Home » আন্তর্জাতিক » ভারতের জাত-পাত প্রথা – গান্ধী আর আম্বেদকর (পর্ব – ৩)

ভারতের জাত-পাত প্রথা – গান্ধী আর আম্বেদকর (পর্ব – ৩)

বেশি ভোট পাওয়া ব্যক্তিই জয়ী হবে এমন নির্বাচনী ব্যবস্থাটি মারাত্মক ত্রুটিপূর্ণ :: অরুন্ধতী রায়

অনুবাদ: মোহাম্মদ হাসান শরীফ

(গত সংখ্যার পর…)

last 4বুকার পুরস্কারজয়ী লেখক অরুন্ধতী রায়ের ‘দ্য ডক্টর অ্যান্ড দ্য সেইন্ট’ ইতোমধ্যে বেশ সাড়া জাগিয়েছে। ড. আম্বেদকরের ‘অ্যানাইঅ্যালেইশন অব কাস্ট’ (জাতপাতের সম্পূর্ণ বিলোপ) বইটিকেই নতুনভাবে উপস্থাপন করেছেন তিনি। আধুনিক বিশ্বেও জাতপাত প্রথা যে কত ভয়াবহভাবে টিকে আছে সেটাই প্রকটভাবে ওঠে এসেছে বইটিতে। এই নৃশংস ব্যবস্থাটি টিকিয়ে রাখতে করমচাঁদ গান্ধীর ভূমিকাও তুলে ধরেছেন তিনি। পুরনো একটি বিষয় দক্ষ হাতে নিখুঁতভাবে প্রকাশিত হয়েছে। এই বইটি কেন্দ্র করেই অরুন্ধতী রায়ের সাক্ষাতকার নিয়েছেন সাবা নকভি। এখানে এর তৃতীয় অংশ প্রকাশ করা হলো।

প্রশ্ন: আপনি বলছেন যে , ভারতের জাতপাত প্রথার– ‘মানব সমাজে পরিচিত সবচেয়ে নৃশংস ক্রমপরম্পরাপূর্ণ সামাজিক সংস্থার অন্যতম। নিন্দা থেকে রক্ষা পাওয়ার কারণ হলো এটা হিন্দুবাদের সাথে মিশে গেছে এবং এটাকে মরমিবাদ, আধ্যাত্মবাদ, অহিংস, সহিষ্ণুতা, নিরামিশভোজন, গান্ধী যোগ, ছুটে চলা, বিটলসইত্যাদিকে ভালো মনে করে এসব বিষয়ের সাথে কিভাবে যেন গুলিয়ে ফেলা হয়েছে। এর ফলে অন্তত বহিরাগতদের কাছে এই বন্ধন ছিন্ন করা এবং এটা উপলব্ধি করা অসম্ভব মনে হয়েছে।’ আপনি যুক্তি দিয়েছেন যে জাতপাত প্রথাটি বর্ণবাদী বৈষম্য ও বর্ণবাদীব্যবস্থার মতো হলেও এটাকে সেভাবে বিবেচনা করা হয়নি। অনেকে বলতে পারেন, এই ঐতিহাসিক অবিচারটি নিরসনে নির্বাচনী রাজনীতি এবং আসন সংরক্ষণ তথা কোটাব্যবস্থাই যথেষ্ট। কিন্তু সম্প্রতি সিনিয়র কংগ্রেস নেতা জনার্দন দ্বিবেদি বলেছেন, কোটা ব্যবস্থা বাতিল করা উচিত। এ ধরনের মন্তব্যের ব্যাপারে আপনার প্রতিক্রিয়া কী?

