Home » প্রচ্ছদ কথা » পদত্যাগ চাওয়া দূরের কথা প্রতিবাদও নিষিদ্ধ

পদত্যাগ চাওয়া দূরের কথা প্রতিবাদও নিষিদ্ধ

আমীর খসরু

coverসোমবার সংবাদপত্রের খবরের অধিকাংশই ছিল দুঃসংবাদ। কোনো সুসংবাদ নেই। খবরের শিরোনামগুলো ছিল এ রকম নারায়ণগঞ্জে দিনেদুপুরে সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলর এবং প্যানেল মেয়রসহ ৫ জনকে অপহরণ, আইনজীবীসহ আরো দু’জন নিখোঁজ। টেকনাফে কথিত বন্দুকযুদ্ধ বা ক্রসফায়ারে নিহত দুই, সাতক্ষীরায় ক্রসফায়ারে নিহত এক, সিরাজগঞ্জে গুলি করে একজন ছাত্র হত্যা, এক বছর ধরে দু’জন নিখোঁজ ও তাদের স্বজনদের আহাজারি। আরো অনেক দুঃসংবাদ ছিল। আরো একটি খবর ছিল, দক্ষিণ কোরিয়ায় ফেরী দুর্ঘটনার দায়দায়িত্ব নিয়ে ওই দেশের প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ। একদিকে বাংলাদেশের খবর, অন্যদিকে দক্ষিণ কোরিয়ার খবরটি। কি বৈপরীত্য, শাসন ব্যবস্থার কি জবাবদিহীতা এবং দায়বদ্ধতা? সামরিক স্বৈরাচারী জেনারেল এরশাদ জমানায় মধ্য আশির দশকে মাজুখান রেল দুর্ঘটনার পরে তৎকালীন রেল ও যোগাযোগমন্ত্রীকে (যিনি আওয়ামী লীগ সরকারের বর্তমান মন্ত্রীসভায়ও আছেন) জিজ্ঞেস করা হয়েছিল তিনি এর দায়দায়িত্ব নিয়ে পদত্যাগ করবেন কি না? জবাবে তিনি বলেছিলেন, ‘কেনো, আমি কি রেল চালাই?’ এখন সেই স্বৈরাচারী সরকারটি নেই। নতুন এই সরকার এবং এর প্রধানমন্ত্রী নিজেদেরকে উচ্চ মাত্রার গণতান্ত্রিক বলে দাবি করে থাকেন বলে বর্তমান সরকারটি কেমন সে সম্পর্কে কোনো মন্তব্য করা খুবই বিপজ্জনক। সরকারটি সম্পর্কে কোনো মন্তব্য করাটা ঠিক হবে কিনা, বিদ্যমান পরিস্থিতিতে তা পাঠক মাত্রই বিবেচনা করবেন।

দক্ষিণ কোরিয়ায় ফেরী দুর্ঘটনায় ৪৭০ জন নিহত হয় যার অধিকাংশই শিশু। আর মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের সাম্প্রতিক এক রিপোর্টে বলা হয়েছে বাংলাদেশে ২০১৩ সালে সড়ক দুর্ঘটনা, রাজনৈতিক সহিংসতাসহ নানাবিধ দুর্ঘটনায় ১১শ’র বেশি শিশু নিহত হয়েছে। যার একটিরও এখন পর্যন্ত বিচার হয়নি, আর কোনোদিন বিচার হবে তারও কোনো নিশ্চয়তা নেই। ওই ফেরী দুর্ঘটনার মতো লঞ্চ ডুবি, ট্রলার ডুবিতে গত ৫ বছরে যে কতো হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন তার হিসেবও কেউ রাখে না। গত বছরের ২৪ এপ্রিল সাভারের ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের স্থানীয় এক নেতার অত্যন্ত ত্রুটিপূর্ণ রানা প্লাজা ধসে নিহত হয়েছেন হতভাগ্য ১১৩৫ জন গার্মেন্টস শ্রমিক, আহত হয়েছেন আড়াই হাজারের বেশি। এখনো সন্ধান মেলেনি ৮২ জনের। ২০১২ সালে তাজরীন ফ্যাশনস গার্মেন্টসে আগুন লেগে নিহত হয়েছেন ১১৭ জন গার্মেন্টস শ্রমিক। এতোদিন পরেও ওই সব ঘটনার কোনো বিচার সম্পন্ন হয়নি। কবে হবে তারও কোনো কূলকিনারা দেখা যাচ্ছে না। এই ঘটনার জন্য কে দায়ী, কার পদত্যাগ করা উচিত? হয়তো জবাব আসবে তারা কি গার্মেন্টস কারখানা চালান?

