Home » আন্তর্জাতিক » সম্পদ লুটের যুদ্ধ আর আগ্রাসন (পর্ব – ৩)

সম্পদ লুটের যুদ্ধ আর আগ্রাসন (পর্ব – ৩)

কতো কৌশল কতো বিস্ময় আর ধ্বংসের চিহ্ন

ফারুক চৌধুরী

last 5যুদ্ধের নানা নাম। ইতিহাসের পাতায় পাতায় লেখা সে সব নাম। যুদ্ধের সে সব নামের মধ্যে রয়েছে আফগান ওয়ার্ম, আফগান যুদ্ধসমূহ। রুশদের ঠেকানোর নামে ব্রিটেন তিনবার যুদ্ধ করে আফগানিস্তানের সঙ্গে। সে যুদ্ধ হয় ১৮৩৮৪২ সালে, ১৮৭৮৭৯ সালে এবং ১৮৭৯৮০ সালে। প্রথম যুদ্ধ ইংরেজদের অব্যবস্থাপনায় ভারাক্রান্ত, দ্বিতীয় যুদ্ধে ইংরেজরা অজুহাত দেখায় যে, আফগানিস্তানের আমীর রুশ প্রতিনিধিকে আনুকূল্য দেখাচ্ছেন। অথচ ব্রিটিশ এজেন্টকে গ্রহণ করছেন না, তৃতীয় যুদ্ধ বাঁধায় ইংরেজরা ব্রিটিশ বিরোধী বিক্ষোভ দমনের উছিলায়। এ তৃতীয় যুদ্ধকালেই এক ইংরেজ সেনাপতি ১০ হাজার সৈন্য নিয়ে ২৩ দিনে পাড়ি দিয়েছিলেন ৩২০ মাইল পথ। সে সময়কার বিবেচনায় এ ছিল সামরিক ক্ষেত্রে বিখ্যাত হওয়ার মতো এক ঘটনা। এরপরে ১৯১৯ সালেও ব্রিটিশ ও আফগানদের মধ্যে প্রবল যুদ্ধ হয়।

যুদ্ধের এ সব নামের এবং ঘটনার যেন কোনো শেষ নেই। মহাদেশ থেকে মহাদেশে তা ছড়িয়ে রয়েছে। যেমন মেক্সিকো যুদ্ধ, ১৮৪৬৪৮ সালে, আলামিনের যুদ্ধ, ১৮৭০ সালের ফ্রাংকোপ্রুশিয়ান ওয়ার, ১৮৭৯ সালে জুলুদের যুদ্ধ, ১৮৪৩ সালে নিউজিল্যান্ডে মাওরিদের প্রথম যুদ্ধ ও ১৮৬০৭০ সালে মাজরিদের দ্বিতীয় যুদ্ধ, ১৮১২১৮১৪ সালে ইঙ্গমার্কিন যুদ্ধ, ১৮০৬ সালে ব্যাটল অব জেনা, ১৮৯৪১৮৯৫ চীনজাপান যুদ্ধ, ১৮৫৩ সালে ক্রিমিয়া যুদ্ধ, ১৮৩৯১৮৪২ সালে ব্রিটেন ও চীনের মধ্যকার যুদ্ধ যা আফিম যুদ্ধ হিসেবে পরিচিত, ব্যাটল অব সোম বা সোম নদী তীরে যুদ্ধ, যে যুদ্ধ হয়েছিল ফ্রান্সের উত্তরপশ্চিমাঞ্চলে নদীটির তীর বরাবর ২০ মাইল জায়গা জুড়ে, ২০ সপ্তাহ ধরে, যে যুদ্ধে মিত্র বৃটেন ও ফ্রান্সের বাহিনী এগিয়েছিল খুব বেশি হলে ১০ মাইল। কিন্তু মারা গিয়েছিল ছয় লাখ সৈন্য, যাদের দুইতৃতীয়াংশই ছিল ব্রিটিশ, যে যুদ্ধে প্রথমবারের মতো ব্যবহৃত হয়েছিল ট্যাংক, ব্যাটল অব ব্যালেন, ১৮০৮ সালের বসন্তে ফরাসি আধিপত্যের বিরুদ্ধে স্পেনীয় জনগণের জাগরণ। উল্লেখিত এ সব যুদ্ধ আধুনিককালের। এ কালেই এ তালিকা দীর্ঘ। এসব যুদ্ধের কোনো কোনোটির ঘটনা ধারা অবাক করে দেয়ার মতো।

