Home » প্রচ্ছদ কথা » জনগণ দমনে ফ্রাঙ্কেনষ্টাইনের দানব ॥ সরকার ক্রমাগত অসহিষ্ণু

জনগণ দমনে ফ্রাঙ্কেনষ্টাইনের দানব ॥ সরকার ক্রমাগত অসহিষ্ণু

শাহাদত হোসেন বাচ্চু

coverপ্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যখন বলেন, আমাদের রিজার্ভ কুড়ি বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। আমরা ২০২১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশে পরিনত হবো। এটি বলার সময় তাঁর প্রচন্ড আত্মবিশ্বাস, আত্মপ্রসাদ এবং মুচকি হাসি দেখে যে কারো মনে হতে পারে, প্রধানমন্ত্রীর চেয়ে সুখী মানুষ এই মূহুর্তে বাংলাদেশে আর কেউ নেই। তাঁর দুই মেয়াদে রাষ্ট্রের রিজার্ভ আকাশচুম্বী এতে প্রধানমন্ত্রী উল্লাসিত হতেই পারেন। কিন্তু সরকার প্রধান হিসেবে এবং তার অর্থমন্ত্রীর নিশ্চয়ই জানা আছে, আমদানী না থাকলে, শিল্পকলকারখানা গড়ে না উঠলে, অভ্যন্তরীন বিনিয়োগ না হলে, ক্যাপিটাল মেশিনারীজ বা শিল্প উৎপাদনের যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল ক্রয় না করলে অলস রিজার্ভ বাড়তেই থাকে। যার কোন সুষ্ঠ বিনিয়োগ নাই, ব্যবহার নাই সেই রিজার্ভ দিয়ে আখেরে কি লাভ হবে? অথচ সরকার প্রধান সহাস্যে এবং সোল্লাসে বলে যাচ্ছেন, ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশে পরিনত হবে। এ কথা সকলের জানা রয়েছে যে, বহু বালামুসিবত সহ্য করে শ্রমিকদের রক্তঘামশ্রমের ফসল রেমিট্যান্স ও গার্মেন্টস শিল্প এখনও আমাদের রিজার্ভের প্রধান উৎস। এতে সরকারের রাজনীতি ও অর্থনৈতিক পলিসি কতটা অবদান রাখছে?

আমাদের অর্থনীতিও রাজনীতির সঙ্গে সঙ্গে চলে যাচ্ছে পেছন যাত্রায়। প্রশ্ন উঠতে পারে, রাজনীতি পেছোলে অর্থনীতি এগোয় কি করে? এর মূল কারণ ছিল, বাংলাদেশের কৃষি নির্ভর অর্থনীতিতে এক বিশাল জনগোষ্ঠি নীরবেনিভৃতে, লাভালাভের তোয়াক্কা না করে উৎপাদনে সকল শ্রম নিয়োজিত রেখেছে। কিন্তু ২০১০ সালে জিডিপিতে কৃষির যে অংশ ছিল তা এখন এসে দাড়িয়েছে ৩ ভাগের এক ভাগে। শিল্পের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। তারপরেও ফসলের ন্যায্য মূল্যে না পাওয়ার বেদনা সত্ত্বেও কৃষি কাজ অব্যাহত রেখেছেন। আর দুনিয়ার সবচেয়ে কম শ্রম মূল্যে শিল্পে নিয়োজিত রয়েছে আরো এক বিশাল জনগোষ্ঠি। লক্ষ লক্ষ মানুষ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে শ্রম নিয়োজিত করে কোটি কোটি ডলার রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছেন। এই দু’য়ে মিলে অর্থনীতিতে যে ইতিবাচক পরিবর্তনটি দেখা দিয়েছে, বিশাল অংকের রিজার্ভ গড়ে উঠছে, তার সমস্ত সুফল নষ্ট হওয়ার আশংকা দেখা দিয়েছে নষ্টভ্রষ্ট পিছিয়ে পড়া রাজনীতির কারনে।

