Home » আন্তর্জাতিক » দক্ষিণ এশিয়ার পানি-কূটনীতি ও আসন্ন পানি-যুদ্ধ

দক্ষিণ এশিয়ার পানি-কূটনীতি ও আসন্ন পানি-যুদ্ধ

আলতাফ পারভেজ

dis 4বাংলাদেশ, পাকিস্তান, শ্রীলংকা, ভারত, মালদ্বীপ, নেপাল, ভূটান ও আফগানিস্তান নিয়ে যে দক্ষিণ এশিয়া গঠিততাতে বিশ্বের জনসংখ্যার এক পঞ্চমাংশের বাস। বিশ্বের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলোও দক্ষিণ এশিয়াতেই অবস্থিত। কেবল ঘনবসতিই নয়বিশ্বে দক্ষিণ এশিয়ার বিশেষ পরিচিতি তার দারিদ্র্যের কারণেও। বিশ্বের দরিদ্র জনগণের এক চতুথাংশের বাস এ অঞ্চলেই। জাতিসংঘের হিসাবে দক্ষিণ এশিয়ার ৫৫ ভাগ বাসিন্দাই দরিদ্র।

দক্ষিণ এশিয়ার আটটি দেশের মধ্যে জিডিপিতে সবচেয়ে এগিয়ে শ্রীলংকা, আর সবচেয়ে পিছিয়ে আফগানিস্তান। পুরো অঞ্চলের মধ্যে অনেক সাংস্কৃতিক ঐক্য থাকলেও দেশগুলোর মধ্যে আন্ত:বাণিজ্য বিশ্বের অন্য যেকোন অঞ্চলের চেয়ে কমদেশগুলোর সম্মিলিত জিডিপির মাত্র ২ শতাংশ। পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে এটা ২০ শতাংশ। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে আন্ত:বাণিজ্য কম হওয়ার প্রধান রাজনৈতিক কারণ হলো দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক আস্থা, বিশ্বাস খুবই দুর্বল। স্বাভাবিকভাবেই এর ছাপ পড়েছে পানির মতো জরুরি প্রসঙ্গেও। পানিও ক্রমে এখানে বিবাদের এক বিষয় হয়ে উঠছেকারণ তার চাহিদা ও যোগানের মধ্যে ব্যবধান ক্রমে বাড়ছে। পাশাপাশি বিশেষ বিশেষ দেশের পানিকেন্দ্রীক কর্তৃত্ববাদী মানসিকতাও রূঢ় রূপ নিচ্ছে।

জীবনের জন্য পানি জরুরি। দক্ষিণ এশিয়ায় এটা বিশেষভাবে জরুরিকারণ সংখ্যাগরিষ্ঠেরই পেশা কৃষি কাজ, মাছ ধরা ইত্যাদি। ফলে এখানে পানির সাথে জড়িয়ে আছে দেশগুলোর অস্তিত্বের প্রশ্ন। আসন্ন দিনগুলোতে পানি এখানে নিরাপত্তা ইস্যু হয়ে উঠবে বলেও অনুমান করা হচ্ছে।

বর্তমানে দক্ষিণ এশিয়া হলো বিশ্বের সেসব অঞ্চলের একটি যেখানে পানির দুষ্পাপ্যতা ঘটছে দ্রুতলয়ে। অথচ নিকট অতীতেও এ অঞ্চলে পানির প্রাচুর্য ছিল। দক্ষিণ এশিয়ায় পানির প্রধান উৎস তিনটি: হিমালয় ও সন্নিহিত এলাকা থেকে বয়ে আসা নদীর পানি; প্রায় ২০টি আন্তর্জাতিক নদী বয়ে চলেছে দক্ষিণ এশিয়া দিয়ে। দ্বিতীয়ত, বৃষ্টিপাতের পানি এবং তৃতীয়ত, ভূগর্ভস্থ পানি।

উপরোক্ত তিনটি উৎস নিয়েই কমবেশি উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ রয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার নদীগুলোতে এমুহূর্তে পানি প্রাপ্তির পরিমাণ কমবেশি তিন হাজার মিলিয়ন একর ফুট। এর বিরাট অংশই প্রবাহিত ভারতের উপর দিয়ে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে নদীর এই প্রবাহ কমে যেতে পারে।

