Home » রাজনীতি » এরশাদীয় রাজনৈতিক দূষণ :: শেষ কোথায়

এরশাদীয় রাজনৈতিক দূষণ :: শেষ কোথায়

শাহাদত হোসেন বাচ্চু

political-cartoons-42বিয়াল্লিশ বছর বয়সী বাংলাদেশের রাজনীতিতে সবচেয়ে সুবিধাভোগী ও সৌভাগ্যবান ব্যাক্তিটি কে? ধীরগতিতে গলফ খেলা, চমৎকার খাবার, সুশ্রী পোষাক আর স্মার্ট নারী পছন্দ করা মানুষটি কে? স্বৈরাচার, হত্যা, বিশ্ব বেহায়াএই তিনটি উপাচার কার নামের সাথে যায়? বাংলাদেশে সবচেয়ে অসত্যবাদী ও জোকার রাজনীতিবিদ হিসেবে বাঙালিরা কাকে মনে করে? দেশের যে কোন প্রান্তে দাঁড়িয়ে প্রশ্নটি করা হলে মুষ্টিমেয় কিছু লোক বাদে সকলেই বলবেন, এটি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। আমাদের প্রায় একদশকের দোর্দন্ডপ্রতাপ সাবেক রাষ্ট্রপতি, সাবেক সেনা প্রধান, জাতীয় পার্টি নামে দলছুট ব্যাক্তিদের একটি রাজনৈতিক দলের জন্মদাতা ও চেয়ারম্যান এবং বর্তমানে মন্ত্রীর মর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত হিসেবে নিয়োজিত। তাকে সুবিধাভোগী ও সৌভাগ্যবান বলা হয়েছে এ কারনে যে, পৃথিবীর অন্য যে কোন দেশে তার জন্ম হলে যুদ্ধাপরাধ, রাষ্ট্রদ্রোহিতা, খুন, রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুন্ঠন ও পাচারসহ অসংখ্য অভিযোগে বিচারের মুখোমুখি হতে হোত এবং চরম দন্ড বা নিদেন পক্ষে আজীবন জেলের ঘানি টানতে হতে পারত। নব্বইয়ের গণঅভ্যূত্থানে পতিত হবার পরে বছর পাঁচেক জেল খাটা ছাড়া পরবর্তীকালে এরশাদ সবসময়ই কোন না কোন ফর্মে ছিলেন রাষ্টীয় ক্ষমতার অংশীদার, আর এখন তো প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত।

একাত্তরের ২৫ মার্চে পাকিস্তানী হানাদাররা যখন বাঙালিদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল এরশাদ তখন রংপুরে ছুটি ভোগ করছিলেন, মুক্তিযুদ্ধে যোগ না দিয়ে এপ্রিলে চলে যান পাকিস্তানে। সেপ্টেম্বরে অসুস্থ পিতাকে রংপুরে দেখতে এসে আবার ফিরে যান। তখন সপ্তম ইষ্ট বেঙ্গলের অধিনায়ক হিসেবে পাকিস্তানের পক্ষে তিনি যুদ্ধে অংশগ্রহন করেন যখন মুক্তিযোদ্ধারা পাক হানাদারদের বিরুদ্ধে মরনপন লড়াইয়ে অবতীর্ন। ১৯৭২ সালে আটকে পড়া বাঙালি অফিসার ও সৈন্যদের দেশদ্রোহিতার বিচারে গঠিত ট্রাইবুনালের চেয়ারম্যান নিযুক্ত হয়েছিলেন লেঃ কর্নেল এরশাদ। ১৯৭৩ সালে ফিরে এসে এ সকল অপরাধে স্বাধীন বাংলাদেশে বিচারের মুখোমুখি হবার বদলে কর্নেল এরশাদ বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর এ্যাডজুট্যান্ট জেনারেলের মত অতি গুরুত্বপূর্ন পদে নিযুক্ত হন। সেনাবাহিনীতে তার সৌভাগ্যের এখানেই শেষ নয়, মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে গঠিত সেনাবাহিনী প্রধান হিসেবে নিয়োগ লাভ করেন ১৯৭৭ সালে, কোন ব্রিগেড বা ডিভিশন কমান্ড করার অভিজ্ঞতা ছাড়াই। ধারনা করা হয় মরহুম জিয়া সম্ভবত এরশাদের মত সেনাপ্রধান চেয়েছিলেন, যিনি তার বিরুদ্ধে অভ্যূত্থান করতে সাহসী হবেন না এবং অর্থ লালসা আর নারী নিয়ে ব্যস্ত থাকবেন। পরবর্তী ইতিহাস প্রমান করেছে, এরশাদ সম্পর্কে এই ধারনা কতবড় ভুল ছিল।

