Home » আন্তর্জাতিক » ঔপনিবেশিকতার বিরুদ্ধে প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রাম

ঔপনিবেশিকতার বিরুদ্ধে প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রাম

ইরফান হাবীব

1857

(১৮৫৭ সালের সিপাহি বিপ্লব ছিল ঔপনিবেশিকতার বিরুদ্ধে এ অঞ্চলের সাধারণ মানুষের বড় ধরনের প্রথম প্রতিবাদ। আর ভারত উপমহাদেশের প্রথম ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রাম। এই বিপ্লব যা প্রকাশিত হয়েছিল সিপাহিদের অভ্যুত্থানের মধ্যদিয়ে। ১৮৫৭ সালের ১০ মে শুরু হয়েছিল এই বিপ্লব তৎকালীন ‘বেঙ্গল’সহ সারা উপমহাদেশে এবং এই বিপ্লব চলেছিল বছরব্যাপী। প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং ঔপনিবেশিকতার বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিবাদকারীদের উদ্দেশ্যে আমাদের বুধবার এর শ্রদ্ধা। লেখাটি পুনঃমুদ্রিত।)

অখণ্ড ভারতে উপনিবেশবাদের ভূমিকার বিস্তৃত প্রেক্ষাপটেই ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিপ্লবের ঘটনাকে বিচার করা উচিত। প্রথমত, ঔপনিবেশিক আমলে লাগাতারভাবেই বিপুল পরিমাণ সম্পদ ভারত থেকে পাচার হয়ে যেত। ১৮৫৪৫৫ অর্থাৎ বিপ্লবের দুই বছর আগের সময়কার হিসাব অনুযায়ী দেখা যায় যে, ভারত থেকে অন্তত ৫ কোটি ৮ লাখ রুপি মূল্যের সম্পদ প্রতি বছর পাচার হয়ে যাচ্ছিল। আমদানির চেয়ে ভারত থেকে রফতানির পরিমাণ যে অনেক বেশি ছিল সে সময়কার ভারতীয় আমদানিরফতানি শুল্কের নথির দিকে তাকালেই যে কেউ ব্যাপারটি বুঝতে পারবেন। মহালওয়ারি হিসেবে বিবেচিত অঞ্চলগুলোতে করের পরিমাণ অতিমাত্রায় বেড়ে গিয়েছিল যেখানে ভূমি করের পরিমাণ স্থায়ীভাবে বন্দোবস্ত দেয়া অঞ্চল এবং মাদ্রাজের রায়তওয়ারি অঞ্চলের মতো নির্ধারিত ছিল না।

প্রকৃত হিসেবে দেখা যায়, ১৮১৯ থেকে ১৮৫৬ সময়ের মধ্যে মহলওয়ারি অঞ্চলসমূহে (আওয়াধ এবং মধ্য ভারতের অঞ্চল বিশেষ ও বর্তমান উত্তর প্রদেশ) করের মাত্রা ৭০ ভাগ বেড়ে গিয়েছিল। আমাদের মনে রাখা উচিত যে, এ অঞ্চলগুলোই ছিল বিপ্লবের সূতিকাগার। এসব অঞ্চল থেকেই সাধারণ সিপাইরা এসেছিল যারা ছিলেন প্রধানত কৃষক পরিবারের সন্তান। একইভাবে এ অঞ্চলের জনগণের কাছ থেকেই বিপ্লবীরা বিপুল পরিমাণ সমর্থন পেয়েছিলেন।

দ্বিতীয়ত, যে বিষয়টি বিবেচিত হওয়া উচিত তা হচ্ছে এখনকার পরিভাষায় যাকে বলে মুক্তবাণিজ্যের সাম্রাজ্যবাদ। ১৮৩৩ সালের আইনি সনদটি স্বাক্ষরিত হওয়ার পর থেকে ইংরেজ শিল্প উৎপাদকরা বস্তুত কোন রকম শুল্ক না দিয়েই ভারতে অনুপ্রবেশ করতে শুরু করে। এর ফল দাঁড়াল এই যে, ভারতীয়রা, বিশেষ করে সুতা ও তাঁত শিল্পের শ্রমিকরা ব্যাপকহারে বেকার হয়ে পড়ল। কারণ ভারতের বস্ত্র চাহিদার একচতুর্থাংশই পূরণ হতে লাগল ব্রিটেন থেকে আমদানি করা বস্ত্রের মাধ্যমে।

