Home » রাজনীতি » উপজেলায় আ’লীগের পরাজয় :: দায়ী শুধু একজনই

উপজেলায় আ’লীগের পরাজয় :: দায়ী শুধু একজনই

আবীর হাসান

electionব্যালট বাক্স স্বচ্ছ হয়েই বা কি লাভ। অন্তরে যে নেই স্বচ্ছতা। কাজেই যেখানে যতোটুকু সুযোগ পেয়েছে জাল ভোট মেরে স্বচ্ছ ব্যালট বাক্সে ফেলেছে সরকারি দলের লোকজন। জাল ভোট মারতে না পারলে ব্যালট পেপার তছরূপ করেছে নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও। তাতেও না হলে ব্যালট বাক্সই লোপাট করে দিয়েছে লীগ করণেওয়ালারা। পবিত্র দায়িত্বজ্ঞানে দলের প্রতি কর্তব্য করেছে তারা এবং পাবলিকের বেতনভুক্ত লোকজনও অন্য দলের বা প্রতীকের সমর্থকদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভয় দেখিয়ে এসেছে নিষেধ করেছে ভোট দিতে যেতে।

কিন্তু তাতেও হয়নি। ভরাডুবি ঠেকানো যায়নি। সরকার সমর্থিত প্রার্থীরা ফেল মেরেছে অভাবিত মাত্রায়। একাধিক প্রার্থী বিদ্রোহীদের অসহযোগিতা, দলের কোন্দল সব কিছু ভেসে গেছে ভোটারদের সরকার বিরোধী মানসিকতার তোড়ে। আসলে ভোট টানতে ব্যর্থ প্রার্থীদের দোষ দিয়ে তো লাভ নেই, ওনারা তো যথাসাধ্য করেছেন। প্রশাসন তাদের সহায়তা দিয়েছে বিরোধী প্রার্থীদের সমর্থকদের বাধা দিতে, নির্বাচন কমিশনের লোকজনও ভোটের দিন সহযোগিতা করেছে নানাভাবে। এখন প্রশ্ন হলো তাতেও কুলালো না কেন?

কুলালোনা যে, তার জন্য দায়ী তো একজনই। হ্যা, একটি মাত্র ব্যক্তি। ধাঁধার মতো যদি মনে হয় তাহলে পাঠক উত্তরটা খুজতে থাকুন। আন লিমিটেড লাইফ লাইন ব্যবহারের সুযোগ থাকছে আপনাদের জন্য। শিশু আর পাগল ছাড়া যাকে ইচ্ছা তাকে জিজ্ঞাসা করুন গ্যারান্টি দিচ্ছি একটাই উত্তর পাবেন। চালিয়ে যান।

যাই হোক, আমরা বলছিলাম অন্তরের স্বচ্ছতার কথা। ৫ জানুয়ারির সংসদ নির্বাচনের পর সরকার তার ক্লিন ইমেজ তৈরির জন্য এবং যুগপৎ তৃণমূল পর্যায়ে কর্তৃত্ব নিরঙ্কুশ করার জন্য এই নির্বাচনটার ব্যবস্থা করেছিল। ইচ্ছাটা ছিল এক ঢিলে দুই পাখী মারার। স্বচ্ছ ব্যালট বাক্স দিয়ে নির্বাচন করে দেখানো যে, ‘ভোটাররা ভোট দেয় এবং আমরা জিততে পারি।’ হ্যা, এই নির্বাচনে ভোটাররা সুযোগ কিছুটা পেয়েছে, বাধাহুমকি এড়িয়ে যারা ভোট দিতে গেছে তারা আসলে আওয়ামী লীগ সমর্থকদের জিততে দেয়নি। ক্ষোভটা তাদের হয়তো নিজের এলাকার আওয়ামী লীগ দলীয় প্রার্থীর ওপরও নয় অথবা পুরো সরকারের ওপরও নয়। অনেক এলাকাতেই ভোটাররা সংসদ নির্বাচনে ভোট দিতে না পারার ক্ষোভ ঝেড়েছেন, অনেকে আত্মীয়, ভাইবেরাদর প্রার্থীদের বঞ্চিত করে বিরোধীদের ভোট দিয়েছেন মিথ্যা প্রতিশ্রুতিদানকারী আর জোর করে আরও বড় ক্ষমতায় থাকা লোকজনকে প্রত্যাখ্যান করার জন্য।

