Home » বিশেষ নিবন্ধ » দ্রুত বিচার আইনের সময় বৃদ্ধি :: উদ্দেশ্য কি রাজনৈতিক?

দ্রুত বিচার আইনের সময় বৃদ্ধি :: উদ্দেশ্য কি রাজনৈতিক?

ইকতেদার আহমেদ

fast-processing-lawআমাদের দেশের একটি হলো উচ্চ আদালত আর অপরটি অধস্তন আদালত। উচ্চ আদালতে সুপ্রীম কোর্টের আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগ। অধস্তন আদালতে জেলা জজ, অতিরিক্ত জেলা জজ, যুগ্ম জেলা জজ, সিনিয়র সহকারী জজ, সহকারী জজ এবং বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতসমূহ। দেশের জনগণ বিচারকদের কাছ থেকে সবসময় ন্যায় বিচার প্রত্যাশা করে এবং সে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যেই দেশের সংবিধানের অনুচ্ছেদ নং ৯৪() ও ১১৬ক তে স্পষ্টরূপে ব্যক্ত করা হয়েছে যে, প্রধান বিচারপতি ও অন্যান্য বিচারক এবং বিচার কর্মবিভাগে নিযুক্ত ব্যক্তিগণ ও ম্যাজিস্ট্রেটগণ বিচারকার্য পরিচালনার ক্ষেত্রে স্বাধীন থাকবেন।

দেশের প্রচলিত আইনের অধীন কোন অপরাধ সংগঠিত হলে তা অপরাধের ধরণ অনুযায়ী সাধারণ বা বিশেষ আদালতে বিচার্য হয়। কোন্ ধরণের অপরাধ কোন্ আদালত কর্তৃক বিচার্য হবে এবং কোন্ ধরণের অপরাধে সাজা বা দন্ডের পরিমাণ কি হবে তা সবিস্তারে বিভিন্ন দন্ড আইনে উল্লেখ রয়েছে।

দ্রুত বিচার আদালত ও দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল আইন শৃঙ্খলা বিঘ্নকারীসহ কতিপয় অপরাধের দ্রুত ও তড়িৎ বিচারের লক্ষ্যে ২০০২ সালে গঠিত হয়। দ্রুত বিচার আদালত গঠনকালে আইন শৃঙ্খলা বিঘ্নকারী অপরাধ (দ্রুত বিচার আইন, ২০০২) এ উল্লেখ ছিল এ আইনটি কার্যকর হওয়ার তারিখ থেকে ৪ বছর বলবৎ থাকবে। পরবর্তীতে ৪ বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পূর্বক্ষণে আইনটির মেয়াদ ২ বছর বাড়ানো হয় এবং এরপর ২০১৪ পর্যন্ত তিন দফায় ২ বছর করে বাড়িয়ে সবশেষ ২০১৪ সালে আইনটির মেয়াদ আরও ৫ বছর বাড়ানো হয়।

আইন শৃঙ্খলা বিঘ্নকারী অপরাধ (দ্রুত বিচার) আইন, ২০০২ এ দ্রুত বিচার আদালত গঠন বিষয়ে বলা হয়েছে – ‘সরকার, সরকারী গেজেটে প্রজ্ঞাপন দ্বারা, এ আইনের উদ্দেশ্য পূরণকল্পে প্রত্যেক জেলায় এবং মেট্রোপলিটন এলাকায় এক বা একাধিক দ্রুত বিচার আদালত গঠন করতে পারবে এবং উক্ত প্রজ্ঞাপনে প্রত্যেকটি দ্রুত বিচার আদালতের স্থানীয় অধিক্ষেত্র নির্ধারণ করে দিতে পারবে।’ আইনটিতে প্রতিটি আদালত সরকার কর্তৃক নিযুক্ত একজন প্রথম শ্রেণীর ম্যাজিস্ট্রেট সমন্বয়ে গঠিত হবে মর্মে উল্লেখ রয়েছে।

