Home » অর্থনীতি » কুইক রেন্টাল :: ২০ সাল পর্যন্ত ক্ষতি ২ লাখ কোটি টাকা (দ্বিতীয় পর্ব)

কুইক রেন্টাল :: ২০ সাল পর্যন্ত ক্ষতি ২ লাখ কোটি টাকা (দ্বিতীয় পর্ব)

বি.ডি.রহমতউল্লাহ

loadshaddingবিগত সংখ্যায় রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল বিদ্যুতের ক্ষেত্রে সরকারিভাবে যে সব ব্যতয়গুলো করা হয়েছে তার বিবরণ দেয়া হয়েছে। এ পর্বে আরও যে ব্যতয়গুলো রয়েছে সে সম্পর্কে আলোচনা করা হচ্ছে।

() রেন্টাল সিস্টেমে টেন্ডার পরিহার করা হয় ফলে অর্থ কামাবার জন্য নিজেদের পছন্দমতো অথর্ব লোকদের দিয়ে অবৈধ অর্থ ভাগাভাগি করার বিরাট সুযোগ সৃষ্টি হয় বিধায় একেবারেই নিম্নমানের কাজ হয়।

() জনেজনে আলাপের মাধ্যমে কার্যাদেশ শুধু অবৈধ অর্থের ভাগাভাগিতে ইচ্ছে মতো দর বৃদ্ধির সুযোগই থাকে না, এ ধরনের “আলাপী টেন্ডার”এর ফলে কতো পুরনো বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র বসানো যায় ঠিকাদার ও কর্ম্মকর্তাদের মধ্যে বোঝাপড়ার পথও সুগম হয়।

() যেহেতু পুরোনো উৎপাদন কেন্দ্র বসানো হয়সেগুলি অদক্ষ বিধায় দক্ষ নতুন বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রের তুলনায় সমপরিমান বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে ১২৫শতাংশ থেকে ১৫০শতাংশ গুন বেশী জ্বালানী ব্যবহৃত হয়। তাতে জ্বালানী বাবদ সরকারের তথা জনগনের বিপুল অর্থের অপচয় হয়, বিদ্যুতের অহেতুক দর বাড়ে, দূষণ বৃদ্ধি পায়।

() বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রে ব্যবহৃত জ্বালানী সরকার কর্তৃক সাবসিডি রেটে সরবরাহ করা হয় বলে বিদ্যুৎ উৎপাদন কারীরা প্রচুর অপচয় করছে এবং জ্বালানীর হিসেব গড়মিল করে বাজারে বিক্রি করার সুযোগ নিচ্ছে।

() পুরনো উৎপাদন কেন্দ্র বসানো হয় বলে উৎপাদন কেন্দ্রের নির্ভরশীলতা অত্যন্ত কম। ইতোমধ্যেই আমরা দেখলাম ঘোষিত ৩০০০ মেঃ ওয়াট এর মধ্যে বর্তমানে সর্বাধিক ১০০০/১২০০ মেঃ ওয়াট চালু আছে।

সবচেয়ে মজার বিষয় রেন্টাল এবং তথাকথিত কুইক রেন্টাল পাওয়ার ষ্টেশনের নামে যে দর নির্ধারণ করা হয়েছেশুধু এই একটি কারনেই বাংলাদেশ যে অচিরেই দূর্নীতির শীর্ষে উঠবে সে বিষয়ে ধারনা করা যায়। রেন্টাল ও কুইক রেন্টালের ট্যারিফ কত হওয়ার দরকার তা নির্ধারণ করার পূর্বে পাঠকদের সুবিধার্থে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে ট্যারিফ নিয়ে আলোচনা করছি। বিদ্যুৎ হার (ট্যারিফ) নির্ধারনে নিচের দুটি উপাত্ত ধরা হয়।

আমরা জানি ১টি ১০০ মেগাওয়াট নোতুন ডিজেল এবং ফার্নেস ওয়েল ভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রের সর্বমোট ক্রয়মূল্য দাঁড়ায় ৫০০ কোটি টাকা এবং একটি পুরনো ১০০ মেঃ ওয়াট রেন্টাল পাওয়ার স্টেশনের ক্রয়মূল্য কিছুতেই ১০০কোটির বেশী নয়।

এর সাথে পরিচালন ব্যয় অর্থ্যাৎ জ্বালানী ব্যয় ও বেতন ভাতাদি যুক্ত হয়ে মোট ট্যারিফ নির্ধারণ করা হয়।

