Home » অর্থনীতি » লুণ্ঠন সন্ত্রাস (পর্ব – ২)

লুণ্ঠন সন্ত্রাস (পর্ব – ২)

ফোকলা করা হয়েছে ব্যাংকগুলোকে

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন

dis 1দেশের ব্যাংকিং খাতের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় কেলেঙ্কারির জন্ম ২০০৮ সালে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নেয়া মহাজোট সরকারের সময়ে। ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে জড়িত প্রভাবশালীদের সরাসরি যোগসাজশে ব্যাংক থেকে লুটপাট হয়েছে হাজার হাজার কোটি টাকা। হলমার্ক, বিসমিল্লাহ গ্রুপসহ বড় কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় লুটপাটের ঘটনা ঘটে। হলমার্ক কেলেংকারি ও এর সঙ্গে সোনালী ব্যাংকের কর্মকর্তাদের জড়িত থাকার খবর প্রকাশিত হওয়ার পর ব্যাংকিং খাতের এমন সব তথ্য বেরিয়ে আসছে একের পর এক, যা এ খাতের ভবিষ্যৎকে সংশয়পূর্ণ করে তুলেছে। গত চার দশকে ব্যাংকিং খাত থেকে কত হাজার কোটি টাকা লুটপাট হয়েছে, তার কোনো পরিসংখ্যান মেলে না। ঋণের নামে অর্থ নিয়ে ফেরত না দেয়ার তো বহু নজরি রয়েছে, যাদের অনেকে আবার এখন দেশের প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী। দুর্বল নজরদারির কারণে অসাধু ব্যবসায়ীরা অধিকাংশ ক্ষেত্রে ক্ষমতার প্রভাব বিস্তার করে, কখনওবা ব্যাংক কর্মকর্তাদের যোগসাজশে ভুয়া কাগজপত্র দাখিল করে হাতিয়ে নিয়েছে বিপুল অংকের অর্থ। কখনো বন্ধকী সম্পত্তি অতিমূল্যায়িত করিয়ে, কখনো ভুয়া এলসি খুলে, কখনওবা জাল সঞ্চয়পত্র ও এফডিআর বন্ধক রাখার মাধ্যমে নিয়েছে ঋণ। ভুয়া দলিল ও নামঠিকানা ব্যবহার করে ঋণ নেয়ার কারণে ৫ বছর পর ওইসব ঋণ মন্দ ঋণে পরিণত হয়েছে। লুটপাট হওয়া অর্থের একটি অংশ গেছে রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের পকেটে, বাকি টাকা বিভিন্ন দেশে পাচার হয়ে গেছে বলে আশংকা করা হচ্ছে। বিপুল অংকের অর্থ লোপাট হওয়ায় স্বভাবতই রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। উদ্বেগের বিষয় হলো, এর ফলে দেশের ব্যাংকিং খাতে সৃষ্টি হতে চলেছে ভয়াবহ সংকট। অর্থ লোপাটের ঘটনায় রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর ওপর মানুষের আস্থা কমে যেতে শুরু করেছে।

মিথ্যা তথ্যে ঋণ বরাদ্দ ও নামেবেনামে অ্যাকাউন্ট খুলে ঋণপত্র (এলসি) জালিয়াতিসহ সরকারিবেসরকারি ব্যাংকগুলো থেকে বিভিন্নভাবে লোপাট হচ্ছে হাজার হাজার কোটি টাকা। একই কায়দায় সরকারিবেসরকারি ১১টি ব্যাংক থেকে প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে। অনিয়মলুটপাটের সঙ্গে ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপনা পর্ষদের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে তথ্যপ্রমাণ পাওয়া গেলেও পরিচালনা পর্ষদের সদস্যের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের দালিলিক প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে না বলে জানাচ্ছে দুদক। ফলে অধরাই থেকে যাচ্ছে জড়িত এসব রাঘববোয়ালরা।