এই সময়ে অর্থাৎ ১৮৪৩ থেকে ১৮৫৬ সময়কালে ভারতের একপঞ্চমাংশ এলাকাই ব্রিটিশদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। প্রত্যেকটি এলাকা দখল করে নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধির প্রত্যেক দফায়ই ব্যাপক সংখ্যায় বেকারত্বের সৃষ্টি হয়। কারণ ইতিপূর্বে যে সব ভারতীয় বিশেষ করে বিভিন্ন রাজ্যের শাসকদের অধীনে নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মচারী ছিল, তারা এবং বিভিন্ন ধরণের কারিগরি পেশায় যুক্ত শ্রমিকরা তাদের রুটিরুজির সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়।

সর্বশেষ মুক্তবাণিজ্যের সাম্রাজ্যবাদ বড় ধরণের রক্তপাতকেও অনিবার্য করে তোলে। দি বেঙ্গল আর্মি ছিল এশিয়ার মধ্যে সর্ববৃহৎ ও সর্বাধুনিক। আধুনিক যুদ্ধবিদ্যায় প্রশিক্ষিত ও পারদর্শী ১ লাখ ৩৫ হাজারেরও বেশি ভারতীয় (দেশী) সৈনিকের সমন্বয়ে এটি গঠিত ছিল। সে সময়কার ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের এটিই ছিল প্রধান সেনাবাহিনী। আফগানিস্তান, সিন্ধু, পাঞ্জাব, বার্মা, ক্রিমিয়া, চীন এবং ইরানের যুদ্ধে বহু সিপাহী যুদ্ধ করে এবং মারা যায়। বছরের পর বছর ধরে ঘটতে থাকে এসব জীবনদানের ঘটনা। আর স্বাভাবিকভাবেই এসব ঘটনা বেঙ্গল আর্মির সিপাহিদের মনের ওপর প্রচণ্ড রকম নৈতিক চাপ সৃষ্টি করে এবং একইভাবে নিয়োগদানকারী কর্তৃপক্ষের প্রতি তাদের আনুগত্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাবও ফেলে।

এক অর্থে দেখতে গেলে ব্যাপারটা এমন দাঁড়িয়েছিল যে, সাম্রাজ্যবাদ ও উপনিবেশবাদ নিজ স্বার্থ হাসিলের জন্য যতো ধরণের ক্ষোভ ও উত্তেজনার জন্ম দিয়েছিল তার সবটাই এসে কেন্দ্রীভূত হয়েছিল তারই তৈরি করা একটি বাহিনীর মধ্যে। ব্রিটিশরা একটি শিক্ষিত ও সুশৃঙ্খল সেনাবাহিনী চেয়েছিল। তাই তারা তাদের বাহিনীর প্রধান যে অংশ অর্থাৎ পদাতিক বাহিনীতে ব্রাহ্মণদের নিয়োগ দিতে শুরু করে। এর ফলে বেঙ্গল আর্মির মধ্যে খুবই স্পর্শকাতর বর্ণাশ্রম প্রথার উপাদান যুক্ত হতে শুরু করে।