নব্বইয়ের পরে তিন তিন বার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থাকা বর্তমান সরকার প্রধানের এসব বিষয় অজানা থাকার কথা নয়। কিন্তু ক্ষমতার মোহে পড়ে যাওয়া একটি দল বা সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী দলীয় প্রধানের কাছে জনগনের ইচ্ছের মূল্য কতটুকু সেটি এখন প্রতিদিনই উপলব্দি করা যাচ্ছে। তাদের এবং জনগনেরদু’পক্ষের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরী হওয়ার কারনে, তাঁরা নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলির ওপরে। যে কোন বিরোধ মীমাংসার জন্য তারা ব্যবহার করছেন গায়ের জোর, কখনও আইনী মারপ্যাচ, কখনও সংবিধানের দোহাই দিয়ে জন ইচ্ছার বিপরীতে তারা যা খুশি তাই করতে পারছেন। এর ফলে একই দেশে চলছে দু’রকম শাসন। একটি সরকারী দলের জন্য, অন্যটি সরকারী দলের অংশ নয় তাদের জন্য। সরকারী দলের বাইরে সুবিচার, ন্যায্যতা, সুশাসনের মানদন্ড বলে কিছুই আর অবশিষ্ট নেই। এজন্যই নারায়নগঞ্জবাসী জানেন, সারাদেশের মানুষই জানেন, ৭ জন মানুষকে প্রকাশ্য দিবালোকে অপহরন ও খুন, ত্বকী হত্যাকান্ডসহ অসংখ্য অপরাধের নাটের গুরুটি কে? কিন্তু সরকার জানে না, অথবা নাটের গুরুটিকে রক্ষার জন্য সব আয়োজন চলছে। ইতিমধ্যেই ঘটনাটিকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার জন্য উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, কারন গডফাদারটিকে তো রক্ষা করতে হবে! এর ফলে মানুষের মনে ক্ষোভ বাড়ছে। নিরাপত্তা নিয়ে মানুষ আরো উদ্বিগ্ন, কিন্তু তাতে কি নিজেরা তো নিরাপদ থাকা যাবে। জনগনের নিরাপত্তা নিয়ে এতো ভাবার দরকার কি! ভোটের যে পদ্ধতি গড়ে তোলা হয়েছে তাতে তো জনগনের কাছে যাবারই দরকার নেই।

সেজন্যই একটি সন্দেহ বার বার জাগছে, সরকার প্রধান ও তাঁর দল কি বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় বসবাস করছেন? তিনি কি দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি সম্পর্কে খবর রাখেন, নাকি তাকে জানানো হয় কিছু? অথবা দল এবং সরকারের সকল ক্ষমতার অধিকারী একক ব্যক্তি হিসেবে প্রধানমন্ত্রী দেশের আসল পরিস্থিতি জানতে চান? সরকারের কর্তৃত্ব এবং রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলি ব্যবহার করে একটি একক নির্বাচন অনুষ্ঠান করে ক্ষমতায় আসীন হলেও সে সরকারের কতগুলি অস্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য জন্ম নেয়, যেটি এর আগে একাধিক লেখায় বলার চেষ্টা করা হয়েছে। পৃথিবী জুড়ে অনেকগুলি দেশে এরকম নিদর্শন আছে। গণতন্ত্রের নামে, সামরিক শাসনের নামে, ধর্মের নামে অথবা স্বৈরাচারের বিরুদ্ধাচারন করতে গিয়ে একটি দেশের রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় অনেকগুলি উপসর্গ তৈরী হয়। একটা সময়ে জনসমর্থনহীন দুর্বল সরকারের এসব উপসর্গের ওপরে খুব বেশি নিয়ন্ত্রন থাকে না। সরকারের ভেতরে তৈরী হয়ে যাওয়া ফ্রাঙ্কেনষ্টাইনের দানবের মাধ্যমে এসব উপসর্গ নিয়ন্ত্রিত হয়। আমাদের প্রধানমন্ত্রী, যিনি সরকার ও তার দলের সমস্ত ক্ষমতার উৎস, তিনি যদি পরিস্থিতির ভয়াবহতা বুঝতে না পেরে, অথবা বুঝেশুনেই বাংলাদেশের রিজার্ভ নিয়ে আত্মপ্রসাদ ও আত্মতৃপ্তিতে ভুগতে থাকেন, তাহলে জনগনের কিইবা বলার থাকতে পারে।