অরুন্ধতী: যেই এ ধরনের কথা বলুন না কেন, তা সাংঘাতিক ব্যাপার। কোটা চরম গুরুত্বপূর্ণ, আমি এ নিয়ে কিছুটা লিখেছিও। কোটা ব্যবস্থার সুযোগ গ্রহণ করতে হলে তফসিলি সম্প্রদায়ভুক্ত ব্যক্তিকে হাইস্কুলের পড়াশোনা শেষ করতে হয়। সরকারি পরিসংখ্যানে দেখা যায়, তফসিলি সম্প্রদায়ভুক্ত ৭০ ভাগ ছাত্র মেট্রিকুলেশনের আগেই ঝরে পড়ে। এর মানে হলো, এমনকি সর্বনিম্ন পর্যায়ের চাকরির ক্ষেত্রেও প্রতি চার দলিতের মাত্র একজন যোগ্য বিবেচিত হন। উচ্চতর চাকরির ক্ষেত্রে ন্যূনতম যোগ্যতা গ্রাজুয়েট ডিগ্রি। দলিতদের মাত্র দুই ভাগ গ্রাজুয়েট। বাস্তবে খুবই সামান্য ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হলেও কোটা নীতির অর্থ হলো ক্ষমতার সিঁড়িতে দলিতদের কিছুটা হলেও প্রতিনিধিত্ব থাকা। এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আম্বেদকরের দিকেই দেখুন না কেন। তিনি সৌভাগ্যবশত কলম্বিয়ায় পড়াশোনা করার একটা স্কলারশিপ পেয়েছিলেন, তাকে এটা যোগাড় করতে হয়েছিল। কোটার কারণেই দলিতরা এখন আইনজীবী, চিকিৎসক, অধ্যাপক, আমলা হচ্ছেন। তাদের জন্য সুযোগ খুবই সীমিত, কিন্তু এই সামান্য সুযোগও কারো কারো জ্বালার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, বিশেষ অধিকারভোগীদের তোপের মুখে পড়েছে। বাস্তবক্ষেত্রে সরকারি প্রতিষ্ঠান, বিচার বিভাগ, আমলাতন্ত্র, এবং এমনকি প্রগতিশীল প্রতিষ্ঠান হিসেবে কথিত জওহেরলাল বিশ্ববিদ্যালয়ে পর্যন্ত কোটাব্যবস্থার প্রয়োগ হচ্ছে ভয়ানক মাত্রায় কম। তবে একটি সরকারি বিভাগে দলিতরা তাদের প্রাপ্যের চেয়ে ছয় গুণ বেশি চাকরি পাচ্ছে। মিউনিসিপ্যাল সুইপারদের প্রায় ৯০ ভাগ দলিত। তারা রাস্তা পরিষ্কার করে, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ম্যানহোলের ভেতরে ঢোকে, পয়ঃনিষ্কাষণ ব্যবস্থা চালু রাখে, তারা টয়লেট পরিষ্কার রাখে, চাকরবাকরের কাজ করে। এখন এমনকি এই খাতও বেসরকারিকরণ করা হচ্ছে। এর মানে হলো, প্রাইভেট কোম্পানিগুলো অস্থায়ী ভিত্তিতে দলিতদের সাবকন্ট্রাক্টে নিয়োগ করবে। তাদের বেতন দেওয়া হবে কম, চাকরির কোনো নিশ্চয়তা থাকবে না। এটা ঠিক যে লোকজন ভুয়া সনদপত্র পাচ্ছে, এবং এ ধরনের আরো অনেক সমস্যা আছে। এগুলোর সমাধান হওয়া উচিত। কিন্তু এটাকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে কোটাব্যবস্থা বাতিল করতে বলাটা হাস্যকর ব্যাপার।

প্রশ্ন: তবে আপনি নিশ্চয় একমত হবেন যে বহুজন সমাজ পার্টি বিএসপি’র মতো দলিত দলগুলোর উত্থানের ফলে ভারতীয় গণতন্ত্রে প্রায় বিপ্লব ঘটে গেছে?