গুমখুন ক্রসফায়ারের ঘটনার কথাই যদি ধরা যায়, তাহলে দেখা যাবে মানবাধিকার সংস্থার হিসাব মতে গত প্রায় চার মাসে গুমঅপহরণের ঘটনা ঘটেছে ৩৫ টির বেশি। এসব খবর সংবাদ মাধ্যমে প্রচারিতপ্রকাশিত এবং এর ভিত্তিতেই ওই হিসাবগুলো করা হয়ে থাকে। গ্রামগঞ্জের খবর সব যদি সংবাদ মাধ্যমে আসতো তাহলে হয়তো সংখ্যাটি আরও বিরাট হয়ে দাড়াতে পারতো। বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডে বছরের প্রথম তিন মাসে নিহত হয়েছেন ৬৯ জন। রাজনৈতিক সহিংসতায় ৮৫ জন জীবন দিয়েছেন যার অধিকাংশই বিরোধী পক্ষের নেতাকর্মী। গণপিটুনিতে নিহত হয়েছেন ৩৩ জন। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর হিসাব মতে, গত ৫ বছরে গুমঅপহরণ হয়েছেন ৩শ’র বেশী মানুষ। এটা এমন একটি ঘটনা, যাতে খুবই নগন্য সংখ্যক ভাগ্যবান ছাড়া আর কেউই ফিরে আসেন না। এর সঙ্গে প্রায় সব ক্ষেত্রেই আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর নাম জড়িয়ে আছে। আর গুমঅপহরণের ঘটনার ক্ষেত্রে বিরোধী নেতা, কর্মীসহ এ জাতীয় ব্যক্তিবর্গই প্রধান শিকার। কথিত ক্রসফায়ারের কর্মকাণ্ড নিয়ে এতো বেশি আলোচনা এবং প্রতিবাদ হচ্ছে, কিন্তু কোনো কাজ হচ্ছে না। দিনে দিনে বাড়ছেই। কাজ হবে না, কারণ খোদ ক্ষমতাসীনরা যখন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনীকে ব্যবহার করে এসবসহ নানাবিধ ঘটনা ঘটায় তখন আর কার কাছে মানুষ বিচার চাইবে? কার বিচার চাইছে মানুষ সমস্ত অন্তর দিয়ে?

আগে থেকেই ক্রসফায়ারের একই গল্প বলা হচ্ছে। কাগজে লেখা বক্তব্য একই রয়ে গেছে, শুধু নতুন নতুন নামঠিকানা যুক্ত হচ্ছে। তালিকা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে এবং হবে। গত ৫ বছর তিন মাসে কথিত ক্রসফায়ারে নিহত হয়েছেন ৮৩৩ জন। এসব হিসাবই সংবাদপত্রের ভিত্তিতে ওই সব সংস্থাগুলো করে থাকে।

শুধু যে গুমক্রসফায়ার দিয়েই নিধন আর হত্যাযজ্ঞ চলছে তাই নয়, পাশাপাশি কথিত গণপিটুনির ঘটনাও চলছে। গত ৫ বছরে ৭ শতাধিক মানুষ এর শিকার হয়ে জীবন দিয়েছেন। থানা পুলিশকে জিজ্ঞেস করা হলে সেই একই গল্প শোনানো হয় গরু চোর, ছিনতাইকারী, কুখ্যাত ডাকাতকে জনগণ পিটিয়ে হত্যা করেছে। এই গণপিটুনিতে বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ ছাত্ররাও নিহত হয়েছেন। এর সঙ্গে পুলিশের সংশ্লিষ্টতারও প্রমাণ মিলেছে। কিন্তু গুম, অপহরণ, খুন, গণপিটুনির নামে নির্বিচারে যে গণহত্যা, গণনির্যাতন চলছে, হাজার হাজার মানুষকে জীবন দিতে হচ্ছে প্রতি বছর, অগুনতি মানুষের জান কবজ করা হচ্ছে অস্বাভাবিকভাবে তার কোনো হিসাব নেই, বিচার নেই। এর প্রতিবাদ জানাতে গেলেও নির্যাতননিপীড়ন, হামলা আর মামলা।

৫ জানুয়ারির ভোটারবিহীন, ক্ষমতাকে দীর্ঘস্থায়ী করার অপকৌশলের নির্বাচনটি করতে গিয়ে আগেপড়ে কতো জনের জীবন কেড়ে নেয়া হয়েছে, কতো জনকে করা হয়েছে মাতৃহারাপিতৃহারা? কতো জনকে নিহত হতে হয়েছে উপজেলা নির্বাচনে ক্ষমতাসীন প্রার্থীদের জোর করে বিজয়ী করে আনার জন্য?