বেঙ্গল আর্মির সৈনিকদের তাদের পূর্বতন নিয়োগ কর্তাদের প্রতি সহজাতভাবেই কিছুটা দরদ ছিল। তারা তাই চর্বি মাখানো কার্তুজের ইস্যুতে তাৎক্ষণিকভাবে বিদ্রোহ করে বসে। এই ইস্যুটি ব্রাহ্মণদের জন্যে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কারণ সেনাবাহিনীতে কর্মরত বেঙ্গল আর্মির মধ্যে তারাই এই চর্বি মাখানো কার্তুজ ও ধর্মীয় প্রথা বা রীতির পবিত্রতার ব্যাপারে অনেক বেশি সচেতন ও স্পর্শকাতর ছিল। একথা ঠিক যে, সিপাহিরা তাদের ‘ধরম’ বা ‘দ্বীন’ (ধর্ম) রক্ষার নামে অস্ত্র ধরেছিল। কিন্তু তা থেকে এটি মনে করার কোনো কারণই নেই যে, তারা কোনো যাজকীয় রাষ্ট্রের ধারণায় বিশ্বাসী ছিল কিংবা আধুনিক চিন্তা চেতনাবিরোধী কোনো সংস্কার দ্বারা আচ্ছন্ন ছিল।

সিপাহিরা সব সময়ই আধুনিক সামরিক সংগঠন ও নেতৃত্বের সঙ্গে ব্যাপকভাবে পরিচিত ছিল এবং যতোটা জানা গেছে, তাতে সামন্ত শ্রেণীর সঙ্গে তাদের কোনো সংশ্রবই ছিল না। দি বেঙ্গল আর্মির একটি বৈশিষ্ট্য ছিল এই যে, এখানে হিন্দু ও মুসলমান সৈনিকদের একই ইউনিটে এক সঙ্গেই রাখা হতো। অভ্যুত্থান শুরু হওয়ার পর সিপাহিরা নিজেরাই নিজেদের অফিসার নির্বাচন করতে শুরু করে। বিস্ময়কর ব্যাপার হলো এই যে, অনেক ক্ষেত্রেই দেখা গেল হিন্দু প্রধান বাহিনীর সিপাহিরা নিজেদের অফিসার হিসেবে মুসলমানদের এবং মুসলিম প্রধান বাহিনীর সিপাহিরা নিজেদের অফিসার হিসেবে হিন্দুদের নির্বাচন করছে।

১৮৫৭ সালের যুদ্ধ সিপাহি বিদ্রোহ ছিল কি ছিল না এ প্রশ্নে বিতর্কে অবতীর্ণ হওয়ার সময় এই বিপ্লবের সিপাহিদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাটি এড়িয়ে যাওয়া ঠিক হবে না। তারাই ছিল এই সশস্ত্র প্রতিবাদের কেন্দ্রে, তারাই ছিল এই ঘটনার সশস্ত্র পক্ষ এবং সবচেয়ে দৃঢ় ও শক্তিশালী উপাদান। এ কারণেই ১৮৫৭ সালের বিপ্লবকে বিশ্বের সবচেয়ে বড় উপনিবেশবাদবিরোধী যুদ্ধ হিসেবে বিবেচনা করা হয়ে থাকে। এই যুদ্ধে বেঙ্গল আর্মির সিপাহিদের মতো ১ লাখ ২০ হাজারেরও বেশি পেশাদার সৈনিক অংশগ্রহণ করেছিল।