যেমন সোম নদী তীরের যুদ্ধ। এ যুদ্ধের এক পর্যায়ে জার্মান বাহিনী নতুন অবস্থা নিতে বাধ্য হয়। কিন্তু বৃষ্টি আর কাদার কারণে জার্মানদের পক্ষে নতুন করে আক্রমণ রচনা করা সম্ভব হয় না। যুদ্ধ শেষে জার্মান জেনারেলরা জানায়, সোম তীরে তাদের ক্ষয়ক্ষতি এত বেশী হয়েছিল যে, প্রথম বিশ্ব যুদ্ধের বাকী সময়ে তারা পুরোপুরি প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ও দক্ষ যুদ্ধ বাহিনী আর সংগঠিত করতে পারেনি। সে বিবেচনায় প্রথম বিশ্বযুদ্ধে প্রকৃতপক্ষেই মোড় ঘুরে গিয়েছিল সোম তীরে, ২০ মাইল জায়গায়।

কে ভুলতে পারে প্রথম বিশ্ব যুদ্ধ আর দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের কথা? কার স্মৃতি থেকে মুছে যাওয়া সম্ভব ভিয়েতনাম যুদ্ধের ঘটনা?

আবার দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধকালে ব্যাটল অব বৃটেন, স্ট্যালিনগ্রাদের যুদ্ধ, লেনিন গ্রাদের যুদ্ধের কথা কি ভুলে যাওয়া সম্ভব? বৃটেনের আকাশে ১৯৪০ সালের ১০ জুলাই থেকে ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত ব্রিটিশ ও জার্মান বিমান বাহিনীর মধ্যকার সে যুদ্ধের প্রথমদিকে নাৎসী জার্মানি ১,৩৫০টির বেশি বোমারু ও ১,২০০ জঙ্গী বিমান নিয়ে আক্রমণ চালায়। এ হামলা ছিল বৃটেনে জার্মান অভিযানের ভূমিকা। ব্রিটিশরা প্রতিরক্ষা রচনায় প্রধানত ব্যবহার করে হ্যারিকেন ও স্পিট ফায়ার বিমান। সংখ্যা অনুপাতে জার্মান তিনটি বিমানের বিপরীতে ছিল একটি ব্রিটিশ বিমান। এ যুদ্ধ যেন ‘শীর্ষে’ পৌঁছায় ১৫ সেপ্টেম্বর। সে দিন ৫৬টি জার্মান বিমান ধ্বংস করেন ব্রিটিশ যোদ্ধাবৈমানিকরা। প্রথমে ব্রিটিশ পক্ষ দাবি করেছিল এ সংখ্যা ১৮৫। এ যুদ্ধে জার্মানরা হারায় ১,৭৩৩টি বিমান আর ব্রিটিশদের দিকে এ সংখ্যা ছিল ৯১৫টি।

