Home » আন্তর্জাতিক » এক ভারতে দুই দুনিয়া (পর্ব – ১)

এক ভারতে দুই দুনিয়া (পর্ব – ১)

india[ভারতকে বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্রের দেশ হিসেবে কথায় কথায় দৃষ্টান্ত তুলে ধরা হয়। কিন্তু ভারতীয় গণতন্ত্রে রয়েছে নানা ফাঁকফোকর, সাধারণ মানুষকে মূল ধারা থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলার নানা প্রচেষ্টা। ভারতের প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক কে এন পানিক্কর ২০১১ সালের ২৬ আগস্ট ফ্রন্টলাইন ম্যাগাজিনে তার ‘ডেমক্র্যাসি ডেফিসিট’ নিবন্ধে সুস্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করেছেন ওই সব বিষয়গুলো। বিষয়টি আজও প্রাসঙ্গিক হওয়ায় কয়েকটি পর্বে বাংলা ভাষান্তর পুনঃমুদ্রণ করা হলো]

সাংস্কৃতিক সমতা

একটি জাতি হিসাবে গড়ে উঠতে গিয়ে ভারতকে তার গণতন্ত্র চর্চায় সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের প্রভাবটি বিবেচনায় নিতে হয়েছে। ভারতীয় সভ্যতার শক্তিই হচ্ছে তার বহু বিচিত্র সংস্কৃতি। কিন্তু সাংস্কৃতিক সমতার অভাবে ভারতের বহু জনগোষ্ঠীই মূলধারার জীবন প্রবাহের বাইরে থেকে গেছে। বর্ণভেদ প্রথা এবং ধর্মীয় বৈষম্যের কারণে সাংস্কৃতিক বিভাজন জন্ম নিয়েছে এবং তা গণতন্ত্রের চর্চায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। ঊনিশ শতকের নবজাগরণ কিংবা জাতীয় আন্দোলন কোনোটিই একটি সাংস্কৃতিক সমতার আবহ তৈরি করতে পারেনি। অথচ এই দুটি সময়েই ধর্মীয় এবং সামাজিক ক্ষেত্রে সংস্কার আন্দোলন চালু ছিল। দীর্ঘকালব্যাপী চলতে থাকা স্বাধীনতা আন্দোলন বিভিন্ন সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীকে অভিন্ন এক লক্ষ্য অর্জনে একত্রিত করেছিল। কিন্তু যে সংস্কৃতিক সীমারেখা সমাজের বিভিন্ন অংশকে বিভক্ত করে রেখেছিল সে সব সীমারেখা মোচনে এটি তেমন কোনো ভূমিকা রাখতে পারেনি। ফলে স্বাধীনতা লাভের পর পরই ভারত যে জাতি গঠন প্রক্রিয়া শুরু করে সেখানে বর্ণ ও ধর্মের ভিত্তিতে জন্ম নেয়া সাংস্কৃতিক বিভাজন বড় ধরনের একটি নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছিল। সমাজটি ছিল নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্যসূচক বিভিন্ন সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীর সমন্বয়ে গড়ে ওঠা।

এক নৃতাত্ত্বিক জরিপ থেকে দেখা গেছে, ভারতে সুনির্দিষ্ট সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যমন্ডিত অন্তত ৪ হাজার জনগোষ্ঠী রয়েছে। বৈচিত্র্য মানেই বহুত্ববাদ এবং সহাবস্থান। এতে করে সমাজ পুরো মাত্রায় একটি অখন্ড অবয়ব যদি নাও পায় তবু অন্তত সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সাংস্কৃতিক আদানপ্রদান তাদের সবাইকেই সমৃদ্ধ করতে পারে। এমন একটি সাংস্কৃতিক জীবন মাথায় রেখেই ভারতের জাতীয় আন্দোলন গড়ে উঠেছিল। আর একটি গণতান্ত্রিক সমাজের জন্যও এটি ছিল খুবই জরুরি। গান্ধীজি এই ধারণাটিকে সমর্থন করেছিলেন এবং অতীত ভারতের অসাম্প্রদায়িক চরিত্রের ব্যাখ্যাবিশ্লেষণের মধ্যদিয়ে জওহরলাল নেহেরু একে এগিয়ে নিতে চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু হিন্দু এবং মুসলমানদের মধ্যে জন্ম নেয়া সাম্প্রদায়িক চেতনা ভারতীয় সভ্যতার বহুবিচিত্র সাংস্কৃতিক ধারণাকে অস্বীকার করে বসল। বিনায়ক দামোদর সাভারকার এবং মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ জাতি সম্পর্কে যে সাংস্কৃতিক ব্যাখ্যা হাজির করলেন সেখানে একটি সাংস্কৃতিক ঐক্য গড়ে তোলার জাতীয় প্রচেষ্টাকে খুবই গুরুত্বহীন করে উপস্থাপন করা হলো।

