Home » অর্থনীতি » বাংলাদেশের যাত্রাপথ :: গতি ও বৈপরীত্য (পর্ব – ২)

বাংলাদেশের যাত্রাপথ :: গতি ও বৈপরীত্য (পর্ব – ২)

শিল্প, টুকটাক অর্থনীতি ও নারীর সচলতা

আনু মুহাম্মদ

last 3এখনও বাংলাদেশে বহুসংখ্যক ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের অস্তিত্ব আছে। কর্মসংস্থানের দিক থেকে শিল্পখাতের মধ্যে এটাই প্রধান। কিন্তু তারপরও উৎপাদনের বিবেচনায় বৃহৎ ও মাঝারি শিল্প কারখানারই আধিপত্য ছিল। ১৯৭২ সাল থেকে এক্ষেত্রে আবার মূল ভূমিকা ছিল রাষ্ট্রায়ত্ত্ব খাতের। এই খাত তৈরি হয়েছিল প্রধানত পাকিস্তানের বৃহৎ ব্যবসায়ী গোষ্ঠী পরিত্যক্ত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এবং তৎকালীন ইপিআইডিসি কর্তৃত্বাধীন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান দিয়ে। পাকিস্তানের বৃহৎ ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোও আসলে প্রধানত রাষ্ট্রীয় অনুদানেই করা। রাষ্ট্রায়ত্ত্ব খাতের মধ্যে গত দশকে অনেকগুলো বৃহৎ ও মাঝারি কারখানা বন্ধ হয়ে যাবার ফলে রাষ্ট্রায়ত্ত্ব খাতের আপেক্ষিক অবস্থান এখন অনেক দুর্বল। আদমজী পাটকল, চিটাগাং স্টীল মিল এর মতো বৃহৎ শিল্পসংস্থা বন্ধ হয়ে গেছে। বিশাল সম্ভাবনাময় পাটখাত এখন সংকট জর্জরিত।

বিশ্বব্যাংকীয় সংস্কার কর্মসূচির দাপটে শুধু রাষ্ট্রায়ত্ত্ব নয় বেসরকারি মালিকানার অনেক ছোটবড় শিল্পকারখানাও বন্ধ হয়ে গেছে। ৮০ দশক থেকে বেসরকারি পর্যায়ে নতুন বেশকিছু কারখানা প্রতিষ্ঠিতও হয়েছে। গার্মেন্টস সহ রফতানিমুখী প্রতিষ্ঠানগুলো তার মধ্যে প্রধান। এছাড়া সংযোজন বা এসেম্বলিং চরিত্রের কারখানা অন্যতম। এছাড়া সিমেন্ট, কাগজ, খাদ্য, প্লাস্টিক, ওষুধ ইত্যাদি ক্ষেত্রে নতুন কারখানা হয়েছে। বাংলাদেশে রফতানিমুখী উৎপাদনকে রাষ্ট্রীয়ভাবে পৃষ্ঠপোষকতা প্রদানের আরেকটি ধরন হলো ইপিজেড, ক্রমে সংখ্যা বাড়ছে। এসব অঞ্চলে কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, ভারত, জাপানসহ বিভিন্ন দেশের বিনিয়োগ আছে।

শিল্পখাতের মধ্যে ধনাত্মক প্রবৃদ্ধি হার দেখা যায় গার্মেন্টসসহ রফতানিমুখী বিভিন্ন শিল্প উৎপাদনে এবং সিমেন্ট কারখানায়। অন্যদিকে ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি হার দেখা যায় পাট, বস্ত্র, চিনি, কাগজ, স্টীল সহ বাংলাদেশের পুরনো বৃহৎ শিল্প প্রতিষ্ঠানে। উঁচু হারে প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে নির্মাণ ও পরিষেবা তৎপরতায়। (শিল্প ও কৃষিখাতসহ অর্থনীতি রাজনীতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার জন্য দেখুন বাংলাদেশের অর্থনীতির গতিমুখ, শ্রাবণ, ২০০৫। এবং কোথায় যাচ্ছে বাংলাদেশ, সংহতি, ২০১০)

