Home » আন্তর্জাতিক » সম্পদ লুটের যুদ্ধ আর আগ্রাসন (পর্ব – ২)

সম্পদ লুটের যুদ্ধ আর আগ্রাসন (পর্ব – ২)

সাম্প্রতিককালের যুদ্ধ ধ্বংস আর রক্তপাত

ফারুক চৌধুরী

war-victimপৃথিবী জুড়ে রয়েছে রাজনৈতিক ঔপনিবেশ, যুদ্ধের চিহৃ, ধ্বংস, রক্তপাত, লুট। যুগের পর যুগ ধরে চলছে যে যুদ্ধের পর যুদ্ধ, তার দীর্ঘ ইতিহাসে এখন পুরোপুরি না গিয়ে চোখ বুলিয়ে নেয়া যাক। কেবল দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পরে কেবল একটি দেশের পরিচালিত যুদ্ধ, বোমাবর্ষণ, অন্তর্ঘাত, হত্যা, সরকার উৎখাতের একটি ছোট্ট বিকরণে।

যুক্তরাষ্ট্র উল্লেখিত কাজগুলোর কোনো না কোনোটি হয়েছে – () ১৯৪৫৪৬ সালে চীনে () ১৯৪৯ সালে সিরিয়ায় () ১৯৫০৫৩ সালে কোরিয়ায় () চীনে () ১৯৫৩ সালে ইরানে () ১৯৫৪ সালে গুয়েতেমালায় () ১৯৫৫১৯৭০এর দশক পর্যন্ত তিব্বতে () ১৯৫৮ সালে ইন্দোনেশিয়ায় () ১৯৫৯ সালে কিউবায় (১০) ১৯৬০৬৫ সালে গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রে (১১) ১৯৬০৬৩ সালে ইরাকে (১২) ১৯৬১ সালে ডোমিনিকান প্রজাতন্ত্রে (১৩) ১৯৬১৭৩ সাল পর্যন্ত ভিয়েতনামে (১৪) ১৯৬৪ সালে ব্রাজিলে (১৫) ১৯৬৪ সালে বেলজীয় কঙ্গোতে (১৬) ১৯৬৪ সালে গুয়েতেমালায় (১৭) ১৯৬৪৭৩ সালে লাওসে (১৮) ১৯৬৫৬৬ সালে ডোমিনিকান প্রজাতন্ত্রে (১৯) ১৯৬৫ সালে পেরুতে (২০) ১৯৬৭ সালে গ্রিসে (২১) ১৯৬৭৬৯ সালে গুয়েতেমালায় (২২) ১৯৬৯৭০ সালে কম্বোডিয়ায় (২৩) ১৯৭০৭৩ সালে চিলিতে (২৪) ১৯৭৬ সালে আর্জেন্টিনায় (২৫) ১৯৮০ সালে তুরস্কে (২৬) ১৯৮০৮১ সালে পোল্যান্ডে (২৭) ১৯৮১৯২ সালে এল সালভাদরে (২৮) ১৯৮১৯০ সালে নিকারাগুয়ায় (২৯) ১৯৮০৮৫ সালে কম্বোডিয়ায় (৩০) ১৯৮০ সালে এঙ্গোলায় (৩১) ১৯৮২৮৪ সালে লেবাননে (৩২) ১৯৮৩৮৪ সালে গ্রেনাডায় (৩৩) ১৯৮৬ সালে ফিলিপাইনে (৩৪) লিবিয়ায় (৩৫) ১৯৮৭৮৮ সালে ইরানে (৩৬) ১৯৮৯ সালে লিবিয়ায় (৩৭) ১৯৮৯৯০ সালে পানামায় (৩৮) ১৯৯১ সালে ইরাকে (৩৯) কুয়েতে (৪০) ১৯৯২৯৪ সালে সোমালিয়ায় (৪১) ১৯৯২৯৬ সালে ইরাকে (৪২) ১৯৯৫ সালে বসনিয়ায় (৪৩) ১৯৯৮ সালে ইরানে (৪৪) সুদানে (৪৫) আফগানিস্তানে (৪৬) ১৯৯৯ সালে যুগোস্লাভিয়াসার্বিয়ায় (৪৭) ২০০১ সালে আফগানিস্তানে (৪৮) ২০০২২০০৩ সালে ইরাকে (৪৯) ২০০৬২০০৭ সালে সোমালিয়ায় (৫০) ২০০৫ এখন পর্যন্ত ইরানে (৫২) ২০১১ সালে লিবিয়ায়।

