Home » প্রচ্ছদ কথা » দুর্নীতির রাজনীতিকরণ :: দিন বদলের ক্ষমতা

দুর্নীতির রাজনীতিকরণ :: দিন বদলের ক্ষমতা

শাহাদত হোসেন বাচ্চু

coverগত ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের প্রাক্কালে নির্বাচন কমিশনে দেয়া হলফনামায় ক্ষমতাসীন দলের কতিপয় নেতা, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীদের সম্পদ বিবরনী যখন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হতে শুরু করে তখন গোটা দেশজনগন স্তম্ভিত ও হতভম্ব হয়ে পড়ে এটা ভেবে যে, এই মানুষগুলিই আমাদের আইন প্রনেতা, আমাদের শাসক, আমাদের প্রতিনিধি! ভোট দিয়ে এদেরইকেই আমরা পাঁচ বছরের জন্য নির্বচন করেছি। কমবেশি পাঁচ বছর আগে একই রকম পরিস্থিতিতে ‘দিন বদলের’ কথা শুনে জনগন ভোট দিয়েছিল এইসব মানুষদের। দিন বদলে গেছে শাসকদের। মন্ত্রীএমপি, নেতাপাতি নেতা সকলের। পাঁচ বছর আগের ৬০ হাজার টাকা ১৫ কোটি টাকা হয়েছে। ২০ একর জমি হয়েছে ২৮০০ একর। প্রধান দুই দলের গনবিচ্ছিন্ন ক্ষমতাভোগী দুর্নীতিবাজ রাজনীতিকরা ব্যস্ত নিজেদের সুযোগসুবিধে এবং অন্যায় ও অনৈতিক ভাবে অর্থ উপার্জন নিয়ে। এখানে মাদক ব্যাবসায়ী ইয়াবা সম্রাট, সন্ত্রাসীদের গডফাদার, খুনের মামলার চার্জশিটভূক্ত আসামী, চোরাচালানীমজুতদার দলীয় টিকেটে এমপিমন্ত্রী হয়ে রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুন্ঠন করে বার বারপুনর্বার জনগনের কাঁধে চেপে বসছে সিন্দাবাদের দৈত্যের মতই।

বাংলাদেশের সকল কর্মপেশার মানুষের জীবনে দুর্নীতির গভীর শেকড় প্রতিদিনই বিস্তার করছে শাখা প্রশাখা। পরিবারসমাজরাষ্ট্র, সর্বত্রই দুর্নীতির সর্বগ্রাসী থাবা ব্যাপ্ত হচ্ছে দিনদিন। টিআইবি’র দেয়া তথ্য মতে, দেশের ৬২.৭ শতাংশ জনগন দুর্নীতির শিকার। গণতন্ত্র, সামাজিক ন্যায় বিচার এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে একটি বড় বাধা হয়ে দাড়াচ্ছে দুর্নীতি। এটি এখন একটি বিশ্বাসে পরিনত হয়েছে যে, দুর্নীতি কোন অপরাধ নয়! ব্যক্তিগত উন্নয়ন, সুখসাচ্ছন্দ্য, ভবিষ্যত নিশ্চিত করতে এই দেশের ক্ষমতাবান মানুষেরা দুর্নীতির প্রতিযোগিতায় লিপ্ত রয়েছেন। যে কারনে বিশ্বের এক থেকে পনের পর্যন্ত দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের মধ্যে বাংলাদেশ থেকেই যাচ্ছে। সবচেয়ে আশংকার বিষয়টি হচ্ছে, দুর্নীতির প্রাতিষ্ঠানিক রূপটি। এটি এখন রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজ ও পরিবার ছাড়িয়ে বৈশ্বিক রূপ পেয়ে গেছে। উন্নয়নশীল বিশ্বেই শুধু নয়, উন্নত বিশ্বের মত রাজনীতিকরণ এবং কর্পোরেট বানিজ্যের সাথে সম্পর্কের কারনে দুর্নীতির বিষয়টি অনেকটাই ‘ওপেন সিক্রেট’।