টুকটাক অর্থনীতি’র বিস্তার

৮০ দশক থেকে শিল্প খাতের তুলনায় দেশে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের বিকাশ ঘটেছে বেশি। স্বনিয়োগভিত্তিক কাজের অনুপাতও বেড়েছে। এছাড়া রিকশা, অটোরিকশা, বাস ট্রাক, টেম্পোসহ বিভিন্ন পরিবহণ, হোটেল রেস্তোরাঁ, ছোট বড় দোকান ইত্যাদি বেশিরভাগ মানুষের অস্থায়ী নিয়োজনের জায়গা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ‘টুকটাক অর্থনীতি’ হয়ে দাাঁড়িয়েছে শ্রমজীবী মানুষের প্রধান কর্মক্ষেত্র। প্রতিদিন শহরে নতুন গাড়ি যোগ হচ্ছে। গাড়িচালক, মেকানিক এর আয়তন তাই এখন বেশ বড়। নির্মাণ খাতের প্রসার নির্মাণ শ্রমিকসহ এই কাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নানা পেশার লোক তৈরি করেছে। এসব খাতে বেশিরভাগ কাজ অস্থায়ী, অনিয়মিত ও মজুরী নিম্নমাত্রার।

নির্বিচার বেসরকারীকরণের জোর ধারায় সর্বজন বা পাবলিক সকল প্রতিষ্ঠানই ক্ষতবিক্ষত। এনজিও, কনসালটেন্সী ফার্ম, বেসরকারি ক্লিনিক ল্যাবরেটরী ও হাসপাতাল, বেসরকারি স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় ইত্যাদিরও বিস্তার ঘটেছে অনেক। এসব খাতে বিনিয়োগ অনেক বেড়েছে, কর্মসংস্থানও। মোবাইল টেলিফোনের প্রসার এইখাতে বিভিন্ন পর্যায়ের কাজের চাহিদা তৈরি করেছে। হাউজিং ব্যবসার বিস্তার ঘটছে, সেইসাথে খাল ডোবা নীচু জমি খেলার জমি সব দখল চলছে। শিল্পখাতের অন্তর্ভুক্ত দেখানোর ফলে এই বিকাশ শিল্পখাতের প্রবৃদ্ধি হিসেবেই উপস্থিত হয়। হাউজিং এবং গার্মেন্টস খাতের সাথে মাস্তান বা সন্ত্রাসী চাহিদা বৃদ্ধি সরাসরি সম্পর্কিত। এসব অপরাধী তৎপরতার সঙ্গে সঙ্গে প্রাইভেট সিকিউরিটি সার্ভিসও বেড়েছে। এই সবগুলোই পরিষেবা খাতের অংশ!

যেহেতু এখানে শিল্পভিত্তি গড়ে উঠার উপর সার্ভিস সেক্টর বিকশিত হয়নি, সেহেতু এখানে দোকানপাট ও ব্যবসায়িক তৎপরতা পরিচালিত হচ্ছে প্রধানত আমদানি করা পণ্যের উপর। দেশে প্রচুর সুপারমার্কেট গড়ে উঠেছে, গড়ে উঠেছে গাড়ির দোকান, কম্পিউটর মোবাইল, টিভি ভিসিডি ইত্যাদি কেন্দ্রিক ব্যবসারও প্রসার ঘটেছে যেগুলো বলাইবাহুল্য প্রধানত আমদানিকৃত পণ্যের উপরই নির্ভরশীল।

দেশের অভ্যন্তরের শিল্প খাতের সঙ্গে সম্পর্কহীনভাবে সার্ভিস সেক্টরের দ্রুত বিকাশ দ্রুত অর্থ উপার্জনের একটি পথ হিসেবে গৃহীত হলেও কর্মসংস্থানকে খুবই অস্থায়ী, নাজুক, কম আয়যুক্ত পর্যায়ে রেখেছে। শিক্ষা প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে এর প্রভাব আছে। দোকানদারি অর্থনীতির উপযোগী শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের চাহিদা বাড়ছে যা দেশে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির স্থায়ী ভিত্তি তৈরির জন্য আগ্রহী নয়। দর্শন, সমাজবিজ্ঞান, ইতিহাস বিষয়ে মৌলিক জ্ঞানচর্চা বাহুল্য জ্ঞান করা হয়। আশা আকাঙ্খা, বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গীর ক্ষেত্রে বাজার ও ভোগবাদিতার প্রভাব বেড়েছে।

