Home » প্রচ্ছদ কথা » সরকারের অস্বীকার আর না বলার সংস্কৃতি ॥ বিএনপির জনবিচ্ছিন্নতা

সরকারের অস্বীকার আর না বলার সংস্কৃতি ॥ বিএনপির জনবিচ্ছিন্নতা

শাহাদত হোসেন বাচ্চু

coverঅস্বীকার আর ‘না’ বলার যে সংস্কৃতি বর্তমান সরকার চালু করেছে তাতেই আষ্টেপৃষ্ঠে বাধা পড়তে যাচ্ছে তারা। ক্ষমতাসীন হবার পর থেকেই প্রতিটি ঘটনার দায় তারা অস্বীকার তো করছেই, চাপিয়ে দিচ্ছে অন্যের ঘাড়ে। খোদ সরকার প্রধান থেকে শুরু করে সরকার ও দলের সকল পর্যায়ে এই সংস্কৃতি মারাত্মকভাবে সংক্রামিত হয়েছে। ফলে জননিরাপত্তা বলতে এই ভূখণ্ডে প্রায় কোন কিছুই আর অবশিষ্ট নেই। দলীয় স্বার্থ চরিতার্থ করতে গিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নিজস্ব বাহিনীর মত ব্যবহার করায় সরকার কি নিয়ন্ত্রন হারিয়ে ফেলেছে প্রশ্নটি এখন সকল মানুষের। সাবেক আইজি এ এস এম শাহজাহানের মতে, “রাষ্ট্রযন্ত্র কাউকে দিয়ে একটি অপরাধ করালে সে নিজের লাভের জন্য আরো দশটি অপরাধ করবে”। অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, কোন ঘটনার কিনারা হচ্ছে না, খুনীঅপহরনকারীদের সনাক্ত করা হচ্ছে না। ফলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে এসব ঘটনায় প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত থাকার একের পর এক অভিযোগ উঠছে। মুশকিল হচ্ছে, কোন রকম তদন্ত বা অনুসন্ধান ছাড়াই সরকারের শীর্ষ ব্যক্তিরা অভিযোগ অস্বীকার করছেন, বিএনপিজামায়াতের ঘাড়ে যে কোন ঘটনায় দায় চাপানোর চেষ্টা করছেন। এ কারনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও উৎসাহিত হচ্ছে, অপরাধ বা অপরাধীদের সনাক্ত করার জন্য উদ্যোগগুলি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

দেশের জনগণের কাছে একটি সাধারন প্রশ্ন বারবার উচ্চারিত হচ্ছে, রাষ্ট্র ও সরকারের সংগঠনগুলি সক্রিয় থাকলে একের পর এক এরকম খুনগুমঅপহরনের ঘটনা কিভাবে ঘটছে? তাহলে কি রাষ্ট্রের ভেতরে রাষ্ট্র, সরকারের ভেতরে সরকার তৈরি হচ্ছে যার সাথে যোগসাজশ রয়েছে অপহরনকারীদের? অথবা রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলিকে ব্যক্তিগত ইচ্ছাপূরনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে কেউ? কোটি টাকা মূল্যের এসব প্রশ্নের জবাব সরকারের কাছে প্রায় একই রকমঃ বিএনপিজামায়াতজঙ্গিগোষ্ঠি সব ঘটনার জন্য দায়ী। যদি সরকারের এই বক্তব্যকে জনগণ সত্যি বলে ধরে নেয়, তাহলে প্রশ্ন ওঠে দায়ী বিএনপিজামায়াত বা জঙ্গিদের সরকার গ্রেফতার করে বিচারের মুখোমুখি করছে না কেন? কেন বারবার ভাঙ্গা রেকর্ডের মত একই কথা তাকে বাজিয়ে যেতে হচ্ছে যা জনগণ আসলেই বিশ্বাস করে না। অপহরন, গুম, ক্রসফায়ার, বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ডকোনটিই স্বীকার করা হচ্ছে না, আমলেও নেয়া হচ্ছে না। বদলে এসব ঘটনার স্বপক্ষে দাঁড়িয়ে রাষ্ট্র তার অগণতান্ত্রিক চেহারা প্রকট করে তুলছে জনগণের সামনে।