গণতান্ত্রিক ভাবাবেগ

বেঙ্গল আর্মির সিপাহিদের মধ্যকার প্রজাতান্ত্রিক কিংবা গণতান্ত্রিক ভাবাবেগের বিষয়টি ছিল খুবই তাৎপর্য বহনকারী। ‘কাউন্সিল’ নামে প্রতিনিধিত্বকারী এক ধরণের সাংগঠনিক কাঠামো তারা তৈরি করেছিল। তাতে তারা তাদের নিজেদের প্রতিনিধিদেরকেও নির্বাচিত করেছিল। দিল্লিতে তারা ক্ষমতাহীন বাদশাহ হিসেবে বাহাদুর শাহ জাফরকে মেনে নিয়েছিল। তবে বাস্তবতা হলো, তারা আসলে বিপ্লবে অংশগ্রহণকারী বিভিন্ন বাহিনী থেকে প্রতিনিধিত্বশীল ব্যক্তিদের নিয়ে একটি প্রশাসনিক আদালত তৈরি করেছিল। লক্ষ্য ছিল দিল্লির শাসনকার্য পরিচালনা করা। লক্ষণীয় অন্য আরেকটি বিষয় হল এই যে, ব্রিটিশরা দিল্লিতে সিপাহিদের কর্মকাণ্ডের যতোই সমালোচনা করুক না কেন, আসল ঘটনা হল চার মাস ধরে চলা এ বিপ্লবের সময় বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণে থাকা দিল্লিতে (এই সময়কার ঘটনা সংবলিত সংবাদপত্র এবং বিভিন্ন দলিল দস্তাবেজ জাতীয় মহাফেজখানায় সংরক্ষিত রয়েছে) সিপাহিরা অত্যন্ত সীমিত আকারেই তাদের প্রতিশোধমূলক কর্মকাণ্ড চালিয়েছে। কিন্তু ব্রিটিশরা দিল্লি পুর্নদখল করে নেয়ার পর সেখানে তারা এর বিপরীত পরিস্থিতিই সৃষ্টি করেছিল। তারা জনগণের বিরুদ্ধে ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ এবং লুটপাট চালায়। অন্যদিকে বিপ্লব চলার চার মাস সময়জুড়ে বিদ্রোহীরা যা করেছে সমসাময়িক পরিস্থিতি বিবেচনায় তা ছিল রীতিমতো দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী।

ধর্মীয় স্লোগানগুলোর গায়ে দেশপ্রেমের একটি প্রলেপ দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। বিপ্লবীরা এ মর্মে যুক্তি প্রদর্শন করছিল যে, হিন্দু এবং মুসলমান উভয়েই একেশ্বরবাদে বিশ্বাসী। অন্যদিকে খ্রিস্টানরা ট্রিসিটি বা ত্রিত্বে বিশ্বাসী। এ কারণেই হিন্দু এবং মুসলমানরা অভিন্ন ধর্মীয় মূল্যবোধ পোষণ করে এবং ইংরেজদের বিশ্বাসের সঙ্গে এর কোনো সংশ্রব নেই। এর বাইরেও যে ধারণাটি কার্যকর ছিল তা হচ্ছে, হিন্দু এবং মুসলমান উভয়েই ভারতের প্রতি অনুগত। অন্যদিকে ইংরেজরা হচ্ছে ভিন্ন জাতির মানুষ এবং তারা ভারতীয়দেরকে অপমান ও পোষণ করেছে।

সে সময় তিনটি সাপ্তাহিক সংবাদপত্র বের হতো। এর মধ্যে দুটি উর্দু এবং একটি ফার্সিতে। প্রধান সাপ্তাহিক ‘দিল্লি উর্দু আখবার’ অত্যন্ত জোরালো ভাষায়ই যুক্তি প্রদর্শন করেছিল যে, ইংরেজ শাসকরা হচ্ছে বিদেশী এবং তারা ভারত থেকে বিপুল পরিমাণ সম্পদ পাচার করে নিয়ে যাচ্ছে।

পত্রিকাটি বরাবরই তার পাঠকদেরকে ‘প্রিয় দেশবাসী’ বলে সম্বোধন করতো এবং বিপ্লবে অংশগ্রহণকারী সেনাবাহিনীকে ফৌজহিন্দুস্তানি বা ভারতীয় সেনাবাহিনী হিসেবে আখ্যায়িত করতো। পত্রিকাটি ‘প্রজাতন্ত্রী’ মনোভাবাপন্ন দিল্লির কমান্ডার ইন চিফ বখত খানকে নায়ক হিসেবে তুলে ধরেছিল। অথচ এ মানুষটিকে খুব অন্যায়ভাবেই কোনো কোনো আধুনিক সমালোচক একজন ওহাবি নেতা হিসেবে চিত্রিত করেছেন। ‘দিল্লি উর্দু আখবার’ পত্রিকাটি এই মর্মে প্রচার চালিয়েছিল যে, জনগণের উচিত কলাকৌশল রপ্ত করা এবং তা দিয়ে রাইফেল বানানো। এটি বিপ্লবীদের ছত্রছায়ায় ডাক বিভাগের কার্যক্রমও পুনরায় চালু করার দাবি জানায়। ১৮৫৭ সালে দেয়া নিজের ঘোষণায় বিপ্লবে প্রখ্যাত নেতা ফিরোজ শাহ জানান যে, বিপ্লবীরা বাষ্পীয় জাহাজ ও রেলওয়ের উন্নতি ঘটাবে।

