Home » আন্তর্জাতিক » ভারত মহাসাগরে বিপদে চীন

ভারত মহাসাগরে বিপদে চীন

জন লি ও চার্লস হর্নার

অনুবাদ: মোহাম্মদ হাসান শরীফ

us-chinaবর্তমানে উন্মুক্ত সাগরে চীনের কৌশলগত অবস্থানের জন্য পূর্ব চীন সাগর এবং দক্ষিণ চীন সাগর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিবেচিত হচ্ছে। তবে চীনের জন্য পূর্ব ভারত মহাসাগরও বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ মনে হচ্ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভারত মহাসাগর নিয়ে বিশেষ পরিকল্পনা রয়েছে। অন্য প্রধান প্রধান দেশও তাদের স্থলভিত্তিক এবং সাগরভিত্তিক স্বার্থ নিয়ে ভাবছে। তাদের ভাবনা ভবিষ্যতে আরো ঘনীভূত হবেএমনটাই মনে করা হচ্ছে।

এমনকি পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকায় ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার জন্য যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, চীন, জাপান ও অস্ট্রেলিয়ার কাছে ভারত মহাসাগর কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ বিবেচিত হচ্ছে। বিশেষ করে পরাশক্তি হিসেবে চীন নিজেকে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে পূর্ব ভারত মহাসাগর বিশেষ ভূমিকা পালন করতে পারে। পাশ্চাত্যে যাতায়াতের জন্য এটাই দেশটির প্রধান নৌ রুট।

ভারত মহাসাগর বর্তমানে বিশ্বের ব্যস্ততম বাণিজ্যপথ। বিশ্বের সমুদ্রবাহিত তেলের ৮০ ভাগ (বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের প্রায় একপঞ্চমাংশ) এই পথেই সরবরাহ করা হয়। দক্ষিণপূর্ব এশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান ও চীনের অর্থনীতিকে টিকিয়ে রেখেছে এই সরবরাহ।

বিশ্বের সমুদ্রবাহিত তেলের প্রায় ৪০ ভাগ যায় হরমুজ প্রণালী দিয়ে। এর এর প্রায় পুরোটাই প্রথমে ভারত মহাসাগরে, তারপর মালাক্কা প্রণালী পাড়ি দেয়। চীন যদিও তার অভ্যন্তরীণ প্রয়োজনের ৯০ ভাগ নিজস্ব উৎস থেকে মেটাতে পারলেও তারা চাহিদার অর্ধেক আমদানি করে। দেশটি মধ্য এশিয়ায় বিপুল বিনিয়োগ করেছে। এর ফলে স্থলপথেও জ্বালানি আমদানি করতে পারবে। কিন্তু তারপরও সাগরপথ তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ থেকে যাবে।

চীন বর্তমানে দিনে প্রায় ৫০ লাখ ব্যারেল তেল আমদানি করে। ২০৩০ সাল নাগাদ তা এক কোটি ৩০ লাখ ব্যারেলে দাঁড়াবে বলে আশা করা হচ্ছে। বার্মা উপকূল থেকে ইউনান প্রদেশ পর্যন্ত নির্মিত পাইপলাইন দিয়ে দিনে চার লাখ ৪০ হাজার ব্যারেল তেল পরিবহন করা যাবে। সাইবেরিয়া থেকে যে পাইপলাইন নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে, তা বাস্তবায়িত হলে উত্তর চীনে দিনে ছয় লাখ ২০ হাজার ব্যারেল তেল পরিবহন করা যাবে। কাজাখস্তানের কাস্পিয়ান সাগরের তেলক্ষেত্র থেকে আরেকটি পাইপলাইন নির্মাণের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। সেটা করা গেলে দিনে চার লাখ ব্যারেল তেল আনা যাবে।

এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলেও সমুদ্রপথে তেলের গুরুত্ব কমবে না। হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেলের রফতানি বাড়তেই থাকবে। আবার চীন ইরাক, সুদান ও অ্যাঙ্গোলার তেলক্ষেত্রগুলোতেও বিনিয়োগ করছে। এসব স্থান থেকে তেল আমদানি করতে ভারত মহাসাগরের গুরুত্ব রয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার সাথে চীনের বাণিজ্য দিন দিন বেড়েই চলেছে। ১৯৯০এর দশকেও এই পরিমাণ ছিল সামান্য। ২০২০ সাল নাগাদ চীন ও মধ্যপ্রাচ্যের বাণিজ্য ৫০০ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়াবে বলে আশা করা হচ্ছে। বর্তমানে আফ্রিকার অন্যতম বিনিয়োগকারী চীন। প্রায় ১০ লাখ চীনা সেখানে কাজ করে। বছরে আফ্রিকার সাথে চীনা বাণিজ্য ২০ ভাগেরও বেশি বাড়ছে।

তবে জ্বালানি ছাড়াও ভারত মহাসাগরপ্রশান্ত মহাসাগরীয় করিডোরের আরো অনেক গুরুত্ব রয়েছে। ভারত, মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়াপ্রশান্ত মহাসাগরী এলাকার মধ্যে নতুন ধরনের ‘ত্রিভুজ বাণিজ্য’ বিকশিত হয়েছে। ভারতের ‘লুক ইস্ট’ বা পূর্বমুখী নীতির ফলে দেশটির সাথে ১০ সদস্যের আসিয়ানের বাণিজ্য ইতোমধ্যে ৭০ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে এবং ২০১৫ সাল নাগাদ তা ১০০ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়াবে। এমনকি ভারত ও চীনের মধ্যে কৌশলগত প্রতিযোগিতা তীব্রতর হতে থাকলেও ভারতের বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদারে পরিণত হয়েছে চীন। তাদের মধ্যে বার্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ ৭৫ বিলিয়ন ডলার।