ঊনিশ শতকে অভ্যন্তরীণ সংস্কার থেকে শুরু করে লোকগণনাসহ আরো বেশ কিছু কারণে ধর্মীয় সম্প্রদায় এ বর্ণ গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে এমন একটি উপলব্ধি প্রসার লাভ করে যা তাদের অন্যান্য বিষয়ের পাশাপাশি নিজ নিজ গোষ্ঠীগত স্বাতন্ত্র্য রক্ষার ব্যাপারেও অনেক বেশি সজাগ করে তুলেছিল। শুরুর দিকে স্বাতন্ত্র্যের এ ব্যাপারটি কেবল সামাজিক ক্ষেত্রেই দৃশ্যমাণ ছিল। নিজ নিজ গোষ্ঠীর স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখেই তারা সামাজিকভাবে উপরের দিকে উঠতে চাইছিল। পাশাপাশি এদের অনেকেই নিজেদের সামাজিক ও ধর্মীয় আচরণে পরিবর্তন এনে এবং শিক্ষা গ্রহণের মাধ্যমে আধুনিক হয়ে ওঠার চেষ্টা করছিল। তবে এ আধুনিকায়নে প্রচেষ্টা কিন্তু তাদের মধ্যেকার গোষ্ঠীগত পরিচয়ের সীমাকে মুছে ফেলতে কিংবা দুর্বল করে দিতে পারেনি। বরং বিস্ময়করভাবে এ বিভাজন রেখা আরো বেশি শক্তিশালী এবং স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। পেশাগত বিচলন কিংবা বর্ণ পরিচয়ের গোষ্ঠীতন্ত্র ভেঙে যাওয়ার মধ্য দিয়েও বর্ণভেদ প্রথায় খুব একটা পরিবর্তন এসেছিল তাও বলা যাবে না।

বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিক থেকেই বর্ণগত পরিচয়টি সামাজিক ক্ষেত্রে আরো বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে শুরু করে। এ সময় রাজনীতিতেও বর্ণগত পরিচয়ে প্রতিনিধিত্বের সুযোগ দেখা দেয়। এ সুযোগ বর্ণ সম্প্রদায়ের মানুষ এর আগে আর কখনো ভোগ করেনি। বিংশ শতাব্দীতে সম্প্রদায়গত প্রতিনিধিত্বের সুযোগ পেয়ে বর্ণ সম্প্রদায়ের মানুষ রাজনৈতিকভাবে নিজেদের আলাদা পরিচয়ে সংগঠিত করতে প্রয়াসী করল। তারা ইতোমধ্যেই তৈরি হয়ে থাকা নিজেদের বর্ণভিত্তিক সামাজিক পরিচয়টিকে কাজে লাগাতে পেরেছিল যা ছিল গণতান্ত্রিক চেতনারই পরিপন্থী। নেহেরু এ বর্ণ প্রথার ধারণা ও চর্চাকে আভিজাত্যের প্রতিভূ এবং গণতান্ত্রিক চেতনার বিপরীত বলেই মনে করতেন।