বিএনপি বা আওয়ামী লীগ জনগণ নিয়ে যাই ভাবুক আর না ভাবুক সেটির অপেক্ষা এখন সম্ভবত কেউ আর করছে না। গণমানুষের রোষ ধুমায়িত হতে শুরু করেছে। আঞ্চলিকভাবে নানা জায়গায় জনগণ সংগঠিত হচ্ছে। যেমনটি ঘটেছে নারায়নগঞ্জে। গত রোববার জনগণের স্বতঃস্ফুর্ত হরতাল প্রমান করেছে তারা রাজনৈতিক দলগুলোর ওপরে আস্থাবিশ্বাস রাখেন না।

গত দু’দশক ধরে বাংলাদেশের রাজনীতি একটি গণতান্ত্রিক বাতাবরনে অসহিষ্ণু, ক্ষমাহীন এবং অগণতান্ত্রিক পথকেই বেছে নিয়েছে। আদর্শ হয়ে উঠেছে শক্তির নামে শান্তি প্রতিষ্ঠার নীতি। ফলে, ক্ষমতাসীনদের কোন হিসেবের মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের অবস্থান আর নেই। জনগণের ভোট, জনগণের মনোজগত, তাদের হৃদয় জয় করার চেয়েও অস্ত্রনির্ভর ভয়ের সংস্কৃতিকেই আশ্রয় করে নিয়েছে। শাসকগোষ্ঠির আস্থাভাজনরা আইনআদালতসহ গণতান্ত্রিক সকল বিধিবিধান অতিক্রম করে গঠন করছে রাষ্ট্রের ভেতরে রাষ্ট্র, সরকারের ভেতরে সরকার। নিয়ন্ত্রক হয়ে উঠছে সবকিছুর। অথচ সাধারন জনগণ জানে সরকার একটি অসম্ভব শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান। সংবিধান অনুযায়ী যে কোন ধরনের অপরাধ দমন করে জননিরাপত্তা বিধান সরকারের একটি অপরিহার্য কাজ। অথচ গত দু’দশক ধরে জনগণ দেখছে, সরকারের কাছে অপরাধীদের যেমন আশ্রয়প্রশ্রয় রয়েছে, কেবল জনগণের আশ্রয় হয়ে উঠতে পারছে না সরকার। শাসকগোষ্ঠির প্রশয়পুষ্টরা যা ইচ্ছে তাই করার যে সংস্কৃতি গড়ে তুলেছে, তাতে সমাজে কেবল সংঘর্ষ আর সংঘাত বিকাশ লাভ করছে।

শাসক শ্রেনীর বল্গাহীন এই আচরনের কারনে ভয়ের সংস্কৃতির পাশাপাশি বাংলাদেশে বিচারহীনতার আরেকটি সংস্কৃতি গড়ে উঠছে। আর এ ধরনের সংস্কৃতি সবচেয়ে বেশি সুবিধে দেয় অগণতান্ত্রিক শক্তিগুলিকে। যে শক্তির বসবাস অন্ধকারে। অন্ধকার সাম্রাজ্য থেকে তারা নিয়ন্ত্রন করে সবকিছু। গণতন্ত্র বিতাড়িত করতে না পারলে তাদের অস্তিত্ব বিপন্ন হতে পারে, এ কারনে তারা রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে নিয়ন্ত্রনে নিতে চায়। এই সংস্কৃতি যে শুধু আমাদের দেশে ঘটছে তা নয়, পৃথিবীর অনেক দেশ এরকম সংস্কৃতি গড়ে তোলে গণতন্ত্রকে বিপন্ন করেছে, অন্ধকারের প্রাণীদের সুযোগ করে দিয়েছে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখলের। বাংলাদেশে এখন সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, আমাদের রাজনীতিতে এখন ভয়ের ও অস্বীকারের সংস্কৃতির একটি বিপনন চলছে ব্যাপকভাবে। ফলে অগণতান্ত্রিক গোষ্ঠিগুলি একত্রিত হচ্ছে গণতন্ত্রের সবশেষ মূলটি উৎপাটনের কাজে। এর একটি নমুনা জনগণ দেখলো, মানিক মিয়া এভিনিউতে গত শনিবারের মানববন্ধনে সমবেত নিরীহ নাগরিক সমাজের প্রতি ভয়ংকর পুলিশি আচরন। এই ঘৃন্য কাজটি কি কতিপয় অত্যুৎসাহী পুলিশ কর্মকর্তার, নাকি উচ্চ মহলের সিদ্ধান্তে করা হয়েছে, এ প্রশ্নের জবাব সরকার দিতে না পারলে অন্ধকারের প্রাণীরা আরো উৎসাহিত হয়ে উঠবে।

