Home » রাজনীতি » ভারত-তুরস্ক এবং আমাদের সরকারপালিত বিরোধী দল

ভারত-তুরস্ক এবং আমাদের সরকারপালিত বিরোধী দল

আবীর হাসান

rawshan-ershadঅনেকে খুব মজা পেয়েছেন গত বৃহস্পতিবার ভারতের পার্লামেন্টে (লোকসভায়) এমপিদের মারামারি দেখে। সেই মজার রেশ না ফুরাতেই গত শনিবার তুরস্কের পার্লামেন্টে হল তুমুল ধস্তাধস্তি। নাক ফাটা, আঙুল ভাঙা তুরস্কের এমপিদের ছবি দেখে বেশ উজ্জীবিত তারা। ভাবছেন এবং বলছেনও যে, ‘আমাদের পার্লামেন্টে অন্তত এমনটা হয় না।’ খুবই সত্যি কথা। এবং আরও সত্যি কথা হলো ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের মাধ্যমে যে দশম সংসদ গঠিত হয়েছে সে সংসদে এমন কিছু হওয়ার আশঙ্কা নেই। কেননা যে বিরোধী দলটি সংসদে আছে তারা সরকার দলীয়দের সঙ্গে তর্কযুদ্ধে লিপ্ত হবে না, হাতাহাতি বা অন্য কিছুতে জড়ানো আরও দূরের ব্যাপার। এদের যে ক্ষমতাও নেই, যোগ্যতাও নেই। প্রশ্ন উঠতে পারে, ভারত বা তুরস্ক পার্লামেন্টে যা হয়েছে তা কি ইতিবাচক কিংবা বৈধ বলে একে মেনে নেয়া যায় কিনা? গণতন্ত্রের তাত্ত্বিকরা সরাসরি ‘না’ বলে দেবেন এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু অন্য আর একটা দিক দিয়ে দেখলে পাঠক বুঝবেন, এ রকম হওয়া তাও ভালো, সরকার পালিত বিরোধী দলের সব কিছুতেই নীরব সম্মতির প্রবণতার চেয়ে।

বিষয়টা কি আরও জটিল হয়ে গেল? না, হয়ে তো উপায় নেই। এদেশের সংসদে বিরোধী দল জাপা, যারা মন্ত্রিসভাতেও আছে। নিয়ম রক্ষার নির্বাচনের কথা বলে সরকার গঠন সংসদ পরিচালনা করা, সেখানে নিয়ম রক্ষার বিরোধী দল রাখা সব মিথ্যার প্রক্রিয়াই যে বেশ জটিল তা বলাই বাহুল্য। আর এই জটিল বিরোধী দল বিরোধীতা তো দূরের কথা, কোন প্রশ্ন করারও যোগ্যতা রাখে না। প্রশ্ন উঠতে পারে তাদের কি মুখ নেই? আছে থাকবে না কেন? কিন্তু মুখ থাকলেই বিরোধীতা করে প্রশ্ন করা যাবে, এমন নয়। হয়তো এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েই মহামতি বার্ট্রান্ড রাসেল লিখেছিলেন – ‘সবাই প্রশ্ন করতে পারে না। বুদ্ধিমানরা প্রশ্ন করে আর বোকারা করে তর্ক।’ এই এক উদ্ধৃতি থেকে বাংলাদেশের সংসদ আর ভারততুরস্কের পার্লামেন্টের ঘটনার একটা ব্যাখ্যা পাওয়া যাচ্ছে। এটা আর কিছুই নয়, আমাদের বিরোধী দলীয়রা মোটেই বুদ্ধিমান নন আর ভারত এবং তুরস্কের পার্লামেন্টে আছে কিছু বোকা এমপি সমন্বিত বিরোধী দল যারা তর্ক তো করেই সেটাকে হাতের কাজও বানিয়ে ফেলে, না হলে মরিচের গুঁড়ো নিয়ে কেউ পার্লামেন্টে যায়। তবু একটা বিষয়কে সাধুবাদ দিতে হয়, ও সব দেশে বিরোধী দলীয় এমপিরা অন্তত সংসদে যান, সংসদে থাকেন তর্ক যুদ্ধ করেন। না থাকলে তো ঘটনাগুলো ঘটতো না। আমরা নবম সংসদে দেখেছি একবার ওয়াক আউট করে বের হলে বিএনপি আর সংসদে যেতে চাইতো না। সংসদের বিতর্ককে রাস্তায় নিয়ে যেতে তৎপর হয়ে উঠতো। আগের সংসদে ঠিক একই কাজ করেছে আওয়ামী লীগ। তখন কিন্তু অনেকে বলতেন, রাজপথে হরতালভাংচুর না করে সংসদের ভেতরে বাকবিতন্ডা, চুলোচুলি, মারামারি যা ইচ্ছা করুন। সে সব কিছু হয়নি। কয়েকবার কাগজপত্র ছোঁড়াছুড়ি হয়েছে, টেবিল চাপড়াচাপড়ি হয়েছে আর যা হয়েছে তা খিস্তিখেউর। তবে দশম সংসদে তা হওয়ারও আশঙ্কা নেই।

