Home » আন্তর্জাতিক » অতীত বিশ্বকাপ ফুটবলের কয়েকজন কিংবদন্তি – (প্রথম পর্ব)

অতীত বিশ্বকাপ ফুটবলের কয়েকজন কিংবদন্তি – (প্রথম পর্ব)

মেহেদী হাসান

last 6কিংবদন্তিদের মধ্যে কে শ্রেষ্ঠ এটি বিচার করে তালিকা তৈরি করা অত্যন্ত কঠিন কাজ। দেখা গেল তৃতীয় এমন একজনকে পাওয়া গেল যে কী না তুলনামূলক বিচারে শ্রেষ্ঠ এবং তখনি শুরু হয়ে যায় আসল হ্যাপা। কীসের ভিত্তিতে কাকে রাখা হবে আর কাকে বাদ দেয়া হবে এটি বিচার করা তখন দরূহ ব্যাপার হয়ে দাড়ায় বিচারকের জন্য। যেমন দ্বিতীয় যুদ্ধোত্তর সময়ের মতো টেলিভিশন যখন এতোটা উন্নত হয়নি, সেই বিশ্বযুদ্ধ পূর্বকালীন সময়ে এমন অনেক কিংবদন্তিতুল্য ফুটবলারের কথা জানা যায় যারা বিশ্বকাপ আসরের বাইরে ছিলেন।

বিশ্বকাপের আসর হচ্ছে এমন একটি জায়গা যেখানে একজন ফুটবলারের সর্বোচ্চ দক্ষতা যাচাই করা যায়। তার খেলোয়াড়ী জীবনের চূড়ান্ত পরীক্ষার জায়গা যেহেতু এই প্রতিযোগিতার আসরটি সেহেতু অন্যদের সঙ্গে তুলনা করা যায় সহজেই। সে জন্য বিশ্বযুদ্ধোত্তর সময়ে, টেলিভাইজড ফুটবরের জামানায় আয়োজনকৃত আসরগুলোর মধ্য থেকেই তারকাদের বেছে নেয়াটা সহজ।

তাই বিশ্বকাপে কে কেমন নৈপুণ্য দেখালো, দলকে জেতানোয় কার কতোটুকু অবদান এবং তার দীর্ঘযাত্রা ইত্যাদির ভিত্তিতে খেলোয়াড়ের যোগ্যতা বিচার করা হয়েছে আমাদের তালিকায়। প্রতিযোগিতায় একটি দুটি জেতাহারার বিষয় নিয়ে আমরা খুব বেশি ভাবিনি।

আমাদের তৈরিকৃত তালিকার একটি সমালোচনা থাকতে পারে এ রকম, অননুপ্রাণিত শিরোপাধারীদের সামান্য কৃতিত্বের বিনিময়ে আমরা দুর্ভাগ্যপীড়িত কিংবদন্তিদের নিয়ে বড় বেশি মাতামাতি করছি। ১৯৯৪এ ব্রাজিলের পক্ষে সর্বোচ্চ গোলদাতা রোমারিওর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ইতালির রবার্তো ব্যাজ্জিও যাদের মধ্যে একজন।

যদিও গোল হচ্ছে ফুটবলের ভাগ্য নির্ধারক। তবুও আমাদের ভুলে গেলে চলবে না ডিফেন্ডার এবং গোলরক্ষকের কাজটিও কম পরিশ্রমের নয়। কিন্তু বেশির ভাগ তালিকায় এই দুই শর্মাকে হিসাবের মধ্যে না নিয়ে অন্যান্য অবস্থানের খেলোয়াড়দের খুব বড় করে দেখানো হয় যা বিতর্কসাপেক্ষ। এতসব বিতর্কের পরও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর বিশ্বকাপ ফুটবলের নায়কদের একটি তালিকা এখানে দেয়া হলো :

পেলে : ফুটবলের সমার্থক কোনো শব্দ যদি থাকে তাহলে সে শব্দটি হচ্ছে পেলে। বিখ্যাত ফুটবলারদের তালিকায় শীর্ষস্থান তিনি দখল করে আছেন তার অসাধারণ, দৃষ্টিনন্দন ক্রীড়ানৈপুন্য এবং অতুলনীয় সাফল্যের কারণে। ১৯৫৮এর বিশ্বকাপে পেলে ছিলেন সর্বকনিষ্ঠ খেলোয়াড়। বয়স ছিল ১৭ বছর ২৪৯ দিন। সেমিফাইনালে ফ্রান্সের বিরুদ্ধে হ্যাটট্রিক করে সবার নজর কাড়েন। ফাইনালে সুইডেনের বিরুদ্ধে দুটো গোল করেন যার মধ্যে প্রথমটি অসাধারণ। প্রথমে বলটি বুকে নিয়ে পরে মাটিতে না ফেলেই ডিফেন্ডারের মাথার ওপর দিয়ে সোজা জালে ঢুকিয়ে দেন। এটি বিশ্বকাপের সেরা গোলের ইতিহাসে প্রথম স্থান অধিকার করে আছে।