অনেকের কাছেই মনে হবে এ তালিকা অসম্পূর্ণ। তাদের দাবি বেঠিক নয়। সূক্ষ্মভাবে বিচার করলে বিশদ তথ্যের দিকে তাকালে দেখা যাবে আরো বহু দেশে এমন হস্তক্ষেপ হয়েছে।

সংক্ষিপ্ত এ তালিকায় দেখা যায়, এশিয়াআফ্রিকালাতিন আমেরিকা এই তিন মহাদেশ তো বাদ যায়ইনি, বরং তালিকায় রয়েছে ইউরোপের একাধিক দেশ। আরো দেখা যায়, কোনো কোনো দেশে একাধিকবার, কোনো দেশে দু’বারেরও বেশি চলেছে যুদ্ধ, হত্যাযজ্ঞ, অন্তর্ঘাত, সরকার উৎখাত, রাজনৈতিক গোলযোগ তৈরি করা, খুন ইত্যাদি কার্যকলাপ।

যদি কেবল যুক্তরাষ্ট্রের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ না রেখে চোখ ফেলানো যায় ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, স্পেন, পর্তুগাল, বেলজিয়াম, ইতালি, জার্মানি, জাপানের ইতিহাসের দিকে এবং যদি দৃষ্টি দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ পরবর্তীকালের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে প্রসারিত করা যায় আরো পেছন দিকে, তাহলে দেখা যাবে যুদ্ধের, আগ্রাসনের, রক্তপাতের, গণহত্যার, লুটের, অন্য দেশসমাজসংস্কৃতিকে অধীন করে রাখার ইতিহাস নির্মমনিষ্ঠুরবর্বরবিচিত্র।

দেশে দেশে, পূর্ব থেকে পশ্চিমে, উত্তর থেকে দক্ষিণে ছড়িয়ে এ যুদ্ধের ইতিহাস, যেন যুদ্ধ ইতিহাসের পৃষ্ঠাগুলো বাতাসে ভর করে ছড়িয়ে পড়েছে পৃথিবীর দিক থেকে দিকে, দিগদিগন্তে। এ যুদ্ধ এশিয়ায়, আফ্রিকায়, দক্ষিণ ও মধ্য আমেরিকায়, পূর্ব ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জে বা ইস্ট ইন্ডিজে, ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জে।

এসব যুদ্ধে হতাহতের সংখ্যা নিয়ে যে কেউ প্রশ্ন তুলতেই পারেন। প্রশ্ন উত্থাপিত হতে পারে যুদ্ধের ফলে সম্পদের ক্ষতির পরিমাণ এবং যুদ্ধের পরে লুটের পরিমাণ নিয়ে।

হতাহতের প্রশ্নের উত্তরে এখন কেবল একটি তথ্য এখানে উল্লেখ করা হলো : গুয়েতেমালায় মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ বা কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা যে যুদ্ধ তৈরি করে, তার ফলে ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত ৩৫ বছরে নিহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছিল এক লাখ। দেশটিতে গুম হয়েছিলেন ৬০ হাজার মানুষ। প্রায় ১০ লাখ মানুষ নিজ দেশ ছেড়ে অন্য দেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছিলেন। আরো ১০ লাখ মানুষ নিজ বসত ছেড়ে দেশের ভেতরে অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হন। এ তথ্য রয়েছে মাইকেল প্যারেন্টি রচিত সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে (বাংলা সংস্করণের নাম) বইতে। (বইটি অনুবাদ করেছেন তারেক চৌধুরী এবং প্রকাশ করেছে ঢাকায় শ্রাবণ প্রকাশনী)

