Home » আন্তর্জাতিক » ভারতের জাত-পাত প্রথা – গান্ধী আর আম্বেদকর (পর্ব – ২)

ভারতের জাত-পাত প্রথা – গান্ধী আর আম্বেদকর (পর্ব – ২)

বিড়লা, টাটাদের মতো শিল্পপতিরা গান্ধীর রাজনৈতিক কার্যক্রমে মুক্তহাতে অর্থ সহায়তা করেছেন : অরুন্ধতী রায়

অনুবাদ : মোহাম্মদ হাসান শরীফ

(গত সংখ্যার পর)

last 3বুকার পুরস্কারজয়ী লেখক অরুন্ধতী রায়ের ‘দ্য ডক্টর অ্যান্ড দ্য সেইন্ট’ ইতোমধ্যে বেশ সাড়া জাড়িয়েছে। ড. আম্বেদকরের ‘অ্যানাইহিলেশন অব কাস্ট’ (জাতপাতের সম্পূর্ণ বিলোপ) বইটিকেই নতুনভাবে উপস্থাপন করেছেন অরুন্ধতী। আধুনিক বিশ্বেও জাতপাত প্রথা যে কত ভয়াবহভাবে টিকে আছে সেটাই প্রকটভাবে ওঠে এসেছে বইটিতে। এই নৃশংস ব্যবস্থাটি টিকিয়ে রাখতে করমচাঁদ গান্ধীর ভূমিকাও তুলে ধরেছেন তিনি। পুরনো একটি বিষয় দক্ষ হাতে নিখুঁতভাবে প্রকাশিত হয়েছে। এই বইটি কেন্দ্র করেই অরুন্ধতী রায়ের সাক্ষাতকার নিয়েছেন সাবা নকভি। এখানে এর দ্বিতীয় অংশ প্রকাশ করা হলো।

প্রশ্ন:তবে চূড়ান্ত পর্যায়ে তিনি সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়েছিলেন, নয় কি? তিনি দেশকে স্বাধীনতা অর্জনে নেতৃত্ব দিয়েছেন

অরুন্ধতী:কারো কারো কাছে যেটা ‘স্বাধীনতা’, অন্যদের কাছে তা ক্ষমতার হস্তান্তর ছাড়া আর কিছুই নয়। আবারো মনে করিয়ে দিচ্ছি, আমি বলছি যে গান্ধীআম্বেদকরের বিতর্ক ‘সাম্রাজ্যবাদ’ ও ‘স্বাধীনতা’র মতো শব্দগুলো সম্পর্কে আমাদের উপলব্ধি গভীর ও জটিল করে তোলে। ১৯৩১ সালে গান্ধীর সাথে আম্বেদকরের প্রথম সাক্ষাতের সময় গান্ধী তাকে তার তীক্ষ্ণ ভাষায় কংগ্রেসকে সমালোচনা করার কারণ জিজ্ঞেস করেন। তখন ওই সমালোচনা স্বাধীনতা সংগ্রামের বিরুদ্ধে সমালোচনা হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছিল। আম্বেদকরের বিখ্যাত এবং হৃদয়বিদারক জবাব ছিল : ‘গান্ধীজী, আমরা কোনো স্বদেশ নেই। কোনো অস্পৃশ্যের এই ভূমিতে গর্ব করার অধিকার নেই।’

এমনকি দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে ফেরার পরও গান্ধী নিজেকে সাম্রাজ্যের ‘দায়িত্বশীল’ প্রজা বিবেচনা করতেন। অবশ্য কয়েক বছরের মধ্যে, প্রথম জাতীয় অসহযোগ আন্দোলনের সময় গান্ধী ব্রিটিশবিরোধীতে পরিণত হন। তার ডাকে কোটি কোটি লোক সাড়া দেয়, অবশ্য এটা বলা ভুল হবে যে, কেবল তিনি একাই ব্রিটিশ শাসন থেকে ভারতকে স্বাধীনতায় নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, তবে অবশ্যই তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন। এই সংগ্রামের মধ্যে গান্ধী যদিও সাম্যের কথা বলেছেন, কখনো কখনো সেগুলো সমাজতন্ত্রীর কথার মতো শোনা গেছে, কিন্তু তিনি কখনোই ঐতিহ্যবাহী বর্ণবাদী ক্রমপরম্পরা বা বড় জমিদারদের চ্যালেঞ্জ করেননি। বিড়লা, টাটাদের মতো শিল্পপতি এবং বাজাজ পরিবারের সদস্যরা গান্ধীর রাজনৈতিক কার্যক্রমে মুক্তহাতে অর্থ সহায়তা করেছেন, তিনিও কখনো তাদের বিরুদ্ধে তরবারি ধরেননি। তাদের অনেকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে বিপুল অর্থ বানিয়ে নিয়েছিলেন, তারা এখন অদৃশ্যমান বাধার মুখে পড়লেন। ব্রিটিশ শাসন এবং বর্ণবাদের সাথে বিরোধ তাদেরকে বিপাকে ফেলেছিল, দমিয়ে রাখছিল। তাই তারা জাতীয় আন্দোলনের সাথে নিজেদের সম্পৃক্ত করলেন।