আইন শৃঙ্খলা বিঘ্নকারী অপরাধ (দ্রুত বিচার) আইন, ২০০২ এ যে সকল অপরাধকে আইন শৃঙ্খলা বিঘ্নকারী অপরাধ গণ্য করা হয়েছে তা হলো ভয়ভীতি প্রদর্শন বা বেআইনী বল প্রয়োগ করে কোন ব্যক্তি, বা সংবিধিবদ্ধ সংস্থা, বা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে চাঁদা আদায় করা বা আদায়ের চেষ্টা করা; বা স্থলপথ, রেলপথ, জলপথ বা আকাশপথে যানচলাচলে প্রতিবন্ধকতা বা বিঘ্ন সৃষ্টি করা; বা ইচ্ছাকৃতভাবে কোন যানবাহনে ক্ষতি সাধন করা; বা ইচ্ছাকৃতভাবে সরকার বা কোন সংবিধিবদ্ধ সংস্থা বা কোন প্রতিষ্ঠান, বা কোন ব্যক্তির স্থাবর বা অস্থাবর যে কোন প্রকার সম্পত্তি বিনষ্ট বা ভাংচুর করা; অথবা কোন ব্যক্তির কাছ থেকে কোন অর্থ, অলংকার, মূল্যবান জিনিসপত্র বা অন্য কোন বস্তু বা যানবাহন ছিনতাই করা বা ছিনতাইয়ের চেষ্টা করা; অথবা কোন স্থানে, বাড়ীঘরে, দোকানপাটে, হাটেবাজারে, রাস্তাঘাটে, যানবাহনে বা প্রতিষ্ঠানে পরিকল্পিতভাবে বা আকস্মিকভাবে একক বা দলবদ্ধভাবে শক্তির মহড়া বা দাপট প্রদর্শন করে ভয়ভীতি বা ত্রাস সৃষ্টি করা; অথবা কোন সংবিধিবদ্ধ সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানের দরপত্র ক্রয়, বিক্রয়, গ্রহণ বা দাখিলে জোরপূর্বক বাধা প্রদান বা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা; অথবা কোন সরকারী বা সংবিধিবদ্ধ সংস্থা বা কোন প্রতিষ্ঠানের কোন কর্মকর্তা বা কর্মচারীকে বা তার কোন নিকটাত্মীয়কে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ভয়ভীতি প্রদর্শন করে উক্ত কর্মকর্তা বা কর্মচারীকে কোন কার্য করতে বা নাকরতে বাধ্য করা।

দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল গঠন বিষয়ে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল আইন, ২০০২ এ বলা হয়েছে সরকার, সরকারী গেজেটে প্রজ্ঞাপন দ্বারা সমগ্র দেশের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যক দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল স্থাপন করবে এবং প্রতিটি দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের এখতিয়ারভুক্ত এলাকা নির্দিষ্ট করে দিবে। এ বিষয়ে আইনটিতে আরও উল্লেখ রয়েছে যে, প্রত্যেক দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে একজন করে বিচারক থাকবেন এবং উক্ত বিচারক বিচারকর্ম বিভাগের জেলা জজ পদমর্যাদার কর্মকর্তাদের মধ্য ন্ত নিযুক্ত হবেন।

দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল আইন, ২০০২ এ মামলা স্থানান্তর বিষয়ে বলা হয়েছে সরকার, সরকারী গেজেটে প্রজ্ঞাপন দ্বারা, জনস্বার্থে হত্যা, ধর্ষণ, আগ্নেয়াস্ত্র, বিস্ফোরক দ্রব্য এবং মাদকদ্রব্য সংক্রান্ত অপরাধের বিচারাধীন কোন মামলা এর যে কোন পর্যায় ক্ষেত্রমতো দায়রা আদালত বা বিশেষ আদালত বা ম্যাজিস্ট্রেট আদালত থেকে বিচারের জন্য দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তর করতে পারবে।

মামলা স্থানান্তর বিষয়ে ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮ যা সচরাচর সকল সাধারণ আইন ও বিশেষ আইনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হয়, তাতে উল্লেখ রয়েছে যে, একজন মুখ্য মহানগর হাকিম অথবা মুখ্য বিচারিক হাকিম অথবা একজন প্রথম শ্রেণীর ম্যাজিস্ট্রেট যে কোন মামলা আমলে নেয়া পূর্ববর্তী তদন্তের জন্য এবং আমলে নেয়া পরবর্তী বিচারের জন্য ক্ষমতাপ্রাপ্ত ম্যাজিস্ট্রেটের নিকট স্থানান্তর করতে পারবেন। ফৌজদারি কার্যবিধিতে দায়রা আদালতকে উক্ত আদালতের বরাবরে যথাযথভাবে ক্ষমতাপ্রাপ্ত ম্যাজিস্ট্রেট কর্তৃক আসামী প্রেরিত না হয়ে থাকলে আদিঅধিক্ষেত্রের আদালত হিসেবে মামলা সরাসরি বিচারার্থে গ্রহণের ক্ষমতা দেয়া হয়নি।

উপরোক্ত বিধান ছাড়াও ফৌজদারি কার্যবিধিতে সুপ্রীম কোর্টের আপিল বিভাগকে হাইকোর্ট বিভাগের এক বেঞ্চ থেকে অপর বেঞ্চে মামলা স্থানান্তরের ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। এ বিষয়ে হাইকোর্ট বিভাগ সম্পর্কে বলা হয়েছে, উক্ত বিভাগের অধীনস্থ যে কোন ফৌজদারি আদালতে বিচারাধীন যে কোন মামলা প্রত্যাহারপূর্বক নিজ আদালতে বিচার করতে পারবে অথবা অধীনস্থ একটি ফৌজদারি আদালত থেকে অপর ফৌজদারি আদালতে স্থানান্তর করতে পারবে। মামলা প্রত্যাহার ও স্থানান্তর বিষয়ে একজন দায়রা জজকে তাঁর এখতিয়ারাধীন এলাকায় হাইকোর্ট বিভাগের অনুরূপ নিজ আদালতে অধস্তন আদালত থেকে প্রত্যাহারপূর্বক বিচার এবং তাঁর অধীনস্থ এক আদালত থেকে অপর আদালতে স্থানান্তরের ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। অনুরূপ ক্ষমতা মুখ্য মহানগর হাকিম, মুখ্য বিচারিক হাকিম এবং একজন জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকেও তাদের অধস্তন আদালতে যে মামলা তারা বিচার বা তদন্তের জন্য প্রেরণ করে থাকেন উক্ত মামলা বিষয়ে দেয়া হয়েছে।

