Home » অর্থনীতি » প্রাথমিক শিক্ষাও বাজারীকরণ (প্রথম পর্ব)

প্রাথমিক শিক্ষাও বাজারীকরণ (প্রথম পর্ব)

দেড় দশকে হয়নি একটিও সরকারি স্কুল :: বাড়ছে বেসরকারি শিক্ষা

মাহতাব উদ্দীন আহমেদ

Last_2বাংলাদেশে শিক্ষাখাতের বাণিজ্যিকীকরণ বলতে ইদানিং উচ্চ শিক্ষা খাতের বাণিজ্যিকীকরণকেই অপেক্ষাকৃত বেশি বোঝানো হচ্ছে। সাম্প্রতিক রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনা এ বিষয়ে আরো নতুন আলোচনার সূত্রপাত করেছে। শাসকশ্রেনী ও তাদের প্রভুরা উচ্চ শিক্ষাখাতের বাণিজ্যিকীকরণের যে চক্রান্ত করছে তার বিরুদ্ধে এই বিক্ষোভ, সমালোচনা ও প্রতিরোধ খুবই সঙ্গত এবং জরুরী। কিন্তু এই রাষ্ট্রের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ মেহনতী মানুষের সন্তানেরা সাধারণত যে পর্যন্ত পড়াশোনা করতে পারে বা করার সুযোগ পায় সেই প্রাথমিক শিক্ষাকে যেভাবে বাজারের উপর ছেড়ে দেয়া হয়েছে, এবং তার ফলে খেটে খাওয়া আপামর জনতার সন্তানদের মেরুদন্ডে কাঠামোগত ভাবে যেভাবে আঘাত করা হচ্ছে সেটা নিয়ে তেমন কোন আলোচনা এখানকার শাসক শ্রেণীর বুদ্ধিজীবী, শিক্ষাবিদ, অর্থনীতিবিদদের মধ্যে তো প্রশ্নই উঠে না, এমনকি যারা প্রগতিশীল আন্দোলনের সাথে যুক্ত তাদের মধ্যেও খুব কম দেখা যায়।

বাণিজ্যিকীকরণ ইস্যুতে প্রগতিশীল ছাত্রসংগঠনগুলোকে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কেবল উচ্চশিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ নিয়েই আন্দোলন করতে দেখা যায়, সেটা অবশ্যই দরকারী। কিন্তু প্রায় দুই কোটি শিক্ষার্থী যে প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থার আওতাধীন রয়েছে, যেটি এদেশের বিপুল জনগোষ্ঠীর সন্তানদের জন্য বাস্তবতা একমাত্র শিক্ষা, সেটির বাণিজ্যিকীকরণের বিরুদ্ধে ছাত্রসংগঠনগুলোকেও সাধারণত রাস্তায় নামতে দেখা যায় না। আপাতত প্রাথমিক শিক্ষাকে বাজারের উপর ছেড়ে দেয়ার কিছু খন্ডচিত্র দেখা যাক।

পরিসংখ্যান কি বলে?

বাংলাদেশে স্বাধীনতার আগে ১৯৭০ সালে মোট প্রাথমিক বিদ্যালয় ছিল ২৯০৮২ টি। যার মধ্যে সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় ছিল ২৬৩৯৯ টি, যা ছিল ঐ সময়ের সর্বমোট প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রায় ৯১ শতাংশ। স্বাধীনতার পর নতুন করে বেশ কয়েক হাজার জাতীয়করণ করার পর ১৯৭৪ সালে মোট সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা দাঁড়ায় ৩৬১৬৫ টিতে। তখন সর্বমোট প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অংশ দাঁড়ায় প্রায় ৯৯ শতাংশে। বাকি ১ শতাংশ ছিল বেসরকারী।

এরপর থেকে একের পর এক সরকারগুলো সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপনের রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব থেকে কার্যত হাত গুটিয়ে নেয়া শুরু করে। ১৯৭৪ থেকে ১৯৮৫ পর্যন্ত পরবর্তী এগারো বছরে সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় বৃদ্ধি পায় মাত্র ৫৩৩ টি। ১৯৮৫ সালে এসে সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা দাঁড়ায় ৩৬৬৯৮ টিতে, যা ছিল তখনকার মোট প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রায় ৮৩ শতাংশ। পক্ষান্তরে এই সময়ে বেসরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় বৃদ্ধি পায় ৭০৩৪ টি। এরপর ১৯৮৫ থেকে ১৯৯৬ পর্যন্ত পরবর্তী এগারো বছরে বেসরকারী বিভিন্ন ধারার প্রাথমিক বিদ্যালয় বৃদ্ধি পায় সর্বমোট ৩৫৬০৬ টি। অথচ এই সময়ে সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা বৃদ্ধি পায় মাত্র ১০১২ টি। ১৯৯৬ সালে সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা দাঁড়ায় ৩৭৭১০টি যা ছিল তৎকালীন মোট প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রায় ৪৭ শতাংশ। আর বেসরকারী বিভিন্ন ধারার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা দাঁড়ায় ৪৩১০৮ টিতে। যা ছিল তৎকালীন মোট প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রায় ৫৩ শতাংশ।