পণ্ডিত জওহর লাল নেহরু তার ‘ভারত প্রসঙ্গে’ গ্রন্থে লিখেছেন, ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহ ছিল মূলত একটি সামন্তীয় অভ্যুত্থান। এই বক্তব্যের কিছুটা সত্যতা আছে এই কারণে যে, অভ্যুত্থানের প্রধান নেতাদের অনেকেই ছিলেন বিভিন্ন রাজ্যের রাজন্য কিংবা জমিদার এবং বিদ্রোহ সংগঠনে তাদের কেউ কেউ অসামান্য অবদান রেখেছিলেন। এদের মধ্যে কুনওয়ার সিং এবং অমর সিং ছিলেন জগদীসপুরের দুই জমিদার। ঝাঁসির রানী লক্ষ্মীবাঈ এবং লখনৌয়ের হযরত মহলও ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে খুব শক্তিশালী প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন। বেরিলির জমিদার খানবাহাদুর খানও অভ্যুত্থান সংগঠনে জড়িত ছিলেন এবং শেষ পর্যন্ত তাকে ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলতে হয়েছিল। বাহাদুর শাহ জাফর অভ্যুত্থান শুরুর দিককার নিজের দোদুল্যমানতার জন্যে খানিকটা প্রায়শ্চিত করেছিলেন বটে, তবে ১৮৫৭ সালের পর লেখা নিজের কিছু কবিতার ভেতর দিয়ে তিনি শেষ পর্যন্ত আত্মসমপর্ণ করেছিলেন। যেসব কবিতায় তিনি অভ্যুত্থানে নিহতদের জন্যে আবেগ মথিত ভাষায় গভীর শোক প্রকাশ করেছিলেন।

লক্ষ্য করার মতো আরো একটি বিষয় হল এই যে, তালুকদার, জমিদার এবং রাজন্যরা যখন বিশ্বের সর্ববৃহৎ ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে বসে, তখন সাধারণ মানুষের প্রতিরোধস্পৃহাও অবধারিতভাবে নিজেদের লক্ষ্য ও আচরণে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন ঘটায়।

প্রথম দিককার আবেদন বা ঘোষণা……

প্রথম দিককার ঘোষণা বা আবেদনসমূহে প্রথাবদ্ধ কিছু কথাবার্তাই স্থান পেয়েছিল। বলা হয়েছিল ইংরেজদের পরাজিত করার পর আগেকার সেই সামন্তীয় ব্যবস্থাই পুনঃপ্রবর্তিত হবে। কিন্তু এক পর্যায়ে এসে বিপ্লবীদের ঘোষণা থেকে আবেগপ্রবণ এসব কথাবার্তা উধাও হয়ে যায়। ১৮৫৭ সালের নভেম্বর মাসে জারিকৃত রানী ভিক্টোরিয়ার ঘোষণাপত্রের জবাবে হযরত মহলের ক্যাম্প থেকে জারি করা বিপ্লবীদের চূড়ান্ত ঘোষণায় এসব বিষয়ে আর কিছুই বলা হয়নি। বরং ভারতের জনগণই তখন এসে গেছে একেবারে সামনের কাতারে। ‘সেনাবাহিনী এবং ভারতের জনগণ’এর উদ্দেশ্যে বলা হলো, তারা যেন রানী ভিক্টোরিয়া এবং তার ঘোষণাকে কোনোভাবেই বিশ্বাস না করে। এই ঘোষণা মিথ্যা এবং প্রতারণাপূর্ণ।