আঘাতজনিত কারণে পরের দুই বিশ্বকাপে চার ম্যাচের বেশি তিনি খেলতে পারেননি। কিন্তু তিনি তো পেলে। এতো সহজে দমে যাওয়ার পাত্র তিনি তো নন। ১৯৭০এর বিশ্বকাপে, সম্ভবত এটিই ছিল ব্রাজিলের বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোৎকৃষ্ট সময় এবং পেলে ছিলেন যার প্রাণ ভোমরা। ফাইনালে প্রথম গোলসহ চার চারটি গোল করেন। এছাড়া জায়ারজিনহো এবং কার্লোস আলবার্তোর গোল দেয়ায় সহায়তা করেন এডিসন অ্যারেন্তস দো নাসিমেন্তো পেলে।

দিয়েগো আরমান্দো ম্যারাডোনা : খুব কম খেলোয়াড়ই আছেন যারা দাবি করতে পারেন, বিশ্বকাপ জেতানোর জন্য তার একক কৃতিত্বই সবচাইতে বড়। ম্যারাডোনা হয়তো তা করতে পারেন। জর্জ ভালদানো এবং জর্জ বুরুচাগার মতো কীর্তিমান সতীর্থ খেলোয়াড়দের ছাড়িয়ে বলতে গেলে তার একক কৃতিত্বেই আর্জেন্টিনা ১৯৮৬এর বিশ্বকাপ ঘরে তোলে। একক দাাবিদারীত্বের কারণটি হলো, কোয়ার্টার ফাইনালে দেয়া তার দুটি গোলের দ্বিতীয়টি। সেটি ছিল ইংল্যান্ডের বিপক্ষে। একা চমৎকার নৈপুন্যতার সঙ্গে সব খেলোয়াড়দের কাটিয়ে ইংল্যান্ডের জালে বল ঢুকিয়ে দেন তিনি। ম্যারাডোনার বৈচিত্র্যময় জীবনের একটি অন্ধকার দিকও আছে। ওই ম্যাচের প্রথম গোলটি করা হয়েছিল হাতের সাহায্যে, যেটিকে তিনি ঢাকতে চেয়েছেন ‘ঈশ্বরের হাত’ বলে। ১৯৯৪ সালে এটি গোচরীভূত হয় যখন তিনি বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিয়েছেন ডোপ টেস্টে ধরা পড়ার কারণে। কিন্তু তাই বলে তার কৃতিত্বকে কোনোভাবেই খাটো করে দেখার কিছু নেই।

ফ্রাঞ্জ অ্যান্টোন বেকেনবাওয়ার : ফুটবলের বর্ণাঢ্য জীবনের শুরুতে তিনি ছিলেন মধ্য মাঠের খেলোয়াড়। তারপর প্রয়োজনে সেন্টার ব্যাক, কখনো ডিফেন্ডার। তবে মূলত জার্মান দলের ডিফেন্ডার হিসেবেই তিনি বেশি পরিচিত। তাকে সুনির্দিষষ্ট কোনো স্থানের খেলোয়াড় হিসেবে চিহিৃত করা মুশকিল। কখনো তিনি গোল সীমানার প্রাচীর হিসেবে দন্ডায়মান আবার কখনো গোল দেয়ার জন্য আক্রমণ পরিচালনাকারী সেনাপতি। এক কথায তাকে বলা চলে ‘লিবেরো’ (আধুনিক সুইপার যিনি শুধু ডিফেন্ডার হিসেবে এক জায়গায় থাকেন না)। যিনি পশ্চিম জার্মানির ফুটবলের ধারাকে আমূল বদলে দিয়েছিলেন। তার অসাধারণ নৈপুন্যে আয়োজনকারী পশ্চিম জার্মানি ১৯৭৪এ বিশ্বকাপ ঘরে তোলে, যে শিরোপাটি অল্পের জন্য হারিয়েছিল ১৯৬৬তে এবং ১৯৭০এ তৃতীয় স্থান অধিকার করেছিল।

গ্যারিঞ্চা : ম্যানুয়েল ফ্রান্সিসকো দ্য সান্তোস, ডাক নাম গ্যারিঞ্চা। মুক্তমনা ব্রাজিলিয়ান উইঙ্গার। জন্মেছিলেন ডান পা থেকে ছয় ইঞ্চি খাটো বাঁ পা নিয়ে এবং সেটি ছিল বাইরের দিকে বাঁকানো। ব্রাজিলিয়ানরা যাকে আদর করে ডাকতেন গ্যারিঞ্চা বা ‘ছোট্ট পাখি’ বলে। তিনি ছিলেন বল কাটানোতে ওস্তাদ। কোমরটাকে একদিকে ঘুরিয়ে, অন্যদিক দিয়ে বল নিয়ে যাওয়াতে তার জুড়ি মেলা ভার। প্রতিপক্ষের কতো ডিফেন্ডারকে যে তিনি ফাঁকি দিয়েছেন এই কায়দায় তার ইয়ত্তা নেই।