আমরা যেহেতু জানি বাংলাদেশের প্রায় ৮০শতাংশ রেন্টাল পাওয়ার স্টেশনই পুরোনো, হিসেবের সুবিধার্থে আপাততঃ সবগুলোকে পুরোনো ধরে আমরা রেন্টাল পাওয়ার স্টেশনের গড় ট্যারিফ কতো হতে পারে সেটি আগে বের করে নেই, পুরোনো বিধায় ২০শতাংশ জ্বালানী বেশী লাগবে বিধায় এর দর বাড়িয়ে প্রকৃত মূল্য কতো হবে তা পরখ করে দেখে নেই কিভাবে এক্ষেত্রে আমাদের প্রতারণা করা হয়েছে। এখানে উল্লেখ্য যে রেন্টালের ক্ষেত্রে চুক্তি অনুযায়ী অনেক কিছুই স্পন্সরকে দিতে হবে না; যথা ভূমি ক্রয় ও উন্নয়ন বাবদ প্রদত্তমূল্য, জ্বালানী সরবরাহের জন্য ভৌত অবকাঠামো নির্মান বাবদ প্রদত্ত ব্যয় ইত্যাদি। এগুলো সরকার দিবে।

এখানে রেন্টাল এর ক্ষেত্রে ১টি বিষয় বিবেচনা করতে হবে। যেহেতু এটি ৩, ৫ ও ৭ বছরের চুক্তি এজন্য অল্প সময়ে টাকা উঠানোর জন্য ট্যারিফ বৃদ্ধি করতেই হবে। কারণ অল্প সময়ে লাভ উঠাতে দর বৃদ্ধি খুবই যৈাক্তিক। অর্থ্যাৎ একই উপকেন্দ্র যদি ১৫ বছরের জন্য বসানো হয় তার লাভের সমান লাভ করতে যে দর দিবে ৭ বছরের জন্য বসানো উপকেন্দ্র থেকে সমান লাভ করতে হলে তার দর স্বাভাবিকভাবেই অনেক বেশী হবে। তবে কতো বেশী হবে তা বিচার বিশ্লেষণহিসাব করতে হবে।

ডিজেল ভিত্তিক রেন্টাল কেন্দ্রের,পুরান বিবেচনায় হিসেব করলে ট্যারিফ দাঁড়ায় ৮.০০ টাকা যেখানে ট্যারিফ ধরা হয়েছে ১৪.৮০টাকা। ফার্নেস ভিত্তিক রেন্টাল কেন্দ্রের, পুরান বিবেচনায় ট্যারিফ দাঁড়ায় ০৬.৬০ টাকা যেখানে ট্যারিফ ধরা হয়েছে ৮.৮০টাকা অর্থ্যাৎ ডিজেলের ক্ষেত্রে আমাদের সরাসরি প্রতারণা করা হচ্ছে (১৪.৮০.০০) .৮০ আর ফানের্সের ক্ষেত্রে আমাদের প্রতারণা করা হচ্ছে (.৮০.৬০).২০। এক্ষেত্রে হিসেবের সুবিধের জন্য দর নির্ধারনে প্রতারণার পরিমানের গড়(ওয়েট ফ্যাকটর অনুযায়ী)টাকা ৭.০০ হিসেবে ন্যুনতম ২০০০ মেঃওয়াট এবং ৬০% প্ল্যান্ট ফ্যাক্টর ধরে নিজেদের অবৈধ অর্থ লুন্ঠনের জন্য শুধু ঠিকাদারকে অবৈধভাবে অতিরিক্ত টাকা দেয়া হচ্ছে বার্ষিক ৮,০০০হাজার কোটি টাকা।

এটা কিন্তু মোট ২০০০ মেঃ ওয়াট ধরে। যদি সরকারের ঘোষনা অনুযায়ী ৩০০০মেঃ ওয়াট তাহলে ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়াবে মোট ১২,০০০হাজার কোটি টাকা।

জ্বালানীতে ভর্তুকি

যে ভর্তুকির কথা সবাই বলাবলি করছে তা হলো বিদ্যুতের ভর্তুকি। ডিজেল ও ফার্নেস ওয়েলে প্রতি লিটরে ভর্তুকি যথাক্রমে ১২.০০ ও ৯.০০ টাকা হলে ভর্তুকির গড় দাঁড়ায় ১১.০০ টাকা তখোন মোট ভর্তুকি হয় যদি