গান্ধী যখন দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে ফিরে এলেন, তখন কর্তৃপক্ষের বিপুল মুনাফার সুফল থেকে বঞ্চিত মিল শ্রমিকেরা উত্তেজিত ছিলেন। পরিণতিতে আহমদাবাদের মিলগুলোতে বেশ কয়েক দফা ত্বড়িৎ ধর্মঘট করেন। মধ্যস্ততা করার জন্য মিলমালিকেরা গান্ধীকে অনুরোধ করলেন। গান্ধী বছরের পর বছর ধরে যেভাবে শ্রমিক বিরোধ নিষ্পত্তি করেছিলেন, শ্রমিক ইউনিয়ন জটিলতার নিরসনে ভূমিকা পালন করতেন, ধর্মঘটের ব্যাপারে শ্রমিকদের প্রতি তিনি যেসব পরামর্শ দিয়েছিলেন, সেসবের অনেকগুলোই ছিল হতবুদ্ধিকর। আমি তা লিখেছি। অন্য আরো কিছু ক্ষেত্রেও, যেমন গান্ধী বিখ্যাত ‘অন্তরাত্মার আহক্ষানে সাড়া দেওয়া’ হতবাক করেছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ১৯২৪ সালে বোম্বের মিলগুলোতে বিদ্যুৎ সরবরাহ করার জন্য পুনে থেকে কিছু দূরে টাটাদের মূলশি ড্যাম নির্মাণের বিরুদ্ধে গ্রামবাসীদের প্রতিবাদের সময় গান্ধী একটি চিঠি লিখে তাদেরকে আন্দোলন বন্ধ করতে উপদেশ দিয়েছিলেন। ২০০০ সালের সুপ্রিম কোর্ট যেসব যুক্তিতে বিশ্বব্যাংকের তহবিলে সর্দার সরোবর ড্যামটির নির্মাণকাজ অব্যাহত রাখতে বলেছিল, গান্ধীর বক্তব্যও ছিল সে রকমই।এ কারণে আম্বেদকরের ‘যদি আমরা প্রশ্ন করি যে, কংগ্রেস কাদের স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করছে, তবে স্বাধীনতার জন্য কংগ্রেস সংগ্রাম করছে কি না সেই প্রশ্নের গুরুত্ব থাকে সামান্যই,’- বক্তব্যটি পুরোপুরি নির্ভুলভাবেই পরিস্থিতি তুলে ধরে।

 

প্রশ্ন:অতীতে মাঠ পর্যায়ে বা সমসাময়িক ঘটনা নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে আপনি শক্তিশালী রাজনৈতিক প্রতিবেদন লিখেছেন। কিন্তু এবার আপনি অত্যন্ত গুরুতর ঐতিহাসিক গবেষণা সামনে নিয়ে এসেছেন। আপনি জাতীয় আন্দোলন, গান্ধী ও আম্বেদকর প্রশ্নে অনেক সুপরিচিত ইতিহাসবিদের অভিমতের বিপরীতে সম্পূর্ণ ভিন্ন মতামত প্রকাশ করেছেন। আপনি নিশ্চিতভাবেই চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে যাচ্ছেন। আপনি কিভাবে ‘দ্য ডক্টর অ্যান্ড দ সেইন্ট’ লেখার কাজে জড়িয়ে পড়লেন, বলবেন কি?