দুর্নীতি দমন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী, রূপালী, অগ্রণী, জনতা ও কৃষি ব্যাংকে প্রায় সাড়ে ১৩ হাজার কোটি টাকা লোপাটের অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া বেসরকারি ব্যাংক আইএফআইসি, প্রাইম, মার্কেন্টাইল, প্রিমিয়ার ও শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকের প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা লুটপাটের অভিযোগ রয়েছে। দুর্নীতির অভিযোগ ওঠা সংশ্লিষ্ট এসব ব্যাংক ও ব্যক্তির বিরুদ্ধে তদন্তে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। তদন্তে নেমে দুর্নীতির চিত্র দেখে তারা রীতিমতো হতবাক। ব্যাংকের পরিচালকদের অনেকেই এসব দুর্নীতি ও অনিয়মের ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রেখেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে ঋণ বরাদ্দের ক্ষেত্রে দালিলিক তথ্য প্রমাণাদির ভিত্তিতে দায়িত্ব পালন করায় দুদকের অনুসন্ধানে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ব্যবস্থাপনা পর্ষদের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে তথ্যপ্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। একইভাবে ওইসব বরাদ্দের ক্ষেত্রে পরিচালনা পর্ষদের সদস্যদের ব্যাপক প্রভাব খাটানোর বিষয়ে অভিযোগ থাকলেও দালিলিক প্রমাণ না থাকায় তাদের বিরুদ্ধে আপাতত আইনি ব্যবস্থা নেয়া যাচ্ছে না।

রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংকের বিভিন্ন শাখা থেকেই প্রায় দশ হাজার কোটি টাকা লোপাটের ঘটনা ঘটেছে। একইভাবে রূপালী ব্যাংকের বিভিন্ন শাখায় প্রায় দেড় হাজার কোটি, জনতা ব্যাংকের কয়েকটি শাখায় ১ হাজার ৯০ কোটি, কৃষি ব্যাংকের ছয়টি শাখায় ৬২১ কোটি, অগ্রণী ব্যাংকের কয়েকটি শাখায় প্রায় ২৫০ কোটি টাকা ঋণের নামে লুটপাট হয়েছে। এছাড়া, আইএফআইসি ব্যাংকে ৩৫০ কোটি, প্রাইম ৪০৮ কোটি, মার্কেন্টাইল ব্যাংকে ৪০ কোটি, যমুনা ব্যাংকে ১৬৪ কোটি, শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকে ১৪৮ কোটি এবং প্রিমিয়ার ব্যাংক থেকে ৬৩ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ পাওয়া গেছে।

বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পরই সরকারের সঙ্গে জড়িত প্রভাবশালীদের নজরে পড়ে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো। আর এসব ব্যাংকগুলোয় বসানো হয় দলীয় লোক। ব্যাংকিং রীতিনীতির তোয়াক্কা না করে অদক্ষ ও ননব্যাংকারদের হাতে তুলে দেয়া হয় রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী, বেসিক, জনতা, রূপালী ও অগ্রণী ব্যাংকের দায়িত্ব। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে বেশি লুটপাটের শিকার হয়েছে সোনালী, বেসিক ও জনতা ব্যাংক। এ তিনটি ব্যাংকের চেয়ারম্যানএমডিসহ পরিচালনা পর্ষদে অধিকাংশই দলীয় লোকদের বসানো হয়। বেসিক ব্যাংকের দায়িত্ব দেয়া হয় মহাজোটের অংশীদার জাতীয় পার্টির নেতা শেখ আবদুল হাই বাচ্চুর হাতে। পরিচালকদের মধ্যে সরকারি ব্যাংকে নিয়োগ পান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলের সাবেক ভিপি ছাত্রলীগ নেতা শুভাষ সিংহ রায়, সবুজ কানন উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং মহিলা আওয়ামী লীগের বন ও পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক জান্নাত আরা হেনরী, ছাত্রলীগের সাবেক নেতা ও আইনজীবী বলরাম পোদ্দার, বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সাবেক সহসভাপতি ও নির্মাণ ব্যবসায়ী শাহজাদা মহিউদ্দিন, যুক্তরাজ্য আওয়ামী আইনজীবী পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর সরকারি কলেজ ছাত্র সংসদের সাবেক সাধারণ সম্পাদক জাকির আহমেদ, বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সদস্য, বুয়েট ছাত্র সংসদের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় উপকমিটির সহসম্পাদক আবদুস সবুর, কলামিস্ট ও মণি সিংহফরহাদ স্মৃতি ট্রাস্টের সম্পাদক শেখর দত্ত, নরসিংদী জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুর রহমান ভূঁইয়া, কেন্দ্রীয় যুবলীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য খন্দকার জাহাঙ্গীর কবির, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলের সাবেক ভিপি কেএমএন মঞ্জুরুল হক প্রমুখ। এছাড়াও যারা ক্ষমতাসীনদের পছন্দের এবং অনুগত তাদের মধ্যের বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, সাংবাদিকসহ অনেক পেশাজীবীকে পরিচালনা পরিষদে নেয়া হয়েছে।