ভারতবর্ষের প্রাচীন অর্থশাস্ত্রবিদ কৌটিল্য বহু শতাব্দী আগেই রাজকীয় কর্মচারীদের চল্লিশ প্রকার অর্থ আত্মসাতের রূপ সনাক্ত করেছিলেন। প্রাচীন ভারতে প্রশাসন, বিচার বিভাগ ও ব্যবসা বানিজ্যে দুর্নীতি বিরাজমান ছিল, সেটি তার লেখায় বি¯তৃত রয়েছে। খিলজীতুঘলকমুঘলব্রিটিশ আমলে এক রূপ থেকে দুর্নীতি অন্য রূপে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় সমন্বিত অংশ হিসেবে পরিগনিত হয়েছিল। পাকিস্তান আমলে রাজনীতিবিদসিভিল আমলাসেনা আমলাদের আপোষে গড়ে ওঠে দুর্নীতির নেটওয়ার্ক, যা পরবর্তীতে সর্বগ্রাসী রূপ লাভ করে। এর সরাসরি শিকার পাকিস্তানের পূব অংশের বিক্ষুব্দশোষিত জনতা আন্দোলন গড়ে তোলে এবং মুক্তিযুদ্ধের পরিনামে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের জন্ম হয়। সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত দেশে শুরুতেই দুর্নীতির রাজনীতিকরণ ঘটে এবং এর পেছনে রাজনৈতিক তোষন ও দুর্বলতাই মুখ্য ভূমিকা পালন করে বলে ইতিহাস সাক্ষ্য দিচ্ছে। ফলে একটি সুবিধাভোগী রাজনৈতিক গোষ্ঠি আকার লাভ করে। এই গোষ্ঠির সাথে সেনা আমলা এবং সিভিল আমলা সমন্বয়ে আগষ্ট ট্রাজেডি ঘটানো হয় শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করে। পরিনামে সুদীর্ঘ সেনাশাসনের নিগঢ়ে আবদ্ধ হয় দেশ ও জাতি। সামরিক শাসকরা শুরুতে দুর্নীতির বিরুদ্ধে ’আয়ুব খান’ মডেলে যৎকিঞ্চিত হম্বিতম্বি করলেও দুর্নীতির বহুমাত্রিকতাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে সর্বাত্মক সহায়তা দেন। বাংলাদেশে সামরিক শাসনের অবশ্যম্ভাবী ফল হিসেবে দুর্নীতির করাল গ্রাস জনগণ ইতিপূর্বে প্রত্যক্ষ করেছে।

নব্বইয়ের গণঅভ্যূত্থানের পরে সিভিল শাসনেও দুর্নীতির বিস্তার ছিল অবারিত। এর মুল কারন ছিল রাষ্ট্রের কোন কাঠামোয় স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা যায়নি। ফলে সামাজিক ন্যায় বিচার ও সুশাসন, যা গনতন্ত্রের অন্যতম প্রধান শর্ত, তা সুদুর পরাহত বিষয়ে পরিনত হয়। আমাদের দেশে বিভিন্ন স্তরকাঠামোয় দুর্নীতি এতই বেশী যে, তা যে কোন উন্নয়নকে প্রভাবিত করে। দুর্নীতি এখন স্রেফ জাতীয় সংস্কৃতিতে পরিনত হয়েছে। এই সংস্কৃতি থেকে গড়ে ওঠা দৃষ্টিভঙ্গিতে এটি কোন ’অপরাধ’ নয়। রাজনীতি ও ক্ষমতা কাঠামোয় অনেকটাই নিয়ন্ত্রক হিসেবে পরিনত হওয়ায় দুর্নীতিবাজদের হাতে রাষ্ট্রসমাজপরিবার জিম্মি হয়ে পড়েছে। এর ফলে মুল্যবোধের ভয়ংকর এক অবক্ষয় নিয়ে গোটা দেশজাতি বিনাশী এক যাত্রা শুরু করেছে। সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী ও আমলাদের দুর্নীতির ভয়াবহ ও সর্বগ্রাসী চিত্রটি বেরিয়ে আসতে শুরু করে। পরবর্তীতে দুর্নীতি বিরোধী অভিযান রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ ও কুখ্যাত ’মাইনাস টু থিওরির’ কবলে পড়লে এটি সবিশেষ ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। অপরাধী হিসেবে দুর্নীতিবাজরা দৃশ্যমান হয়ে উঠলেও প্রচলিত আইনী কাঠামোয় তাদের শাস্তি নিশ্চিত করা যায়নি। বরং রাষ্ট্র এবং এর বিভিন্ন অঙ্গঁ আইনের ফাঁক ফোঁকড় দিয়ে দুর্নীতিবাজদের মুক্ত করে দিচ্ছে। ফলে দুর্নীতি বিরোধী জনমত গড়ে ওঠার বদলে জনগনের মধ্যে সৃষ্টি হয় সন্দেহ আর অবিশ্বাস।

