Home » প্রচ্ছদ কথা » তারেক কি বিএনপির এ্যাসেট না লায়াবিলিটি?

তারেক কি বিএনপির এ্যাসেট না লায়াবিলিটি?

শাহাদত হোসেন বাচ্চু

coverলোকায়ত জ্ঞানের অধিকারী প্রাচীন সেই বুদ্ধিমান বৃদ্ধের গল্পটি দিয়ে শুরু করা যাক। গ্রামের এই বৃদ্ধের কাছে বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া এক তুখোড় ছাত্র এসে বললে, এসো দাদু একটি খেলা করা যাক। তুমি একটি প্রশ্ন করবে, না পারলে আমি তোমাকে এক হাজার টাকা দেব। আমি যে প্রশ্ন করবো সেটি না পারলে তুমি দেবে একশ টাকা। এসো শুরু করা যাক। শুরুতেই পর পর তিনটি প্রশ্নের জন্য বৃদ্ধের গচ্চা গেল তিনশ টাকা। এবার বুড়োর পালা, আচ্ছা বলতো নাতি, দু’পা দিয়ে পাহাড়ে ওঠে, তিন পা দিয়ে নামেজীবটির নাম কি? ছাত্রটি অনেকক্ষণ ভেবেচিন্তে আস্তে আস্তে এক হাজার টাকা বাড়িয়ে দিল বৃদ্ধের দিকে। দাদু তাহলে তুমি বলে দাও উত্তরটাঅপ্রস্তুত ছাত্রের জিজ্ঞাসা? বৃদ্ধ তাড়াতাড়ি একশ টাকা ধরিয়ে দিলেন ছাত্রের হাতে।

এটি ছিল একটি বুদ্ধির খেলা এবং অর্বাচীন এক তরুনকে সে খেলায় হারিয়ে দিয়েছিলেন প্রাচীন বুদ্ধিমান বৃদ্ধ, যাকে তরুনটি মনে করেছিল মূর্খ। আমাদের রাজনীতির একজন যুবরাজ, বিএনপি’র পাওয়ার হাউস, বিলেত প্রবাসী তারেক জিয়া অর্বাচীন সেই তরুনের বুদ্ধির খেলাটিই কি শুরু করেছেন জাতির সাথে। সাম্প্রতিককালে রাজনীতিতে একের পর এক তার উদ্ভট মন্তব্য, অপ্রয়োজনীয় বিতর্কের সৃষ্টি করে চলেছে। এতে তার, তার দল বা দেশের কি লাভ হচ্ছে, সেটি পরিষ্কার নয়। উদ্ভট ও আজব ধরনের ঐতিহাসিক তথ্য আবিষ্কার ও প্রচার করার আনন্দে মশগুল হয়ে তিনি বলে চলেছেন, তার পিতা জিয়াউর রহমান নাকি বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি এবং শেখ মুজিবুর রহমান ৭২ সালের অবৈধ প্রধানমন্ত্রী। এর মধ্য দিয়ে তিনি কি অর্জন করতে চাচ্ছেন, সেটিও পরিষ্কার নয়। তবে তিনি অনেকগুলো প্রশ্নের জন্ম ইতিমধ্যেই দিয়ে ফেলেছেন।

বাংলাদেশে আগামীতে রাজনীতি করতে হলে এইসব প্রশ্নের উত্তর তারেক জিয়াকে দিতে হবে। গত ৫ জানুয়ারির জাতীয় নির্বাচন বয়কটে প্রবল প্রভাব বিস্তার করে দলকে নির্বাচন থেকে বিরত রাখতে তারেক সক্ষম হয়েছিলেন। এ কাজটি ভুল কি সঠিক ছিল, সে প্রশ্নের উত্তর তোলা থাকল ভবিষ্যত ইতিহাসের কাছে। তার দ্বিতীয় মেয়াদে সরকার গঠন কতোটা স্থায়িত্ব পাবে, কিংবা প্রায় ভোটারবিহীন নির্বাচনে গঠিত কর্তৃত্ববাদী সরকারের ভবিষ্যত পরিনতি কি, সেটিও ভবিষ্যতের হাতে তোলা থাকল। বিএনপি নির্বাচন বয়কট করেছে, প্রতিরোধে গণ আন্দোলন গড়ে তুলতে সক্ষম হয়নি, উল্টো জামায়াতের ধ্বংসাত্মক রাজনীতির সাথে সর্বাত্মক সম্পৃক্ততা দল হিসেবে মারাত্মক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি করে দিয়েছে। তারা নিজেদের মধ্যে ‘ব্লেম গেম’ নিয়ে এতোটাই মগ্ন যে মিডিয়ায় সরব উপস্থিতি ছাড়া সারাদেশে অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া মুশকিল হয়ে গেছে। তাদের অনৈক্য, শক্তিহীনতা, দুর্বলতাক্ষমতাসীন দলকে শাসক হিসেবে দানবীয় রূপে আবির্ভূত হতে প্রণোদনা জোগাচ্ছে।