এর পরবর্তী ১৬ বছরের ইতিহাস আরো ন্যাক্কারজনক। ১৯৯৬২০১২ এই ১৬ বছরে বিভিন্ন ধারার বেসরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা বেড়েছে ২৩২৩৭ টি। অন্যদিকে এই ১৬ বছরে সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা বৃদ্ধি তো পায়ই নি, উপরন্তু ৩৮টি বন্ধ হয়ে গিয়েছে। ফলে ২০১২ সালে এসে দেখা যায় মোট প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অংশ নেমে এসেছে মাত্র ৩৬ শতাংশে। বাকি ৬৪ শতাংশই বেসরকারী। ২০১২ সালে সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা দাঁড়ায় ৩৭৬৭২টিতে। আর বিভিন্ন ধারার বেসরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা দাঁড়ায় ৬৬৩৪৫ টিতে। বাংলাদেশ সরকারের প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইট (১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০১৪) এবং বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) তিনটি প্রকাশনা: Statistics on primary Education 1448 to 1983, Educational statistics of Bangladesh 1985 এবং Bangladesh Education Statistics 2012 হতে বিদ্যালয়ের সংখ্যার তথ্যগুলো একত্রিত করা হয়েছে এবং তার ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে হিসেব করা হয়েছে।

জাতীয়করণের “কৃতিত্ব”

এমপিও ভুক্ত বেসরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর শিক্ষকদের মূল বেতন সরকার বহন করলেও এগুলোর অবস্থা যে কতটা করুণ তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ ছিল এসব বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের চাকরী জাতীয়করণের আন্দোলন। অবশেষে ১৯৯১ সাল থেকে চলে আসা বেসরকারী রেজিস্টার্ড প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর শিক্ষকদের সুদীর্ঘ আন্দোলনের মুখে, নির্বাচনের আগের বছরে, ২০১৩ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ২৬২০০ টি বেসরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় পর্যায়ক্রমে জাতীয়করণ করার ঘোষনা দেয়। যার আওতায় রয়েছে: এমপিও ভুক্ত রেজিস্টার্ড বেসরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, স্থায়ী ও অস্থায়ী নিবন্ধন প্রাপ্ত বেসরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, পাঠদানের অনুমতি প্রাপ্ত বেসরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, কমিউনিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়, সরকারী অর্থায়নে প্রতিষ্ঠিত এনজিও প্রাথমিক বিদ্যালয়। প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে সরকারের কর্তাব্যক্তিরা এটা নিয়ে খুব কৃতিত্ব জাহিরের চেষ্টা সেসময় করেছিলেন। কিন্তু প্রশ্ন হল যেখানে স্বাধীনতার পর পর ১৯৭৪ সালে ৯৯ শতাংশ প্রাথমিক বিদ্যালয়কেই সরকারীতে পরিণত করা হয়েছিল, সেখানে ৩৮ বছর পর এসে কেন সরকারকে নতুন করে বেসরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় “জাতীয়করণ” করার কাজটি করতে হল? তাহলে ৩৮ বছর ধরে সরকারগুলো কি করলো? কেন একের পর এক সামরিক সরকার ও আওয়ামী লীগ, বিএনপিগুলো ক্রমবর্ধমান চাহিদার সাথে তাল মিলিয়ে নতুন নতুন সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন করলোনা? লীগ সরকারের যে “হিরো” শিক্ষামন্ত্রী শিক্ষাক্ষেত্রে এত এত সাফল্যের ঢাক পেটান তাকে তো এই প্রশ্ন করাই যায় যে কেন তার আমলেও একটিও নতুন সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন করা হলনা? দেশের মিডিয়ার প্রচার পাওয়া ভাড়াটে “শিক্ষাবিদেরা” সৃজনশীলের নামে মুখে ফেনা তুললেও এ বিষয়টি নিয়ে কোন কথা তুলেন না। কিন্তু কেন? এসব “শিক্ষাবিদ” নামধারীদের কাছ থেকে জনগণের এসব প্রশ্নের উত্তর পাওনা।