জোট সরকারের সীমাহীন দুর্নীতি অনিয়মের বিরুদ্ধে সোচ্চার আওয়ামী লীগ প্রণীত ২০০৮ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে সর্বোচ্চ পাঁচটি অগ্রাধিকার তালিকায় দুর্নীতি দমনের বিষয়টি ছিল দু’নম্বরে। এই নির্বাচনী ওয়াদা আওয়ামী লীগের বিজয়ে গুরুত্বপূর্ন অবদান রেখেছিল। কিন্ত দুর্নীতি ও রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুন্ঠনের করাল গ্রাস থেকে জনগনের মুক্তি মেলা তো দুরের কথা, বরং অবহেলা, বঞ্চনা আর বৈষম্যে সকল রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে মহাজোট সরকার। একতরফা হলফনামায় সরকারের মন্ত্রীসংসদ সদস্যদের দেয়া তথ্যে গোটা জাতি স্তম্ভিত। তাদের দুর্নীতি ও রাষ্ট্রীয় সম্পদের লুন্ঠনকে অনেকেই আলাদিনের চেরাগের সাথে তুলনা করেছেন। সাধারন মানুষের সামষ্টিক আয় এক শতাংশ না বাড়লেও শাসক দলের ক্ষমতাধরদের কারো কারো আয় বেড়েছে একশ শতাংশ থেকে এক হাজার শতাংশেরও বেশি। লাখ বা কোটি টাকায় নয়, হাজার কোটি মহাজোট সরকারের মন্ত্রীএমপিদের টাকার ক্ষতিয়ান পরিমাপ করতে হচ্ছে। সম্ভবত: এ কারনেই লজ্জা কিংবা নৈতিকতার দায় এড়াতে এবারের নির্বাচনী ইশতেহারে আওয়ামী লীগ দুর্নীতি বিরোধী ইস্যুটি পাশ কাটিয়ে যাবার চেষ্টা করেছে। এই চেষ্টায় তারা আজ্ঞাবহ নির্বাচন কমিশনকেও সামিল করতে চেয়েছে। যে কারনে প্রার্থীদের সম্পদের হিসাব প্রকাশ করতে নানা কূটকৌশলের আশ্রয় নেয়। রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুন্ঠনের অন্যতম ভাগীদার বিএনপি নির্বাচনে অংশ না নেয়ায় তাদের অনেক নেতার বিশাল সম্পদ বিবরন জনগন জানতে পারেনি।

নির্বাচনী ওয়াদা পূরনের ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ প্রায় তৃপ্তির ঢেকুর তুলে বলে, ২০০৮ সালের ইশতেহারে যা ওয়াদা করা হয়েছিল তার চেয়েও নাকি বেশি অর্জন হয়ে গেছে! পাঠকদের স্মরণ করিয়ে দেয়ার জন্য ঐ ইশতেহারের প্রধান পাঁচটি অগ্রাধিকারের অংশমাত্র এখানে উদ্বৃত্ত করা হয়েছে। পাঠক বিষ্মিত হবেন এটা ভেবে যে, নির্বাচনী ওয়াদার বিপরীতে গত পাঁচ বছর ক্ষমতাসীন দলের অনেক প্রভাবশালী নেতা দুর্নীতি ও রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুন্ঠনের সাথে কিভাবে জড়িয়ে পড়েছিলেন।

২০০৮ সালে নির্বাচনী ইশতেহারে বলা হয়েছিল, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা : দুর্নীতি দমন কমিশনের স্বাধীনতা নিশ্চিত করে শক্তিশালী করা হবে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধে বহুমুখী কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হবে। ক্ষমতাধরদের বার্ষিক সম্পদ বিবরণ দিতে হবে। রাষ্ট্র ও সমাজের সকল স্তরের ঘুষ, দুর্নীতি উচ্ছেদ, অনোপার্জিত আয়, ঋণখেলাপি, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, কালোটাকা ও পেশীশক্তি প্রতিরোধ ও নির্মূলে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। প্রতি দফতরে গণঅধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য নাগরিক সনদ উপস্থাপন করা হবে। সরকারি কর্মকাণ্ডের ব্যাপকভাবে কম্পিউটারায়ন করে দুর্নীতির পথ বন্ধ করা হবে। মজুতদারি ও মুনাফাখোরি সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়া হবে, চাঁদাবাজি বন্ধ করা হবে। ‘ভোক্তাদের স্বার্থে ভোগ্যপণ্য মূল্য নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ’ গড়ে তোলা হবে। সর্বোপরি সরবরাহ ও চাহিদার ভারসাম্য সৃষ্টি করে দ্রব্যমূল্য কমানো হবে ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা করা হবে। রাজনীতিতে সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ নিষিদ্ধ করা হবে। ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করা হবে। রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে শিষ্টাচার ও সহিষ্ণুতা গড়ে তোলা হবে এবং সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজি নিষিদ্ধ হবে। একটি সর্বসম্মত আচরণ বিধিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ গ্রহণ করাহবে। দলীয়করণমুক্ত অরাজনৈতিক গণমুখী প্রশাসন প্রতিষ্ঠা করা হবে। যোগ্যতা, জ্যেষ্ঠতা ও মেধারভিত্তিতে সব নিয়োগ ও পদোনড়বতি নিশ্চিত করা হবে। জনজীবনে নিরাপত্তা বিধানে পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসমূহকে রাজনীতিরপ্রভাবমুক্ত, আধুনিক ও যুগোপযোগী করে গড়ে তোলা হবে। (সূত্র: আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহার ২০০৮)