অরুন্ধতী: দলিত রাজনৈতিক দলগুলোর উত্থান চোখ ধাঁধানো ঘটনা। তবে আমাদের নির্বাচনী রাজনীতিতে, বর্তমান আকারে, সত্যিকার অর্থে কোনো বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসেনি, এসেছে কি? বইটিতে, কেবল ভূমিকায় নয়, এ নিয়ে কিছুটা বিস্তারিতভাবে বলা হয়েছে। ১৯৩১ সালে লন্ডনে দ্বিতীয় গোল টেবিল বৈঠকে বিষয়টি নিয়ে গান্ধীর সাথে আম্বেদকরের ঝগড়া হয়েছিল। দলিতদের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব নিয়ে এবং করা প্রশ্নে তাদের মধ্যে তীব্র মতভেদ ছিল। আম্বেদকর বিশ্বাস করতেন যে দলিতদের প্রতিনিধিত্ব করার অধিকার মৌলিক অধিকার। তিনি তার সারা জীবন অস্পৃশ্যদের ওই অধিকার আদায়ে লড়াই চালিয়ে গেছেন। বেশি ভোট পাওয়া ব্যক্তিকেই জয়ী ঘোষণাসংবলিত নির্বাচনীব্যবস্থা নিয়ে তিনি অনেক চিন্তাভাবনা করেছেন, লিখেছেন। তিনি দেখেছেন, অস্পৃশ্য সম্প্রদায়ের সদস্যরা সারা দেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকায় এই ব্যবস্থায় বিশেষ অধিকারভোগী জাতির আধিপত্যপূর্ণ কোনো রাজনৈতিক আসনে অস্পৃশ্যরা কখনোই জয়ী হতে পারবে না। মিশনারি উদ্দীপনা নিয়ে অস্পৃশ্যদের মধ্যে কাজে নিয়োজিত গান্ধী দলিতদেরকে প্রতিনিধিত্ব অধিকার দিতে প্রস্তুত ছিলেন না। আর গান্ধী অস্পৃশ্যদের ওই অধিকার পাওয়ার সম্ভাবনার বিরুদ্ধে প্রকাশ্য ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন। মন্দিরে প্রবেশ আন্দোলনের বিরুদ্ধে তিনি গঠন করেছিলেন ‘হরিজন সেবক সংঘ’ (জি ডি বিড়লার তহবিলপুষ্ট)। এই সংঘে কেবল উচ্চবর্ণের লোকদেরই স্থান ছিল। আহমদাবাদে গান্ধীর সূচিত মিল শ্রমিকদের ইউনিয়ন ‘মহাজন মজদুর সংঘে’ অনেক অস্পৃশ্য ছিলেন, তবে তাদেরকে কোনো পদ দেওয়া হতো না, প্রতিনিধিত্ব করার কোনো অধিকার ছিল না তাদের। ১৯৩১ সালে লন্ডনে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় গোল টেবিল বৈঠকে গান্ধী বলেন, ‘আমি নিজেকে, আমার সম্পূর্ণ কর্তৃত্বে, অস্পৃশ্যদের বিপুল জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব দাবি করছি।’ এস আনন্দ বইটির পেছনে থাকা ‘পুনা চুক্তি’র ব্যাপারে তার নোটে লিখেছেন, কংগ্রেস দলের সদস্য এক অস্পৃশ্য মানুষের রাজ্য পরিষদ ও পঞ্চায়েত সভায় হরিজনদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে পারবেন কি না এমন প্রশ্নের জবাবে গান্ধী বলেছিলেন, এমন কাজ হবে ‘বিপজ্জনক’।

আম্বেদকরের পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে অস্পৃশ্যদের নিজেদের অধিকারের ব্যাপারে সচেতন একটি রাজনৈতিক সম্প্রদায় (যারা নিজেদের মধ্য থেকে নিজস্ব প্রতিনিধি নির্বাচন করতে পারবে) হিসেবে বিকশিত হওয়ার সম্ভাবনা দেখে তা নস্যাৎ ও ধসিয়ে দিতে গান্ধী বিরাট ভূমিকা পালন করেছিলেন। এমনকি বর্তমান সময়েও দলিতরা সেই দাম চুকিয়ে যাচ্ছে। এতসব প্রতিকূলতা সত্ত্বেও উত্তর প্রদেশে বহুজন সমাজ পার্টির (বিএসপি) আত্মপ্রকাশ ঘটেছে। অবশ্য কাশিঁরাম এবং তারপর মায়াবতীর সফল হতে অর্ধ শতকের বেশি সময় লেগেছে। কাশিঁরামকে সফল হওয়ার জন্য বছরের পর বছর ধরে কাজ করতে হয়েছিল, নিম্নতম জাতের লোকজনের সাথে বেদনাক্লিষ্ট জোট গড়তে হয়েছিল। বিএসপিকে উত্তর প্রদেশে বিশেষ ধরনের জনসংখ্যার প্রয়োজন হয়েছে এবং অনেক পশ্চাদপদ শ্রেণীর (ওবিসি) সমর্থন দরকার হয়েছে। তবে একে রাজনৈতিক দল হিসেবে বিকশিত হতে হলে এমন সব জোটে যেতে হবে, যার ফলে তার রাজনৈতিক শক্তি দুর্বল হয়ে পড়বে। এমনকি উত্তর প্রদেশেও কোনো উন্মুক্ত আসন থেকে নির্বাচনে জয়ী হওয়া দলিত প্রার্থীর জন্য এখনো প্রায় অসম্ভবই রয়ে গেছে। দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের নানা অভিযোগের মধ্যেও আমি মনে করি না যে, দলিতদের মর্যাদা গঠন করতে বিএসপির বিপুল অবদান খাটো করে দেয়ার কোনো অবকাশ আছে। তবে আসল দুশ্চিন্তা হলো, পার্লামেন্টারি রাজনীতিতে দলিতরা যত বেশি প্রভাবশালী হয়ে ওঠছে, গণতন্ত্র নিজেই মারাত্মক ও কাঠামোগত পন্থায় দুর্বল করা হচ্ছে।