দেশের সবচেয়ে বড় ও ঐতিহ্যবাহী ব্যাংক হিসেবে খ্যাত সোনালী ব্যাংকের ব্যবসা সঙ্কুচিত হয়ে পড়ছে। এরই মধ্যে এ ব্যাংকটির সঙ্গে লেনদেন বন্ধ করে দিয়েছে বিশ্বের নামিদামি সব ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো। সম্প্রতি মালয়েশিয়ার অন্যতম বড় ব্যাংক মে ব্যাংক জানিয়ে দিয়েছে, তারা আর সোনালী ব্যাংকের সঙ্গে ব্যবসা করবে না। একইভাবে চীনজাপান বৎ সহ দেড় শতাধিক বড় ব্যাংক সোনালী ব্যাংকের সঙ্গে ব্যবসা না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে খবর রয়েছে। একইভাবে দেশের ভেতরকার অনেক ব্যাংক সোনালী ব্যাংকের এলসি নেয়া বন্ধ করে দিয়েছে। এরই মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত রূপালীসহ কয়েকটি ব্যাংক পাওনা টাকা ফেরত চেয়ে সোনালী ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে লিগ্যাল নোটিশও পাঠিয়েছে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে আমদানিরফতানিতেও। শুধু তাইই নয়, বিদেশ থেকে পণ্য আমদানির ক্ষেত্রেও সোনালী ব্যাংকের এলসি গ্যারান্টি নিচ্ছে না অধিকাংশ বিদেশি রফতানিকারকরা।

হলমার্ক গ্রুপ রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন সোনালী ব্যাংকের রূপসী বাংলা শাখা থেকে জালিয়াতির মাধ্যমে ৩ হাজার ৮৬৮ কোটি ৩১ লাখ টাকা লুট করে। গণমাধ্যমে এ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়ার পর ব্যাপক আলোচনাসমালোচনা হয়। পরে সোনালী ব্যাংকের জড়িত কর্মকর্তা এবং হলমার্কের এমডি, চেয়ারম্যান ও মহাব্যবস্থাপকের বিরুদ্ধে মামলা করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। তবে হলমার্কের নামে লুটপাটে জড়িত আওয়ামী লীগের দলীয় লোকজন ও প্রভাবশালীদের সবাই এখন পর্যন্ত ধরাছোঁয়ার বাইরে। ঘটনা ফাঁস হয়ে যাওয়ার পর তৎকালীন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত হলমার্কের পক্ষে কথা বলেছেন। উচ্চমহলের হস্তক্ষেপে হলমার্ক সোনালী ব্যাংক থেকে ঋণের নামে হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাট করে। প্রতিষ্ঠানটি ঋণের বিপরীতে যে সম্পত্তি দেখিয়েছে, তা ভৌতিক। যেমন হলমার্ক গ্রুপ সোনালী ব্যাংকের কাছে যেসব জমি বন্ধক রেখেছে, তার বেশিরভাগই দেখানো হয়েছে সাভারের হেমায়েতপুরে। বন্ধক হিসেবে সাভারের হেমায়েতপুর এলাকায় ২১৪৩ শতাংশ জমির কাগজপত্র জমা দেয়া হয় ব্যাংকের কাছে। যার বাজারমূল্য ধরা হয়েছিল ২ হাজার কোটি টাকা। সে হিসেবে প্রতি শতাংশ জমির দাম ধরা হয়েছে ৯৩ লাখ ৩২ হাজার টাকা। এ এলাকার উঁচু জমির দাম সর্বোচ্চ শতাংশপ্রতি ৫ লাখ টাকা। ফলে সোনালী ব্যাংকের কাছে বন্ধক রাখা জমির মূল্য বাজারদরের চেয়ে ১৯ গুন বেশি দেখিয়েছে হলমার্ক গ্রুপ। সোনালী ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষায় দেখা যায়, হলমার্ক গ্রুপের কাছে ফান্ডেড ও ননফান্ডেড ১৫৫ কোটি টাকা বকেয়া থাকার পরও ২০১১ সালের ২০ এপ্রিল পর্ষদের বৈঠকে ৬৫ কোটি টাকার মেয়াদি ঋণ অনুমোদন দেয়া হয়েছিল। আর এটি হয়েছিল সরাসরি ক্ষমতাসীনদের কয়েক প্রভাবশালীর সহযোগিতায়। জানা গেছে, সোনালী ব্যাংকের পরিশোধিত মূলধনের সাড়ে ৩ গুন অর্থ আত্মসাৎ করেছে হলমার্কসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান।