১৯৮১ সালের ৩০ মে রাতে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে অবস্থানকালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়া নিহত হওয়ার ঘটনায় ১৯৮৩ সাল থেকে দায়ী করে আসলেও বিএনপি চেয়ারপারসন ও তিনবারের প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া এরশাদকে বিচারের মুখোমুখি করাতে পারেননি। উল্টো তার ছেলে তারেক রহমান ‘এরশাদ চাচার’ সাথে ২০০৬ সালে দেখা ও বৈঠক করে একটি রাজনৈতিক আঁতাতের চেষ্টা করেছিলেন। জিয়া হত্যার অভিযোগে দায়েরকৃত মামলাটিও এখন হিমাগারে। এরশাদ জিয়া হত্যার সাথে জড়িত ছিলেন কিনা সেটি তদন্ত সাপেক্ষ, তবে তিনিই যে জিয়া হত্যাকান্ডের মূল বেনিফিশিয়ারি, পরবর্তী সকল ঘটনাবলীই সেদিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে। অন্যদিকে, জিয়া হত্যায় প্রধান অভিযুক্ত জেনারেল মঞ্জুরের এক্সষ্ট্রা জুডিশিয়াল খুনের ঘটনায় বহু কাঠখড় পুড়িয়ে বিচারাধীন মামলায় চুড়ান্ত রায়ের অপেক্ষায় এরশাদ ও তার সহযোগীরা। বিচারাধীন মামলার বিষয়ে মন্তব্য করা যায়না, তবে চুড়ান্ত রায় ঘোষনার আগে এই মামলার বিচারক পরিবর্তন হয়েছে এবং জনগনের মধ্যে একটি নেতিবাচক পারসেপসন তৈরী হয়েছে। কারন জনগন ইলেকট্রনিক মিডিয়ার কল্যানে দেখতে পাচ্ছে, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত হিসেবে জাতীয় পতাকাবাহী গাড়িতে চড়ে মামলায় হাজিরা দিতে এসেছিলেন এরশাদ।

১৯৮২ সালে এরশাদ ক্যুদেতা হিসেবে একটি নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করে সদলবলে ক্ষমতাসীন হবার পরে রাষ্ট্রের মৌলিক চরিত্র বদলে দেয়ার জন্য প্রায় সবকিছুই করেছেন। রাজনীতিকে অর্থনৈতিক উন্নয়ন দিয়ে ঢাকতে চেয়েছেন প্রতিষ্ঠানগুলিকে দুর্নীতিগ্রস্থ করার মধ্য দিয়ে। রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার সুনিশ্চিত করেছেন। সংবিধানে রাষ্ট্রধর্ম ইসলামকে সন্নিবেশিত করেছেন। দুর্নীতিকে বিকেন্দ্রীভূত করেছেন। গনতন্ত্র ও অর্থনেতিক উন্নয়নের মাঝে সব রকম অনৈতিকতাকে ব্যবহার করে দেশ শাসন করেছেন প্রায় দশককাল। সামরিক বাহিনীকে বেসামরিক প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে কাজে লাগিয়েছেন। অসত্য আর শঠতার ফুলঝুড়ি ছড়িয়ে উন্নয়নের একটি মিথ গড়ে তুলে দেশব্যাপী একটি টাউট রাজনৈতিক গোষ্ঠি গড়ে তুলেছেন সুণিপুনভাবে। তার শাসনামলেই অনেক অনামী, অচেনা, অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল মানুষ রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতায় হয়ে উঠেছে রাজনীতিঅর্থনীতির নিয়ামক। এর ফল হয়েছিল সুদুরপ্রসারী। নীতিহীন রাজনীতির নামে একটি বিশেষ শ্রেনীকে অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী করার এরশাদীয় এই মডেলটি পরবর্তীকালে সকল শাসকরাই কাজে লাগিয়েছেন। ফলে রাষ্ট্রের গনতান্ত্রিক চরিত্র বারবার পড়ছে চ্যালেঞ্জের মুখে।

বিরোধিতা ও ভিন্নমত দমনে এরশাদ কতটা নিষ্ঠুর ও নির্মম ছিলেন সে বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনায় না গিয়ে আমরা মনে করতে চাই ১৯৮৩ সালেন ১৪ ফেব্রুয়ারি তারিখের কথা। যে দিনটি এখন বাংলাদেশে ভালবাসা দিবস হিসেবে পালিত হয়। রক্স্নাত এই দিনটিকে কিছু সাধারন মানুষ ও প্রত্যক্ষদর্শী ছাড়া আর কেউ মনে রাখেনি। এরশাদের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে ঐদিন হাজার হাজার ছাত্রজনতা সমবেত হয় আন্দোলনের সূতিকাগার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায়। এখান থেকে ছাত্রদের মিছিল শিক্ষাভবনের সামনে চলে আসলে পুলিশের গুলিতে নিহত হয় জয়নাল, জাফর, মোজাম্মেল, কাঞ্চন, দিপালী সাহাসহ ৮ জন। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনাসহ দুই নারী নেত্রী গ্রেফতার হন। এভাবেই নয় বছরে আন্দোলন দমনের নামে এরশাদের নির্দেশে হত্যা করা হয় সেলিম, দেলোয়ার, রাউফুন বসুনিয়া, জেহাদসহ নাম না জানা অনেক ছাত্রছাত্রীকে। ডাঃ মিলন, নুর হোসেন, ময়েজ উদ্দীনের হত্যাকারী হিসেবে অভিযুক্ত এরশাদকে ১৯৯০ সালে গণঅভ্যূত্থানে ক্ষমতাচ্যূত হয়েও বিচারের মুখোমুখি হতে হয়নি।

