Home » রাজনীতি » রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস আর বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড চলছেই

রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস আর বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড চলছেই

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন

dis 1এমন কোনো দিন নেই যেদিন কোনো না কোনো বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে না। এছাড়াও রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের নানাবিধ ধরন এবং প্রকাশ মানুষ প্রত্যক্ষ করছে। মানবাধিকার সংস্থা এবং সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী এই জানুয়ারি মাসেই ৩৩ জনের বেশি মানুষ বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। ফেব্রুয়ারির প্রথম ১৫ দিনেই নিহত হয়েছেন কম করে হলেও ২০ জন। এই হিসাবই যে সব তা নয়, কারণ দেশের আনাচেকানাচে হত্যার যে মহোৎসব চলছে তার হিসাব সবটা এই রাজধানী পর্যন্ত পৌঁছে না। মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, প্রতিদিন গড়ে একজনেরও বেশি মানুষ নিহত হচ্ছেন বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডে। অথচ স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী তার দায়িত্বভার নেয়ার মাত্র কিছুদিনের মাথায় এসে বললেন, দেশে বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বলে কিছু হচ্ছে না। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদটি এমনই যে ওই পদে কেউ বহাল হলেই এমন কথা শেখানো বুলির মতো বলতেই থাকেন। এতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। অতীতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীরাও একই ভাষায় কথা বলেছেন। নতুন যিনি এলেন তিনিও বললেন।

অথচ রাষ্ট্রীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মিজানুর রহমান এ সপ্তাহেই এক অনুষ্ঠানে বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারে প্রকাশ্যে তীব্র সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেছেন, আগে ক্রসফায়ারের গল্প বানানো হতো, এখন বন্দুক যুদ্ধের গল্প বানানো হচ্ছে।

ক্রসফায়ার, বন্দুকযুদ্ধ, গুমসহ রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের ঘটনা নতুন নয়। এদেশে এ ঘটনা অনেকদিন ধরেই ঘটছে। আর এর শিকার প্রধানত রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ। মূলত রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমনের উদ্দেশ্যই এমন হত্যাকাণ্ডের অবৈধ অধিকার দেয়া হয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনীকে। এই বাহিনী এর যথেচ্ছ ব্যবহারও করছে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ছাড়াও সাধারণ মানুষও এই হত্যাকাণ্ডের শিকার। বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের এক পর্যায়ে গুম রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের ক্ষেত্রে নতুন এক কৌশল হিসেবে যুক্ত হয়েছে। এখন গুমও চলছে, চলছে বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড।

বিগত বছরে বিরোধী আন্দোলন শুরু হওয়ার পর থেকেই বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, বিচারবিহীন অবস্থায় আটক করার ঘটনা বেড়েছে। নির্বাচনের আগে এই পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেয়। আর পরবর্তী সময়ে অসংখ্য মানুষ বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। এরা বিরোধী দলের নেতাকর্মী। সাধারণভাবেই হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা সাম্প্রতিককালে বেড়ে গেছে। নির্বাচনের ঠিক পর পরই শুরু হওয়া যৌথবাহিনীর অভিযানের নামে তিন সপ্তাহে কম করে হলেও ১৪ জন নিহত হয়েছেন। এছাড়া ওই সময়ে সারাদেশে কর্তৃপক্ষীয় হিসেবেই ১৩৮ জন নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে ৩২ জন রাজনৈতিক নেতা। এছাড়া অপহরণ এবং নিখোঁজ রয়েছেন অনেকেই, এমন অভিযোগও পাওয়া যাচ্ছে। উপজেলা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এখন রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের নানাবিধ ঘটনা ঘটছে বিরোধী পক্ষের বিরুদ্ধে।

আওয়ামী লীগ ২০০৮ সালে তার নির্বাচনী ইশতেহারে স্পষ্টভাষায় জানিয়ে দিয়েছিল যে, বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বন্ধ করা হবে। ওই একই ইশতেহারে পুলিশ বাহিনীসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনীকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হবে না এমন প্রতিশ্রুতিও দেয়া হয়েছিল। কিন্তু ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগ যে নির্বাচনী ইশতেহার প্রকাশ করেছে তাতে বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারে একটি কথাও বলা হয়নি। এতে বোঝা যায়, বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডকে আওয়ামী লীগ সরকার প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে।