শীর্ষ ক্ষমতাসীনরা অবশ্য এন্তারবিষোদগার চালিয়ে যাচ্ছেন বিএনপির বিরুদ্ধে, খিস্তিখৈউরে ভরা সেই সব শব্দের অনেকগুলোই লেখার অযোগ্য। বোধের বিকৃতি আগেই ঘটেছিল ভাষার বিকৃতিও তারা ঘটিয়েছেন এই ভাষা আন্দোলনের মাসেও। সংযম বা ভদ্রতার বালাই ভুলে তারা বলেছেন, ‘যে সরকারকে তারা অবৈধ বলেছে সেই সরকারের দেয়া নির্বাচনেই তারা অংশগ্রহণ করেছে এবং বেশি সংখ্যক চেয়ারম্যান পদে নির্বাচিতও হয়েছে।’ আবার পাওয়া গেছে একটা থুতু তত্ত্ব : বেগম জিয়া নাকি ফেলে দেয়া থুতু চেটে খেয়েছেন। তারা এও বলেছেন যে, বিএনপি মিথ্যা অভিযোগ করেছিল, এই বলে যে, ‘এই সরকার এবং নির্বাচন কমিশনের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন হবে না।’ প্রথম দফা উপজেলা নির্বাচনে বিএনপির বেশি সংখ্যক প্রার্থী জিতেছে ঠিকই কিন্তু ওই অভিযোগের মিথ্যাটা খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। বিএনপি বলছে, ‘ক্ষমতাসীনরা জোরজবরদস্তিশক্তি প্রয়োগ আর নির্বাচন কমিশন পক্ষপাতিত্ব না করলে আরও বেশি প্রার্থী জিততো তাদের।’ সরেজমিন তথ্য যা পাওয়া গেছে এবং পত্রপত্রিকা যা লিখেছে তাতেও এ বক্তব্যের পক্ষেই বরং কিছু সত্যতা পাওয়া যাচ্ছে। আর এটাও বোঝা যাচ্ছে, ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে যদি বিএনপি অংশ নিতো তাহলে এমন ঘটনাই ঘটতো। সব কলাকৌশল মালমশলা তৈরিই ছিল কেবল প্রয়োগের প্রহর গুনছিল কুশীলবরা। সেটা শুরুও হয়ে গেল। পাঁচ পর্বের উপজেলা নির্বাচনের মাত্র এক পর্বেই এই বিষয়টা প্রমাণ হয়ে গেছে বাকি পর্বগুলোর কেমন কৌশল হবে আওয়ামী লীগের তা অনেকটাই আঁচ করা যাচ্ছে। আইন প্রয়োগকারী আর নির্বাচন কমিশনকে দিয়ে প্রার্থীদের হয়রানি করা একটা বাধা ছক। এর বাইরে অন্য কৌশল অর্থাৎ ভোটার ঠেকানোর অপচেষ্টাও চলমান থাকবে, বেগবান হবে, এটাও ধরে নেয়া যায় এবং নির্বাচনে ভোটাররা যাতে তাদের পছন্দের প্রার্থীই খুঁজে না পায় সেটাই মুখ্য করে তোলার চেষ্টা চলবে। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে তো ঠিক এই কাজটাই করা হয়েছিল।

বাকি পর্বগুলোর কেমন কৌশল হবে আওয়ামী লীগের তা অনেকটাই আঁচ করা যাচ্ছে। আইন প্রয়োগকারী আর নির্বাচন কমিশনকে দিয়ে প্রার্থীদের হয়রানি করা একটা বাধা ছক। এর বাইরে অন্য কৌশল অর্থাৎ ভোটার ঠেকানোর অপচেষ্টাও চলমান থাকবে, বেগবান হবে, এটাও ধরে নেয়া যায় এবং নির্বাচনে ভোটাররা যাতে তাদের পছন্দের প্রার্থীই খুঁজে না পায় সেটাই মুখ্য করে তোলার চেষ্টা চলবে।

হোক স্থানীয় সরকার পর্যায়ের নির্বাচন হোক অকার্যকর উপজেলা পরিষদ তবু এই নির্বাচনগুলো করে সরকার প্রমাণ করতে চেয়েছিল তাদের গণতন্ত্র রক্ষার সদিচ্ছা। স্থানীয় সরকারের সবচেয়ে অকার্যকর স্তর বলেই এই নির্বাচনটা এতো চটজলদি করার তাগিদ ছিল এবং সঙ্গে সঙ্গে এই ইরাদাও ছিল যে, ‘এই সরকারের অধীনে কোন নির্বাচনে অংশগ্রহণ নয়’ এ কথাটা যদি বিএনপি রাখতো তাহলে সরকারের সবকূল রক্ষা হতো, অর্থাৎ নির্বাচনও হতো আওয়ামী লীগও জিততো এবং বর্হিবিশ্ব দেখতো সর্বস্তরে গণতন্ত্র আছে বাংলাদেশে। যেহেতু পশ্চিমারা পাকিস্তানআফগানিস্তানইরাক ইত্যাদি দেশে স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে চাপাচাপি করে, সেহেতু ওরা প্রশ্ন তোলার আগেই ব্যাপারটা চুকিয়ে ফেলা উচিত এবং তাহলে ৫ জানুয়ারির উদ্ভট নির্বাচনটা তার পরিপ্রেক্ষিতে গঠিত সরকার ও সংসদ বৈধতা পেলেও পেতে পারতো!