সদ্য সমাপ্ত হলফনামায় দেয়া তথ্য অনুযায়ী পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত খবর অনুয়ায়ী ক্ষমতাসীন দলের যে সব নক্ষত্ররা জনগনের ভোট নিয়ে শতকোটি থেকে হাজার কোটি টাকার মালিক বনে গেছেন, তারা হচ্ছেন গত আমলের দপ্তরবিহীন মন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহিউদ্দিন খান আলমগীর, গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী আব্দুল মান্নান খান, স্বাস্থ্যমন্ত্রী আফম রুহুল হক, বনমন্ত্রী হাছান মাহমুদ, পরাষ্ট্রমন্ত্রী দিপু মনি, পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী মাহবুবুর রহমান, এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবীর নানক, মৎস্যমন্ত্রী আব্দুল লতিফ বিশ্বাস, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী মাহবুব উল আলম হানিফ, পাবর্ত্য প্রতিমন্ত্রী দীপঙ্কর তালুকদার, সংসদ সদস্য আবদুর রহমান বদি, মির্জা আজম (বর্তমান বস্ত্রমন্ত্রী), শেখ হেলাল, ফজলে নুর তাপস, নূর ই আলম চৌধুরী, ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লাহ, আসলামুল হক, নজরুল ইসলাম প্রমুখ। (সূত্র: প্রথম আলো, সমকাল, একুশে টেলিভিশন)

অন্যদিকে, অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত, এলজিআরডি মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল হকসহ বেশ কয়েকজনের সম্পদের স্থিতি রয়েছে অথবা কমেছে। কিন্তু তারাই আবার বিষ্ময়করভাবে দুর্নীতি ও লুন্ঠনকে জায়েজ করার জন্য যে সব কথা বলছেন, তাতে আগামীতে দুর্নীতিবাজরা আরো উৎসাহিত হতে পারে। যেমনটি বলেছেন অর্থমন্ত্রী মুহিত, “ক্ষমতাবানদের অধিক আয় হতেই পারে”কাকে খুশি করার জন্য এ কথা বলেছেন সেটি বোঝা না গেলেও তিনিও কি শাসকশ্রেণীর দুর্নীতি ও লুন্ঠন জায়েজ করার পক্ষে! তার চেয়ে এক কাঠি সরেস মন্তব্য করেছেন, আওয়ামী লীগের সাধারন সম্পাদক ও এলজিআরডি মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন নির্বাচন কমিশনে প্রার্থীদের হলফনামা দেওয়ার এখতিয়ার নিয়ে। তিনি বলেছেন, “এই হলফনামা এখন রাজনীতিবিদদের চরিত্র হনননামায় পরিনত হয়েছে”। ইনকাম ট্যাক্সে তো আমাদের সবকিছু দেয়া আছে, রাজনীতিকরা যদি দুর্নীতি করেন, তারাই ধরতে পারেন। নির্বাচন কমিশিনে হলফনামা দিতে হবে, আবার ইনকাম ট্যাক্সে হিসাব দিতে হবেএকদেশে দুই নীতি থাকতে পারে না। প্রয়াত: রাজনীতিক, মুক্তিযুদ্ধের সময়কার অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামের সন্তান দীর্ঘদিন বিলেত প্রবাসী সৈয়দ আশরাফ কেন এরকম বলতে গেলেন? তিনি নিজে দল বা মন্ত্রণালয় চালানোর ব্যাপারে খুব একটা সক্রিয় না থাকলেও সজ্জন এবং ভাল মানুষএ ব্যাপারে কেউ দ্বিমত করবেন না। দীর্ঘদিন বিলেতে থাকার কারনে তার জানা রয়েছে সেখানে মন্ত্রীএমপিরা স্বেচ্ছায় সম্পদের হিসেব দেন, কারো কাছ থেকে কোন অবৈধ সুযোগ, দুর্নীতি, রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুন্ঠনের সাথে যুক্ত হন না। হলে তাকে শাস্তি পেতে হয় এবং রাজনৈতিক ক্যারিয়ার খতম হয়ে যায়। সৈয়দ আশরাফ কেন দলের দুর্নীতিবাজদের সাফাই গাইবেন! তার সম্পর্কে তো কোন প্রশ্ন ওঠেনি। প্রশ্ন উঠেছে তাদের সম্পর্কে যারা গত পাঁচ বছরে মন্ত্রীসংসদ সদস্য শব্দটি ব্যবহার করে বিপুল বৈভবের মালিক হয়েছেন, ব্যাংকবীমাবিশ্ববিদ্যালয়সরকারী জমি, মায় শেয়ারবাজার থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। এই জনপ্রতিনিধিদের সম্পদ কিভাবে পাহাড় ছুঁলো, লাখোপতি থেকে কোটিপতি বনে গেলেন, তা জানার অধিকার জনগনের নিশ্চয় রয়েছে।