অরুন্ধতী:আপনি বলছেন যে আমি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ব? ওহ্। অথচ আমি ভেবে বসে আছি যে আমিই চ্যালেঞ্জ করছি। কয়েক বছর আগে ‘নভোযান’এর প্রকাশক এস আনন্দ আমাকে ‘অ্যানাইহিলেশন অব কাস্ট’এর একটি স্পাইরাল বাঁধাই কপি আমাকে দিয়ে জানতে চাইলেন যে আমি এর একটি ভূমিকা লিখে দেব কি না। এটা পড়ে চমকে ওঠেছিলাম। তবে এ নিয়ে ভূমিকাখাঁটি ভূমিকা, কিছু প্রশংসা ও গতানুগতিক কথাবার্তা নিয়ে কিছু উদ্ধৃতিসংবলিত নয়লেখার কথা ভেবে আমি ভীত হয়ে পড়েছিলাম। আমার মনে হয়নি যে আমি তা করার জন্য প্রস্তুত। আমি জানতাম, এর অর্থ হবে আমাকে দৃশ্যত কিছুটা টলটলে মায়াময় পানিতে সাঁতার কাটতে হবে। আনন্দ বললেন যে তিনি অপেক্ষা করবেন এবং করেছেন।

ইতোমধ্যে জায়গা মতো বসানোর জন্য তিনি টীকা রচনার কাজ শুরু করে দিয়েছিলেন। এর মাধ্যমে তিনি এই বিষয়ে আগ্রহী বিদ্বজ্জনদের জন্য ‘অ্যানাইহিলেশন অব কাস্ট’কে অত্যন্তসমৃদ্ধ উৎসে পরিণত করলেন। আমি ফিকশন লিখছিলাম, আমি নিজের কাছে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিলাম যে, আমি আর এমন কিছু লিখতে যাচ্ছি না যা ফুটনোটে পড়ে থাকবে। তবে অবশ্যই বলতে হয়, আমি যখন ভূমিকা লিখতে শুরু করি, তখন আমার যুক্তিকে শানিত করতে প্রতিটি বাক্যে রেফারেন্স দিতে হয়েছিল। কিছু সময় পর আমি নিজেকে উপভোগ করতে শুরু করলাম। নোটগুলো আর কেবল রেফারেন্স হিসেবেই থাকল না, এগুলো নিজেরাই সহজাতভাবে প্রায় সমান্তরাল রচনা হয়ে ওঠল। আমি আশা করছি অন্তত কিছু লোক এগুলো পড়ার কষ্টটা কবুল করবেন।

যা হোক, আপনার প্রশ্নে– ‘দ্য ডক্টর অ্যান্ড দ্য সেইন্ট’ চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বেফিরে আসি। আগেও অনেক ইতিহাসবিদ নানা কারণে গান্ধীকে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন। ফলে আমি মনে করি না যে আমিই এই কাজে একা। অনেক দলিত ও দলিত বিশেষজ্ঞ দশকের পর দশক ধরে গান্ধী ও গান্ধীবাদের তীব্র সমালোচনা করে চলেছেন। এ প্রেক্ষাপটে এই বইটি যদি আরেকটি বিতর্কের সূচনা করে, সত্যিকারের বিতর্ক, সেটা অবশ্যই ভালো কিছু হবে। আমি মনে করি, এমনটা করার এখনই সবচেয়ে ভালো সময়। আমি নিশ্চিত, অনেক লোকই এর ওজন দেখে খুশি হবেন।

 

প্রশ্ন:ওয়েন্ডি ডনিগারের বইটি নিয়ে কী ঘটল, আপনি কি এতে উদ্বিগ্ন?