চীন কেবল বাণিজ্যিক গুরুত্বের কারণে নয়, তার ক্রমবর্ধমান নৌশক্তির জন্যও ভারত মহাসাগরকে চায়। এই সাগরটি উন্মুক্ত রাখতে না পারলে দেশটি অবরুদ্ধ হয়ে পড়বে বলে আশঙ্কা রয়েছে। ভারত, চীন, জাপান, ইন্দোনেশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র পূর্ব ভারত মহাসাগর নিয়ে বিশেষ কৌশল প্রণয়ন করছে। চীনের ভবিষ্যতের জন্য ভারত মহাসাগরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে। তবে এ দিকটা তেমনভাবে আলোচিত হয়নি। চীনের নতুন ‘মার্চ ওয়েস্ট’ নীতিতে ত্রিমুখী অগ্রাভিযান ভারত মহাসাগর ছাড়া পূর্ণ হওয়ার নয়।

প্রথম রুটটি চীনা শাসিত মধ্য এশিয়া তথা জিনজিয়াং থেকে জ্বালানি সমৃদ্ধ কাজাখস্তান, তুর্কমেনিস্তান ও কাস্পিয়ান উপকূল পর্যন্ত বিস্তৃত। দ্বিতীয় রুটটি পাকিস্তান, আফগানিস্তান, ইরান পর্যন্ত বিস্তৃত হয়ে পারস্য উপসাগর পর্যন্ত গিয়ে পৌঁছেছে। তবে তৃতীয় রুটটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এর শুরু হয়েছে ইউনান প্রদেশ থেকে। রেলপথ ও সড়কপথে এটা নতুন করে গড়ে নেয়া পুরনো সিল্করোডের দক্ষিণপশ্চিমগামী শাখা ধরে এগিয়ে বাংলাদেশ হয়ে উত্তরপূর্ব ভারত যাবে এবং তারপর ঢুকবে পারস্য তথা ইরানে। তিব্বত সীমান্তসংলগ্ন ইউনান তবে এই কৌশলের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিন্দু। ইউনান ছাড়াও চীনা ভূখণ্ডের অন্য প্রদেশগুলোও ইন্দোপ্যাসিফিক অর্থনৈতিক করিডোরে যুক্ত হবে। প্রধান লক্ষ্যবস্তু হবে দক্ষিণপূর্ব এশিয়া, যে স্থানটিকে প্রাকৃতিক অর্থনৈতিক অঞ্চলের জন্য এশিয়ান উন্নয়ন ব্যাংক গ্রেটার মেকং সাবরিজিয়ন হিসেবে অভিহিত করেছে। এই অঞ্চলের মধ্যে ইউনান প্রদেশ এবং স্বায়াত্তশাসিত গুয়ানজি ছাড়াও রয়েছে ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, লাউস ও মিয়ানমার।

২০০৯ সালে তদানিন্তন চীনা প্রেসিডেন্ট হু জিনতাও ইউনান সফর করে প্রদেশের সরকারি কর্মকর্তাদের গ্রেটার মেকং সাব রিজিয়নের সাথে অর্থনৈতিক সহযোগিতা জোরদার করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। দক্ষিণ ও দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার মধ্যে প্রধান অর্থনৈতিক সেতুবন্ধ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে ইউনান। অন্যদিকে পশ্চিম ও দক্ষিণপশ্চিম চীনের জন্য বঙ্গোপসাগর ও আন্দামান সাগর গুরুত্বপূর্ণ বিবেচিত হচ্ছে। সব মিলিয়ে ভারত মহাসাগরে সামান্য সুবিধা বিরাট সাফল্যে পরিণত হতে পারে। চীন এসব দিকে গুরুত্ব দেয়ায় জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া ও ভিয়েতনাম এবং অবশ্যই যুক্তরাষ্ট্র হুঁশিয়ার হয়ে গেছে। তারাও তাদের স্বার্থের ব্যাপারে সগাজ হয়ে গেছে।

যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যেই ভারতকে সহযোগিতার অংশিদার এবং অস্ট্রেলিয়াকে চুক্তিবদ্ধ মিত্রে পরিণত করেছে।

এমন এক প্রেক্ষাপটে চীনের নৌশক্তি যদি বিশ্বশক্তিতে পরিণত হতে চায়, তবে তাকে দক্ষিণ চীন সাগর থেকে মালাক্কা প্রণালির পশ্চিম দিকে হয়ে মধ্যপ্রাচ্যের মূলভূমিতে পৌঁছাতে হবে। আর সেটা করতে গেলে তাকে ভারত মহাসাগরজুড়ে আধিপত্য বিস্তার করতে হবে। কিন্তু সমস্যা হলো এখানে তার প্রকৃত মিত্র বলতে গেলে কেউ নেই। পাকিস্তান তার মিত্র আছে, কিন্তু দেশটির টালমাটাল অবস্থা বেড়েই চলেছে। অথচ যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত মিত্র ও অংশিদার উভয়টিই আছে।।

(এশিয়া টাইমস অনলাইন অবলম্বনে)