নারীর সচলতা

আগের তুলনায় নারীর দৃশ্যমান সচলতা এখন বেশি। পাশাপাশি যৌন নিপীড়ন ও তার বিরুদ্ধে ছোটবড় প্রতিরোধ এখন নিয়মিত খবর। গার্মেন্টস এ বর্তমানে শ্রমিকদের মধ্যে শতকরা প্রায় ৯০ ভাগই নারী। মজুরী বা বেতনের বিনিময়ে কিংবা উপার্জনমুখী কাজের সঙ্গে নারীর সম্পৃক্ততা উল্লেখযোগ্য মাত্রায় বেড়েছে ৮০ দশক থেকে। এসব কাজের সঙ্গে না থাকা মানে কাজ না করা নয়। প্রথাগতভাবে নারী এদেশে যেসব কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকেন সেগুলো অর্থনৈতিক কাজ হিসেবেই স্বীকৃত ছিল না। এর বেশিরভাগ যেমন কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ, হস্তশিল্প, হাঁসমুরগী গরুছাগল প্রতিপালন, শাকসব্জি উৎপাদন, ফলগাছ দেখাশোনা, পরিবার ব্যবস্থাপনা ইত্যাদি কাজ দুভাবে অর্থনৈতিক ভূমিকা পালন করে। এর একটি হচ্ছে, ব্যয় হ্রাস এবং অন্যটি আয় বৃদ্ধি। এই বিবেচনায় নারী সবসময়ই অর্থনৈতিক কাজ করে আসছে। কাজ এর সংজ্ঞা পরিবর্তনের ফলে এখন এর কিছু কিছু স্বীকৃত, পুরোটা নয়। ক্ষুদ্র্ঋণ আর এনজিও কার্যক্রম ডিম দুধ কাঁথা হস্তশিল্প উৎপাদন ইত্যাদি কাজকে পারিবারিক ও সামাজিক গন্ডি থেকে বের করে বাজারের আওতায় এনেছে।

শহর ও গ্রামে সরাসরি মজুরিশ্রমিক হিসেবে নারীর উপস্থিতি এখন তুলনায় অনেক বেশি দেখা যায়। মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়েদেরও নিয়মিত বেতনের বিনিময়ে কাজে অংশগ্রহণ অনেক বেড়েছে। প্রকৃত আয়ে ধ্বস নামার ফলে এক ব্যক্তির আয় দিয়ে পরিবারের প্রয়োজন মেটানো অসম্ভব হয়ে যাওয়ায় মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারে প্রয়োজন হয় এক ব্যক্তির কাজের সময় বাড়ানো, কাজের ক্ষেত্র বাড়ানো এবং পরিবারে একাধিক ব্যক্তির আয় রোজগারের কাজে প্রবেশ করা। অর্থনৈতিক রোজগারের কাজে নারীর প্রবেশে পারিবারিক বাধা শিথিল হবার এটি একটি কারণ। অর্থনৈতিক সংকটে রোজগারী পুরুষের পরিবার ত্যাগ, অসুস্থতা, মৃত্যু অনেক নিম্ন আয়ের পরিবারে নারীর আয় রোজগারে যুক্ত হবার একটা বাধ্যবাধকতা হিসেবে অনেক ক্ষেত্রে কাজ করেছে। এভাবে যোগান সম্প্রসারিত হয়। অন্যদিকে রফতামিুখী প্রতিষ্ঠানগুলোতে, গার্মেন্টস কিংবা চিংড়ি, নারী শ্রমিক নিয়োগের আগ্রহ ‘নারী শ্রমিকের’ চাহিদাও তৈরি করে। এনজিও কাজের বিকাশ তার কর্মী হিসেবে এবং ক্ষুদ্র ঋণ বিস্তারের মধ্য দিয়ে বিভিন্ন অর্থনৈতিক তৎপরতার বিস্তার বিভিন্ন কাজে নারীকে যুক্ত করে।

গ্রাম শহরে জমি, কাজ ও আশ্রয় থেকে উচ্ছেদ হয়ে যাওয়া ছিন্নমূল মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি শিশু ও নারীকে তুলনায় আক্রান্ত করে বেশি। জালিয়াতি প্রতারণা এবং নিপীড়নের মাধ্যমে যৌনবাণিজ্যে শিশু কিশোরী ও তরুণীদের ক্রমবর্ধমান হারে যুক্ত করবার সুযোগ এখান থেকেই তৈরি হচ্ছে। প্রাতিষ্ঠানিক অপ্রাতিষ্ঠানিক পতিতাবৃত্তি, পর্ণোগ্রাফি বাণিজ্য তাই অনেক বেড়েছে। নারী পাচারও এর সঙ্গে যুক্ত। (বাংলাদেশে নারীর জীবন ও অর্থনীতি নিয়ে অধিক আলোচনার জন্য নারী, পুরুষ ও সমাজ, ৩য় সংস্করণ, সংহতি প্রকাশন।)

(চলবে…)