এখনকার এই সংসদের কাছ থেকে প্রাণের উচ্ছ্বাস খুঁজে আর লাভ নেই। কারণ যা করার আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতা করেছেন, ‘নিজের বুদ্ধিতে, নিজের একক বিবেচনায় এবং সৃজনশীলতা’ (!) দিয়ে। ফলে সংসদ তো বটেই পুরো রাজনৈতিক নেতৃত্বই জনগণের সঙ্গে যে সম্পর্ক তৈরি করেছে তা তেল আর জলের। কিছু শিক্ষিত সচেতন মানুষ এখনো তাদের কাছ থেকে শুভবুদ্ধির আশা করলেও সাধারণ মানুষ কিছুই আশা করে না। তারা একেবারেই আস্থাহীন সরকার এবং রাষ্ট্রের প্রশাসন যন্ত্রের কর্মকাণ্ডের ওপর। এটা ঢালাও তথ্য নয়। আর যতোটা মনে করা হচ্ছে, পরিস্থিতি তার চেয়ে ভয়াবহ। কারণ ৭৫ শতাংশের ওপরে মানুষ মনে করছে রাজনীতিবিদরা তাদের জন্য কিছুই করবেন না তা তারা সরকার বা বিরোধী দল যেখানেই থাকুন না কেন। সম্প্রতি একটি গবেষণা সংস্থা পিপিআরসি এ তথ্য জানিয়েছে। সুশাসনের বিষয়টি সবচয়ে প্রশ্নবিদ্ধ বিষয় এখন বাংলাদেশে। পিপিআরসির প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, রাজনীতিবিদদের পরেই আস্থাহীনের কাতারে রয়েছে পুলিশ। ৭১ শতাংশ মানুষ পুলিশকে বিশ্বাস করে না। এর কারণ আর কিছুই নয় নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে থাকার প্রকোপ। অপহরণ, খুন, ক্রসফায়ার, এনকাউন্টার, বন্দুকযুদ্ধ আর সময় মতো যথাযথ আইনের প্রয়োগ দেখতে না পাওয়াতেই সাধারণ মানুষের মধ্যে এই প্রতিক্রিয়া হয়েছে।

পরিস্থিতি ভয়াবহ শুধু নয়, সাংঘাতিক নেতিবাচক। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এই নেতিবাচক অবস্থা থেকে উত্তরণ ঘটাতে পারে কে? সেই ঘুরে ফিরে কিন্তু রাজনীতিবিদ আর সংসদের কাছেই আশা করতে হচ্ছে কিছু একটা করার ব্যাপারে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে এই সব দাবি নিয়ে সংসদে বিরোধী দল কিছু একটা বলতে এমনটাও আশা করে না বাংলাদেশের মানুষ। দশম সংসদে তো এ রকম অবস্থা আগেও বহু বছর ধরেই সংসদে এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা করেনি কোন বিরোধী দল। সেই ১৯৯১ থেকেই এই পরিস্থিতি চলছে। আওয়ামী লীগবিএনপির মুখ দেখাদেখিহীন সংসদীয় সংস্কৃতিকেই গণতান্ত্রিক রীতি বলে মেনে নিয়েছে (!) জনসাধারণ। তারা জানে যেদিন সংসদ সদস্যদের বেতনভাতা বৃদ্ধি নিয়ে কিংবা শুল্কমুক্ত গাড়ি নিয়ে কথা হয় সেদিন সব দল মিলে মিশে তা করে, তারপর আবার যাকে সেই। সংসদে জনস্বার্থ সম্পর্কিত কাজকর্ম হয় খুবই কম। সরকার পক্ষ বদান্যতা দেখানোর জন্য যতোটুকু করতে চায় ততোটুকুই করে। বিরোধী দলও কখনই নিজস্ব স্বার্থের কথাবার্তা ছাড়া আর কিছু বলতে চায় না। তার মধ্যে যথেষ্ট খিস্তিখেউর থাকলেও সারবস্তু থাকে না। দলীয় নেতাকর্মীদের নিরাপত্তা আর জননিরাপত্তা যে এক নয় তাও তারা ভুলে যান। মামলাহয়রানির মতো পুলিশি অন্যায় নিয়ে দলীয় অবস্থানের বাইরে একচুল কেউ কখনই বের হননি। এ কারণেই বাংলাদেশের হাইকোর্টে জনস্বার্থে রিট হয় এতো বেশি। অনেক ব্যাপারেই আদালতকে সুয়োমটো রুল জাারি করতে হয়।

তবে দলীয় বংশবদরা একটা প্রশ্ন তুলতে পারেন – ‘দেশটা চালাচ্ছে কে?’ হ্যাঁ খুবই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন নিঃসন্দেহে। এর উত্তরটাও খুব সহজ, ‘জনগণ ও আদালত।’ একটু ঘটনাবলীর দিকে নজর রাখুন রাজনীতিবিদ, পুলিশ অন্যান্য প্রশাসনিক দায়িত্বশীলতার কাজকর্ম লক্ষ্য করুন, দেখবেন জনস্বার্থে তাদের কোন ইতিবাচক ভূমিকা নেই। স্বার্থপরতা আর দুর্নীতির মধ্যে থেকে যতটুকু করা সম্ভব ততটুকুই তারা করেন। আর জনসাধারণ নিজের মতো করে নিয়ম বানিয়ে নিয়ে চলতে চেষ্টা করে। কিন্তু সেটাও প্রয়াশই বাধাগ্রস্ত হয় যতোক্ষণ না আদালত রক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়।

কাজেই আমাদের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান নিয়ম রক্ষার নামান্তর, নির্বাচন থেকে নিয়ে আলোচনা, তর্ক, ঝগড়াঝাটি সবই নিয়ম রক্ষার জন্য। ওটাকেই এখন রীতি বলে রাজনীতিবিদরা মেনে নিচ্ছে। তেমনি করে কিন্তু জনসাধারণ মানছে না। তারা ঘোর সন্দেহ নিয়ে দেখছে কি করে রাজনীতিবিদরা গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো ধ্বংস করতে করতে নিজেদের পায়েও কুড়াল মারার দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন।।