Home » আন্তর্জাতিক » ভারতীয়রা কিভাবে বেঁচে আছে

ভারতীয়রা কিভাবে বেঁচে আছে

মোহাম্মদ হাসান শরীফ

living-standard-on-indiansম্যাক্সকে অবাক হয়ে চেয়ে থাকতে দেখে, এক পাক নেচে উঠলো বন্দনা।

সে কি? শোননি? আমরাও যে রাশিয়া, চীন, ইংরেজের মতন শক্তিশালী দেশ হয়ে উঠলাম! আর কিসের ভয়! হাতে হাতে খড়গ ধরে আমরাও এগিয়ে যাব।’

কিন্তু ব্যাপার কি?’ বললো ম্যাক্স।

জমিতে ফসল ফলবে, গাছে গাছে ধরবে ফুল, ঘরে ঘরে জ্বলবে আলো। আমরা পেট পুরে খেতে পাব, পরনের কাপড় পাব, প্রাণভরে নাচতে পারবো। আর কেউ গরিব থাকবে না। সেই আকাশচাওয়া স্বপ্ন আজ সার্থক করলেন আমাদের দেবী দুর্গা।’

দেবী দুর্গা?’

আমাদের জননী ইন্দিরা গান্ধী ! একটু আগে রেডিও মারফত উনি দেশের মানুষকে জানিয়ে দিলেন।’ একটু চুপ করে বন্দনা ফের বললো, ‘আজ সকালে আমরা যে আণবিক বোমা ফাটালাম, ম্যাক্স ভাই! শোননি তুমি?’”

আনন্দনগরে (সিটি অব জয়) এমন বর্ণনাই দিয়েছিলেন দোমিনিক লাপিয়ের।

বন্দনার কথা মিথ্যে হয়নি। রাশিয়া, চীন, ইংরেজের মতো শক্তিশালী হয়ে ভারত এখন অন্য দেশগুলোকে ভয় দেখাচ্ছে, তার ইচ্ছামতো চলতে বাধ্য করছে। বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্রের দাবিদার ভারত প্রতিবেশি দেশের গণতন্ত্রকে পিষে মারতেও দ্বিধা করছে না। কেবল পারমাণবিক বোমাই নয়, দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র, পারমাণবিক সাবমেরিন, বিমানবাহী রণতরী এসব দিক দিয়েও আমেরিকা, রাশিয়া, চীনের সাথে পাল্লা দিচ্ছে ভারত।

তবে সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নতির সূচকগুলোর দিকে তাকালে শিউরে উঠতে হয়। জঠরজ্বালা সহ্য করতে না পেরে ভারতেই সবচেয়ে বেশি কৃষক আত্মহত্যা করে। দেশটির গ্রাম এলাকার ৬০ ভাগ বাড়িতে ল্যাট্রিন নেই। পল্লী ভারতে প্রায় ৫০ ভাগ বাড়ির সদস্যদের খাবার পানি আনতে আধা কিলোমিটার দূরে যেতে হয়।

ন্যাশনাল স্যাম্পল সার্ভে অফিসের (এনএসএসও) ৬৯তম জরিপে ভারতীয়দের জীবনযাত্রার কিছু দিক ওঠে এসেছে। এতে দেখা যায়, ভারত সামরিক দিক থেকে পরাশক্তি হয়ে পড়লেও, তার নাগরিকদের মৌলিক সুযোগসুবিধাগুলোর বন্দোবস্ত করতে পারেনি। অনেক অনুন্নত দেশের চেয়েও ভারত অনেক পিছিয়ে আছে। ২০১২ সালের জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত পুরো ভারতে ‘খাবার পানি, পয়োঃনিষ্কাষণ, স্বাস্থ্যবিধি ও গৃহায়ণ পরিস্থিতি’ শীর্ষক জরিপটি চালানো হয়। ৪,৪৭৫টি গ্রাম এবং ৩,৫২২টি নগর ব্লক এর আওতায় পড়ে।

খাবার পানি

জরিপে দেখা যায়, পল্লী ও নগর ভারতের যথাক্রমে ৮৬ শতাংশ ও ৮৯.৫ শতাংশ বসতবাড়ি সারা বছর পর্যাপ্ত পানি পায়। সহস্ত্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এমডিজি) একটি সূচক ছিল ‘খাবার পানির উন্নত উৎস’। অনেকে বিভিন্ন ধরনের পদ্ধতি প্রয়োগ করে খাবার পানির মান উন্নত করার উদ্যোগ নিয়েছে। দেখা গেছে, ২০১২ সালে গ্রাম এলাকার ৮৮.৫ শতাংশ এবং নগর এলাকার ৯৫.৩ শতাংশ বাড়ি খাবার পানির উন্নত উৎস ব্যবহার করে।