এর মূল কারণ হচ্ছে, আওয়ামী লীগ, বিএনপি পরবর্তীকালে যে কোন অবস্থায় ক্ষমতায় টিকে থাকার এরশাদীয় কৌশল অনুসরন করতে গিয়ে বার বার এরশাদেরই দ্বারস্থ হয়েছে। নিজেদের দলের ভেতরে তো নয়ই, শাসক হিসেবে সংসদে, রাষ্ট্র পরিচালনায়কোথাওই ন্যায্যতা ও নীতিকে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়নি। ব্যাক্তি, পরিবার আর আত্মীয়তাকে প্রধান্য দিয়েছে সর্বস্তরে। সে হিসেবে এরশাদ সফল তার অনৈতিক রাজনীতির দূষণ প্রধান রাজনৈতিক দল ও গনতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলিকে আক্রান্ত করেছে পরম স্বার্থকতায়। ১৯৮৬ সালে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবাহী দল আওয়ামী লীগকে সাথে পেয়েছেন সামরিক শাসন থেকে তথাকথিত গনতন্ত্র যাত্রায়। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি সাংবিধানিক নিয়ম রক্ষার নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে সঙ্গ দিয়েছেন পরম কৃতজ্ঞতায় নানান ভানুমতির খেল দেখিয়ে! উইনিং সাইডে খেলার নীতি নিয়ে করা রাজনীতিতে সব ধরনের নীতিহীনতাই তার আদর্শ। একটা সময়ে শেখ হাসিনা, খালেদা জিয়া ছিলেন তার প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ। রাষ্ট্রশক্তি ব্যবহার করে তাদের ও দলকে করেছেন চরম নিপীড়ন। তারপরেও এরশাদকে জোটে ধরে রাখতে বা জোটে পেতে কখনো রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার লোভ, নগদ অর্থ, জেলের ভয়, মামলার হুমকি, সাজার ভয়সব মিলিয়ে দু’নেত্রীর প্রাণান্তকর চেষ্টা দেশের রাজনীতিকে দেউলিয়া করে দিয়েছে। নীতিহীনতা দিয়ে এরশাদ দু’নেত্রীকে জয় করে নিয়েছেন, ক্ষমতার নোংরা খেলায় নিজের অপরিহার্যতা প্রমান করে।

জেনারেল জিয়া সামরিক শাসনের আওতায় রাজনীতিকে ডিফিকাল্ট করার কথা বলেছিলেন। মুখে অনেকেই জিয়ার বিরোধিতা করলেও প্রায় সকলেই জিয়ার পথ অনুসরন করেছেন রাজনীতিকে রাজনীতিবিদদের জন্য আরো ডিফিকাল্ট করে তুলে। এই যাত্রায় এরশাদ কখনো গোপনে, কখনো প্রত্যক্ষ থেকেছেন। স্বৈরশাসক হিসেবে বাংলাদেশে প্রথম গনঅভ্যূত্থানে পতিত হবার পরেও প্রাক্তন শত্রুপক্ষকে মিত্র হিসেবে পেয়েছেন। এক্ষেত্রে তিনি যদি আওয়ামী লীগের সঙ্গ ছাড়েন, বিএনপি মুখিয়ে আছে তাকে সঙ্গী করার জন্য। তার রাজনীতির মূল অনুসঙ্গ হচ্ছে, নীতিহীনতা ও ভ্রষ্টাচার। তিনি কখনোই নীতি মানেননি, ন্যায্যতা চাননিদলের মধ্যে, দেশের মধ্যে, কোথাওই না। বাংলাদেশের রাজনীতিতে দু’কূল রক্ষা করে কি করে অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা যায়, সেই চর্চা তিনি করেই যাচ্ছেন। রাজনীতির এই এরশাদ এখনও অনুকরনীয় এবং অনুসরনীয় হয়ে উঠেছেন আমাদের বড় দুই দলের কাছে। আর সে কারনেই একদা স্বৈরাচার, রাষ্ট্রদ্রোহিতা, হত্যা, দুর্নীতি ও অনৈতিকতার দায়ে অভিযুক্ত এরশাদ বিচারের মুখোমুখি হবার বদলে রাষ্ট্র ক্ষমতার অংশীদার, গনতন্ত্র আর মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গী!