হলমার্কের পর মহাজোট সরকারের আমলে ব্যাংকিং খাতে লুটপাটের ঘটনায় এখন পর্যন্ত দ্বিতীয় অবস্থানে আছে ‘বিসমিল্লাহ্ গ্রুপ’। প্রতিষ্ঠানটির দুই অবৈতনিক পরিচালকদের সহায়তায় ব্যাংকিং খাত থেকে ঋণের নামে ১২০০ কোটি টাকা লুট করা হয়। এরই মধ্যে দুদক এই দুর্নীতির তদন্ত শুরু করেছে। সম্প্রতি বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটির কাছে এ বিষয়ে একটি লিখিত অভিযোগও দিয়েছেন সাজ্জাদ হোসেন নামের এক ব্যবসায়ী। তার অভিযোগে বলা হয়, হলমার্ক গ্রুপের পর বড় ধরনের ব্যাংক ঋণ কেলেঙ্কারির সঙ্গে জড়িত বিসমিল্লাহ্ গ্রুপ। এই গ্রুপটি জালিয়াতির মাধ্যমে ৬টি ব্যাংক থেকে ১২শ’ কোটি টাকা তুলে নিয়েছে। জানা গেছে, বিসমিল্লাহ্ গ্রুপকে জালিয়াতির মাধ্যমে প্রায় ১২শ’ কোটি টাকা ব্যাংক ঋণ পেতে সহযোগিতা করেছে প্রতিষ্ঠানটির দুই অবৈতনিক পরিচালক যারা আওয়ামী লীগ থেকে নির্বাচিত দুই সংসদ সদস্যের দুই ছেলে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক তদন্তে দেখা গেছে, সরকারিবেসরকারি পর্যায়ে বিভিন্ন পক্ষের যোগসাজশে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন বিসমিল্লাহ্ গ্রুপের মালিক খাজা সোলায়মান আনোয়ার চৌধুরী। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিশেষ পরিদর্শনে রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংক ও বেসরকারি খাতের প্রাইম ব্যাংক থেকেই বিসমিল্লাহ্ গ্রুপ হাতিয়ে নিয়েছে ৪১১ কোটি ৪৩ লাখ টাকা। সরকারি জনতা ব্যাংকে লুটপাট শুধু দেশের মধ্যেই সীমাবন্ধ থাকেনি, সংযুক্ত আরব আমিরাতে জনতা ব্যাংকের শাখায় অভিনব উপায়ে অর্থ জালিয়াতির ঘটনা ধরা পড়েছে। ব্যাংকটির দুবাই শাখায় কোনো হিসাব খোলার আগেই মেসার্স স্টিভেন ফ্রন্স গ্রোসারির নামে হিসাব নম্বর ব্যবহার করে ৯ লাখ ৫১ হাজার ডলারের (প্রায় ৯ কোটি টাকা) এলসি জালিয়াতির প্রমাণ পেয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