১৯৭৪ সালে সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যার যে বৃদ্ধি ঘটেছিল সেটা জাতীয়করণ করার মাধ্যমে হয়েছিল। অর্থাৎ আগে যা ছিল সেগুলোকেই নিয়ে নেয়ার মাধ্যমে হয়েছিল। সরকার নতুন করে নিজ দায়িত্বে প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন করেনি। ১৯৭৪ সালে জাতীয়করণ করার পর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ছিল ৩৬১৬৫টি। স্বাধীনতার পর ২০১২ পর্যন্ত সময়ে সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায় ১৯৯৬ সালে, সর্বমোট ৩৭৭১০ টি। এরপর তো আবার কমে গিয়ে ২০০৫ সাল থেকে ৩৭৬৭২ টিতে নেমেছে। ২০১৩ সালের পরিসংখ্যানে আবার যে সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়বে সেটাও হবে জাতীয়করণ করার ফলে, সরকারের নতুন বিদ্যালয় স্থাপন করার ফলে নয়। তাহলে যদি ১৯৯৬ সালের সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যার সাথে ১৯৭৪ সালের সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যার তুলনা করলে দেখা যাচ্ছে, স্বাধীনতার পরবর্তী ৪২ বছরে সরকারগুলো নিজ উদ্যোগে পূর্ণ দায়িত্ব নিয়ে সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন করেছে মাত্র ১৫৪৫টি। ব্যানবেইসের প্রকাশনা ২০১২ অনুসারে, সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে বিদ্যালয় প্রতি শিক্ষার্থীর সংখ্যা এখন প্রায় ২৮৬ জন। এটিকে যদি ৪২ বছরের যদি গড় মানদন্ড হিসেবে ধরি (প্রকৃত গড় আরো কম হবে) তবে দেখা যাচ্ছে, স্বাধীনতার পর থেকে গত ৪২ বছরে সরকারগুলো নিজ উদ্যোগে, দায়িত্বে ও ব্যবস্থাপনায় মাত্র ৪ লক্ষ ৪২ হাজার শিক্ষার্থীর জন্য নতুন সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন করেছে (সরকারী হিসেবে বর্তমানে প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থী সংখ্যা এক কোটি ৯০ লাখের কিছু বেশি)। এই যদি হয় অবস্থা তাহলে এর চাইতে বড় লজ্জার বিষয়, এর চাইতে বেশি ন্যাক্কারজনক ঘটনা একটি দেশের শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও প্রাথমিক শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জন্য আর কি হতে পারে?

দেখা যাচ্ছে, সরকারগুলো একদিকে সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন করা বন্ধ রেখে প্রাথমিক শিক্ষা খাতকে কার্যত বাজারের উপর ছেড়ে দিল। রেজিস্টার্ড স্কুলগুলোতে এমপিও ও অনুদান দেয়ার নাম করে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত নূণ্যতম মান ও অন্যান্য বিষয়ক দায়িত্বগুলোকে এড়িয়ে গেল। অন্যদিকে বাজার কয়েক দশক ধরে বেসরকারী রেজিস্টার্ড ও নন রেজিস্টার্ড প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে এমন ল্যাজেগোবরে অবস্থা সৃষ্টি করলো যে সেগুলোর শিক্ষকদের ন্যূণতম শিক্ষকোচিত জীবনমানের নিরাপত্তাটুকুও রইলো না। তখন সরকার আন্দোলনের মুখে জাতীয়করণ করার ঘোষনা দিতে বাধ্য হল এবং তা থেকে কৃতিত্ব নেয়ার চেষ্টা করলো। আর এসব কিছুর মধ্যে দিয়ে তারা এড়িয়ে গেল রাষ্ট্র কর্তৃক প্রাথমিক শিক্ষা প্রদানের ব্যবস্থা করার তথা রাষ্ট্রীয় প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন করার সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতাটি। জাতীয়করণ করার নামে গলাধঃকরণ করতে হলো ২৬ হাজার নিম্নমানের স্কুল। সামগ্রিকভাবে যা নামিয়ে দেবে ইতোমধ্যেই অধঃপতিত রাষ্ট্রীয় প্রাথমিক শিক্ষার গড় মান। অথচ সময় থাকতে পরিকল্পিতভাবে সরকারগুলো প্রয়োজনীয় সংখ্যক সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন করলে এই জাতীয়করণ করারই কোন দরকার হতনা।।

১টি মন্তব্য

  1. মাহতাব উদ্দীন আহমেদ

    এই লেখাটির ৫ম প্যারার শেষে তথ্যসূত্র হিসেবে ব্যানবেইসের যে প্রকাশনাগুলোর নাম দেয়া আছে সেখানে অনিচ্ছাকৃত দুটি ত্রুটি রয়ে গেছে। একটি ত্রুটি টাইপিং মিসটেক। সেটি লেখাটি প্রকাশিত হওয়ার পরই চোখে পড়েছিল। কিন্তু সেটি তেমন গুরুতর নয়। ফলে তথ্যগুলো সঠিক হওয়ার কারণে সেটা নিয়ে সংশোধনী দেয়ার প্রয়োজন হয়নি। তবে অন্যটি গুরুতর ত্রুটি যেটা এইমাত্র চোখে পড়ল। লেখক হিসেবে এই ত্রুটির দায়ভার সম্পূর্ণ আমার। দুটি তথ্যসূত্রের সংশোধনই এখানে কমেন্ট আকারে দিয়ে দিচ্ছি। বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) প্রকাশনা: Statistics on primary Education 1448 to 1983, তে সালটি 1947 to 1983 হবে। এবং Educational statistics of Bangladesh 1985 এর জায়গায় তথ্যসূত্রটি Primary Education in Bangladesh, January 1987 হবে। অনিচ্ছাকৃত এই ত্রুটির জন্য লেখক হিসেবে আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করছি।