রাষ্ট্রীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ক্রমাগত রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের কাজে ব্যবহার করলে, বিরোধীদের দলনের হাতিয়ারে পরিনত করলে, তারা একসময় পেশাদারিত্ব হারিয়ে দলীয় ক্যাডার বাহিনীতে পরিনত হয়, – এই উপসর্গটি বাংলাদেশের বাস্তবতায় এখন ভয়াবহভাবে বিদ্যমান। এর ফলে জনগনের বদলে ক্ষমতাসীনদের গুপ্ত চিন্তা ও গুপ্ত মিশন বাস্তবায়নে তারা সমগ্র শক্তি নিয়োজিত করেছে। এজন্যই গুপ্তহত্যা, গুম, অপহরন, ক্রসফায়ার, ক্লিনজিং মিশনইত্যাদি সকল অপরাধের সাথে রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সম্পৃক্ততার অভিযোগ দেশ ছাড়িয়ে এখন আন্তর্জাতিক পর্যায়ে চলে গেছে। এর পরিনতি বুঝতে অক্ষম অথবা না বোঝার কারনে কি পরিনতি ডেকে আনবে সেটি আগাম বলা না গেলেও বাংলাদেশ এখন আন্তর্জাতিকভাবে বিপদাপন্ন ও অগণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে পরিচিতি পেতে যাচ্ছে। এরকম চিত্র এখনও পৃথিবীতে অনেকগুলি দেশে বিদ্যমান এবং অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে অনেক দেশই পরিবর্তনের চেষ্টা চালাচ্ছে। সুতরাং গুপ্তহত্যা, গুম, অপহরন পৃথিবীতে নতুন ঘটনা না হলেও বাংলাদেশে এই বিষয়টি এক দশক ধরে ক্রমাগত বেড়ে চলেছে। আর এগুলিই হচ্ছে সত্যিকারের উপসর্গ। রোগের মূল হচ্ছে, গণতন্ত্রহীনতা, জবাবদিহিতা না থাকা, একক বা ব্যক্তি নির্ভর রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা। এই মূল রোগের চিকিৎসা না করে উপসর্গ কিভাবে দুর করা যাবে, সেটি এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ও ঝুঁকি হয়ে দাঁড়িয়েছে দেশ ও জনগনের সামনে।

আজ থেকে বছর দুয়েক আগে মেধাবী ছাত্র লিমনকে ক্রসফায়ারের নামে যখন র‌্যাব পঙ্গু করে দিয়েছিল, তখন সরকার যথাযথ তদন্ত করে শাস্তি নিশ্চিত করত তাহলে আজকের এই পরিস্থিতির উদ্ভব হতো না। ২০০৮ সালে ক্ষমতায় আসার পরে ছাত্রলীগযুবলীগের রাশ যদি সরকার ও দলীয় প্রধান টেনে ধরতেন, তাদের অপরাধের যথাযথ শাস্তি বিধান করতেন, তাহলে প্রকাশ্য দিবালোকে চাপাতির কোপে বিশ্বজিতকে খুন হয়ে যেতে হতো না। ফ্রাঙ্কেনষ্টাইন’র দানবের মত ছাত্রলীগ, যুবলীগ জনজীবন দুর্বিসহ করে তুলতে পারতো না। প্রথম গুম বা অপহরনের খবর পাওয়ার পরে সরকার আন্তরিক হলে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে দলীয় কাজে ব্যবহার না করে জবাবদিহিতার আওতায় নিয়ে আসতেন, তাহলে অনেক দুঃখজনক ঘটনা এড়ানো যেত।