গত ৫ বছর ধরেই দেশের জনগণ প্রত্যক্ষ করে আসছে রাষ্ট্র বা নাগরিকের স্বার্থসংশ্লিষ্ট কোন ইস্যুতে নিরীহ প্রতিবাদ পর্যন্ত এই সরকার সহ্য করতে পারে না। সেজন্য তারা নিয়োজিত করে পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি, জলকামান, আর্মার্ড পারসোনাল ক্যারিয়ার, টিয়ার শেল আর রাবার বুলেটের অফুরন্ত ভান্ডার। আর সেইসাথে চলতে থাকে জিগীর যুদ্ধাপরাধীদের বাঁচাতে সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে এসব আন্দোলন করা হচ্ছে! জনগণের দাবির প্রতি, জনগণের অনুভূতির প্রতি এরকম অবহেলা ও হিংসাত্মক আচরন এবং সবকিছুকে অস্বীকার করার প্রবণতা আজকের বাংলাদেশকে ধীরে ধীরে ঠেলে দিচ্ছে ভয়াল অন্ধকারের দিকে। গত এক বছর ধরেই এই প্রবণতাকে কেবল অনুসরন করা হচ্ছে। অপহরন হচ্ছে, গুম হচ্ছে, ধলেশ্বরীশীতলক্ষ্যায় ভেসে উঠছে লাশের পরে লাশ। দুর্দমনীয় গড ফাদারদের সাথে সরকারী বাহিনীর কতিপয়ের অশুভ সখ্যতা ও বোঝাপড়ায় জনপদ হয়ে উঠছে আতংকিত। পেছনে সমর্থন থাকছে সর্বোচ্চ পর্যায়ের কারো না কারো। জন্ম হচ্ছে কতিপয়তন্ত্রের। মন্ত্রীরা বলছেন, এটি বিএনপি, জামায়াতের নতুন কৌশল। ঠিক একই ভাষায় না হলেও প্রধানমন্ত্রীও একইরকম কথা বলছেন। বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়াও কম যাচ্ছেন না। তিনিও সমানে বলছেন, এ সবই সরকার এবং সরকারী দলের কাজ। দু’পক্ষের এই দায়িত্বহীন ও লাগামহীন বক্তব্যের কারনে জনগণ কোথাও কোন ঠাঁই খুঁজে পাচ্ছে না।

গুম, অপহরন আর গুপ্ত হত্যার প্রথম প্রকাশ্য আইনগত অনুমোদন দিয়েছিল বিএনপি। গত বিএনপি আমলে জাতীয় সংসদে পাশ করা যৌথ অভিযান দায়মুক্তি আইন ২০০৩এর মাধ্যমে। এর ফলে ২০০২ এর অক্টোবর থেকে ২০০৩ এর মধ্য জানুয়ারী পর্যন্ত অপারেশন ক্লিনহার্টে যে সব ব্যক্তি খুন হয়েছিলেন, আহত বা অঙ্গহানি ঘটেছিল, ঐ সব অপরাধের বিচার আর করা যায়নি। এভাবেই জাতীয় সংসদে জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা খুনীদের যে ইনডেমনিটি দিয়েছিল তা বর্তমান সরকার ঠিকই অব্যাহত রেখেছে। ১৫ আগষ্ট হত্যাকান্ডের পর ওরকম একটি ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্স ১৯৯৬ সালে ক্ষমতাসীন হবার পরে বাতিল করে দিয়ে আওয়ামী লীগ জনগণকে আশ্বস্ত করতে পেরেছিল। দীর্ঘ বিচারহীনতার সংস্কৃতি ভেঙ্গে দিয়ে ন্যায় বিচারের পথ উন্মুক্ত করে দেয়া হয়েছিল। সেই আওয়ামী লীগ বিএনপি’র সবকিছুর ব্যাপারে সোচ্চার হলেও তাদের করা ইনডেমনিটি তারা ঠিকই বাতিল করেনি। কারন এটি বাতিল করলে তাদেরকেই বিচারের মুখোমুখি করতে হবে, যাদের তারাও দলীয় ক্যাডারদের মত ব্যবহার করছে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার কাজে অতীতের ধারাবাহিকতা অনুসরন করে।