তবে নগর এলাকার ৭৬.৮ শতাংশ এবং গ্রাম এলাকার ৪৬.১ শতাংশ বাড়ির মধ্যেই খাবার পানির উৎস রয়েছে। আর গ্রাম এলাকার ৫০.২ শতাংশ এবং নগর এলাকার ২১.১ শতাংশ পরিবারকে খাবার পানি সংগ্রহ করতে প্রায় আধা কিলোমিটার দূরে যেতে হয়। খাবার পানি প্রধান উৎস থেকে তা সংগ্রহ করতে গ্রাম এলাকার ওইসব বাড়ির সদস্যদের গড়ে ১৫ মিনিট এবং নগর এলাকার সদস্যদের ১৬ মিনিট অপেক্ষা করতে হয়।

বাথরুম ও স্যানিটেশন সুবিধা

ভারতে কেবল ল্যাট্রিন হিসেবে ব্যবহৃত হয়, এমন স্থাপনাসংবলিত বাড়ি কেরালা রাজ্যে আছে সবচেয়ে বেশি (৯২.৭ শতাংশ) এবং সবচেয়ে কম আছে ঝাড়খণ্ডে (.৫ শতাংশ)। সার্বিকভাবে পৃথক ল্যাট্রিনসংবলিত বাড়ির সংখ্যা গ্রামে ৩১.৯ শতাংশ এবং নগরী এলাকায় ৬৩.৯ শতাংশ। আর উন্নত ধরনের ল্যাট্রিন আছে এমন বাড়ি নগরে ৮৯.৬ শতাংশ এবং গ্রামে ৩৮.৮ শতাংশ।

ভারতে ল্যাট্রিন একেবারেই নেইএমন বাড়ি রয়েছে নগর এলাকায় ৮.৮ শতাংশ এবং গ্রামে ৫৯.৪ শতাংশ। একেবারেই ল্যাট্রিন নেইএমন বাড়ি সবচেয়ে বেশি রয়েছে ঝাড়খণ্ডে। সেখানকার ৯০.৫ শতাংশ বাড়িতে ল্যাট্রিনের অস্তিত্বই নেই।

পল্লী ভারতে ৬২.৩ শতাংশ এবং নগরে ১৬.৭ শতাংশ বাড়িতে বাথরুমের জন্য আলাদা কোনো ব্যবস্থা নেই। বড় বড় রাজ্যগুলোর মধ্যে ঝাড়খণ্ডে ৮৯.৪ শতাংশ বাড়িতেই নেই বাথরুম। কেরালায় এই হার ৯.৭ শতাংশ। এই রাজ্যটিই এই দিক থেকে সবচেয়ে ভালো অবস্থায় রয়েছে বলে গণ্য হয়ে থাকে। বাড়িতে বাথরুমের আলাদা ব্যবস্থা নেইএমন হার উড়িষ্যায় ২৫.১ শতাংশ, ছত্তিশগড়ে ২৭.৮ শতাংশ এবং পশ্চিমবঙ্গে ৪৭ শতাংশ।

বিদ্যুৎ সুবিধা

২০১২ সালে পল্লী ও নগর এলাকায় ঘরোয়া কাজে ব্যবহারের জন্য বিদ্যুৎ ছিল যথাক্রমে ৮০ ও ৯৭.৯ শতাংশ বাড়িতে। সবচেয়ে বেশি বিদ্যুৎ সুবিধা ভোগ করেছে দিল্লি। সেখানকার ৯৯.৯ শতাংশ বাড়িতে বিদ্যুৎ ছিল। আর বিহারে ছিল সবচেয়ে কম (৮৯.২ শতাংশ)

নিশ্চিত বাসস্থান

আইনসম্মতভাবে বাস করার অধিকারকে বলা যায় নিশ্চিত বাসস্থান। পল্লী এলাকায় ৯৪.২ শতাংশ এবং নগর এলাকায় ৭১.৩ শতাংশ বাড়ি ছিল নিশ্চিত বাসস্থান। কেরালার নগর এলাকায় নিরাপদ বাসস্থান ছিল সর্বোচ্চ হারে (৯০.২ শতাংশ)। সবচেয়ে খারাপ ছিল অন্ধ্রপ্রদেশে (৪৫.৮ শতাংশ)

গ্রাম এলাকায় ৪৭.৪ শতাংশ বাড়িতে এবং নগর এলাকায় ৬৬ শতাংশ বাড়িতে আলাদা রান্নাঘর ছিল।

গ্রাম এলাকায় মাত্র ২৬.৩ শতাংশ বাড়িতে ‘বায়ু চলাচলের সুষ্ঠু’ ব্যবস্থা দেখা গেছে। নগর এলাকায় এই হার ৪৭.১ শতাংশ। গ্রাম এলাকায় ৩১.৭ শতাংশ বাড়িতে এবং নগর এলাকার ৮২.৫ শতাংশ বাড়িতে ‘উন্নত ড্রেনেজ’ সুবিধা পাওয়া গেছে।

বর্জ্য রাখার ব্যবস্থা গ্রাম এলাকায় ছিল মাত্র ৩২ শতাংশ বাড়িতে, নগর এলাকায় তা ৭৫.৮ শতাংশ।।

(ফ্রন্টলাইন অবলম্বনে)