Home » শিল্প-সংস্কৃতি » সামরিক আগ্রাসন :: হলিউডের চলচ্চিত্রে (পর্ব – ৪)

সামরিক আগ্রাসন :: হলিউডের চলচ্চিত্রে (পর্ব – ৪)

ফ্লোরা সরকার

last 5উইন্ডটকার্স” ছবিটিও একই ভাবে পেন্টাগনের কবল থেকে রেহাই পায়নি। ছবিতে দেখা যায় নাভাজো ইন্ডিয়ান্স নামে পরিচিত আমেরিকার একজন আদিম অধিবাসী দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মার্কিন নৌবাহিনীতে যোগ দেয় এবং কোড হিসেবে স্থানীয় ভাষা ব্যবহার করে কীভাবে জাপানিদের বোকা বানিয়ে দেয় তার চিত্রায়ন। ছবিতে দেখানো হয় জো এনডার্স নামে একজন মেরিন সার্জেন্টকে নিয়োগ দেয়া হয় এরকম কোড টকারকে বাধা প্রদানের উদ্দেশ্যে এবং জাপানিদের দ্বারা গ্রেফতারের মুহূর্ত্তে তাকে হত্যা করার জন্যে। ঠিক এই জায়গাতেই পেন্টাগনের সঙ্গে মূল তর্ক বাঁধে।

মেরিন ফিল্ম লিয়াজোঁ অফিসের ক্যাপ্টেন ম্যাট মরগ্যান অভিযোগ তোলেন – “ছবিটি অমেরিন সংক্রান্ত এবং তা পরিবর্তন করতে হবে। সেই লিঁয়াজো অফিসারের দাবি ছিলো ছবিতে যেভাবে সার্জেন্ট এনডার্সকে নিয়োগ দেয়া হয় সেই আদিবাসীকে মেরে ফেলার জন্য, তা একেবারেই কল্পকাহিনী বা অবাস্তব কাহিনীর মতো সাজানো হয়েছে, কাজেই ছবির এই অংশটি বাতিল করতে হবে।” অথচ পরবর্তীতে দেখা গিয়েছিলো এনডার্সেরও অভিযোগের ঠিক উল্টোটাই বাস্তবে ঘটেছিলো (অর্থাৎ মেরিন অফিসারদের ঠিক এভাবেই আদিবাসীদের মেরে ফেলার অনুমতি দেয়া হয়েছিলো) যা পরবর্তীতে বেঁচে যাওয়া কোড টকার এবং ইউ.এস. কংগ্রেসে এসবের সত্যতা প্রমাণিত হয়।

থার্টিন ডে’জ” এর তুলনায় “উইন্ড টকার্স” এর প্রযোজকেরা পান্ডুলিপির এই পরিবর্তন মেনে নেন। কিন্তু এটাই যথেষ্ট ছিলো না ; স্ট্রাব এবং মরগ্যান চাইলেন একটি পুরো চরিত্রের পরিবর্তন, সে চরিত্রটি হলো একজন ডেনটিস্টের, যার চরিত্রটি সম্পূর্ণ ভাবে মুছে ফেলা হয়। যে ডেনটিস্ট বাস্তবের ইতিহাসে ছিলো একজন উন্মাদগ্রস্ত, যে মৃত জাপানি সেনাদের দাঁত নির্দয় ভাবে তুলে ফেলতো। মর্গ্যান আবার দাবি করলেন, এই বর্ণনা অমেরিনসুলভ। মিলিটারিরা আরেকটি দৃশ্য মুছে ফেলার দাবি করলো, যেখানে দেখা যায় কেজ নামের আরেকটি চরিত্র বন্দী জাপানি সেনাদের জলন্ত আগুনের দণ্ড দিয়ে মেরে ফেলে। পরিচালক জন উ নির্লজ্জভাবে তাদের এসব চাহিদা পূরণ করেন, অথচ মূল পান্ডুলিপিটি প্রকৃত ইতিহাস ঘেঁটে লিখিত হয়েছিলো। শেষপর্যন্ত “উইন্ড টকার্স” ছবিটি যখন মুক্তি পেলো তখন মেরিন সংশ্লিষ্ট পত্রিকাগুলোতে বিজয়ল্লোসিতভাবে লেখা হলো উ’র ছবিটি শুধু যথাযথ বাস্তব ইতিহাসকে তুলে ধরেনি ছবির প্রতিটি ডিটেইল বা বিস্তৃত বর্ণনা একেবারে পুঙ্খানুপুঙ্খ তুলে ধরা হয়েছে।