আজকে বিএনপি নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া বলছেন, সকল হত্যা, গুম, অপহরনের দায়িত্ব সরকারকে নিতে হবে। তিনি অভিযোগ করছেন, গুম, অপহরনের সাথে সরকার ও সরকার দলীয় লোকজন জড়িত। র‌্যাব ও পুলিশ বাহিনী বেপরোয়া হয়ে উঠছে বলেও তিনি অভিযোগ করেছেন। বাংলাদেশের প্রায় সকল জনগণ তার এই বক্তব্যর সাথে একমত হলেও তারা যখন মনে করেন ২০০১ থেকে ২০০৬ এর তার শাসনামল তখন এসবই তাদের কাছে বিরোধিতার জন্য বিরোধিতা মনে হয়। এর কারন হচ্ছে, তখনকার সংবাদপত্রগুলো উল্টালে দেখা যাবে, যে ভাষায় খালেদা জিয়া এখন সরকারকে অভিযুক্ত করছেন, হুবহু না হলেও প্রায় একই ভাষায় শেখ হাসিনাও তার সরকারকে অভিযুক্ত করেছিলেন। আর দায় নেয়ার কথা বলছেন খালেদা জিয়া, ২১ আগষ্টের গ্রেনেড হামলার দায় কি তার সরকার নিয়েছিল? উল্টো তিনি বা তার পারিষদবর্গ দায় চাপিয়ে দিচ্ছিলেন আওয়ামী লীগের ওপরেই। এ মামলা তদন্তের নামে যে ‘জজ মিয়া’ নাটকটি সাজানো হয়েছিল সেখানে কি তার অনুমোদন ছিল না? যদি তাই হয়ে থাকে তাহলে, আওয়ামী লীগ তাদের অথবা তারা আওয়ামী লীগের কৃত অপরাধমূলক কর্মকান্ডকে অনুসরন করে আসছে?

বিএনপি গুম, অপহরনের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য তাদের দলীয় কর্মীদের ১০ দফা পরামর্শ দিয়েছে। এই পরামর্শ দেয়ার মধ্য দিয়ে দলীয় কর্মী বিনাশী এই সংস্কৃতির বিরুদ্ধে উজ্জীবিত করার চেষ্টা করা হ্েচ্ছ। কিন্তু জনগণের মনে প্রশ্ন জাগছে তাদের বাঁচার জন্য বিএনপি’র পরামর্শ কি? দিক নির্দেশনাগুলি কি কি? কিছুই কি নেই? ফলে এটি মনে করার যৌক্তিক কারন রয়েছে যে, জনগণ আওয়ামী লীগ বা বিএনপিকারো ভাবনার মধ্যে নেই। গত ৪ মে’র গণ অনশনে খালেদা জিয়া একটি ভিন্ন প্রসঙ্গে অভিযোগ তুলেছেন। যেটি গত প্রায় সাড়ে তিন দশক ধরে বাংলাদেশের মানুষের মুখে মুখে উচ্চারিত। বেগম জিয়া বলেছেন, জিয়া ও মঞ্জুরের খুনের সাথে এরশাদ জড়িত। ১৯৯১ থেকে তিন তিনটি মেয়াদে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় তিনি ও তার দল ছিল। এই হত্যাকান্ডের বিচারের ব্যাপারে তার আগ্রহ আছে বলে শোনা য়ায়নি। বরং তার পুত্র বিএনপি’র সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান ২০০৬ সালে পিতার কথিত খুনীর সাথে মিলিত হয়েছিলেন। জনগণ জানতে চায়, বেগম খালেদা জিয়া এ সবের কি জবাব দেবেন, অথবা তার কাছে আদৌ কি এর কোন জবাব আছে?

বিএনপি বা আওয়ামী লীগ জনগণ নিয়ে যাই ভাবুক আর না ভাবুক সেটির অপেক্ষা এখন সম্ভবত কেউ আর করছে না। গণ মানুষের রোষ ধুমায়িত হতে শুরু করেছে। আঞ্চলিকভাবে নানা জায়গায় জনগণ সংগঠিত হচ্ছে। যেমনটি ঘটেছে নারায়নগঞ্জে। গত রোববার জনগণের স্বতঃস্ফুর্ত হরতাল প্রমান করেছে তারা রাজনৈতিক দলগুলোর ওপরে আস্থাবিশ্বাস রাখেন না। এভাবেই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে গুপ্ত, অপহরন, হত্যা ও গডফাদারদের বিরুদ্ধে জনগণ ফুঁসে উঠছে। এতে এটিই প্রমান করে, গণ মানুষের একটি বিষ্ফোরন অত্যাসন্ন যা ভাসিয়ে নিতে পারে সব অন্যায়, অনাচার আর অবিচার।।