ধর্মের প্রভাব : একই সময়ে ধর্মীয় সম্প্রদায়গুলোর মধ্যেকার পার্থক্যও ক্রমাগতভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছিল। তাদের মধ্যেকার পাস্পরিক সম্পর্কও ক্রমান্বয়ে তিক্ততার দিকে গড়াচ্ছিল। ঘটনাক্রমে এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল ব্যক্তি জীবনকে ছাড়িয়ে গিয়ে ধর্মের প্রভাব জনজীবনে পড়তে থাকার ক্রান্তিকালটি। এই ক্রান্তিকালীন প্রবণতার বড় দুটি পরস্পর সম্পর্কিত ও সাম্প্রতিক উদাহরণ হলো সমাজের ধর্মীয়করণ এবং ধর্মকে বাণিজ্যিক পণ্যে পরিণত করা। যেমন আজকাল বিপুল পরিমাণে নতুন নতুন ধর্মীয় উপাসনালয় তৈরি হচ্ছে এবং তীর্থ যাত্রীদেরও সংগঠন জন্ম নিচ্ছে। নেহেরু বাধ এবং কারখানাকে নতুন ভারতের উপাসনাগার বা মন্দির হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন। রাষ্ট্র বর্তমানে প্রয়োজনীয় সংখ্যক বাঁধ এবং কারখানা তৈরি করতে না পারলেও দেশে মন্দির এবং মসজিদের সংখ্যা রেকর্ড পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েই চলেছে। সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, কয়েক বছর ধর্মের প্রতি বিশ্বাস এবং ধর্মীয় রীতিনীতি পালনের প্রবণতা বিশ্বব্যাপী ব্যাপকভাবে বেড়ে গেছে। এ প্রবণতাটি বুঝতে পারার জন্য সম্ভবত কোনো প্রমাণ হাজির করার প্রয়োজন নেই। যে হারে পুণ্যার্থীরা তীর্থস্থানগুলোর দিকে ঝুঁকছে তা থেকেই বোঝা যায় ধর্মের প্রতি আস্থা কতটা বৃদ্ধি পেয়েছে। কারণ যাই থাক, মধ্যবিত্তের সঙ্কট, উন্নত অবকাঠামো, পরিবহন এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা মিলে ধর্মকে এখন একটি বাণিজ্যিক পণ্যে পরিণত করে ফেলেছে।

ধর্মীয় এবং আনুষঙ্গিক কর্মকাণ্ডকে ঘিরে কী পরিমাণ অর্থের বাণিজ্য হয়ে থাকে তা পরিমাপ করা কঠিনই। তীর্থস্থানগুলোকে ঘিরে বহু ধরনের ব্যবসাবাণিজ্যের প্রসার ঘটেছে। এর মধ্যে একটি হচ্ছে পুণ্যার্থ পর্যটন। এসব প্রবণতা বৃদ্ধি পাওয়ার বড় কারণ হলো সমাজ ধর্মীয় পরিচয়ে বিভাজিত হয়ে পড়েছে। এটি অসাম্প্রদায়িক চেতনার প্রসারে একটি বড় বাধা। ধর্ম এবং ধর্ম নিয়ে বাণিজ্য ক্রমাগত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠার প্রভাব কিন্তু অসাম্প্রদায়িক চেতনার ক্ষেত্রগুলোর ওপরও পড়ছে। এ প্রভাব সবচেয়ে বেশি লক্ষণীয় রাজনীতিতে। ফলে একদিকে রাজনীতির যেমন ধর্মীয়করণ ঘটছে অন্যদিকে তেমনি ধর্মেরও ঘটছে রাজনীতিকীকরণ। ধর্ম তাই ভারতের বর্তমান রাজনীতিতে অতি শক্তিশালী একটি অস্ত্র। এটিকে এমন কি ধর্মনিরপেক্ষ রাজনৈতিক দল এবং ব্যক্তিরাও ক্ষমতায় যাওয়ার অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে থাকে। ফলে ধর্ম সাধারণ মানুষের জীবনেও স্থায়ী আসন গেড়ে বসছে এবং সেখান থেকে অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে বেশ ভালোভাবেই বিদায় করে দিচ্ছে। সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের নাম করে ধর্মীয় সংগঠনগুলোর সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলছে। হিন্দুদের মধ্যে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ অসংখ্য বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানের জন্ম দিয়েছে যেগুলো সামাজিক জীবনের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কাজ করছে। জনসংঘ এবং পরে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) মাধ্যমে রাজনীতিতেও তারা তাদের উপস্থিতি জানান দিয়েছে। মুসলমানদের ক্ষেত্রেও অনুরূপ ঘটনাই ঘটেছে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে রাষ্ট্রের মনোভাব এক্ষেত্রে দোদুল্যমান এবং আপসকামীই থেকে গেছে। ফলে ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতিতে ধর্মের হস্তক্ষেপ উৎসাহিত হয়েছে। বাবরী মসজিদ বিতর্কে রাষ্ট্রের ভূমিকা এক্ষেত্রে বড় একটি উদাহরণ হয়ে আছে। ধর্মনিরপেক্ষতার প্রতি রাষ্ট্রের অঙ্গীকার দিন দিন যে কমে যাচ্ছে সাম্প্রতিক সময়ে ভারতীয় গণতন্ত্রের জন্য তা এক ভয়ঙ্কর হুমকি।

জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সময় ভারতের রাজনীতিতে বর্ণ প্রথা এবং ধর্মের উপস্থিতি অনেকটা অন্তরালবর্তীই ছিল। তবে এর পর থেকে নাটকীয়ভাবেই অবস্থার পরিবর্তন ঘটতে থাকে। বর্ণ প্রথা এবং ধর্মভিত্তিক দলগুলো ক্রমেই রাজনীতির পাদপ্রদীপে চলে আসতে শুরু করে এবং বর্তমানে এরা রাজনৈতিক অঙ্গনে বেশ বড় একটি জায়গাই দখল করে আছে। তাদের প্রভাব এতটাই বেশি যে, বেশ কয়েকটি রাজ্যেই বর্ণভিত্তিক রাজনৈতিক দল ক্ষমতায়ও অধিষ্ঠিত হয়েছে। পাশাপাশি কেন্দ্রের শাসন ক্ষমতা দখল করতে পারার মধ্যদিয়ে হিন্দু সাম্প্রদায়িক শক্তিগুলো বড় ধরনের এক রাজনৈতিক অগ্রগতিই সাধন করেছে। আরো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বর্ণাশ্রয়ী এবং ধর্মীয় চেতনা এখন এতটাই শক্তিশালী রূপ নিয়েছে যে, প্রায় সব রাজনৈতিক দলই এখন বর্ণ ও ধর্মভিত্তিক দলগুলোর সমর্থন লাভের আশায় চেয়ে থাকে। বর্ণ প্রথা বিরোধিতা এবং ধর্মীয় সংঘাত এখন তাই দৈনন্দিন বাস্তবতায় রূপ নিয়েছে। অন্যদিকে সমঝোতা ও সাংস্কৃতিক আদানপ্রদানের ঐতিহ্য নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে। ফলে ধর্ম এবং বর্ণসমূহের মধ্যেও পার্থক্য দিন দিন বেড়েই চলেছে। হিন্দুরা মুসলমানদের সাংস্কৃতিকভাবে নিম্নস্তরের মনে করে। আর হিন্দুদের মধ্যেই আবার দলিতসহ অন্য নিম্নবর্ণের মানুষ সাংস্কৃতিকভাবে নিগ্রহের শিকার হচ্ছে। সংস্কৃতির ক্ষেত্রে এ উঁচু নিচু ভেদাভেদ চর্চা গণতন্ত্রবিরোধী একটি আবহের জন্ম দিয়েছে। সাংস্কৃতিক অসাম্যের কারণে বড় একটি জনগোষ্ঠী সংস্কৃতির মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্ন থেকে গেছে এবং এর ফলে সমাজের মধ্যে একটি অন্তহীন উদ্বেগউৎকণ্ঠা বিরাজ করছে।।