পেন্টাগনের হস্তক্ষেপ শুধু যুদ্ধভিত্তিক ছবিগুলিতেই সীমিত থাকেনি। বিল মুরে অভিনীত “স্ট্রিপস্ (১৯৮১)” কমেডি টিভি সিরিজ, যেখানে বিলকে দেখানো হয় একজন বেমানান সেনাকর্তার নিয়োগসংক্রান্ত ঘটনা, সেখানেও প্রিপ্রোডাকশন বা নির্মাণ পূর্ব সময়ে কঠোরভাবে পরিবর্তন, পরিবর্ধন আনা হয়। শিশুদের জন্যে নির্মিত “ল্যাসি” এবং “দ্য মিকি মাউজ ক্লাব” এর পান্ডুলিপিও পুনরায় লিখিত হয়, যাতে করে ইউ.এস.সেনাদের সম্মানজনকভাবে উপস্থাপিত করা যায়। “স্ট্রিপস্” এর প্রযোজক এবং সহকারি নাট্যকার ড্যান গোল্ডবার্গ পেন্টাগনকে নিশ্চিত করেছেন যে তিনি এমন দেশাত্মক প্রেমে আপ্লুত একটি কমেডি নির্মাণ করতে চান যাতে করে আমেরিকার সেনাবিভাগে নিয়োগকর্মের ক্ষেত্রে ধনাত্মক প্রতিক্রিয়া প্রতিফলিত হয়। কিন্তু তারপরেও পান্ডুলিপিটি প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত পুনরায় লেখার জন্যে ইউ.এস. সেনাবাহিনী থেকে নির্দেশ আসে।

আমেরিকান সেনাবাহিনীর পরিচালনা ও পরিকল্পনা বিভাগের প্রধান, লেফটেনেন্ট কর্নেল রিচার্ড গ্রিফিটস্, ব্যারাকে সেনাদের ড্রাগ ব্যবহারের বিষয়টি কিছুতেই স্বীকার করতে নারাজ এবং ড্রিল সার্জেন্ট হুলকা আরেক ধাপ অগ্রসর এক ধর্ষকাম ব্যক্তি ছিলেন। প্রকৃতপক্ষে, হুলকা ছিলেন সেনা ক্যাম্পের পাশবিক নিয়মাবলী শিক্ষনদাতা বা ট্রেনার হিসেবে এক ধীরমস্তিস্কোচিত অনুশীলনকারী।

পেন্টাগনের নির্দেশে আমেরিকান সেনাদের কাছে সংরক্ষিত সমস্ত লাতিন আমেরিকা ও মেক্সিকোর দলিল দস্তাবেজ মুছে ফেলা হতো; যেমন ধর্ষণ ও লুঠতরাজ সম্পর্কে যেসব কৌতুক প্রচলিত ছিলো, বিভিন্ন চরিত্রের বর্ণনামূলক দলিল ইত্যাদি। ফোর্ট নক্স এর স্থানসমূহ, বিভিন্ন যুদ্ধ ট্যাংক ব্যবহার এবং সি১৪০ প্লেন ব্যবহারের বিনিময়ে গোল্ডবার্গ পেন্টাগনের যেকোনো চাহিদা পুরোনে সচেষ্ট থাকতেন। “ইন্ডেপেনডেন্স ডে (১৯৯৬)” ছবির প্রযোজকদের প্রতিরক্ষা বিভাগের ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার থেকে বিরত রাখা হয়। কেননা, পেন্টাগনের অভিযোগ ছিলো ছবিটিতে প্রকৃত সেনা নায়কোচিত কোনো চরিত্র ফুটিয়ে তোলা হয়নি এবং কাহিনীতে ক্যাটেন স্টিভ হিলারকে (উইল স্মিথ) দায়িত্বজ্ঞানহীন একজন মেরিন নেতা হিসেবে দেখা যায়। তাছাড়া জয়ী দল সাধারণ নাগরিক দ্বারা বাঁধাপ্রাপ্ত না হয়ে মেরিনদের দ্বারা বাঁধাপ্রাপ্ত হয়। চিত্রনাট্যকার ডিন ডেভলিন এসব আপত্তি সংশোধন করতে রাজি হলেও শেষ পর্যন্ত তাকে কোনো ধরণের সহযোগিতা দেয়া হয়নি।।

(চলবে…)