আজকে জেলায়, উপজেলায় এমনকি ইউনিয়ন পর্যায়ে যে সব গডফাদার সন্ত্রাসীরা দলীয় নামে জনগনের ওপর যে সন্ত্রাস, লুন্ঠন, দখল, চাঁদাবাজি করছে এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কোন কোন কর্মকর্তার সহযোগিতা নিয়ে যে রাজত্ব কায়েম করেছে, সে বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে কোন পদক্ষেপ কি নেয়া হয়েছে? উল্টো সবকিছু বিরোধী পক্ষের ওপর চাপিয়ে দিয়ে তাদের সাইজ করার সকল আয়োজন চলছে। ছাত্রলীগ, যুবলীগ কোন সন্ত্রাসী কর্মকান্ড ঘটালে সরকার ও দলের পক্ষ থেকে সাফাই গাওয়া হয়েছে, জামায়াতশিবির ও বিএনপির অনুপ্রবেশকারীরা এসব ঘটনা ঘটাচ্ছে। যদি তাদের কথা সত্যি বলে ধরে নেয়া হয় তাহলেও দেখা যাবে, কথিত ঐসব অনুপ্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে আজ পর্যন্ত একটি ব্যবস্থাও নেয়া হয়নি। ফলে সরকারের ওপরে জনগণের আস্থাহীনতা একেবারেই শূণ্যের কোঠায় গিয়ে পৌছেছে। অন্যদিকে, গত এক বছর যাবত জামায়াত, শিবির, হেফাজতের ভয়াবহ তান্ডবের বিরুদ্ধে মামলা গ্রেপ্তার ছাড়া দৃশ্যমান কোন ব্যবস্থা সরকার নেয়নি। জামায়াত কর্মীরা এখন দল বেঁধে আওয়ামী লীগে যোগদান করছে, হেফাজত বলছে, আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ তাদের বন্ধু তাহলে কি জনগন ধরে নিতে পারে, সবটাই ছিল একটি সাজানো নাটকের মহড়া? যে নাটকের মাধ্যমে কোন কিছুরই তোয়াক্কা না করে আওয়ামী লীগ একটি রক্তক্ষয়ী একক নির্বাচন সম্পন্ন করে পুনরায রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসীন হয়েছিল?

রাষ্ট্রীয় রিজার্ভ বা উন্নয়ন নিয়ে সরকার প্রধান বা তার দল যতই আত্মতৃপ্তির সাগরে ভাসতে থাকুক না কেন, তাতে নিরীহ জনগনের আর কিছুই এসে যায় না। আর সে কারনেই আশংকা হচ্ছে, আগামীতে রাষ্ট্র আরো অসহিষ্ণু হয়ে উঠবে। ফলে গণ গ্রেফতার, গুম, গুপ্ত হত্যা, ক্রসফায়ার, বিক্ষোভ দমনে নিষ্ঠুর আচরন বাড়তে থাকবে। চাটুকারীতা, স্তুতি এবং অনুগত প্রচার ছাড়া সরকার আর কোন কিছুই মানতে চাইছে না। কারন সরকার জনগনের ওপর ভরসা করতে দ্বিধা করছে। তার ভরসার স্থল হয়ে উঠছে অন্য কোন ক্ষমতাকেন্দ্র। হতে পারে সেটি ক্ষমতাধর রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলি অথবা দৃশ্যমান নয় এরকম কোন গোষ্ঠির সাথে সমঝোতা কিংবা ভিন্ন কোন দেশ। এজন্যই বিপদ মূলত: দেশের অগনন সাধারন জনগনের, যারা বোঝে না রিজার্ভ কত বিলিয়ন ছাড়িয়েছে, উন্নয়নের নামে রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুন্ঠিত হয়েছে, বিদেশে কত অর্থ পাচার হয়েছে। তারা শুধু বোঝে প্রতিদিনের খাদ্য নিরাপত্তা, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসার গ্যারান্টি আর সর্বোপরি স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি।।