বৃষ্টিপাতের ক্ষেত্রে দক্ষিণ এশিয়া সৌভাগ্যবান। বছর জুড়ে এ অঞ্চলে গড়ে ১১৬৪ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়। যার মধ্যে সবচেয়ে বেশি হয় বাংলাদেশে। কিন্তু বৃষ্টিপাতের এ পানি ধরে রাখার পর্যাপ্ত কোন অবকাঠামো গড়ে তোলা হয়নি। যদিও এখন বিভিন্ন দেশে পানি সংরক্ষণাগার তৈরির হিড়িক পড়েছেকিন্তু এ অঞ্চলে মাথাপিছু পানি সংরক্ষণ সামর্থ্য এখনও খুব কমগড়ে ১৭৬ কিউবিক মিটার। ফলে নির্ভরতা থেকে যাচ্ছে নদীর পানির ওপর। কিন্তু সেখানে পানি প্রাপ্তি কমে যাওয়ায় শেষবিচারে চাহিদার যোগান দিতে হচ্ছে ভূগর্ভস্থ উৎস থেকে। কৃষিতে সবুজ বিপ্লব এই চাহিদা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

দক্ষিণ এশিয়ায় পানির গুণগত মানও কমছে। রাসায়নিক ও কীটনাশকের গাহর্স্থ্য ময়লা, শিল্পবর্জ্য নিয়ন্ত্রণহীনভাবে পানিকে কলুষিত করছে। নদীগুলোর মধ্যে গঙ্গাতেই দূষণ সবচেয়ে বেশি। বাংলাদেশ যার বড় শিকার। টেক্সটাইল, সিমেন্ট, কাগজ, স্টীল, গ্লাস ইত্যাদি শিল্পের আধিক্য দূষণও বাড়িয়ে চলেছে।

চাহিদা যেভাবে বাড়ছে

বর্তমানে দক্ষিণ এশিয়ায় লোকসংখ্যা রয়েছে প্রায় ১৭০ কোটি। এ শতাব্দিতে বিশ্বে জনসংখ্যা যা বাড়বে তার ৩০ শতাংশই জন্ম নেবে দক্ষিণ এশিয়ায়। ২০৫০ সাল নাগাদ এ অঞ্চলে লোকসংখ্যা দাঁড়াবে প্রায় ২৩০ কোটি। আর জনসংখ্যার আধিক্য মানেই পানির বাড়তি চাহিদা। আর পানির সংকট মানেই সংঘাত ও উত্তেজনা। ফলে আসন্ন দিনগুলোতে দক্ষিণ এশিয়ায় সংঘাত ও উত্তেজনার অন্যতম ইস্যু হবে পানি।

দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ জায়গা হলো মালদ্বীপ ও বাংলাদেশ। এই দুই দেশে প্রতি বর্গ কিলোমিটারে এক হাজারের বেশি মানুষ বাস করে (বাংলাদেশে ১০৯৯ এবং মালদ্বীপে ১৩৩০)। অর্থনৈতিকভাবে সক্রিয় জনগোষ্ঠীও এই দুই দেশে সর্বোচ্চযথাক্রমে ৪৯ ও ৪৮ শতাংশ। ফলে তাদের পানির চাহিদাও বেশি হওয়ার কথা। কিন্তু জনপ্রতি বাৎসরিক পানি ব্যবহারের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার অন্য অনেকের চেয়ে পিছিয়ে।

বিশ্বে জনপ্রতি গড়ে পানি সম্পদ আছে ৬২৩৬ কিউবিক মিটার। অথচ দক্ষিণ এশিয়ায় জনপ্রতি পানিসম্পদ ১১৯৯ কিউবিক মিটার। স্বাভাবিকভাবেই জনসংখ্যা যত বাড়বে মাথাপিছু পানি প্রাপ্তির সম্ভাবনা ততই কমবে। বর্তমানে বিশ্ব জনসংখ্যার প্রায় এক পঞ্চমাংশের বাস দক্ষিণ এশিয়ার আটটি দেশে। কিন্তু বিশ্ব মানচিত্রের মাত্র ৩.৩ অংশ তাদের নিয়ন্ত্রণে। ফলে পানির উৎসের খোঁজে নতুন বসতি নির্মাণের সুযোগও দক্ষিণ এশিয়াবাসীর সীমিত।