দুর্নীতি সারা পৃথিবীতেই হয়, কম আর বেশি। কিন্তু সরকার বা রাষ্ট্র দুর্নীতিবাজদের পক্ষে দাঁড়ায় এরকম নজির পৃথিবীতে খুব কমই আছে। ভারতের সাহারা গ্রুপের প্রধান সুব্রত রায় দুর্নীতি ও রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুন্ঠনের দায়ে গ্রেফতারের পরে আদালতে নীত হলে তার মুখমন্ডলে দোয়াত ভর্তি কালি ছুঁড়ে মারেন মনোজ নামের এক ব্যক্তি। এই অভিনব প্রতিবাদের মধ্য দিয়ে মনোজ সরষে চিৎকার করেছেন, সুব্রত রায় চোর, সে সাধারন মানুষের কষ্টার্জিত টাকা চুরি করেছে। আমাদের জাতীয় ক্রিকেট দল ওপরে সাহারা, নিচে বাংলাদেশ নামের লোগো নিয়ে মাঠে নামছে, তার স্পন্সর সাহারা গ্রুপের সর্বেসর্বা সুব্রত রায়ের আপাতত: ঠিকানা তিহার জেলে। ২০ হাজার কোটি রূপি ফেরত দেবেন এই শর্তে হয়তো জামিন পেলেও পেতে পারেন। ব্যতিক্রমটি এখানেই। ভারতে রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। আবার দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত হচ্ছেন তারা। রাষ্ট্র বা সরকার তাদের পাশে দাঁড়াচ্ছে না, সাফাই গাইছে না, আশ্রয়প্রশয় দিচ্ছে না, প্রচলিত আইনে বিচার হচ্ছে।

দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতাসীন হওয়ার পরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গণভবনে প্রথম সভায় আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেছিলেন, তিনি অন্তত দুর্নীতিবাজদের পক্ষে দাঁড়াবেন না। এর ফলে ব্যক্তির ইচ্ছেয় পরিচালিত দল ও সরকারের প্রধান ব্যক্তির এই বানীতে জাতি কতোটা আশ্বস্ত হতে পেরেছে তা জানা না গেলেও দুর্নীতি দমন কমিশন বেশ একটু নড়েচড়ে বসেছিল। তবে প্রধানমন্ত্রী পরে আবার সম্পদ স্ফীতির ব্যাপারে কিছুটা সাফাইও গেয়েছিলেন। এর ফল কি হবে, জনগনের জানা নাই। কিন্তু সব দেখেশুনে মনে হচ্ছে এবং পারসেপশন দাঁড়িয়েছে, প্রধানমন্ত্রী সত্যিকার অর্থে যদি চান, আন্তরিক হন, তাহলেই কেবল দুর্নীতিবাজদের বিচার হতে পারে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে প্রত্যাশিত নির্দেশনা না পাওয়া এবং অর্থমন্ত্রী ও এলজিআরডি মন্ত্রীর বক্তব্য শোনার পরে মনে হচ্ছে, ক্ষমতাসীন দল সম্ভবত: তার দলের এসব চিহ্নিত দুর্নীতিবাজ ও রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুন্ঠনকারীদের পক্ষেই দাঁড়াবেজনগনের পক্ষে নয়। যদি সামান্য কিছু হয়ও তাও হবে লোক দেখানো বা আইওয়াশ, পদ্মা সেতুসহ অতীতের ঘটনাগুলোর মতোই।।