এতো গেল অস্বাভাবিক মৃত্যুর খবর, মানুষের জীবন সরাসরি কেড়ে নেয়ার ঘটনা। পরোক্ষভাবেই মানুষের উপরে চরম জুলুমপীড়ন, অত্যাচার চলছে। বিদ্যুতের দাম আরেক দফা অর্থাৎ এই সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার পরে ষষ্ঠ দফায় বেড়েছে। আর এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে লোডশেডিং। কুইক রেন্টালের নামে পকেট ভারী হচ্ছে ক্ষমতাসীনদের এবং তার আশপাশের মানুষগুলোরই। অথচ মানুষের জীবন যখন দিনেরাতে বিদ্যুৎবিহীন অবস্থায় ওষ্ঠাগত তখন গরম গরম বক্তৃতা দিয়ে বলা হয়, বিদ্যুতের উৎপাদন এমন মাত্রায় বেড়েছে যে, এবার মানুষ বিদ্যুতের বন্যায়ই ভেসে যাবে। কিন্তু বাস্তবে কি তাই দেখা যাচ্ছে? গ্যাসের তীব্র অভাব, শোনা যাচ্ছে গ্যাসের দাম আবার বাড়বে। পানির কারবালা চলছে ঢাকাসহ সারাদেশেই। নদনালা শুকিয়ে মরুভূমি হওয়ার পথে। এ নিয়ে নেতিবাচক কথা আছে ক্ষমতাসীনদের পক্ষ থেকে, কোনো ইতিবাচক বক্তব্য নেই।

প্রথম দফায় ক্ষমতা গ্রহণের সময় বলা হয়েছিল দ্রব্যমূল্য হ্রাসের কথা। কিন্তু ধানের এই ভরা মৌসুমেও মাত্র দিন দশেক সময়ে চালের দাম আবার কেজি প্রতি বেড়েছে ৫ থেকে ৮ টাকা পর্যন্ত। কেন, কি কারণে তার কোনো খবর নেই। ক্ষমতাসীন কারো মুখ থেকে এসব সম্পর্কে একটি শব্দও শোনা যাচ্ছে না। সবকিছুরই দাম বেড়েছে স্বাভাবিক মৃত্যুর সুযোগ ছাড়া।

সব নিত্য ব্যবহার্যের দাম বেড়েছে, অভাব বেড়েছে, অভিযোগ বেড়েছে, মানুষের খাদ্য তালিকা দিনে দিনে ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর হচ্ছে। অথচ এর বিপরীতে বাড়ছে দুর্নীতি আর দুঃশাসন।

দক্ষিণ কোরিয়ায় সামান্য জবাবদিহীতাটুকুও আছে, একজন মানুষের জীবনকেও তারা মূল্য দেয়। এ কারণে ফেরী দুর্ঘটনার দায়দায়িত্ব নিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে বিদায় নিতে হয়। সেখানে ওই সব দুর্ঘটনার যারা প্রতিবাদ করেন এবং করছেন, যে স্বজনেরা শোক প্রকাশ করে বেদনার্থ হৃদয়ে রাজপথে নেমেছেন তাদের উপরে তো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনীর কোনো অত্যাচারনির্যাতনের খবর দেখিনি, শুনিওনি। আর পোড়া কপাল মানুষের এই দেশে ঠিক তার বিপরীত ঘটনাগুলোই ঘটছে। এখানে পদত্যাগ চাওয়া তো দূরের কথা প্রতিবাদ জানানোরও সুযোগ নেই। এই দেশে চিন্তা নিষিদ্ধ, কণ্ঠ নিষিদ্ধ, প্রতিবাদ নিষিদ্ধ। যদি একা একা মনে মনেও এমনটা কেউ ভাবেন, তাহলে তিনি তো হয়ে যাবেন দেশপ্রেমহীন দেশদ্রোহী।।