রাষ্ট্র খাতের বেসিক ব্যাংকে লুটপাট হয়েছে। কোনো নিয়মনীতি, বিধিবিধানের তোয়াক্কা করছে না ব্যাংকটির পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ। অন্তত সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা এই ব্যাংক থেকে জালজালিয়াতি, অনিয়ম করে বের করে নেয়ার অভিযোগ উঠেছে। এসব কাজে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনার যোগসাজশের বিষয়টি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শনেও একাধিকবার উঠে এসেছে। অনেক অস্তিত্বহীন, ভুয়া অর্থাৎ কাগুজে বা বেনামি প্রতিষ্ঠানকেও ঋণ দিয়েছে ব্যাংকের পর্ষদ। বছর পাঁচেক আগেও বেসিক ব্যাংক ছিল দেশের অন্যতম ভালো মানের ব্যাংক। কিন্তু নানা ধরনের অনিয়মের কারণে এখন ব্যাংকটির পরিস্থিতি নাজুক। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে বেসিক ব্যাংকের মোট বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ ছিল দুই হাজার ৭০০ কোটি টাকা। ২০১৩ সালের মার্চে তা দাঁড়িয়েছে ৯ হাজার ৩৭৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকার অনিয়ম তদন্ত শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)

সরকারি ৫ ব্যাংকের কাছে ব্যাংক খাতের মোট খেলাপি ঋণের দুইতৃতীয়াংশ রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, তহবিল ব্যবস্থাপনায় অদক্ষতা, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ঋণ বিতরণের কারণে ব্যাংকগুলোর এই উদ্বেগজনক চিত্র। প্রতিবেদন অনুযায়ী রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বাণিজ্যিক ব্যাংক সোনালী, জনতা, অগ্রণী এবং বিশেষায়িত কৃষি ও রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকে রয়েছে সর্বাধিক খেলাপি ঋণ। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ডিসেম্বর ২০১২ শেষে সামগ্রিক ব্যাংক খাতে ৪২ হাজার ৭২৫ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ রয়েছে। এর মধ্যে রাষ্ট্রীয় মালিকানার তিনটি বাণিজ্যিক ও বিশেষায়িত দুটি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ২৬ হাজার ৮০০ কোটি টাকা, যা মোট খেলাপি ঋণের ৬২ দশমিক ৭০ শতাংশ।

ব্যাংকিং খাতে সাম্প্রতিক সময়ে দুর্নীতি বৃদ্ধির হার সব রেকর্ড ভঙ্গ করেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাবেই গত এক বছরে ব্যাংক সেক্টরে দুর্নীতি বেড়েছে প্রায় ৭০ শতাংশ। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, দেশের সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে অনিয়মদুর্নীতি জেঁকে বসেছে। ব্যাংকগুলোর বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়ম, দুর্নীতি ও হয়রানির জন্য গ্রাহকদের অভিযোগ দিন দিন বেড়েই চলেছে। গ্রাহকদের অভিযোগের শীর্ষে রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত চার ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংকের কাস্টমার সার্ভিসেস ডিভিশনের ২০১২১৩ অর্থবছরের বার্ষিক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানা গেছে।