অরুন্ধতী:বিশেষ করে এই বইটি নিয়ে নয়, না। কথা হলো আম্বেদকরের বইটি নিয়ে। তবে এটা সত্য যে আমরা যা চিন্তাভাবনা করি তা নিয়ে লিখতে ও বলতে আমরা দিনে দিনে কম স্বাধীনতা পাচ্ছি। ১৯ শতকে দুর্বিনীত মির্জা গালিব ইসলামের সাথে তার সম্পর্ক নিয়ে যা কিছু বলতে পারতেন, ১৯৪০এর দশকে সাদাত হাসান মন্টো মোল্লাদের ব্যাপারে যা বলতে পারতেন, ১৯৩০এর দশকে আম্বেদকর হিন্দুবাদ নিয়ে যা বলতে পারতেন, নেহরু বা জেপি কাশ্মীর নিয়ে যা বলতে পারতেনএখন আমাদের কেউ তার জীবনের ঝুঁকি না নিয়ে তেমন করে কিছু বলতে পারে না। ‘অ্যানাইহিলেশন অব কাস্ট’ প্রকাশের পর গান্ধী ও আম্বেদকরের মধ্যকার বাদপ্রতিবাদ ছিল দুই অসাধারণ মানুষের মধ্যকার তীব্র ও রূঢ় বিতর্ক। তারা সত্যিকারের বিতর্ক নিয়ে ভীত ছিলেন না। বর্তমান কালের গোঁড়াদের বইনিষিদ্ধ করার দাবির বিপরীতে গান্ধী (তিনি আম্বেদকরের বক্তৃতায় ভিন্নমত প্রকাশের উপাদান খুঁজে পেয়েছিলেন) আন্তরিকভাবেই চাইতেন যে লোকজন বইটি পড়–ক। তিনি বলেছিলেন, ‘কোনো সংস্কারকই প্রশ্ন অগ্রাহ্য করতে পারেন না।এটা কেবল এ কারণেই পড়তে হবে যে এটা মারাত্মক আপত্তি তুলে ধরেছে। ড. আম্বেদকর হিন্দুবাদের প্রতিই চ্যালেঞ্জ।’

 

প্রশ্ন:আপনার ভূমিকা শুরুই হয়েছে মিডিয়াসহ প্রভাব বিস্তারের প্রতিটি ক্ষেত্রে ঐতিহ্যবাহী উচ্চবর্ণের প্রবল আধিপত্যের জোরালো সমালোচনা দিয়ে। আপনি বলতে চাচ্ছেন, রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোজুড়ে ‘চেপে যাওয়ার চেষ্টা’ শুরু করেছে। আপনি কি মনে করেন, মন্ডলপরবর্তী বর্তমান ভারতের বাস্তবতা সত্যিকার অর্থে বর্ণকে সব রাজনীতির মৌলিক ইউনিটে পরিণত করেছে।

অরুন্ধতী:জাতপাতের প্রিজমের মধ্য দিয়ে ভারতের দিকে তাকালে আপনি দেখতে পাবেন কারা অর্থ নিয়ন্ত্রণ করছে, কারা করপোরেশনের মালিক, কারা বড় বড় মিডিয়ার অধিকারী, কারা বিচার বিভাগ, আমলাতন্ত্র গঠন করে, কারা ভূমির মালিক, আর কারা নয়। এটা দেখলেই হঠাৎ করেই বর্তমান ভারতকে চরমভাবে অবর্তমান মনে হবে। মন্ডল কমিশনের সুপারিশমালার অনেক আগে থেকেই কেবল হিন্দু সমাজ নয়, জাতপাতের ইঞ্জিনই ভারতকে পরিচালিত করছে। ‘দ্য ডক্টর অ্যান্ড দ্য সেইন্ট’ গ্রন্থের একটি বড় অংশই ১৯ শতকের শেষ দিকে (যখন ‘সাম্রাজ্য’ রূপান্তরিত হচ্ছিল ‘জাতি’তে, যখন শাসন পরিচালনা এবং ‘প্রতিনিধিত্ব করা’র নতুন নতুন ধারণা আমাদের উপকূলে ভিড়ছিল) কিভাবে জনসংখ্যা নিয়ে, সংখ্যা নিয়ে কী উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছিল তার বর্ণনা। এর শত শত বছর আগে নিম্ন বর্ণের কোটি কোটি লোক (যাদেরকে হাজার বছর ধরে বিশেষ অধিকারভোগী উঁচু জাতের লোকজন সামাজিকভাবে অচ্ছুৎ করে রেখেছিল) তাদের জাতপাতের কলঙ্ক থেকে রক্ষা পেতে প্রথমে ইসলাম এবং পরে শিখ ও খ্রিস্টান হিসেবে ধর্মান্তরিত হচ্ছিল। কিন্তু হঠাৎ করেই সংখ্যাটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠল। সংখ্যার খেলায় প্রায় পাঁচ কোটি ‘অস্পৃশ্য’ খুবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে গেলেন। নিম্নবর্ণের লোকজনের ধর্মান্তর ঠেকাতে হিন্দু সংস্কারবাদী দলগুলো জোট বেঁধে কাজ করতে শুরু করল। অস্পৃশ্য ও আদিবাসীদের ‘হিন্দু ছত্রছায়ায়’ ফিরিয়ে নিতে আর্য সমাজ শুদ্ধি আন্দোলন শুরু করল। এ ধরনের কাজ এখনো চলছে। ভিএইচপি (বিশ্ব হিন্দু পরিষদ) ও বাজরং দল ‘ঘর ভাপাসি’ কর্মসূচি পরিচালনা করছে। এই কর্মসূচির মাধ্যমে আদিবাসী লোকজন ‘শুদ্ধ’ হয়ে হিন্দুবাদে ‘প্রত্যাবর্তন’ করে। তাই বলা যায়, হ্যাঁ, জাতপাত এখনো ভারতে সব রাজনীতির মৌলিক ইউনিট হিসেবে অব্যাহত রয়েছে।