এরকম একটি ভয়াবহ পরিস্থিতিতে বিলেত প্রবাসী বিএনপি’র সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান ইতিহাসের কতোগুলি মীমাংসিত বিষয় নিয়ে কেন মেতে উঠলেন? তিনি যার উত্তরাধিকার বাংলাদেশের রাজনীতিতে, সে মরহুম জিয়া জীবদ্দশায় এসব নিয়ে কোন বিতর্কিত কথা বলেছেন, এমনটি কখনও শোনা যায়নি। তাহলে তারেক কি আওয়ামী লীগের হাতে একটি গরম ইস্যু তুলে দেয়ার জন্য একথাগুলো বলছেন? তিনি কি জামায়াতের মুখপাত্র হিসেবে কথা বলছেন? তিনি কি বিএনপিকে নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতি থেকে অন্য কোন দিকে ধাবিত করতে চাচ্ছেন? অথবা তিনি কি একাডেমিশিয়ান বা ইতিহাসবিদের তকমা লাগাতে চাচ্ছেন? জিয়াকে প্রথম রাষ্ট্রপতি এবং শেখ মুজিবকে ৭২ সালের অবৈধ প্রধানমন্ত্রী বানাতে গিয়ে তারেক একটি ভাল ট্রাম্প কার্ড ক্ষমতাসীনদের হাতে তুলে দিয়েছেন। ব্যাস, নাভিশ্বাস ওঠা জনগনের অজস্্র সমস্যা আপাত চাপা দিয়ে তারেকের বক্তব্য নিয়ে ক্ষমতাসীনরা মেতে উঠেছেন। জাতীয় সংসদ, মিডিয়া, টিভি টক শোইত্যাদি এখন ভীষণ সরগরম তারেকের বক্তব্য নিয়ে। যদি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আসার জন্য তারেক ওরকম বক্তব্য দিয়ে থাকেন, তাহলে তিনি সাফল্যের ঢেকুর তুলতেই পারেন। কিন্তু এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে তিনি যে ক্ষতিটি করে ফেললেন তা হচ্ছে, নানারকম জনসম্পৃক্ত ইস্যুকে পাশ কাটিয়ে ক্ষমতাসীনদের দেশজুড়ে ঝড় তোলার সুযোগ করে দিলেন।

৫ জানুয়ারি’র ভোটারবিহীন নির্বাচন, উপজেলা নির্বাচনে দখলসহিংসতা, আজ্ঞাবহ নির্বাচন কমিশন, ক্ষমতাসীনদের গুমখুন, লুটপাট এবং জনগনের অফুরন্ত সমস্যাকে ইস্যু হিসেবে বেছে নেয়ার বদলে তারেক জিয়ার হঠাৎ এই ইতিহাসমনস্কতা যেকোন রাজনৈতিক বিশ্লেষকের কাছে আজব এবং উদ্দেশ্য প্রণোদিত মনে হবে। কিন্তু একটু পেছনে ফিরলে দেখা যাবে, ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের আগে বিলেতে বসে আচমকা একটি ভিডিও বার্তায় তারেক জেহাদের ডাক দেন। তৃণমূলে ভয়ংকর সহিংসতা আর প্রানহানি ছাড়া ঐ বার্তার কোন সুফল ছিলই না। বিলেতে বসে তারেক জিয়া দেশের অভ্যন্তরীন পরিস্থিতি, আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট তার মতো করে বিশ্লেষণ করছেন। গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর বাধা আরোপের কারনে মায়ের সাথেও তার যোগাযোগ কমেছে। ৫ জানুয়ারি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে তারেকের নিজস্ব ফর্মূলা হিতে বিপরীত হয়ে যায়। জামায়াতের ফাঁদে পড়া এই পরিকল্পনা ফাঁস হয়ে গেলে সরকার হার্ড লাইনে চলে যায় এবং গত ২৯ ডিসেম্বরে মার্চ ফর ডেমোক্রেসি ব্যর্থ হয়। আরো রক্তাক্তসহিংস কর্মসূচি গ্রহনের পরিকল্পনা পশ্চিমা কূটনীতিকসহ সকলকে আতঙ্কিত করে তোলে। ফলে ৫ জানুয়ারির নির্বাচন ঠেকাতে তাদের বিপুল প্রত্যাশিত সমর্থন আদায়ে ব্যর্থ হয় বিএনপি।