ঋণ জালিয়াতির মাধ্যমে রূপালী ব্যাংকের বিভিন্ন শাখায় প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা লোপাটের কয়েকটি অভিযোগের অনুসন্ধান চলমান রয়েছে। এরই মধ্যে কয়েকটি অভিযোগের অনুসন্ধান শেষ হয়েছে। এর মধ্যে ঋণ জালিয়াতির মাধ্যমে ১৫ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে রূপালী ব্যাংকের মতিঝিল দিলকুশা স্থানীয় শাখার মহাব্যবস্থাপক এসএম আতিকুর রহমান, একই শাখার জ্যেষ্ঠ প্রিন্সিপাল অফিসার মো. আবদুস সামাদ সরকার ও গুলশান শাখার উপমহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ আলীসহ ৫ জনের বিরুদ্ধে গত ১৬ সেপ্টেম্বর মামলা করে দুদক। অপর দুই আসামি হলেন এভারেস্ট অ্যান্ড টেকনোলজি লিমিটেডের চেয়ারম্যান আবু বোরহান সিদ্দিক চৌধুরী ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক এএইচএম বাহাউদ্দিন। মামলাটি তদন্তাধীন রয়েছে। এছাড়া, ব্যাংকটির লোকাল অফিস থেকে মেসার্স বেনিটেক্স লিমিটেড, মাদার টেক্সটাইল মিলস ও মাদারীপুর স্পিনিং মিলস নামে ৩টি প্রতিষ্ঠানকে অবৈধভাবে অন্তত ৮০১ কোটি টাকা ঋণ দিয়েছে। আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে একইভাবে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা ঋণ দেয়ার অভিযোগ পেয়েছে দুদক।

মার্কেন্টাইল ব্যাংক : মিথ্যা তথ্য দিয়ে বেনামি অ্যাকাউন্ট খুলে প্রায় বিশ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে ব্যাংকটির পরিচালক এসএম আহসানের বিরুদ্ধে। দুদকের উপপরিচালক আবু সাঈদ আহমেদ অনুসন্ধান শুরু করেছেন। অভিযোগে বলা হয়, এসএম আহসান গত বছর ব্যাংকটির চেয়ারম্যান ছিলেন।

প্রাইম ব্যাংক : ব্যাংকের কয়েকটি শাখায় মোট ৩৭টি সঞ্চয়ী ও চলতি হিসাবে অর্থ স্থানান্তর এবং ভুয়া এলসির মাধ্যমে ৪০৬ কোটি টাকা আত্মসাত করা হয়েছে। শাখাগুলোতে ভুয়া বিনিয়োগ (ঋণ) হিসাব সৃষ্টি করে জিএল (জেনারেল) হিসাব থেকে অর্থ স্থানান্তর করা হয়েছে। কখনও কখনও লেনদেনহীন বিনিয়োগ হিসাবে নতুন করে লিমিট দিয়ে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিভিন্ন ভুয়া সঞ্চয়ী বা চলতি হিসাবে স্থানান্তরের মাধ্যমে আত্মসাতের ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে, দিলকুশার ইসলামী ব্যাংকিং শাখায় মেসার্স নিউ এসকে এন্টারপ্রাইজের একটি চলতি হিসাবের মাধ্যমে (যার নম্বর ১০৮১১০৩০০০০৭৩৮) প্রায় ৬২ কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়। লেনদেনহীন বিনিয়োগে নতুন লিমিট দিয়ে প্রায় ৪০ কোটি টাকা আত্মসাত করা হয়। এছাড়া, ভুয়া এলসির মাধ্যমে ৩০৬ কোটি ২২ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে বিসমিল্লাহ গ্রুপ। এ বিষয়ে অনুসন্ধান করছেন দুদকের উপপরিচালক সৈয়দ ইকবাল হোসেন।

আইএফআইসি ব্যাংক: ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স ইনভেস্টমেন্ট অ্যান্ড কমার্স (আইএফআইসি) ব্যাংকের মতিঝিল, ধানমণ্ডি, গুলশান, নয়াপল্টন শাখা এবং চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জ ও চকবাজার শাখায় সাড়ে ৩০০ কোটি টাকার ঋণ জালিয়াতির ঘটনা ঘটেছে এমন অভিযোগের ভিত্তিতে অনুসন্ধান চলছে। এছাড়া, প্রায় দেড় কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে বাংলাদেশ ড্রেজিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ দু’জনের বিরুদ্ধে ১ নভেম্বর মামলা করেছে দুদক।।

১টি মন্তব্য

  1. Nice article. Thanks for giving those information. people will know how govt create money and how people lost their wealth. Bank help govt to take money from poor people.