বাড়তি জনসংখ্যার সাথে পানি প্রাপ্তি কম যাওয়ার সম্ভবনাটা একটা দুষ্টচক্রের মতো। কারণ বাড়তি জনসংখ্যা মানেই বাড়তি খাদ্যশস্য উৎপাদনের চাপআর তার জন্য প্রয়োজন বাড়তি পানি। জনসংখ্যা বাড়লে খানা পর্যায়ে বেশি পানি প্রয়োজন। বাড়তি মানুষদের ভোগ চাহিদা মেটাতে যে বাড়তি শিল্প কারখানা গড়ে উঠবে সেখানেও দরকার হবে বাড়তি পানি। আবার এই মানুষদের জন্য সভ্যতার চাকা ঘোরাতে প্রয়োজন বাড়তি বিদ্যুত। আর সে জন্যও চাপ পড়বে জলসম্পদে।

পানির ক্ষেত্রে দক্ষিণ এশিয়ায় সংকটের এক প্রধান দিক হলো এর কৃষি নির্ভরতা এবং পানিনির্ভর কৃষি। এখানে আবাদে ধান অগ্রাধিকার পায়। দক্ষিণ এশিয়ায় ব্যবহৃত পানির ৯১ ভাগ ভোক্তা কৃষি খাত। ফলে পানি এখানে সরাসরি খাদ্য নিরাপত্তার সাথে জড়িয়ে আছে। এমনকি অনেক এলাকায় পানি থাকা না থাকার ওপর সেখানকার দারিদ্র্য পরিস্থিতির ওঠানামা নির্ভর করে। চাষযোগ্য জমির ৪৬ ভাগ এখানে সেচের আওতাভুক্ত। পাকিস্তানে এটা প্রায় ৯৪ শতাংশ। দেশটি প্রধানত একটি নদীর অববাহিকাভিত্তিক। বাংলাদেশে সেচের আওতাভুক্ত জমির ৮৬ শতাংশে ধান আবাদ হয়।

কিন্তু কৃষিতে পানির উৎপাদনশীলতা বিশ্বের অন্য যেকোন অঞ্চলের চেয়ে দক্ষিণ এশিয়ায় অনেক কম। সেচ প্রযুক্তির নিম্নমান পানির অপচয় ও কম উৎপাদনশীলতার বড় এক কারণ। শিল্পে পানি ব্যবহার দক্ষিণ এশিয়ায় এখনো অনেক কমপুরো ভোগের মাত্র ২ ভাগ। তবে দ্রুতলয়ে এটা বাড়ছে। এক্ষেত্রে ভারতের ক্ষুধাই অত্যধিক। দক্ষিণ এশিয়ায় শিল্পে পানি চাহিদার ৮৫ ভাগই যোগাতে হচ্ছে ভারতে। দক্ষিণ এশিয়ায় পানির তৃতীয় প্রধান ভোক্তা বিদ্যুত উৎপাদন কেন্দ্রগুলো। এ অঞ্চলে জ্বালানী ব্যবহারের হার বছরে ৬ শতাংশ হারে বাড়ছেযদিও চাহিদা আরও বেশি। হাইড্রো পাওয়ার প্রজেক্টগুলো হলো বিদ্যুতের সবচেয়ে সস্তা উৎস।

পানির বিবাদ বাড়তে পারে

দক্ষিণ এশিয়ার পানি বিষয়ক ভাবনায় জলবায়ু পরিবর্তন বিরাট এক কালোমেঘ হয়ে আছে। এ অঞ্চলের পানির দুই প্রধান উৎসতথা নদীর প্রবাহ এবং মৌসুমী বৃষ্টিপাত জলবায়ু পরিবর্তন দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছে ও হবে। প্রধান তিন নদীসিন্ধু, গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্রের প্রবাহ অংশত হিমালয়ের বরফ গলা পানি। মুশকিল হলো জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পানির প্রবাহ বাড়লেও বিপদ, কমলেও বিপদ। অতিরিক্ত পানি বা স্বল্প পানি দুটোই কৃষিকে প্রভাবিত করবেযা আবার দক্ষিণ এশিয়ায় খাদ্য নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থানের প্রধান আশ্রয়। জলবায়ু পরিবর্তন খরা, বন্যা ও লবনাক্ততা রূপে স্বাস্থ্যখাতে বিপর্যয় ঘটাতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে যদি সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ে তা হলে উপকূলীয় মানুষদের অনেককেই আবাসস্থল ত্যাগ করতে হতে পারে। এরূপ মানুষের শতকরা হার মালদ্বীপের পরই বাংলাদেশে বেশি। মালদ্বীপে পুরো জনগোষ্ঠীই এক্ষেত্রে ঝুঁকিতে আছে। বাংলাদেশে এ হার প্রায় ৪৬ ভাগ। যদিও শিল্পায়ন সীমিত হওয়ার কারণে গ্রীণহাউজ গ্যাসের নির্গমন দক্ষিণ এশিয়ায় সামান্যইকিন্তু নগরায়ন ও জ্বালানি এবং পরিবহন ইত্যাদির চাহিদা যেভাবে বাড়ছে তাতে গ্রীণ হাউজ গ্যাসের নির্গমন দ্রুতলয়ে বাড়বে এ অঞ্চলে। ১৯৯০ থেকে ২০০৫ পর্যন্ত যে বৃদ্ধির হার দেখা গেছে বছরে ৩.৪ শতাংশ।

পানি ব্যবস্থাপনা উন্নত করা জরুরি

দক্ষিণ এশিয়ায় পানির মূল্য এর পানির অপচয় ও কম উৎপাদনশীলতাকেই উৎসাহিত করে। সেচের জল এত সস্তা যে সেচ প্রকল্পগুলো লাভজনক হয়নি এখানে। সেগুলোর পুনর্নিমাণ, সংস্কার কম। ফলে চাষাবাদ পর্যায়ে পানির অপচয়ও বেশি। দক্ষিণ এশিয়ায় পানি সংকটের অন্তত একটি কারণ পানির অদক্ষ, অপচয়মূলক ব্যবহার।

দক্ষিণ এশিয়ার একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো পানিকে সচরাচর খোদার দান হিসেবেই দেখা হয়। ফলে পানিকে কম দামেই পেতে অভ্যস্ত সবাই। আবার ভূমির ব্যক্তিগত মালিকানাকে একই সঙ্গে ভূগর্ভস্থ পানির মালিকানা হিসেবেও ধরে নেয়া হয়। উপরন্তু এইরূপ পানি উত্তোলনে ভর্তুকিও দেয়া হয়! দক্ষিণ এশিয়ার প্রায় সবদেশে কৃষির জন্য সেচে বিদ্যুতভর্তুকি রয়েছে। পাকিস্তানে সেচের ক্ষেত্রে ২০১০ সালে বিদ্যুত সাবসিডি ছিল ১২ বিলিয়ন রুপি। এইরূপ ভুর্তকির ফল হয়েছে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাওয়া ও লবণাক্ততার বিস্তৃতি। তবে এ অঞ্চলের কৃষকদের আর্থিক অবস্থা বিবেচনায় এরূপ ভর্তুকি পুরোপুরি তুলে দেয়া যৌক্তিক হবে না।

বিশ্বে অঞ্চলগতভাবে দক্ষিণ এশিয়াতেই ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন বেশি এবং তা নিয়ন্ত্রণে কোন আইন বা কর্তৃপক্ষ নেইযদিও এ অঞ্চলের দেশগুলো পানি সম্পদকেন্দ্রীক মন্ত্রণালয় রয়েছে। কোন কোন দেশে পানি বিষয়ে কৃষি মন্ত্রণালয়ের বিস্তর এখতিয়ার রয়েছে। যেমন, বাংলাদেশ। তবে এইরূপ দ্বৈততায় পানিকেন্দ্রীক শাসন কাঠামো কোন সুনির্দিষ্ট রূপ পায়নি।