আগের দফায় আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পরে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের নানা ধরন লক্ষ্য করা গেছে। দেশীবিদেশী মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তীব্র উদ্বেগ আর প্রতিবাদের এক পর্যায়ে আওয়ামী লীগেরই গত ৫ বছরের শাসনামলের তিন বছরের মাথায় এসে জেনেভায় জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিলের শুনানিতে তৎকালীন পররাষ্ট্র মন্ত্রী দীপু মনিকে বলতে হয়েছিল ক্রসফায়ার বন্ধ করা হবে। তিনি যখন জেনেভায় বসে ওই জাতীয় বক্তব্য দিচ্ছিলেন দেশে তখনো বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের নামে গুম, কথিত ক্রসফায়ারের ঘটনা ঘটছিল। রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের বিস্তার এমন পর্যায়ে গিয়ে দাঁড় করানো হয় যে, এখন বিরোধী মতপথের কেউ রাস্তায় নামলেই দেখামাত্র গুলির বৈধ অধিকার দেয়া হয়েছে। নির্বিচারে এমন গুলিবর্ষণের ঘটনা অতীতে আর দেখা যায়নি। এমনকি স্বাধীনতার ঠিক পরপরই আওয়ামী লীগের যে সরকারটি ছিল তারাও এমন কাজ করেনি। যদিও এ দেশে কথিত ক্রসফায়ার শুরু হয়েছিল সিরাজ সিকদার হত্যাকাণ্ডের মধ্যদিয়েই। রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের ধরনধারণ পরিবর্তন হচ্ছে প্রতিদিনই। সরকারের নির্দেশে সভাসমাবেশ বন্ধ করার ঘটনাও ঘটেছে। রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের নামে যাবতীয় কলাকৌশল আরও তীব্রভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে, অথচ সরকারের দিক থেকে এ সম্পর্কে একটি বক্তব্যও নেই। আর এ বক্তব্য না থাকাই প্রমাণ করে, রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস এবং বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডকে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়া হয়েছে।

বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড হচ্ছে, গুমের ঘটনা ঘটছে, ঠিকানাবিহীন অসংখ্য মরদেহ যত্রতত্র পাওয়া যাচ্ছে। অথচ এর একটির জন্যও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনীর কাউকে কোনোদিন জবাবদিহিতার আওতায় পড়তে হয়নি।

রাষ্ট্রীয় বাহিনী দিয়ে বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের পাশাপাশি দলীয় ক্যাডারদের দিয়েও হত্যাখুনের ঘটনাও ঘটানো হচ্ছে। যার সর্বসাম্প্রতিক উদাহরণ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। ওই ঘটনায় অস্ত্রধারীদের ছবি টেলিভিশনে দেখানো হয়েছে, সংবাদপত্রে ছাপা হয়েছে। অথচ কারো বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে এমনটা শোনা যায়নি, অতীতের ঘটনাগুলোর মতোই।

রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসকে আরও জোরদার করার জন্য মন্ত্রীসভা গত ১৭ ফেব্রুয়ারি দ্রুত বিচার আইনের মেয়াদ আরও ৫ বছর বাড়িয়েছে। এর উদ্দেশ্য কি তা সবারই জানা। এর লক্ষ্য যে বিরোধী মত এবং পথকে দমন তাও সবাই অবগত।

সরকারকে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের, বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের আশ্রয় নিতে হয় তখনই যখন সরকারটি গণবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, হয়ে পড়ে জনসমর্থনহীন। এমন ঘটনা অতীতেও বহু দেশে ঘটেছে। এক সময় ল্যাটিন আমেরিকাসহ বিশ্বের বহু দেশে এমন ঘটনা ঘটিয়েছে ফ্যাসিস্ট শাসকরা। আর এভাবেই তারা ইতিহাসের খলনায়ক হিসেবেই চিহ্নিত হয়ে আছে। কারণ এটাই হচ্ছে পরিণতি। এই পথে যে ক্ষমতাকে সত্যিকার অর্থে দীর্ঘমেয়াদী এবং পাকাপোক্ত করা যায় না এটাই হচ্ছে ইতিহাসের শিক্ষা। তবে দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হলো ফ্যাসিস্টরা ওই সব শিক্ষা এবং অতীত অভিজ্ঞতাকে কখনই তোয়াক্কা করে না। করেনি কোনো দিনই। আর এ কারণেই রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস চালিয়ে যায় ফ্যাসিস্ট শাসকরা।।