এ যুদ্ধ সম্পর্কে চার্চিল লিখেছিলেন, আওয়ার ফেট নাউ ডিপেন্ড আপন ভিক্টরি ইন দি এয়ার অর্থাৎ আকাশ যুদ্ধে জয়ের ওপর এখন নির্ভর করছে আমাদের ভাগ্য। ব্রিটিশ পার্লামেন্টে ৪ জুন চার্চিল বলেছিলেন, ‘কয়েক হাজার বৈমানিকের দক্ষতা ও নিষ্ঠা সভ্যতার স্বার্থ রক্ষা করবেন। তাই নয় কি?’ এরও পরে এ যুদ্ধ সম্পর্কে হাউজ অব কমন্সে চার্চিল বলেছিলেন, ‘নেভার ইন দি ফিল্ড অব হিউম্যান কনফ্লিক্ট ওয়াজ সো মাচ ওউড বাট সো মেনি টু সো ফিউ’ অর্থাৎ, মানব জাতির সংঘাতের ইতিহাসে আর কখনো এতো অল্প সংখ্যক মানুষের কাছে এতো বিপুল সংখ্যক মানুষের ঋণী হয়ে থাকার নজীর নেই।

তিনি এ কথা বলেছিলেন ব্রিটিশ বিমান যোদ্ধাদের উদ্দেশ্য করে। কারণ, এ যুদ্ধে ব্রিটিশ বৈমানিকরা জার্মান নাৎসী বিমান হামলা প্রতিহত করতে না পারলে সমগ্র জার্মান যুদ্ধ অন্য রূপ নিতে পারত, তা হয়তো পতন ঘটানো বৃটেনের, তা প্রভাব ফেলতে পারত সমগ্র দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধে জার্মানদের অবস্থান জোরালো করে।

স্ট্যালিনগ্রাদের যুদ্ধ মানুষের ইতিহাসে যেন এক বিস্ময়। সে বিস্ময় সাহসে, সহিষ্ণুতায়, অদম্য মনোবলে। জার্মান জেনারেল পলাসের অধিনায়কত্বে ১৯৪২ সালের ৫ সেপ্টেম্বর স্ট্যালিনগ্রাদে এগিয়ে আসে নাৎসী বাহিনী। নগরটির পথে পথে, বাড়িতে বাড়িতে, বাড়ির কক্ষে কক্ষে নাৎসী বাহিনীকে প্রতিহত করে সোভিয়েত লাল ফৌজ। সোভিয়েত জেনারেল ঝুকভের নেতৃত্বে লাল ফৌজের আরেক দল সৈন্য এসে ঘেরাও করে ফেলে স্ট্যালিনগ্রাদ ঘেরাও করে ফেলা নাৎসীদের। জার্মান জেনারেলরা ও তাদের অধীনস্থ বাহিনী ধরা পড়ে লাল ফৌজের হাতে। এ সংখ্যা ছিল ৯১ হাজার। জার্মানদের ২১ ডিভিশন সৈন্য অংশ নেয় স্ট্যালিনগ্রাদ যুদ্ধে।

এ যুদ্ধের শেষ পর্বে ১৯৪৩ সালের ৩০ জানুয়ারি জেনারেল পলাস বেতারযোগে হিটলারকে বার্তা পাঠালেন, চূড়ান্ত ধস নেমে আসার জন্য ২৪ ঘন্টার বেশি বিলম্বিত করা যাবে না।

হিটলার এ বার্তা পেয়ে এক সহকারীকে বলেন, সামরিক ইতিহাসে এমন কোনো তথ্য নেই যে, কোনো জার্মান ফিল্ড মার্শাল বন্দি হয়েছে।

তাই জেনারেল পলাসকে বেতার বার্তা মারফত উন্নীত করা হলো ফিল্ড মার্শাল পদে। সেই সঙ্গে ১১৭ জন অফিসারকেও এক ধাপ করে পদোন্নতি দেয়া হলো। কি অদ্ভূত কৌশল।

কিন্তু শেষ মুহূর্ত ঘনিয়ে এলো। সদর দফতর থেকে পলাস পেলেন শেষ বার্তা, শেষ গুলিটি নিয়ে শেষ মানুষটি লড়াই করবে।

