Home » মতামত » স্থানীয় সরকারের ঐতিহ্য বনাম রাজনীতিকীকরণ

স্থানীয় সরকারের ঐতিহ্য বনাম রাজনীতিকীকরণ

ইকতেদার আহমেদ

political-cartoons-34আমাদের এ দেশ বৃটিশদের শাসনাধীন থাকাবস্থায় ইউনিয়ন বোর্ড ও জেলা বোর্ড নির্বাচনের মাধ্যমে যে স্থানীয় নির্বাচনের সূচনা হয়েছিল তা পাকিস্তান শাসনামলের মাঝামাঝি পর্যায়ের কিছুকাল পর পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। অতঃপর ইউনিয়ন ও জেলা বোর্ড পরিবর্তিত নামধারণ করে ইউনিয়ন কাউন্সিল ও জেলা কাউন্সিলে পরিণত হয় যা বাংলাদেশ সৃষ্টির পর থেকে অদ্যাবধি অব্যাহত আছে। ইউনিয়ন বোর্ড ও জেলা বোর্ড গঠন পরবর্তী অতীতে দেখা গেছে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি সমাজসেবার মহান ব্রত নিয়ে নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বীতায় অবতীর্ণ হতেন এবং তাদের অধিকাংশেরই রাজনৈতিক দলের সাথে কোন সংশ্লিষ্টতা থাকতো না।

তখনকার স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি নিজ আকাঙ্খার পরিবর্তে জনগণের আকাঙ্খায় নির্বাচনে অবতীর্ণ হতেন এরূপ হাজারো উদাহরণ রয়েছে ইতিহাস এমনই সাক্ষ্য দেয়। স্থানীয় এ সকল গণ্যমান্য ব্যক্তি অতি সাধারণ ও অনাড়ম্বর জীবনযাপনে অভ্যস্থ ছিলেন এবং তাদের সবসময় অসহায় ও বিপন্ন মানুষের পাশে পাওয়া যেতো। তারা জীবনের সবক্ষেত্রে ভোগ নয় ত্যাগকে অগ্রাধিকার দিতেন এবং তাদের জীবন সর্বোপরি ত্যাগের মহিমায় উদ্ভাসিত ছিল। তাদের দুর্নীতির সাথে সম্পৃক্ত হওয়া দূরের কথা তারা কেউ কোন ধরণের অনৈতিক কাজের সাথে জড়িত ছিলেন এমন উদাহরণও বিরল ছিল।

সামরিক শাসক আইয়ূব খান পাকিস্তানের শাসনক্ষমতা দখলের পর রূপান্তরিত ইউনিয়ন কাউন্সিল ও জেলা কাউন্সিলের চেয়ারম্যান পদে নির্বাচনে জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটের পরিবর্তে পরোক্ষ ভোটের ব্যবস্থা করায় সামগ্রিক নির্বাচনী কার্যক্রম কলুষিত হয়ে পড়ে। পরবর্তীতে বাংলাদেশে সৃষ্টির পর পুনঃ প্রত্যক্ষ ভোটের ব্যবস্থা করা হলেও পূর্বের সে কলুষতার অবসান তো হয়নি বরং দিন দিন বৃদ্ধি পেয়ে চলেছে।

বর্তমানে দেশে বিভিন্ন শ্রেণীপেশার মধ্যে রাজনীতি এমন গভীরভাবে গ্রথিত হয়েছে যে, যে কোন পেশাজীবী সংগঠনের নির্বাচন রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত এটি কল্পনারও অতীত হয়ে গেছে। ব্যবসায়ী, সাংবাদিক, আইনজীবী, প্রকৌশলী, চিকিসক প্রভৃতির যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় এ সকল নির্বাচনে আমাদের বড় দু’টি রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির সমর্থন ব্যতীত একজন নির্দলীয় ও নিরপেক্ষ ব্যক্তির পক্ষে বিজয়ী হওয়া বাস্তবতার নিরীখে কোনভাবেই সম্ভব নয়। আর নিরপেক্ষ কোন ব্যক্তি যদি রাজনৈতিক দলের সমর্থন নিয়ে নির্বাচনে অবতীর্ণ ও বিজয়ী হয় সে ক্ষেত্রে তার নিরপেক্ষতা কি অক্ষুণ্ন থাকে?

