Home » অর্থনীতি » বাতি না জ্বললেও গরীবকেই দাম শোধ করতে হবে

বাতি না জ্বললেও গরীবকেই দাম শোধ করতে হবে

ফারুক আহমেদ

dis 3শাসক দলের জনগণের চাহিদার সাথে প্রতারণার রাজনীতি নতুন না হলেও এখন জনগণ সেই প্রতারণার এক অভূতপূর্ব রূপ দেখছে। বিদ্যুৎ নিয়ে প্রতারণা অন্য সব কিছুকেই ছাড়িয়ে গেছে। কর্ম, খাদ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, দ্রব্যমূল্য সহ সবদিক দিয়েই শাসক দলের হাতে নিষ্পেষিত গরীব জনগণের প্রাণের অস্তিত্ব পরখ করে দেখার জন্য আরেকটি শক্ত আঘাতের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। গত মহাজোট সরকার থেকে এ পর্যন্ত সরকারের সময়কালে পাইকারী এবং খুচরা পর্যায়ে ১১ বার বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির পর আবারও বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। যুক্তি হলো উৎপাদন খরচ বৃদ্ধিজনিত ভর্তুকি কমানো। সরকারের এই যুক্তির মধ্যে ¯পষ্ট দুটি দিক হলো () উৎপদন খরচ যেন হঠাৎ কোন এক দৈব দুর্বিপাকে বেড়ে গেছে। সরকারের যেন এ ব্যাপারে কোন পূর্বজ্ঞান ছিল না। () ভর্তুকি যেন সরকারের নিজস্ব টাকায় দেওয়া হয়, জনগণ কোনো টাকা দেয় না, জনগণের কোনো কষ্টও হয় না।

কুইক রেন্টাল বিদ্যুতকে পুঁজি বানিয়ে জনগণের সাথে প্রতারণার এবং লুটপাটের যে এক মস্তবড় ফাঁদ সেটা কারোরই কখনও অজানা নয়। সাধারণত যুদ্ধকালীন পরিস্থিতি এবং প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায়ই কুইক রেন্টাল বা দ্রুত ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করা হয়ে থাকে, খরচ বেশী হলেও। আর এ ব্যবস্থা দীর্ঘমেয়াদে নয়, ক্ষনস্থায়ী। এসব পরিস্থিতির বাইরে এ পদ্ধতিতে বিদ্যুতের চাহিদা পূরণ করতে গিয়েছে কেবলমাত্র দুর্নীতিগ্রস্থ সরকারগুলো। ২০০৮ সালে পাকিস্তান পিপলস পার্টির সরকার রেন্টাল পদ্ধতিতে সে দেশে বিদ্যুৎ চাহিদা মেটানোর উদ্যোগ নেয়। এ পদ্ধতির অন্তর্নিহিত কারণেই এ নিয়ে দুর্নীতির প্লাবন বয়ে যায় এবং সে দেশের সাধারণ জনগণ ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়ে। ২০১১ সালের মার্চে সেখানকার সুপ্রিম কোর্ট রেন্টাল পদ্ধতিতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। পাকিস্তানের প্রসঙ্গ এখানে আনা হলো এই কারণে যে, সেখানকার শাসক শ্রেণির দুর্নীতিগস্থ রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং সেখানকার সরকারের গণবিরোধী নীতি স¤পর্কে সারা দুনিয়ার মানুষের সাথে সাথে বাংলাদেশের মানুষও অবগত। সে রকম একটি দুর্নীতিগ্রস্থ দেশেও সেখানকার আদালত তা বন্ধ করে দিয়েছে। পাকিস্তানেও যখন এই পরিস্থিতি এবং কঠোর অবস্থান তখন বাংলাদেশে গণতন্ত্রের বুলি আওড়িয়ে কুইক রেন্টালকে সাময়িকভাবেই শুধু নয় এর স্থায়ীকরণের দিকেই এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা দিয়েছেন, ২০২০ সাল পর্যন্ত ওই ব্যবস্থা জোরেশোরেই বহাল থাকবে। হিসাবে দেখা যাচ্ছে, রেন্টাল এবং কুইক রেন্টাল পদ্ধতিতে এক হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করলে জনগণকে বছরে ২৮ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। ২০০৯ সাল থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত জনগণকে ভর্তুকি গুণতে হয়েছে ৫০০০০ কোটি টাকা। সরকার যখন ভর্তুকির কথা বলে তখন তা এমনভাবে বলা হয় যেন এ টাকার অন্য কোন ভৌতিক উৎস আছে। এ যে জনগণের রক্তঘাম ঝরানো পরিশ্রমের টাকা তা সব সময়ই অগোচরে রাখা হয়। এই ভর্তুকির টাকা যায় কোথায়? অর্থনীতির নিয়ম অনুসারে তা কখনোই হাওয়ায় মিলিয়ে যায় না। এ টাকা যায় তাদেরই পকেটে। এভাবে চলতে থাকলে ২০২০ সাল নাগাদ তারা নিয়ে নেবে দুই লক্ষ কোটি টাকা। দক্ষ কারিগর আওয়ামীলীগ রেন্টালকুইক রেন্টাল নামে জনগণের শরীরের সাথে এমন পাইপ লাইন যুক্ত করে দিয়েছে যার মধ্যদিয়ে ১১ বছরে এদেশের বাৎসরিক বাজেটের সমপরিমাণ টাকা লুটারেদের পকেটে গিয়ে পড়বে।

ভর্তুকিতো জনগণকে গুণতেই হচ্ছে তার ওপর আবার বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে জনগণকে দুইদিকে থেকে মারার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। একদিকে ভর্তুকি গুণতে হচ্ছে অপর দিকে বিদ্যুতের বাড়তি দামের সাথে সাথে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিষ কিনতে হচ্ছে চড়া দামে। বিদ্যুৎ প্রায় সকল উৎপাদনের সাথে স¤পর্কিত। বিদ্যুতের দাম এক টাকা বৃদ্ধি পেলে সাধারণ জনগণকে কমপক্ষে পাঁচ টাকা ক্ষতির সম্মুখীন হয়। বিদ্যুতের দাম বাড়লে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় কৃষক। সরকার যেভাবে বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি করছে এবং এ কারণে জীবন যাপনের ব্যয়ভার যেভাবে বাড়ছে তাতে এক সময় বিদ্যুৎ আর সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে থাকবে না। তবে সরকারের লুটপাটনীতির কারণে জনগণকে ভর্তুকি দিতে হবে ঠিকই, কিন্তু তাঁর নিজের ঘরের বাতি আর জ্বলবে না। আর যাতে না জলে এবং বিদ্যুৎ ক্ষমতাসীন এবং অর্থবানদের ব্যবহার্যে পরিণত হয় তার সমস্ত আয়োজন সরকার সম্পন্ন করছে, কথায় প্রতিশ্রুতিতে যতো বড় বড় কথাই বলুক না কেন।।