তবে ব্রিটিশদের সে সময়কার কর্মকাণ্ডের ওপরও যেন কোন পর্দা টেনে দেয়া উচিত হবে না। কিছুটা অকূটনৈতিক সুলভ হলেও প্রসঙ্গটি উত্থাপন না করে পারা যায় না। বিপ্লব ব্যর্থ হওয়ার পর ভারতীয়দের অবস্থা কী দাঁড়িয়েছিল এবং সে সব কাহিনী যতোই গোপন করা হোক না কেন, ইতিহাসের পাতা থেকে তা মুছে ফেলা যাবে না। জে ডব্লিউ কে তার বিখ্যাত গ্রন্থ ‘সিপাহি যুদ্ধের ইতিহাস’এ বলছেন, ‘একজন মিসেস চ্যাম্বার কিংবা কোন মিস জিনিংস হিংস্র এক কালো আদমির ছোরার আঘাতে খুন হচ্ছেন এমন দৃশ্যের বর্ণনা পড়ে একজন ইংরেজের হয়তো ক্রোধে দম বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হবে। কিন্তু স্থানীয়দের ইতিহাসেও তো কীভাবে ভারতের নাম না জানা অসংখ্য সাধারণ মা, স্ত্রী, সন্তানেরা ইংরেজদের প্রতিহিংসার নিষ্ঠুর শিকারে পরিণত হয়েছিল, তার ভয়াবহ বর্ণনা লিপিবদ্ধ থেকে থাকতে পারে। গভীর বেদনার এসব কাহিনীও তো হৃদয় বিদীর্ণ করা হতে পারে। যেমন করে বিদীর্ণ হয়ে আছে আমাদের নিজেদেরও হৃদয়।’

দিল্লিতে নৃশংসতা

দিল্লিতে যে নৃশংস হত্যাকাণ্ড সংঘঠিত হয়েছিল অনেকের স্মৃতিকথায়ই তার বর্ণনা খুঁজে পাওয়া যায়। ব্রিটিশদের অনেক নথিতেও সে সব হত্যাকাণ্ডের উল্লেখ রয়েছে। পুরো নগরীই বধ্যভূমিতে পরিণত হয়ে জনশূন্য হয়ে গিয়েছিল। দিনের পর দিন চলেছিল নরহত্যা। সিপাহিরা যদি কয়েকশ’ ইংরেজকে হত্যা করে থাকে তবে ইংরেজরা তার বিপরীতে নিয়ে নেয় লাখ লাখ মানুষের জীবন। শত সাধারণ ও নিরপরাধ ভারতীয় নারীপুরুষ আর শিশুকে হত্যার কারণে কোনো একজন ইংরেজকে কি কখনো শাস্তি পেতে হয়েছে? তাহলে কী করে দুই পক্ষকেই অভিন্ন মানদণ্ডে বিচার করব?

সুতরাং ভালো কিছু সম্পর্কে বলতে গিয়ে যখনই আমরা বলি যে, এটি ব্রিটিশ শাসনের সুফল, যেমন ভারতীয় সিভিল সার্ভিসের প্রতিষ্ঠা, তখন আমাদের যেন ১৮৫৭ সালের কথাটিও স্মরণে থাকে। তবে সেটি কেবল যেন বিপ্লবের কথা প্রসঙ্গেই না হয়। মনে রাখতে হবে আমাদের, মহান ত্রাতাদের ছত্রছায়াতে কীভাবে অসংখ্য ভারতীয় নারীপুরুষ আর শিশু গুলিবিদ্ধ হয়ে অস্ত্রের আঘাতে কিংবা অন্যান্য নৃশংসতার শিকার হয়ে জীবন হারিয়েছিল।।

[লেখক: প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ, প্রফেসর এমিরিটাস, আলিগড় বিশ্ববিদ্যালয় এবং বর্তমানে ‘জনগণের ইতিহাস’ প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত]