Home » রাজনীতি » কোনো বিরোধী দল নেই ॥ রাজনীতির ঘোর দুর্দিন

কোনো বিরোধী দল নেই ॥ রাজনীতির ঘোর দুর্দিন

আমীর খসরু

dis 1বাংলাদেশে বর্তমানে এক চরম রাজনৈতিক সঙ্কট চলছে। সঙ্কটটি যতোটা না দুই বড় দলের কাজিয়াফ্যাসাদ, তার চেয়েও অনেক বেশি গভীরে। মূল সঙ্কটটি নামমাত্র গণতন্ত্রের মুমূর্ষ অবস্থার কারণে। একটি নামকাওয়াস্তে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্যও যে সব অধিকার জনগণকে নিশ্চিত করতে হয়, তার ছিটেফোঁটাও এখন নেই। মানুষের বাকব্যক্তি স্বাধীনতা, স্বাধীন মতামত প্রকাশ, সভাসমাবেশসহ এ জাতীয় অধিকার এবং অন্যান্য যে শর্তাবলী রয়েছে তা এখন অনুপস্থিত। এমনকি প্রতিনিধিত্বশীলতার নামে নির্বাচনী গণতন্ত্রের কথিত ব্যবস্থাটুকুও বিলুপ্ত করা হয়েছে। গণতন্ত্র চর্চার সব পথ রুদ্ধ হয়ে আসছে ক্রমশ। আর এরই ধারাবাহিকতায় যে গুরুত্বপূর্ণ সঙ্কটের সৃষ্টি হয়েছে তা হচ্ছে একটি প্রতিনিধিত্বশীল সরকার ব্যবস্থায় কার্যকর এবং শক্তিশালী বিরোধী দলের উপস্থিতি প্রয়োজন হয় তা নেই।

জাতীয় সংসদের কথাই যদি বলা যায় তাহলে সেখানে এখন ‘অতি লয়াল অপজিশন’ বা মাত্রাতিরিক্ত অনুগত একটি বিরোধী দল রয়েছে এবং এটি সরকারি দলই সৃষ্টি করে দিয়েছে। সেই হিসেবে আনুষ্ঠানিক কোনো বিরোধী দল নেই বাংলাদেশে। বিরোধী দল না থাকাটা গণতন্ত্রের অনুপস্থিতিসহ সামগ্রিক গণতান্ত্রিক প্রথাপ্রতিষ্ঠানকে ধ্বংস করার ইঙ্গিত বহন করে। তত্ত্বগতভাবে এমন পরিস্থিতিতে বিরোধী দল এবং সঙ্গে সঙ্গে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাদির অনুপস্থিতি স্বৈরশাসনের জন্ম দেয়। বাংলাদেশে এখন তাই চলছে।

একটি কার্যকর ও শক্তিশালী বিরোধী দল থাকা প্রয়োজন শাসন কাজে ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষার জন্য। বিরোধী দল না থাকার ফলে ভারসাম্যহীনতার সৃষ্টি হয়। বর্তমান ক্ষমতাসীনরা সেই ভারসাম্যহীনতার চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। যে বিরোধী দলটি সংসদে নেই, তাদেরও নিশ্চিহ্ন করার লক্ষ্যে অতীতে যেমন নানা কর্মকাণ্ড গ্রহণ করা হয়েছিল, তেমনি এখনো ওই লক্ষ্যে যাবতীয় উদ্যোগ জারি রয়েছে। অচিরেই সমূলে উৎপাটনের জন্য আরও কঠিন এবং কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। ফলে ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতা আরও বাড়বে। আর এ কারণে যা হওয়ার তাই হচ্ছে এবং এই অবস্থা চলতে থাকলে পরিস্থিতি আরও জটিল এবং ভয়াবহ রূপ নেবে।

স্বাধীনতার পরেও এমন এক পরিস্থিতির সৃষ্টি করা হয়েছিল। প্রথমে ১৯৭৩ সালের ২২ সেপ্টেম্বরে সংবিধানের দ্বিতীয় সংশোধনীর মাধ্যমে জরুরি অবস্থা জারির বিধানসহ বেশ কিছু নিবর্তনমূলক আইনকে সংবিধানে সন্নিবেশিত করা হয়। এর উদ্দেশ্য সম্পর্কে প্রথমে নানা ভালো কথা বলা হলেও এর মূল কারণটি ছিল তৎকালীন বামপন্থী নেতাকর্মীদের নিধন এবং শায়েস্তা করা। কারণ ওই সময়ে ওই শক্তিই তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের জন্য চ্যালেঞ্জ হিসেবে দাঁড়িয়েছিল। রক্ষীবাহিনী গঠনসহ বেশ কিছু অগণতান্ত্রিক কর্মকাণ্ড তখন পরিচালিত হয়েছিল। এতেও তারা সন্তুষ্ট হতে না পেরে ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে একদলীয় বাকশাল গঠনের মাধ্যমে সর্বময় কর্তৃত্ব এককেন্দ্রীক করে ফেলে। আর এক দল হওয়ার কারণে বিরোধী দলের অস্তিত্ব সংবিধানেই থাকলো না। পুরো শাসন ব্যবস্থাটি ব্যক্তি এবং তার পছন্দসইদের শাসনের সর্বোচ্চ রূপ হিসেবেই প্রতিষ্ঠিত হয়। বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণে দেখা যায়, কার্যকর ও শক্তিশালী বিরোধী দল থাকতে না দেয়া বা একে নিশ্চিহ্ন করার যে কর্মকাণ্ড তা ক্রমাগত ওই পুরনো পথপদ্ধতিরই অনুসরণ ও অনুকরণ মাত্র, তবে এবারে কিছুটা ভিন্ন পন্থায়।

এই ব্যবস্থাটি যে একদিনে নেয়া হয়েছে তা নয়, আওয়ামী লীগ ২০০৯এ ক্ষমতাসীন হওয়ার পর থেকেই বিরোধী দল, পক্ষ, গোষ্ঠী এমনকি ব্যক্তি পর্যায়ে যে অত্যাচারনির্যাতন চালিয়েছে, সভাসমাবেশ নিষিদ্ধ করেছে এবং এরই ধারাবাহিকতায় তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল এবং ৫ জানুয়ারির নির্বাচনটি অনুষ্ঠিত হয়।

শক্তিশালী বিরোধী দল যে প্রয়োজন তা বোঝার জন্য প্রতিনিধিত্বশীল সরকার ব্যবস্থা এবং বিরোধী দলের সৃষ্টির ঐতিহাসিক ঘটনাবলীর দিকে দৃষ্টি দেয়া প্রয়োজন। খ্রিস্টপূর্ব পাঁচশ বছর বা তারও আগে গ্রিসের এথেন্সে নগর রাষ্ট্রে নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্র চর্চা হতো এবং সেখানে নারী, দাস এবং এথেন্সের বাইরের কেউ নাগরিক হতে পারতেন না। এই নগর রাষ্ট্রের যে নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্র তা ছিল আসলে অভিজাতদের শাসন। প্রাচীন রোম সাম্রাজ্যেও সিনেট নামে একটি প্রতিনিধি পরিষদ ছিল, যা রাজ্য শাসনে সহায়তা করতো। এটিও ছিল অভিজাতদের প্রতিনিধি পরিষদ। গণতন্ত্র নিয়ে নানা পরীক্ষানিরীক্ষা হয়েছে বিভিন্ন সময়ে। সুইজারল্যান্ডে ১৩ শতকে প্রথম আইন প্রণয়ন শুরু হয়। এর দীর্ঘ ধারাবাহিকতায় ১৮৪৭ সালে প্রথম গণভোট প্রথা চালু হয়। এটাই সম্ভবত প্রথম গণভোটের ঘটনা। ১৮৯১ সালে সে দেশের পার্লামেন্টে আইন প্রণয়ন কার্যক্রমে কার্যকর বিরোধীতা করার আইন পাস হয়। এভাবেই গণতন্ত্র চর্চা হয়েছে এবং বিকশিত হয়েছে গণতান্ত্রিক প্রথাপ্রতিষ্ঠানের। ১৮৬১ সালে জন স্টুয়ার্ড মিল তার বিখ্যাত গ্রন্থ রিপ্রেজেনটেটিভ গভর্নমেন্টএ শাসন কার্যক্রমে প্রতিনিধিত্বশীলতার ধারণাটিকে সূত্রবদ্ধ করে ব্যাখ্যাবিশ্লেষণ করেছেন। আর এর মধ্যদিয়ে তিনি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ নির্বাচন ব্যবস্থার মাধ্যমে শাসন ব্যবস্থা এবং পার্লামেন্ট কার্যক্রমকে জনপ্রতিনিধিত্বমূলক করার ব্যবস্থার কথা বলেছিলেন। ১৭ শতকের দিকেই ব্রিটিশ রাজতন্ত্রের মধ্যেই পার্লামেন্ট ব্যবস্থার কার্যক্রম শুরু হয়। কিন্তু প্রথমদিকে অনেক দিন সেখানে কোনো বিরোধী দল ছিল না। পরে রাজা বা রানীদের শাসনকালে তারাই উপলব্ধি করেন যে, একটি বিরোধী দলের উপস্থিতি ওই পার্লামেন্টে থাকা জরুরি এবং এটা প্রয়োজন তাদের শাসনের স্বার্থেই। আর একেই বলা হয়, হিজ ম্যাজেস্টিজ অপজিশন। ব্রিটেনে রাজার শাসনের সময় একে বলা হতো হিজ ম্যাজেস্টিজ অপজিশন এবং রানীর শাসনকালে একে বলা হতো হার ম্যাজেস্টিজ অপজিশন। ১৮২৬ সালে স্যার জন হবহাউজ প্রথম ওই ধারণার তত্ত্বগত বিষয়টি কাগজেকলমে প্রথম উল্লেখ করেন।

এ পরিস্থিতি দীর্ঘকাল প্রলম্বিত হবে এটা মনে করার কোনো কারণ নেই। কারণ শূন্যতা সাময়িক হলেও স্থায়ী কোনো বিষয় নয়। সাধারণ মানুষ কখনই স্থায়ীভাবে বোকাকানা হয়ে, নিথর হয়ে, আশাভরসা ছেড়ে দিয়ে বসে থাকে না। প্রতিবাদপ্রতিরোধের নানান পথ জনগণ খুঁজে নেয় নিজে নিজেই, দরজা খুজে পায় তারা অন্ধকারেও। এটাই হচ্ছে ইতিহাসের শিক্ষা।

এই দীর্ঘ ইতিহাসের মধ্যদিয়ে একটি বিষয় প্রমাণিত যে, গণতন্ত্রের জন্য জনঅংশীদারিত্ব, এ লক্ষ্যে প্রতিনিধিত্বশীলতা, কার্যকর পার্লামেন্ট, শক্তিশালী বিরোধী দল কেন থাকা প্রয়োজন। এবং ক্ষমতার ভারসাম্য যে প্রয়োজন হয় তাও এর মাধ্যমে প্রমাণিত। তবে এখানে বলে রাখা ভালো, এই প্রতিনিধিত্বশীল সরকার ব্যবস্থাটিও সাধারণ মানুষের প্রতিনিধিত্বশীল শাসন ব্যবস্থা হিসেবে দাঁড়াতে পারেনি। এই শাসন ব্যবস্থাটি আসলে কখনো কতিপয়, কখনো দল বা গোষ্ঠী এবং কখনো কখনো একটি শ্রেণীর শাসন হিসেবেই কাজ করেছে। প্রতিনিধিত্বশীল শাসন ব্যবস্থাটি যখন নির্বাচনী গণতন্ত্র হিসেবে রূপ নিয়েছে, তখন অধিকাংশ মানুষ প্রতিনিধিত্বশীল গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ধ্যানধারণা থেকে ছিটকে পড়েছে। তা সত্ত্বেও বিদ্যমান পরিস্থিতিতে কার্যকর প্রতিনিধিত্বশীল সরকার ব্যবস্থা যদি সচল থাকে, তা একেবারে না থাকার চেয়ে অনেক শ্রেয়।

প্রতিনিধিত্বশীল শাসন ব্যবস্থায় শক্তিশালী বিরোধী দলের উপস্থিতি যে একটি অপরিহার্য বিষয় তা প্রমাণিত। কিন্তু আগেই বলা হয়েছে, বাংলাদেশে এই মুহূর্তে আনুষ্ঠানিক কোনো বিরোধী দল নেই।

যে বিরোধী দল সংসদে নেই কিন্তু বিরোধী দলের কর্মকাণ্ড বাইরে থেকে পরিচালনা করবে বলে ধারণা করা হয়েছিল তারা কি এই সঙ্কটাপন্ন রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সঙ্কট মোকাবেলায় আসলেই সক্ষম? বিএনপি একটি বিরোধী দল হিসেবে বার বার হোচট খাচ্ছে। এই হোচট খাওয়ার পেছনে ক্ষমতাসীনদের নেতিবাচক কর্মকাণ্ড যেমন দায়ী তেমনি বিএনপিও বিরোধী দল হিসেবে মেরুদন্ড সোজা করে দাড়ানোর চেষ্টা কখনো করেছে, এমনটা দেখা যায়নি। বর্তমান সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার পর থেকে নানাবিধ জনবিরোধী কর্মকাণ্ড চালিয়ে গেলেও সেক্ষেত্রে বিরোধী দল একদিকে চুপচাপ থেকেছে, অন্যদিকে বিদেশ থেকে তাদের নেতাকে ফিরিয়ে আনা এবং বাড়িঘর রক্ষার আন্দোলনেই বেশি ব্যস্ত সময় কাটিয়েছে। জনগণ যখন প্রবলভাবে প্রত্যাশা করেছিল, অপেক্ষায় ছিল বিরোধী দলের কার্যকর এবং শক্তিশালী উপস্থিতির, তখন তারা ব্যস্ত ছিল নিজ স্বার্থ রক্ষার আন্দোলন এবং পুনরায় ক্ষমতায় যাবার উদগ্র বাসনায়। নেতিবাচক ভোটের মাধ্যমে ক্ষমতাসীনদের জনগণ যখন প্রত্যাখ্যান করেছে, বিএনপি তাকে তাদের সমর্থন বৃদ্ধি বলে ভুল হিসাবনিকাশ করেছে। এই জনবিচ্ছিন্নতা ক্রমান্বয়ে তাদের দলের মধ্যে অভ্যন্তরীণ সমস্যারও সৃষ্টি করেছে। তৃণমূলের নেতাকর্মীদের সঙ্গেও যোজন যোজন মাইলের দূরত্বের সৃষ্টি হয়েছে। তাই এই পরিস্থিতিতে আন্দোলনের হুংকার দেয়া হলেও তাতে কাজের কাজ কতোটুকু হবে বলা মুশকিল। কারণ সাধারণ জনগোষ্ঠী তাদের উপরে ভরসা করতে পারছে না।

অথচ বিএনপির ভবিষ্যত নেতা বলে খ্যাত তারেক রহমান এসব ইস্যুর ধারে কাছে না গিয়েও অতীত ইতিহাস ঘাটাঘাটির নামে নিজ দল বিএনপিরই শুধু ক্ষতি করেনি, আবারও প্রমাণ করেছেন তারা জনগণের সাথে নেই।

একটি কার্যকর ও সবলসতেজ বিরোধী দল থাকার মধ্যদিয়ে শাসন ব্যবস্থার ভারসাম্য যেমন রক্ষিত হয় তেমনি রাজনৈতিক সংস্কৃতির সুস্থতা এবং গণতন্ত্র রক্ষাও নির্ভর করে। সর্বোপরি ক্ষমতাসীনদের নানাবিধ জনবিরোধী কর্মকাণ্ডের বিপরীতে জনসম্পৃক্ত বিষয়গুলোতে পুরোপুরি না হলেও অন্তত কিছুটা প্রতিবাদপ্রতিরোধ গড়ে তোলা সম্ভব। আর এটুকু করলেই জনগণ তাদের ডাকে সাড়া দেয়। কিন্তু জনবিচ্ছিন্নতার কারণে সাধারণ জনগোষ্ঠী এখন প্রতিনিধিত্বহীন। তাদের কোনো পথ এবং পন্থা আপাতত নেই। আর নেই বলেই বিদ্যুতের দাম দফায় দফায় বাড়ানো হচ্ছে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সীমাহীন অবনতি হয়েছে, দেশের স্বার্থ বিপন্নকারী সিদ্ধান্ত গ্রহণের মতো বিষয়গুলোতে কথা বলার কেউ নেই। কিন্তু এ পরিস্থিতি দীর্ঘকাল প্রলম্বিত হবে এটা মনে করার কোনো কারণ নেই। কারণ শূন্যতা সাময়িক হলেও স্থায়ী কোনো বিষয় নয়। সাধারণ মানুষ কখনই স্থায়ীভাবে বোকাকানা হয়ে, নিথর হয়ে, আশাভরসা ছেড়ে দিয়ে বসে থাকে না। প্রতিবাদপ্রতিরোধের নানান পথ জনগণ খুঁজে নেয় নিজে নিজেই, দরজা খুজে পায় তারা অন্ধকারেও। এটাই হচ্ছে ইতিহাসের শিক্ষা।।