এ অঞ্চলে পানি ব্যবস্থাপনার আরেকটি দুর্বল দিক হলো, পানি সংরক্ষণের অবকাঠামো কম থাকা। যেমন, পাকিস্তানের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, বন্যার সময় দেশটিতে ৩৫ মিলিয়ন একর ফুট পানি আরব সাগরে চলে যায়। বাংলাদেশেও বর্ষায় দেখা যায়, দেশটির গড়ে ৪০ ভাগ অঞ্চল বন্যা উপদ্রুত। অথচ অন্য মৌসুমে একই এলাকায় থাকে পানির তীব্র সংকট।

পানি সংরক্ষণ উদ্যোগগুলোর সাথে বিদ্যুত উৎপাদনের ধারণাকেও যুক্ত করা যায়। ভূটান ছাড়া দক্ষিণ এশিয়ার প্রায় সবদেশে বিদ্যুত ঘাটতি রয়েছে। ভারতের রাজনৈতিক আনুকূল্যে ভূটান হাইড্রোইলেকট্রিসিটিকে তার আয়ের প্রধান এক খাত বানিয়ে নিয়েছে। তবে পানি সংরক্ষণাগার বা ড্যামধর্মী অবকাঠামো গড়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ এক বিবেচনা থাকা উচিত পরিবেশ প্রশ্ন। উপরন্তু এসব প্রকল্পে অনেক ক্ষেত্রেই প্রচুর মানুষ উদ্বাস্তু হয়ে পড়ে। ফলে তাদের যথাযথ পুনর্বাসনের প্রশ্ন এসে পড়ে এবং এভাবে পানি প্রশ্নের সাথে জড়িয়ে পড়ে রাজনীতিও।

দুষ্পাপ্যতা ও কর্তৃত্ববাদী মানসিকতা

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর পানি সংকটের কিছু একক বৈশিষ্ট্য থাকলেও বিভিন্ন দেশের আবার কিছু কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট্যও রয়েছে। যেমন, বাংলাদেশ তার পানি প্রবাহের ৯০ ভাগের জন্যই চীনভারতের ওপর নির্ভরশীল। উদ্বেগের দিক হলো, কৃষিশিল্প ইত্যাদিকে ঘিরে ভারত ও চীনে পানির ক্ষুধা বৃদ্ধি মানেই বাংলাদেশের পানি প্রাপ্তির সম্ভাবনা কমে যাওয়া। ভারতে ১৯৫০ সালেও জনপ্রতি পানির প্রাপ্যতা ছিল পাঁচ হাজার কিউবিক মিটার। ২০০৫ সালে যা এসে দাঁড়িয়েছে ১৮০০ কিউবিক মিটারে। ধারণা করা হচ্ছে ২০২৫ নাগাদ এটা এক হাজার কিউবিক মিটারে নেমে আসবে। খবর হিসেবে এটা বাংলাদেশের জন্য উদ্বেগের। কারণ ভারতের সঙ্গে সংযুক্ত প্রায় সকল গুরুত্বপূর্ণ প্রবাহে বাংলাদেশ ভাটির দেশ হওয়ায় দরকষাকষির সুযোগ তার অল্প। স্বাভাবিকভাবেই বাংলাদেশীদের মাঝে এটা এক বোবা ক্ষোভের জন্ম দিয়ে যাবে।

ভারতের নদী প্রবাহের প্রধান তিনটি ধারার (সিন্ধু, গঙ্গা ও ব্রহ্মপত্র) দু’টিতেই বাংলাদেশের সরাসরি স্বার্থ জড়িত রয়েছে। দু’দেশের মধ্যে ৫৪টি অভিন্ন নদী রয়েছে। তার মধ্যে, বিশেষত শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশের পানির প্রাপ্যতার ৮৫ ভাগ নির্ভরতাই গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্রকে ঘিরে। অন্যদিকে, ভারতে বিশ্ব জনসংখ্যার ছয় ভাগের এক ভাগের বাস হলেও বিশ্ব পানি সম্পদে তার হিস্যা ২৫ ভাগের এক ভাগ। ক্রমে এই ব্যবধান বাড়ছে, আর দেশটি তার নদী প্রবাহের পুরোটাই নিয়ন্ত্রণ করাকে কর্তব্য জ্ঞান করছে। এইরূপ মনোভাব অনিবার্যভাবেই রাজনীতিতে উত্তাপ ছড়াচ্ছে এবং নিকট ভবিষ্যতে তা উত্তেজক রূপ নিতে পারে।