এ তো গেলো পেশাজীবীদের কথা। যে কোন বেসরকারী পেশাজীবী সংগঠন রাজনৈতিক দলের লেজুড়ভিত্তিক হলে এর স্বাতন্ত্র বলে আর কিছু অবশিষ্ট থাকে না। অতীতে স্থানীয় নির্বাচনে ক্ষমতাসীন সরকারের পক্ষে কর্মকর্তারা একজন প্রার্থীর বিজয় বা পরাজয় উভয় ক্ষেত্রে কোন ধরণের ভূমিকা রাখতেন না কিন্তু বর্তমানে কর্মকর্তাদের মধ্যে এ বিষয়টি সম্পূর্ণরূপে অনুপস্থিত।

বাংলাদেশের যে সকল নির্বাচন স্থানীয় শাসন ব্যবস্থার অন্তর্ভুক্ত সেগুলো হলো ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি কর্পোরেশন। আমরা সচরাচর স্থানীয় শাসনকে স্থানীয় সরকার বলে থাকি। এ বিষয়ে দেশের সর্বোচ্চ আইন সংবিধানের প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ করলে দেখা যায় সংবিধানের ৪র্থ ভাগের ৩য় পরিচ্ছেদে ‘স্থানীয় শাসন’ শব্দ দু’টি ব্যবহৃত হয়েছে যার ইংরেজী অর্থ করা হয়েছে Local Government, Local Government শব্দটির শাব্দিক অর্থ ‘স্থানীয় সরকার’ বিধায় সাধারণ্যে ‘স্থানীয় শাসন’ এর স্থলে ‘স্থানীয় সরকার’ শব্দ দু’টি ব্যাপকভাবে পরিচিতি লাভ করেছে। এমনকি স্থানীয় শাসন ব্যবস্থা সংশ্লিষ্ট যে সকল আইন ও বিধি প্রণীত হয়েছে সে সকল আইন ও বিধিতেও স্থানীয় সরকার শব্দ দুটো ব্যবহৃত হয়েছে। যেমনস্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) আইন, ২০০৯; স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) নির্বাচন বিধিমালা, ২০১০; স্থানীয় সরকার (উপজেলা পরিষদ) অধ্যাদেশ, ২০০৮; স্থানীয় সরকার (উপজেলা পরিষদ) নির্বাচন বিধিমালা, ২০০৮; স্থানীয় সরকার (পৌরসভা) (সংশোধন) আইন, ২০১০; স্থানীয় সরকার (পৌরসভা) নির্বাচন বিধিমালা, ২০১০ এবং স্থানীয় সরকার (সিটি কর্পোরেশন) আইন, ২০০৯ ও স্থানীয় সরকার (সিটি কর্পোরেশন) নির্বাচন বিধিমালা, ২০১০। সংবিধানে স্পষ্টত উল্লেখ রয়েছে যে, বাংলা ও ইংরেজী পাঠের মধ্যে বিরোধের ক্ষেত্রে বাংলা পাঠ প্রাধান্য পাবে। সে নিরীখে সর্বত্র ‘স্থানীয় সরকার’ এর পরিবর্তে ‘স্থানীয় শাসন’ শব্দদ্বয়ের ব্যবহার যুক্তিযুক্ত বিবেচিত হয়।

নির্বাচন কমিশনকে জাতীয় নির্বাচন পরিচালনার ক্ষেত্রে সাংবিধানিকভাবে যে সকল দায়িত্ব দেয়া হয়েছে তার মধ্যে অন্যতম হলো রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচন অনুষ্ঠান, সংসদ সদস্যদের নির্বাচন অনুষ্ঠান, সংসদ নির্বাচনের জন্য নির্বাচনী এলাকার সীমানা নির্ধারণ এবং রাষ্ট্রপতির পদের এবং সংসদের নির্বাচনের জন্য ভোটার তালিকা প্রস্তুতকরণ।

স্থানীয় শাসন ব্যবস্থা অথবা সরকার ব্যবস্থার অধীনে নির্বাচন কমিশন নির্বাচন অনুষ্ঠানের যে সকল দায়িত্ব পালন করে থাকে সে সকল নির্বাচন অনুষ্ঠানের দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনকে স্থানীয় সরকার সংক্রান্ত বিভিন্ন আইনের অধীনে প্রদান করা হয়েছে।

বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকারের সময় ৬ হাজারের অধিক স্থানীয় নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে এটিকে অবলম্বন করে ক্ষমতাসীনরা জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠান তাদের অধীনে যৌক্তিক দাবি করে আসলেও দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন কতটুকু অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও প্রতিদ্বন্দ্বীতাপূর্ণ হয়েছে সেটি প্রত্যক্ষ করার সুযোগ দেশবাসীর হয়েছে।

স্থানীয় সরকার নির্বাচন সংক্রান্ত ইউনিয়ন পরিষদ (নির্বাচন আচরণ) বিধিমালা, ২০১০, উপজেলা পরিষদ (নির্বাচন আচরণ) বিধিমালা, ২০০৮, পৌরসভা (নির্বাচন আচরণ) বিধিমালা, ২০১০ এবং সিটি কর্পোরেশন (নির্বাচন আচরণ) বিধিমালা, ২০১০ এ চারটির প্রত্যেকটিতে পৃথকভাবে বলা হয়েছে যেনির্বাচনী প্রচারণায় কোন প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী নিজ ছবি ও প্রতীক ব্যতীত কোন রাজনৈতিক দলের নাম বা প্রতীক বা কোন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের নাম বা ছবি ছাপাতে কিংবা ব্যবহার করতে পারবেন না। কিন্তু কার্যক্ষেত্রে আমরা দেখি স্থানীয় শাসন ব্যবস্থা বা স্থানীয় সরকারের এ চারটি নির্বাচনে ব্যানার, পোষ্টার, লিফলেট ও দেয়ালে লিখনে প্রার্থীর নাম ও প্রতীকের সাথে রাজনৈতিক দলের নাম ও প্রতীক এবং নেতৃবৃন্দের নাম উল্লেখ না থাকলেও সরকারের পদধারী নন এমন অনেক নেতৃবৃন্দ নির্বাচনী প্রচারণায় অংশগ্রহণ করে প্রার্থীর প্রতি দলীয় সমর্থন যে রয়েছে তা জনসম্মুখে প্রকাশ করে প্রার্থীর পক্ষে দলের সুস্পষ্ট অবস্থান তুলে ধরেন।

স্থানীয় শাসন বা সরকার ব্যবস্থার অধীন অনুষ্ঠিত কোন নির্বাচনে রাজনৈতিক দলের সংশ্লিষ্ট হওয়ার সুযোগ না থাকলেও গত দু’দশকের অধিক সময় ধরে অনুষ্ঠিত নির্বাচনসমূহে দেখা গেছে রাজনৈতিক দলের সমর্থনহীন নির্বাচনের সংখ্যা নগণ্য। আরও পরিতাপের বিষয় বিধিমালা অনুযায়ী স্থানীয় শাসন বা সরকারের যে কোন নির্বাচনকে রাজনৈতিক রূপ দিলে সেটি অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে এবং এ অপরাধের জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে ৬ মাস কারাদন্ড অথবা অনধিক ৫০ হাজার টাকা অর্থদন্ডে দন্ডিত করা যাবে মর্মে বিধিতে বলা হয়েছে। কিন্তু এ যাবৎকাল পর্যন্ত আমাদের কোন নির্বাচন কমিশন এ সকল নির্বাচন রাজনৈতিক দলের পরিচিতি পাওয়া সত্ত্বেও এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করে কোন দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পেরেছেন কি না তা দেখার সুযোগ আজ পর্যন্ত দেশবাসীর হয়নি।

স্থানীয় শাসন বা সরকার নির্বাচন বিষয়ে দীর্ঘদিন যাবৎ দেশের প্রধান ৪টি রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি ও জামায়াত আচরণ বিধির বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে প্রার্থীর রাজনৈতিক পরিচয়কে নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার অবলম্বন হিসেবে ব্যবহার করায় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে যে, এ সকল নির্বাচনকে অরাজনৈতিক বলার সুযোগ কোথায়? আর যদি অতীতের স্বাতন্ত্র বজায় না রাখায় এ সকল স্থানীয় নির্বাচনকে অরাজনৈতিক বলার সুযোগ না থেকে থাকে সেক্ষেত্রে আচরণ বিধিতে পরিবর্তন এনে এ নির্বাচনগুলো রাজনৈতিক পরিচয়ে অনুষ্ঠিত হওয়া যথার্থ বিবেচিত হয়।

(সাবেক জজ, সংবিধান ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক)

iktederahmed@yahoo.com