কিন্তু সমস্যাটা হয়েছে বিএনপি এই নির্বাচনে তাদের প্রার্থীদের গ্রীন সিগন্যাল দিয়ে দেয়ায়। আসলে আওয়ামী লীগ নেতাদের মাথায় রাখা উচিত ছিল রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কিছু নেই এই আপ্ত বাক্যটি মাথায় রাখা। আর কথাটা তো হরহামেশাই তারা বলতেন, এখন বলেন না। বলেছেন সুবিধা মতো, মহাজোট গঠনের সময়, এরশাদের জাতীয় পার্টিকে বিরোধী দলে বসানোর সময়, গণতন্ত্রে রক্ষক বানানোর সময় তাদের সংসদ সদস্যদের মন্ত্রীও দেয়ার সময়। এখন বলেন না। কারণ বিএনপি আপ্ত বাক্যটা প্রয়োগ করেছে এই সরকার আর নখরে গাথা ইসির অধীনে নির্বাচনে নেমেছে। এই ভরসায় যে ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে বঞ্চিত ভোটাররা তাদের বিমুখ করবে না, করেওনি।

এখন তাই ক্ষমতাসীনদের রেষটা দেখা যাচ্ছে ওই বেচারা নীরব প্রতিবাদী ভোটারদের উপরেই বেশি। প্রথম দফার নির্বাচনেই ৬২ শতাংশ ভোটার সব পরিকল্পনা গুবলেট করে দিয়েছে। ফলে কলাকৌশলে তাৎক্ষণিক অনেক পরিবর্তন আনতে গিয়ে লেজেগোবরে হয়ে গেছে। সামনের চার দফায় কী হবে? প্রশ্নটা অনেককেই ভাবাচ্ছে বটে তবে ভাবাভাবি বা অভাবিত কোনো পরিবর্তনের কোনো আভাস বা ইঙ্গিত নেই। ক্ষমতাসীনদের রাজনীতিতে যে গণতান্ত্রিক শিষ্ঠাচার এবং স্বচ্ছতার যথেষ্ট অভাব তা আগেই প্রকট হয়েছে এবং এই উপজেলা নির্বাচনের প্রথম দফার হোচটটা খেয়ে তা ফিরে আসবে এমন বোধ হচ্ছে না। কারণ ইত্যবসরে যে সব কথাবার্তা শীর্ষ ব্যক্তিরা বলেছেন তাতে করে তাদের কদাকার দানবীয় মানসিকতাই মূর্ত হয়ে উঠেছে। এখন হয়তো তারা চাচ্ছেন ওদের চাহিদাকে বাস্তবতার নিরিখে নির্ধারণ করতে, আর এ জন্যই নিজের দলের সাংগঠনিক ঐক্য বজায় রাখার চেষ্টা করছে দলের বিদ্রোহী সুযোগ বঞ্চিতদের কর্মকাণ্ডকে স্তিমিত করতে চাচ্ছে। কিন্তু সময়টা তাদের জন্য বেশ কম হয়ে গেছে। অন্য পক্ষে কিন্তু তাদের বিপরীতে রয়েছে বিএনপিও নয়, ক্ষুব্ধ জনগণ তারাও কিন্তু নিজেদের চাহিদার নিরিখে বাস্তবতাকেই পুনঃনির্মাণ বা পাল্টে দিতে চাচ্ছে। লক্ষ্য করলেই দেখা যাবে, চাহিদাকে বাস্তবতার নিরিখে নির্ধারণ আর চাহিদার নিরিখে বাস্তবতা পুনঃনির্মাণ দুটো দুই জিনিস এবং দুয়ের মধ্যে রয়েছে বিস্তর ফারাক। এ কারণে ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে জনগণের মানসিকতা মিলছে না।

এই সরকারের দিক থেকে মানবিক ও গণতান্ত্রিক আচরণ আশা করাটা বেশি আশাই হয়ে যাবে। কারণ তারা মানবিক বা মানবতার বিষয়টাকে আগেই শিকেয় তুলে রেখে পেশি শক্তি আর অপকৌশলকেই পাথেয় করে নিয়েছে। তাদের সামনে রূঢ় বাস্তবতাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ আর এটা হচ্ছে, জনগণের ক্ষোভ। কাজেই তারা কোন এক সুন্দর সকালে স্বচ্ছ গণতান্ত্রিক মানবতাবাদী হয়ে যাবেন এ আশা করা বাতুলতা।।