, নতুন জীবন। নিজেকে যে চেনে অন্যকে জানাবোঝা তার পক্ষে সহজ। আজ বাঙালি আত্মস্থ হয়েছে। তার আত্মজিজ্ঞাসা হয়েছে প্রখর, সংহতি ও কামনা হয়েছে প্রবল। শিক্ষিত তরুণ বাঙালি জেগেছে, তাই সে তার ঘরের লোককে জাগাবার ব্রত গ্রহণ করেছে। বলছে – ‘বাঙালি জাগো’। জাগ্রত মানুষই সংস্কৃতি চর্চা করে। এবার স্বস্থ ও প্রকৃতিস্থ বাঙালি জাগবে ও সংস্কৃতি ক্ষেত্রে দ্রুত এগিয়ে যাবে। জীবনে ও জগতে সে নতুনকে করবে আবাহন এবং নতুন ও ঋদ্ধ চেতনায় হবে প্রতিষ্ঠিত।।

(উত্তরণ প্রকাশিত ‘সংস্কৃতি ভাবনা’ গ্রন্থ থেকে পুন:র্মুদ্রিত)