কিন্তু হায়। রাত ৭টা ৪৫ মিনিটে বেতার বার্তা প্রেরক নিজ উদ্যোগে পাঠায় এক বার্তা, রুশরা আমাদের বাংকারের দোরগোড়ায়। আমরা ধ্বংস করা শুরু করেছি আমাদের সব সরঞ্জাম।

ফিল্ড মার্শাল পলাসের হেডকোয়ার্টারে শেষ মুহূর্তে কোনো লড়াই হলো না, তিনি ও তার স্টাফ শেষ মানুষটি থাকতে লড়াই চালানোর সাহস রাখলেন না। সোভিয়েত লাল ফৌজের একজন জুনিয়র অফিসারের নেতৃত্বে এক স্কোয়াড লাল সেনা উকি মারলেন মাটির নিচে ফিল্ড মার্শালের কক্ষে। কক্ষটি তখন অন্ধকার। লাল সেনা আত্মসমর্পণের দাবি জানালো। চিফ অব স্টাফ জেনারেল স্মিথ তা মেনে নিলেন। ফিল্ড মার্শাল তখন বিছানায় বসে, বিষন্ন, বিমর্ষ। স্মিথ তার অধিনায়ককে জিজ্ঞাসা করলেন, আর কিছু বলতে হবে কিনা, সে কথা কি ফিল্ড মার্শালের কাছে জানতে চাইতে পারি? কোনো জবাব এলো না।

ফেব্রুয়ারির ২ তারিখে সুপ্রিম কমান্ডার হিটলারের দফতর থেকে বার্তা পৌঁছালো আরেকটু উত্তরে একটি ট্রাক্টর ফ্যাক্টরিতে আটকে থাকা এক দল জার্মান সৈন্যদের কাছে, লং লিভ জার্মানি, জার্মানি জিন্দাবাদ।

শেষ হলো স্ট্যালিনগ্রাদের যুদ্ধ। বরফঢাকা প্রান্তরে এখন নিস্তব্ধতা, ধ্বংসের চিহ্ন, রক্তের দাগ। ওই দিনই বেলা পৌনে ৩টা নাগাদ অনেক ওপর দিয়ে উড়ে গেল এক জার্মান অনুসন্ধান বিমান। বৈমানিক আকাশ থেকে বার্তা পাঠালো তার দফতরে। নো মাইন অব এনি ফাইটিং এট স্ট্যালিনগ্রাদ।

নাৎসী বন্দিদের মধ্যে ছিল ২৪ জন জেনারেল। এরা তখন অর্ধাহারে ভুগছে, বরফে দেহের ত্বকে ক্ষত, অনেকে আহত, শরীরে, মনে ভেঙে পড়েছে, হামাগুড়ি দেয়ার মতো করে নড়াচড়া করছে, কেউ মাথার ওপরে ধরে রেখেছে রক্তমাখা কম্বল। তাপমাত্রা তখন শূন্য ডিগ্রিরও ২৪ ডিগ্রি নিচে।

বিশ্ব জুড়ে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার জন্য হিটলারের দরকার ছিল। সে তেল পাওয়ার পথে পড়ে স্ট্যালিনগ্রাদ। তাই এত প্রবল যুদ্ধ।

লেনিনগ্রাদের যুদ্ধ আরেক বিস্ময়কর ঘটনা। বিস্ময় জাগিয়ে গেলো মস্কোর যুদ্ধ। সোভিয়েত লাল ফৌজ ১৯৪২ সালের নভেম্বর মাস থেকে ১৯৪৩ সালের ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত গুড়িয়ে দেয় নাৎসী জার্মানদের ২১৮টি ডিভিশন।

এসব যুদ্ধের আড়ালে রয়েছে কত পরিকল্পনা, কতো স্বার্থ। বিবদমান দ্ইু পক্ষের স্বার্থ দুই ধরনের। এক পক্ষের আগ্রাসী যুদ্ধ, অপর পক্ষের কাছে দেশ রক্ষার যুদ্ধ।।