প্রশ্ন:সাম্প্রদায়িক রোয়েদাদ’এর মাধ্যমে ব্রিটিশরা অস্পৃশ্যদের জন্য পৃথক নির্বাচনের যে ব্যবস্থা করেছিল তা ছিল খুবই দারুণ। কিন্তু গান্ধীর দক্ষ হাতের খেলায় আম্বেদকরকে তার স্বপ্ন ত্যাগ করে ১৯৩২ সালে ‘পুনা চুক্তি’ স্বাক্ষর করতে হয়েছিল। আপনি বিষয়টি তুলে ধরেছেন। যাক, পৃথক নির্বাচন নিয়ে আমার একটি প্রশ্ন আছে। অনেক ইতিহাসবিদ মনে করেন যে, ভারতবর্ষের বিভক্তির মূলে ছিল এই পৃথক নির্বাচনীব্যবস্থা। আর অনেকে পৃথক নির্বাচনীব্যবস্থার বিরুদ্ধে যুক্তি তুলে ধরেছেন। আপনি কি মনে করেন যে ভারতের এখনো পৃথক নির্বাচনীব্যবস্থার প্রয়োজন রয়েছে?

অরুন্ধতী: আমি মনে করি আমাদের বেশি ভোট পাওয়া ব্যক্তি জয়ী হবেএমন নির্বাচনী ব্যবস্থাটি মারাত্মক ত্রুটিপূর্ণ এবং এটা আমাদের ব্যর্থ করে দিচ্ছে। এ নিয়ে আমাদের নতুন করে ভাবা উচিত। তবে আমি মনে করি, পৃথক নির্বাচন, সাম্প্রদায়িক বাঁটোয়ারা, দেশ ভাগ ইত্যাদির মতো অত্যন্ত বিতর্কমূলক ইস্যুগুলোকে তালগোল পাকানোর বিষয়ে পরিণত করার ব্যাপারে সতর্ক থাকা উচিত। আমি আগেও বলেছিলাম, আম্বেদকর অত্যন্ত চিন্তাভাবনা করেই পৃথক নির্বাচনীব্যবস্থা এবং পৃথক প্রতিনিধিত্বের দাবিটি উত্থাপন করেছিলেন। আমি যা লিখেছি, তার পুনরাবৃত্তি করতে চাই নাতবে এটুকু কেবল বলছি যে তিনি একটি দুর্দান্ত ও অসাধারণ পরিকল্পনা নিয়ে এসেছিলেন।

তিনি এমন এক পরিস্থিতি সৃষ্টি করার পরিকল্পনা করেছিলেন যাতে দলিতরা নিজস্ব নেতার নেতৃত্বে একটি রাজনৈতিক সম্প্রদায়ে পরিণত হতে পারে। পৃথক নির্বাচনীব্যবস্থাসংক্রান্ত তার প্রস্তাবটি ছিল মাত্র ১০ বছরের জন্য। আর আমরা এমন এক সম্প্রদায় নিয়ে কথা বলছি, যাদেরকে হাজার বছর ধরে বিশেষ অধিকারভোগী একটা জাত অকল্পনীয় রূঢ় ও নৃশংস পন্থায় দমিয়ে রাখত। এই সম্প্রদায়টি ছিল অচ্ছ্যুৎ তবে অন্য সবার ব্যবহারের জন্য উন্মক্ত হলেও তাদের জন্য তাদেরই গ্রামের কূপ থেকে পানি তোলা, শিক্ষা লাভ করা, মন্দিরে যাওয়া ইত্যাদি অধিকার ছিল না। সহিংসতা আর বঞ্চনা ছাড়া তাদের আর কিছু পাওয়ার অধিকার ছিল না। কিন্তু তারা যখন পৃথক নির্বাচনীব্যবস্থার কথা বলল, তখন প্রত্যেকেই এমন ভাব ধরল যেন কেয়ামত নেমে আসছে।