 

প্রশ্ন:তাহলে আপনি কিভাবে একে ‘চেপে যাওয়ার চেষ্টা’ হিসেবে অভিহিত করতে পারেন?

অরুন্ধতী:চেপে যাওয়ার চেষ্টা’ বলতে যা লিখেছি, তা আসলে সম্পূর্ণ ভিন্ন জিনিস। এ দিয়ে প্রকৃতপক্ষে ভারতের বর্তমান সময়ের প্রভাবশালী বুদ্ধিজীবীদের, বিশেষ করে বামদের বোঝানো হয়েছে, যাদের কাছে জাতপাত স্রেফ একটা ফুটনোটঅতি সরলভাবে উপস্থাপিত মাক্সর্সবাদী বিশ্লেষণের বিব্রতকর ও অস্বস্তিকর অপ্রয়োজনীয় অংশ। তাদের জন্যও জাতপাত প্রথা অলক্ষ্যে রয়ে গেছে। ‘আমরা জাতপাতে বিশ্বাস করি না’কথাটা সুন্দর ও প্রগতিশীল শোনায়। কিন্তু আসলে এটা হয় পলায়নবৃত্তি কিংবা তা আসে এমন এক পরিশুদ্ধ কোনো বিশেষ অধিকারভোগী অবস্থান থেকে যেখানে জাতপাত মোটেই চ্যালেঞ্জে পড়েনি। আমাদের সাংস্কৃতিক ব্যবস্থার প্রায় সর্বত্র ‘চেপে যাওয়ার চেষ্টা’ বিরাজমান। বলিউড কি এর মোকাবিলা করেছে? কখনোই না। কতজন সমাদৃত লেখক এটাকে চ্যালেঞ্জ করেছেন? খুবই কম। যারা ন্যায়বিচার ও পরিচিতি নিয়ে লেখেন, নব্যউদারবাদের বাজে প্রভাব নিয়ে লেখেন, তাদের কতজন জাতপাত ইস্যুর সমাধান চাচ্ছেন? এমনকি আমাদের সবচেয়ে উগ্র গণআন্দোলনের অনেকগুলোও জাতপাত প্রথা এড়িয়ে গেছে।

ডারবানে ২০০১ সালে বর্ণবাদবিরোধী বিশ্ব সম্মেলনে অংশগ্রহণ করতে আগ্রহীদের প্রতি ভারত সরকারের অভব্য আচরণও ‘চেপে যাওয়ার চেষ্টার’ অংশবিশেষ। একইভাবে, ভারতের আদমশুমারিতে তথ্য সংগ্রহে জাতপাত পুরোপুরি এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। ফলে চলমান ঘটনা সম্পর্কে আমাদের সম্পূর্ণ অন্ধ রাখা হচ্ছে। দলিতদের নিঃস্ব করা এবং তাদের বিরুদ্ধে সহিংসতাও ‘চেপে রাখা চেষ্টার’ অংশবিশেষ। এখানে আরেকটি ঘটনা উল্লেখ করা যায়। ১৯১৯ সালে ‘দ্য রেড সামার’ নামে অভিহিত ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রে ১৬৫ কৃষ্ণাঙ্গ নিহত হয়েছিল। এর প্রায় ১০০ বছর পর ২০১২ সালে ভারতেদলিত গণধর্ষণ ও খুনের বছরেসরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী ১,৫৭৪ দলিত নারী ধর্ষিতা হয় এবং ৬৫১ জন দলিত নিহত হয়। এগুলো দলিতদের বিরুদ্ধে অপরাধমূলক আক্রমণ। আরেকটি বিষয় হলো অর্থনৈতিক আক্রমণ, যদিও দলিত মিলিয়নিয়ারদের ঝাঁক বেঁধে অভ্যুদয় ঘটেছে।।

(চলবে…)