() ২০০০ মেঃওয়াট হয় তাহলে বার্ষিক ভর্তুকির পরিমাণ ১২,০০০ কোটি টাকা

() আর সরকার ঘোষিত ৩০০০ মেঃওয়াট হয় তাহলে বার্ষিক ভর্তুকির পরিমাণ ১৮,০০০ কোটি টাকা

ভর্তুকির প্রকৃত বিভাজন

তাহলে স্পষ্টতই ভর্তুকির আমরা ৩টি ভাগ পেলাম

() টেন্ডার না করে ইচ্ছেমতো অবৈধ ভাবে দরবৃদ্ধির ফলে ভর্তুকির পরিমান দাঁড়াচ্ছে ৮০০০ কোটি টাকা। এর ফলে বিউবোর্ড প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ ১৪.৮০টাকা দরে ক্রয় করে বিক্রয় করছে গড়ে৭.৮০ টাকা। এতে বিউবোর্ডএ ক্ষতি দাঁড়াচ্ছে বার্ষিক ৮০০০ কোটি টাকা।

() টেন্ডার না করে ইচ্ছেমতো অবৈধ অর্থ আয়ের লোভে পুরোনো কেন্দ্র বসানোর ফলে ভর্তুকির পরিমান দাঁড়াচ্ছে ৮০০০ কোটি টাকা। যেহেতু জ্বালানী সরবরাহ করছে সরকার এবং এর ফলে সরকারকে অতিরিক্ত অর্থ অপচয় হচ্ছে বার্ষিক ৮০০০ কোটি টাকা।

() সরকার ডিজেল লিটর প্রতি ৭৩.০০ দরে এবং ফার্ণেস অয়েল ৬৯.০০দরে ক্রয় করে রেন্টাল ও তথাকথিত কুইক রেন্টালের কাছে যথাক্রমে লিটর প্রতি ৬১.০০ ও ৬০.০০ দরে বিক্রি করার ফলে শুধুমাত্র জ্বালানীর মূল্যবাবদ ভর্তুকি দিতে হচ্ছে ১২,০০০ কোটি টাকা।

সুতরাং সঠিক হিসেব করলে বর্তমানে রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল যদি ১০০০ মেঃ ওয়াট চালু থাকে তাহলে আমরা মোট বার্ষিক ভর্তুকি দিচ্ছি ২৮,০০০ কোটি টাকা। অর্থ্যাৎ উপরের () এর ৮,০০০ কোটি, () এর ৮,০০০ কোটি এবং () এর ১২,০০০ কোটি টাকার যোগফলের সমান। আমাদের ভাগ্য যদি ভালো হয় তাহলে সবাইর এই প্রার্থনা করাই উচিৎ যেনো রেন্টালের পরিমান আর না বাড়ে। এবং রেন্টাল যেনো আজই বন্ধ করে দেয়া হয়।

আর উল্টো হিসেবে আমরা যদি অন্ততঃ ন্যায্য মতো টেন্ডার করে যথাযথ দর ও পুরোনের পরিবর্তে নোতুন কেন্দ্র বসাতে পারতাম তাহলে কম জ্বালানীর ব্যবহার হতো বিধায় ভর্তুকির সর্বাধিক পরিমাণ কিছুতেই ৪,০০০কোটি টাকার বেশী দাঁড়াতো না। আর এসব রেন্টাল যদি ২০২০ পর্যন্ত চলে তাহলে অত্যন্ত সহজ হিসেবে প্রতি বছর ২০ হাজার কোটি টাকা ধরে ৭ বছরে মোট ভর্তুকির পরিমান দাঁড়ায় কমপক্ষে ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা। দেশকে ধ্বংস করার এর চেয়ে সহজ পদ্ধতি আর কি আছে। ২০০৯ সালে চালু হওয়া বিদ্যুতের এই ব্যবস্থায় সরকারকে ২০১৩ পর্যন্ত কমপক্ষে ৫০ হাজার কোটি টাকার ভর্তুকির শিকার হতে হয়েছে। ২০১৪ থেকে ২০২০ পর্যন্ত কুইক রেন্টাল ব্যবস্থা অব্যাহত থাকে তাহলে দেশের জন্য বিশাল এক ক্ষতির অংক দাঁড়াবে। ২০০৯ থেকে শুরু করে ২০২০ পর্যন্ত হিসাব করলে এ ক্ষতি কোনোক্রমেই ২ লাখ কোটি টাকার কম নয়। রেন্টাল না বসিয়ে অনেক সাশ্রয়ী পথে এবং ২ টাকা ট্যারিফে অনেক আগেই আমরা বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারতাম।।

চলবে