দায়রা জজের আদালত এবং দায়রা জজের সমমর্যাদাসম্পন্ন আদালতসমূহে রাষ্ট্রের পক্ষে পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) মামলা পরিচালনা করে থাকেন। যে কোন মামলা ফৌজদারি আদালতে বিচারাধীন থাকাবস্থায় পাবলিক প্রসিকিউটর একজন আসামী বা সকল আসামী সংশ্লিষ্ট সরকার কর্তৃক আদিষ্ট হয়ে প্রত্যাহারের আবেদন করতে পারেন, তবে সে ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট আদালতের অনুমোদনের আবশ্যকতা রয়েছে।

আইন শৃঙ্খলা বিঘ্নকারী অপরাধ (দ্রুত বিচার) আইন, ২০০২ এবং দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল আইন, ২০০২ পর্যালোচনায় দেখা যায় দ্রুত বিচার আদালত নির্ধারিত সময়সীমা বেঁধে দিয়ে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে এবং প্রতিষ্ঠা পরবর্তী নির্ধারিত সময়সীমা অতিক্রমের পূর্বেই পুনঃ পুনঃ সময়সীমা বর্ধিত করার কারণে এ আইন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠিত আদালত ২০১৯ সালের এপ্রিল মাস অবধি কার্যকর থাকবে, যদি না ২০১৯ এপ্রিল পূর্ববর্তী পুনঃ বর্ধিত করা না হয়। অপরদিকে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল কোন সময়সীমা বেঁধে না দিয়ে প্রতিষ্ঠা করায় এ আইনটি যতদিন বলবৎ থাকবে ততদিন এ আইনের অধীন প্রতিষ্ঠিত ট্রাইব্যুনালসমূহও কার্যকর থাকবে।

আমাদের দেশের বিভিন্ন সাধারণ ও বিশেষ আদালতের প্রতিষ্ঠার ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় সাধারণ আদালতের ক্ষেত্রে কখনও সময়সীমা বেঁধে দেয়া হয় না। বিশেষ আদালতের ক্ষেত্রে যদিও দু’একটির ক্ষেত্রে সময়সীমা বেঁধে দেয়ার নজির আছে। কিন্তু দ্রুত বিচার আদালতকে সময়সীমা বেঁধে দেয়ার বিষয়টি রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোাদিত বলেই ধারণা করা যায়। দ্রুত বিচার আদালত ও দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে যে সকল মামলার বিচারকার্য পরিচালনা করা হয় তার অধিকাংশের পিছনে যে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য থাকে তা বিভিন্ন মামলায় প্রদত্ত সাজা এবং সাজা পরবর্তী আপিল মামলার ধরণগুলো থেকেই স্পষ্ট হয়।

বিচার আদালত মামলা প্রত্যাহার ও স্থানান্তরের ক্ষেত্রে ফৌজদারি কার্যবিধির বিধানাবলির অনুসরণ করে থাকলেও দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল তা করে না। দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের ক্ষেত্রে দেখা যায় সরকারের পক্ষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন কমিটি মামলা প্রত্যাহার ও স্থানান্তর বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে থাকে। একজন ম্যাজিস্ট্রেট কর্তৃক যে কোন ফৌজদারি মামলা আমলে নেয়া পূর্ববর্তী তদন্তের জন্য অপর ম্যাজিস্ট্রেটের নিকট প্রেরণ অথবা আমলে নেয়া পরবর্তী বিচারের জন্য স্থানান্তর একটি বিচারিক সিদ্ধান্ত। একজন ম্যাজিস্ট্রেট বা বিচারকের এ বিচারিক সিদ্ধান্তটি যদি প্রশাসনিক ক্ষমতা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয় সে ক্ষেত্রে একজন বিচারক বা ম্যাজিস্ট্রেটকে দেশের সর্বোচ্চ আইন সংবিধান স্বাধীনভাবে বিচারকার্য পরিচালনায় যে ক্ষমতা বা অধিকার প্রদান করেছে তার ওপর হস্তক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত।

দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল আইন, ২০০২ এ মামলা স্থানান্তর বিষয়ে সরকারকে যে ক্ষমতা দেয়া হয়েছে সরকারের এ ক্ষমতার সাথে ফৌজদারি মামলা প্রত্যাহার ও উত্তোলন বিষয়ে ফৌজদারি কার্যবিধির অধীন বিভিন্ন ফৌজদারি আদালতকে যে ক্ষমতা দেয়া হয়েছে এর পর্যালোচনা করলে প্রতীয়মান হয় স্থানান্তর বিষয়ক সরকারের ক্ষমতাটি স্বাধীন বিচার ব্যবস্থার পরিপন্থি এবং সমভাবে সংবিধান স্বীকৃত বিচারকদের স্বাধীনভাবে বিচারকার্য পরিচালনার চেতনা বিরোধী।।

iktederahmed@yahoo.com