দর্শন বিষয়ে স্ট্যানফোর্ড এনসাইক্লোপেডিয়াতে বলা হয়েছে : যুদ্ধ বর্বর, এক কুৎসিত উদ্যোগ। অথচ মানুষের ইতিহাসে ও সামাজিক পরিবর্তনের ক্ষেত্রে এরই রয়েছে কেন্দ্রীয় ভূমিকা। এ দুটো তথ্য স্ববিরোধী ও ব্যাখ্যাতীত মনে হতে পারে। তবে এটা নিশ্চিত যে, যুদ্ধ আর যুদ্ধের হুমকি আমাদের জীবনে শক্তি রূপে অব্যাহতভাবে উপস্থিত রয়েছে। ২০০০ সাল দিয়ে যে নতুন শতাব্দী, নতুন যে সহস্রাব্দ শুরু হলো, তা নিয়ে আমাদের সকলেরই বিপুল আশা ছিল। কিন্তু হায়, এই নতুন শতাব্দী ইতোমধ্যেই ক্ষতবিক্ষত হয়েছে যুদ্ধে।

এতে বলা হয় : যুদ্ধের সহিংস চরিত্র আর এর বিতর্কিত সামাজিক প্রতিক্রিয়া চিন্তাশীল মানুষের কাছে এমন সব নৈতিক প্রশ্ন তোলে যা বিচলিত করে দেয়। যুদ্ধ কি ভুল? হয়তো এমন পরিস্থিতি থাকে, যখন যুদ্ধ ন্যায়সঙ্গত হয়ে ওঠে, অথবা হয়তো সেটাই হয়ে ওঠে কাজের উপযুক্ত উপায়। যুদ্ধ কি সব সময়ই মানুষের অভিজ্ঞতার অংশ হয়ে থাকবে? নাকি যুদ্ধকে বিলোপ করতে আমরা কিছু একটা করতে পারবো? যুদ্ধ কি মানুষের অপরিবর্তনীয় চরিত্রের ফসল, নাকি পরিবর্তনযোগ্য সামাজিক ব্যবস্থার ফসল? যুদ্ধ করার কি কোনো ন্যায়সঙ্গত ও যুক্তিগ্রাহ্য পথ রয়েছে? নাকি, যুদ্ধ সব সময়ই এক নৈরাশ্যকর, বর্বর মানব হত্যা? খোদ আমাদের সমাজ যখন যুদ্ধে জড়ায়, তখন আমাদের অধিকার কি কি, দায়িত্বগুলোই বা কি?

এভাবেই প্রশ্নের পর প্রশ্ন মানব জাতিকে তাড়া করে ফেরে। যুদ্ধের ইতিহাসের মতোই এ সব প্রশ্নও পুরনো।

প্রশ্ন আসে: আক্রান্ত দেশের মানুষদের অধিকার কি কি? কোনো দেশের ওপর যুদ্ধ কেন চাপিয়ে দেয়া হয়? কে চাপিয়ে দেয় যুদ্ধ? যুদ্ধ চাপিয়ে দেয়ার খেসারত কে দেবে? তা কি দেয়া হয়? কোন সে ব্যবস্থা, যা যুগ যুগ ধরে যুদ্ধ চাপিয়ে দেয়? সে ব্যবস্থাটিকে চালায় কোন সে শক্তি?

যুদ্ধে, সহিংসতায়, বর্বরতায়, সন্তানহারা ক্রন্দনরত মা, শোকাতুর বাবা, ভাই হারা বোন, বোন হারা ভাই, লুন্ঠিত, লাঞ্ছিত, পদদলিত দেশ, সমাজ বার বার উত্তর খুঁজেছে যুদ্ধ নিয়ে এ সব প্রশ্নের। যুদ্ধে ফিরে না আসা অসংখ্য মানুষ বারবার প্রশ্ন তুলেছে সমগ্র মানব জাতির কাছে, কেন যুদ্ধ? কেন যুদ্ধ? কেন এ নিষ্ঠুরতা?

প্রশ্নের উত্তর কি মানুষের স্বভাবেচরিত্রেপ্রকৃতিতে? নাকি স্বার্থে? প্রশ্নের উত্তর কি মনের অন্দরে নাকি সমাজে থাকা অর্থনীতিতে?

যুদ্ধের বিচিত্র ইতিহাসে লেখা আছে নানা তথ্য, যা এ সব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে সাহায্য করবে। নানা ঘটনায়, নানা মৈত্রী বন্ধনে, আঁতাতে, জোটে, নানা স্বার্থের টানাটানিতে যুদ্ধের এ বিচিত্র বিবরণ আগামীতে, বিভিন্ন পর্বে।।

চলবে