ভারতের এইরূপ মনোভাব পাকিস্তানের সঙ্গেও তার বৈরিতা বাড়াচ্ছে। অন্তত ছয়টি নদীতে এই দুই দেশের যৌথ হিস্যা রয়েছে। ১৯৬০ সালের সিন্ধু নদী চুক্তি দেশ দুটির মধ্যে পানি বৈরিতা নিরসনের একটি দিকনির্দেশান হিসেবে নির্ধারিত হলেও তার বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে সমঝোতায় আসতে পারছে তারা কমই। অনুরূপ বিবাদ রয়েছে নেপালভারত পানি সম্পর্কের ক্ষেত্রেও। তবে সমঝোতার দৃষ্টান্তও এক্ষেত্রে পুরানো। ১৯২০এ সারদা ব্যারাজ চুক্তির মধ্যদিয়ে নেপালভারত পানিসমঝোতার শুরু। এরপর ১৯৫০এ কোশি চুক্তি, ১৯৫৯ সালে গন্ধক চুক্তি, ১৯৯৬ সালে হয়েছে মহাকালি চুক্তি। এসব চুক্তি হওয়ার পরও পানি বিষয়ে এই দুই দেশের জনসমাজে পারস্পরিক আস্থাবিশ্বাস কম। বিশেষত নেপালের নাগরিক সমাজ মনে করে চুক্তিগুলোতে [অন্তত মহাকালী চুক্তিতে] তাদের দেশের স্বার্থ রক্ষিত হয়নি। এইরূপ মনোভাবের যথেষ্ট সত্যতাও বিদ্যমান। ফলে ১৯৮৩ সালে ভারত যখন নেপাল সীমান্তে এককভাবে তানকপুর ব্যারাজ তৈরি করতে শুরু করে তখন নেপাল জুড়ে ব্যাপক বিক্ষোভ হয়। অন্যদিকে, জলবিদ্যুতের বিস্তর সুযোগ থাকার পরও নেপাল এখনো ভারত থেকে বিদ্যুত আমদানি করে। পানিকূটনীতির ক্ষেত্রে নেপালের নীতিনির্ধারকদের প্রতি জনআস্থাহীনতার এটাও একটা দিক।

তবে কেবল দেশেদেশে বিবাদই নয়অনেক দেশের প্রদেশে প্রদেশেও পানি নিয়ে বিবাদ চলছে। পাকিস্তানের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, সিন্ধু ও খাইবার পাখতুনোয়ার বিরোধিতার কারণে ১৯৫৩ সালে শুরু করেও কলাবাগ ড্যাম নির্মাণ সম্পন্ন করতে পারেনি। অথচ সেচ ও বিদ্যুত উৎপাদনের জন্য প্রকল্পটি দরকার ছিল পাকিস্তানের। ভৌগলিকভাবে উঁচুনিচু ও উজানভাটির সমস্যা থেকে এসব বিবাদের উপত্তি। তবে কোন কোন ক্ষেত্রে অববাহিকার সকলের স্বার্থকে সুবিবেচনা না করাই এসব বিবাদকে উত্তেজক রূপ দিচ্ছে। তবে সুখবরও আছে। গত শতাব্দির শেষ ৫০ বছরে দেখা গেছে, বিশ্বের আন্তর্জাতিক নদীগুলোর পানি নিয়ে অন্তত ১৫৭টি চুক্তি হয়েছে। এই পটভূমিতে দক্ষিণ এশিয়ার সামনে স্বাভাবিকভাবেই বিকল্প মাত্র দু’টিযৌথ নদীগুলোর অববাহিকাজুড়ে সহযোগিতার ন্যায্য ক্ষেত্র প্রসারিত করা কিংবা এমুহূর্তের বোবাবিরোধকে ক্রমে সহিংস বিবাদের দিকে নিয়ে যাওয়া।।

১টি মন্তব্য