গান্ধী অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘটে গেলেন, ফলে বিপুল গণচাপের কাছে আম্বেদকরকে নতি স্বীকার করে তার দাবি ত্যাগ করতে হলো, ‘পুনা চুক্তি’ স্বাক্ষরে বাধ্য হলেন। এটা ছিল উদ্ভট ব্যাপার। আমরা কিভাবে এই সম্ভাবনার কথা বলতে পারি যে, পৃথক নির্বাচনের আম্বেদকরের দাবির ফলেই ভারতবর্ষ বিভক্ত হয়েছে? বরং আবেগ ছিল বিপরীত। তিনি ভয়ানক ধরনের বর্ণবাদে জর্জরিত সমাজে স্বাধীনতা ও সাম্য আনার চেষ্টা করেছিলেন। তিনি দেশ ভাগ নয়, বরং ন্যায়বিচার, ভ্রাতৃত্ববোধ, ঐক্য ও সহমর্মিতার কথা বলছিলেন। কিন্তু বর্ণবাদী ক্রমপরম্পরার অর্থ হলো কেবল বিশেষ অধিকারভোগীরাই দলিতদের মুখের ওপর দরজা বন্ধ করতে পারে।

দলিতরা যখন তাদের জন্য দরজা বন্ধ করে দিল, তখন সেটা বিশ্বাসঘাতকতাপূর্ণ কাজ হিসেবে প্রচার করা হলো। একইভাবে আমরা দেশভাগের সব দোষ…… ‘দোষ’ শব্দটির ব্যবহার পূর্বানুমানভিত্তিক, এতে ধরে নেওয়া হয় যে, দেশভাগ ছিল ভয়াবহ বিষয়জিন্নাহর ওপর চাপিয়ে দিতে পছন্দ করি। অথচ আমরা ভুলে যাই যে লাহোরে আর্য সমাজের স্তম্ভ ‘গদর পার্টি’র প্রতিষ্ঠাতা সদস্য (পরে তিনি হিন্দু মহাসভার গুরুত্বপূর্ণ নেতা হয়েছিলেন) বীর পরমানন্দ সেই ১৯০৫ সালে বঙ্গবিভাগের সময় পরামর্শ দিয়েছিলেন যে, সিন্ধুকে আফগানিস্তান ও উত্তর পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের সাথে জুড়ে দিয়ে বৃহত্তর মুসলিম রাজ্য গঠন করা হোক। দেশভাগ হওয়ার কারণ ছিল সব শক্তিই এতে সক্রিয় হয়ে পড়েছিল এবং পুরো বিষয়টা যাদের নিয়ন্ত্রণ করার কথা ছিল, সেটা তাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছিল।

প্রশ্ন: আদিবাসীদের ব্যাপারে রূঢ় দৃষ্টিভঙ্গির জন্য আপনি আম্বেদকরের সমালোচনা করেছেন

অরুন্ধতী: গান্ধী যে পৃষ্ঠপোষকতা ধরনের পন্থায় অস্পৃশ্যদের প্রসঙ্গে কথা বলেছেন, আদিবাসীদের ব্যাপারে আম্বেদকরও একই সুরে বলেছেন। এটা বিশ্বাস করা কঠিন, যে ব্যক্তি তার নিজের জনগোষ্ঠীর প্রতি অমর্যাদাজনক অবস্থান উপলব্ধি করতে পারেন, তিনি কিভাবে সুস্পষ্টভাবে এমনটা করতে পারলেন।

আম্বেদকর ছিলেন যুক্তিবাদী মানুষ। ন্যায়বিচারের ব্যাপারে তার প্রখর অনুভূতি ছিল। আমি বিশ্বাস করি তিনি এই সমালোচনা আন্তরিকভাবে গ্রহণ করে তার দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টে ফেলতেন। তবে আমি কেবল এ নিয়েই তার সমালোচনা করিনি। পাশ্চাত্যের উদারবাদ গ্রহণের ক্ষেত্রে তিনি নগরায়ন ও আধুনিক ‘উন্নয়ন’কে সমর্থন করেছেন। তিনি এর ভেতরে লুকানো ভয়াবহ বিপর্যয়ের বীজ দেখতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। আমি এ নিয়েও বিস্তারিত লিখেছি।।

(চলবে…)