তারেক জিয়া উত্তরাধিকারের ধারায় ভবিষ্যতে বিএনপির নেতৃত্ব দেবেন এবং সেটি অবধারিত, নেতৃবৃন্দ এটি ধরেই নিয়েছিলেন। সিনিয়র নেতাদের অনেকেই চেয়েছিলেন, মায়ের øেহের আশ্রয়েপ্রশ্রয়ে নয়রাজনীতির ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে তারেক জিয়া দলের হাল ধরবেন। কিন্ত ২০০১২০০৬ মেয়াদে বিএনপি জামায়াত জোট ক্ষমতায় আসার পরে তারেক দল ও সরকারের পাওয়ার হাউস হয়ে ওঠেন এবং তার ব্যবসায়িক অফিস হাওয়া ভবনকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে সমান্তরাল আরেকটি ক্ষমতাকেন্দ্র। সুবিধাবাদী এক শ্রেনীর চাটুকারিতা আর বন্দনায় ভাসতে থাকা তারেকের নাম জড়িয়ে যায় রাষ্ট্রীয় লুটপাটসহ ২১ আগষ্টের গ্রেনেড হামলার মত ভয়ঙ্কর ঘটনার সাথে। দলের মধ্যে সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব পদ বানিয়ে তাকে বসিয়ে দেয়া হয়। দলের মধ্যে প্রায় একক ক্ষমতার অধিকারী তারেক জিয়ার মদদে এবং তার ভবনের সঙ্গে বিরোধের জের ধরে একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরীকে অত্যন্ত অসম্মানকভাবে রাষ্ট্রপতির পদ ছাড়তে বাধ্য করা হয়। কর্নেল (অব🙂 অলি আহমেদও দল ছেড়ে বেরিয়ে আসেন। এরা দু’জনেই মরহুম জিয়ার অত্যন্ত ঘনিষ্ট ছিলেন।

পরবর্তীকালে ২০০৬ সালে গঠিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন ও সেই সরকারের ওপর তারেক জিয়ার প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা তাকে বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসে। আওয়ামী লীগসহ প্রধান দলগুলি নির্বাচন বয়কট ও আন্দোলনের ডাক দেয়। পরিনামে সেনাসমর্থিত অদ্ভুত এক ধরনের তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয় যার অন্যতম ভিকটিম হিসেবে তারেক অমানবিক নির্যাতনের শিকার হয়ে দেশ ছাড়তে বাধ্য হন এবং সুদীর্ঘ নির্বাসনে বিলেত চলে যান। এই নির্বাসনকালে দলীয় প্রধান মায়ের ইচ্ছেয় তিনি সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যানের পদ অলকৃত করেন এনং আগের মতই হাওয়া ভবন সিন্ডিকেটের মাধ্যমে দলকে নিয়ন্ত্রনে রাখতে সক্ষম হন। এই সময়কাল থেকে গত প্রায় সাত বছরে বিএনপিকে কখনো সংগঠিত একটি দল মনে হয়নি। সে না পেরেছে জাতীয় সংসদে বিরোধী দলে কার্যকর ভূমিকায় অবতীর্ন হতে, না পেরেছে রাজপথে লক্ষ্যভেদী কোন গনআন্দোলন গড়ে তুলতে, না পেরেছে দল গোছাতে। এর ফলে বিশ্লেষকরা তো বটেই, খোদ বিএনপির অভ্যন্তরে নীরব প্রশ্ন আছেতারেক কি দলের জন্য এ্যাসেট নাকি লায়াবিলিটি অর্থাৎ তিনি কি দলের জন্য দায় না সম্পদ? তারা এও মনে করছেন, যদি দলের জন্য এ্যাসেট হতে হয় তাহলে তাকে অতীত বিশ্লেষন ও মূল্যায়ন করে গোটা দলের সকলের নেতা হতে হবে, কখনোই বিশেষ একটি গোষ্ঠীর নয়।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করেছিলেন, গত অর্ধ যুগে বিলেত প্রবাসী তারেক জিয়ার রাজনীতির ক্ষেত্রে দৃষ্টিভঙ্গির ইতিবাচক পরিবর্তন করছেন। বৈরী রাজনৈতিক পরিবেশ, বাধ্যতামূলক নির্বাসন, দল হিসেবে বিপর্যস্ত বিএনপি, একটি একক জাতীয় নির্বাচনএসবের কারনে বিএনপি’র আগামী নেতা তারেক ইতিবাচকভাবেই বদলে গেছেন, যা দেশ ও দলের জন্য আশীর্বাদ হতে পারতো। কিন্তু ঘটেছে উল্টোটা। হাওয়া ভবনের এককালের দোর্দন্ড প্রতাপশালী সর্বেসর্বা তারেককে ঘিরে এখনও সেইসব কুশীলবরা, যারা কিনা বিএনপি’র আজকের পরিনতির জন্য অনেক দায়িত্ব বহন করে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে জামায়াতের কৌশল। ভাইয়া খ্যাত তারেক জিয়ার বন্দনাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে জামায়াত তৃণমূল বিএনপির কর্মীদের যেমন এক্সপ্লয়েট করছে, তেমনি ধ্বংসাত্মক কর্মসূচির সহভাগী করে গণতান্ত্রিক রাজনীতি থেকে তাদের দুরে সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। রাষ্ট্রীয় আন্তর্জাতিক প্রতিরোধের মুখে জামায়াতের কৌশলী রাজনীতি বিএনপির তৃণমূল কর্মীদের মনোজগতে এমন ধারনা সৃষ্টি করেছে যে, তারেক জিয়ার নেতৃত্ব ছাড়া বর্তমান নেতৃত্ব দলের দুরবস্থা কাটিয়ে উঠতে সক্ষম নয়। ফলে তারেক ও বিএনপির জামায়াত নির্ভরতা সরকারের জন্য অনেকটা আশীর্বাদ হয়ে দেখা দিয়েছে। বিএনপি’র গণতান্ত্রিক আন্দোলন এবং জামায়াতের সন্ত্রাসী আন্দোলনকে একত্রিত করে ক্ষমতাসীনরা দেশ জুড়ে একধরনের ধোঁয়াশা সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছে।

জামায়াতের পিছু নেয়া সরকার বিরোধী আন্দোলন ব্যর্থ হওয়ার কারনে দলের ভেতরে সন্দেহঅবিশ্বাস বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। চলছে পরস্পরের প্রতি দোষ চাপানোর পালা। বএনপি’র রয়েছে পরস্পর বিরোধী দুটি গ্রুপ। চেয়ারপার্সনের কার্যালয় জিম্মি হয়ে আছে সাবেক কতিপয় আমলা, সাবেক সেনা কর্মকর্তা ও হাওয়া ভবনের কিছু কুশীলবদের হাতে। এরা যতটা না অগ্রসর রাজনৈতিক চিন্তার অধিকারী তার চাইতে বেশি ক্ষমতালোভী ও ভবিষ্যত সুবিধা প্রত্যাশী। বিএনপি’র ভেতরের এই গ্রুপিং দলকে ক্রমশ: দুর্বল থেকে দুর্বল করে দিচ্ছে। সম্প্রতি ফখরুল ইসলাম আলমগীরের জামিন বাতিল হয়ে গেলে অভিযোগ উঠেছে, গুলশান কার্যালয়ের প্রভাবশালী অংশটির সাথে সরকারের গোপন যোগাযোগ রয়েছে। জামায়াত এই গ্রুপটির মাধ্যমে তাদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছিল বলে ধারনা করা হয়। ফলে এই দুর্বলতর অবস্থান এবং তারেক জিয়ার বিভিন্ন সময়ের বক্তব্য বিএনপি’র অভ্যন্তরে প্রগতিশীল অংশটিকে দুর্বল করে উগ্রপন্থী অংশটিকে সামনে নিয়ে আসছে। এ কারনে জামায়াত প্রশ্নে তারা অনেক নমনীয়। এদের তত্ত্ব হচ্ছে জামায়াতের সাথে বিএনপির কট্টরপন্থার সমন্বয় ঘটিয়ে সরকার বিরোধী জঙ্গী আন্দোলন গড়ে তোলা সম্ভব।

এই মুহুর্তে জামায়াত প্রসঙ্গে নিরাপদ দুরত্ব বজায় রেখে চলছে বিএনপি। অন্য দিকে জামায়াতের সাথে সরকারী মহলের সাথে সমঝোতা বা সম্পর্ক একটি অবয়ব পেতে শুরু করেছেএমন বেশ কিছু আলামত দেখা যাচ্ছে। মূলত: উপজেলা নির্বাচনের মধ্য দিয়ে এই নতুন রাজনৈতিক সমীকরনটি ঘটতে শুরু করে। দু’একটি জায়গায় চেয়ারম্যান ও অনেকগুলি ভাইস চেয়ারম্যান পদে ছাড় দেয়ার মাধ্যমে এই সখ্যতার সূচনা ঘটে। পরিস্থিতি এমন দাড়িয়েছে যে, বগুড়া বিএনপির ঘাটি হওয়া সত্ত্বেও উপজেলা নির্বাচনে জামায়াতের সাথে সিট ভাগাভাগির ঘটনা ঘটেছে। রাজশাহী, পাবনাসহ আরও কয়েকস্থানে জামায়াত কৌশলে বিএনপিকে পাশ কাটিয়ে তাদের প্রার্থীদের জয়ী করিয়ে নিয়েছে। এতে বিএনপির শীর্ষ পর্যায় থেকে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়।

এদিকে, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রশ্নে সাম্প্রতিককালে সরকারের আচরন মনে করিয়ে দিচ্ছে, এটা কি ছিল নিছকই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রনোদিত। সরকার এই ইস্যুতে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে সরকারকে যতোটা সিরিয়াস মনে হয়েছে, নির্বাচনের পরে বিষয়টি অনেকটা চাপা পড়ে আছে। পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, জামায়াতের সাথে একটি আপোষ রফার ক্ষেত্রে সরকার যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ইস্যুটি ব্যবহার করবে। যদি আপোষ না হয়, জামায়াতকে যদি বিএনপি থেকে আলাদা না করা যায়, ভবিষ্যত সরকার বিরোধী আন্দোলনের সময় এটিকেই যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বন্ধের অপচেষ্টা হিসেবে আবারও ময়দানে নিয়ে আসা হবে বলে ধারনা করা হচ্ছে।

মাঠ পর্যায়ে বিএনপি এখন অনেক চাঙ্গা। তৃণমূলে জনসমর্থন তো কমেইনি বরং আরো বেড়েছে। উপজেলা নির্বাচন তার একটি বড় প্রমান। গেল বছর ৫টি সিটি কর্পোরেশনের বিপুল বিজয়ও ছিল আরেকটি প্রমান। এই বিশাল বিজয়ের কোন রকম বিশ্লেষণ বা মূল্যায়ন বিএনপি করেনি। করলে দেখতে পেতো আওয়ামী লীগ ও সরকারের বিরুদ্ধে সৃষ্ট নেতিবাচক ক্ষোভের ফলশ্রুতি হচ্ছে এই ভোটের জোয়ার। স্পষ্টত: জনগন এতোটাই ক্ষুব্দ যে, একটি যে কোন ধরনের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নিস্করুন পরাজয় ঘটতোএ বিষয়টি সকলে বুঝলেও বিএনপি নেত্রী এবং তার পুত্র বুঝতে অক্ষম ছিলেন। ফলে তারা ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পরে অনেকটা দিশেহারা বিএনপি উপজেলা নির্বাচনের মধ্য দিয়ে কিছুটা হলেও ট্রাকে ফিরতে শুরু করেছিল। কিন্তু কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব এই জনসমর্থনকে কাজে লাগিয়ে লক্ষ্যভেদী কোন আন্দোলন গড়ে তুলতে পারবে কিনা তা অনেকটাই নির্ভর করছে বিএনপি জামায়াতের প্রভাবমুক্ত হয়ে জনগনকে কতোটা আশ্বস্ত করতে পারবে। বেগম জিয়া এই মূহুর্তে আটকে আছেন, সরকারের চাপ, ঐক্যের ভুল রাজনীতি, তারেক জিয়ার অসংলগ্ন বক্তব্য আর দলীয় অনৈক্যে।

চতুর্মূখী এই দেয়াল ভেদ করে বেগম জিয়া আদৌ কি এগুতে পারবেন? নাকি, বার বার একই ধরনের ভুল করে তিনি ও তার পুত্র বিশাল এই দলকে জড়তা ও স্থবিরতার দিকে নিয়ে যাবেন সেটি এখন সবচেয়ে বড় কৌতুহলের বিষয়। কার্যত: দেশে সংসদ রয়েছে, একটি অনুগত বিরোধী দলও রয়েছে, সরকারের বিরুদ্ধে কথা বলার মত কোন রাজনৈতিক শক্তি এই মূহুর্তে অনুপস্থিত। শতকরা ৪০ ভাগ সমর্থনপুষ্ট একটি দল এসব বিবেচনায় এনে, মূল্যায়ন করে রাজনীতির মূলধারায় আসতে পারলে সেটিই হবে দেশ ও জনগনের জন্য একটি বড় সাফল্যের খবর। আপাতত: এই মূহুর্তে তার কোন লক্ষণ জনগন দেখতে পাচ্ছে না।।