১৯৫৮ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালে সুইডেন যখন ইতোমধ্যে ব্রাজিল থেকে ১০ গোলে এগিয়ে তখন ব্রাজিলের ঘুরে দাঁড়ানোর মূল কৃতিত্বটাই ছিল তার। প্রথম গোলটি শোধ হয় খুব দ্রুতই। প্রথমার্ধের কিছুক্ষণ আগে দ্বিতীয় গোলটি করে ব্রাজিল এগিয়ে যায়। পরপর দুবার দুটি গোলের জন্যই রাইট উইং ভাভাকে বল বানিয়ে দেয়ার অসাধারণ কাজটি তিনি করেন। ১৯৬২এর বিশ্বকাপে পেলে আঘাতজনিত সমস্যায় যখন ভুগছেন তখন গ্যারিঞ্চা পুনরায় ত্রাতা হিসেবে আবির্ভূত হন। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে দুটো গোল করেন কোয়ার্টার ফাইনালে এবং সেমিফাইনালে আয়োজনকারী চিলির বিপক্ষে দুটো গোল করে ‘সোনার জুতা’ লাভ করেন। আর এর মধ্যদিয়ে ব্রাজিল টানা দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ শিরোপা জয় করে।

জোহান ক্রোয়্যাফ : পুরো নাম হ্যান্ড্রিক জোহেনস ক্রাইএফ। ক্রোয়্যাফ নামেই বেশি পরিচিত। ১৯৭৪ সালের বিশ্বকাপ ঘরে নিতে না পারলেও সে সময়কার সেরা দলগুলোর অন্যতম ছিল হল্যান্ড। সে হল্যান্ডের তুলনা করা চলে ১৯৫৪ সালের হাঙ্গেরি এবং ১৯৮২ সালের ব্রাজিলের সঙ্গে। পূর্ণ অর্থে ফুটবল বা টোটাল ফুটবল খেলা যাকে বলে সেই নৈপুন্য ছিল হল্যান্ডের। যেমনি তার জটিল পাস তেমনি তার প্রতিপক্ষকে হতভম্ব করার সুচতুর গতি, সব মিলিয়ে অসাধারণ এবং সবার নজরকাড়া জোহান ক্রোয়্যাফ ছিলেন হল্যান্ডের সেই আবিষ্কারের মধ্যমণি। চোখ ধাঁধানো দক্ষতা তিনি রপ্ত করছিলেন। আবিষ্কার করেছিলেন নিজস্ব ধরন ‘ক্রোয়্যাফ টার্ন।’ নিজস্ব কৌশল কিংবা আঙুলের নখ দিয়ে আলতো আঘাতে বল মারার দক্ষতা যে কোনোটিই তার বল দেয়ানেয়ার মৌলিক ধরন, গতি, নান্দনিক সমাপ্তিকে ছাড়িয়ে যেতে পারেনি। তিন তিনবার তিনি ব্যালেন ডিওর (দ্যা গোল্ডেন বল) লাভ করেন। আসরে অসাধারণ তিনটি গোল করেন। সেই আসরেই একবার আর্জেন্টিনাকে এবং দ্বিতীয়বার উড়ন্ত বলকে মাটিতে পড়তে না দিয়ে ব্রাজিলের বিপক্ষে গোল করে তাদের প্রতিযোগিতা থেকে ছিটকে যেতে বাধ্য করেন হল্যান্ডের এই তারকা।

রোনালদো লুই ন্যাজেরিও দে লিমা : ১৯ খেলায় ১৫ গোল। বিশ্বকাপের শোভা বর্ধনকারী সবচেয়ে বেশি গোলদাতাদের তালিকায় শীর্ষস্থান দখল করে আছেন ব্রাজিলিয়ান এই স্ট্রাইকার। তাকে বলা যায় পরিপূর্ণ একজন স্ট্রাইকার যিনি তার অভিজাতসুলভ স্বাচ্ছন্দ্যময় গতি, শক্তি, চলাফেরা, পাএর ওপর বলকে অবিরত নাচানো এবং নান্দনিক পরিসমাপ্তির কারণে বিখ্যাত। ১৯৯৮ সালে যখন তার বয়স মাত্র ২১ তখন চার চারটি গোল করে ব্রাজিলকে ফাইনালে পৌছে দেন। কিন্তু ফাইনালের আগের দিন তিনি আঘাতজনিত বিরক্তিকর যন্ত্রণায় ভুগছিলেন। যদিও তিনি ফাইনালে খেলেছিলেন কিন্তু চোখ ধাঁধানো কারিশমা আর উপহার দিতে পারেননি সেদিনকার ফাইনালে। ব্রাজিল ৩০ গোলের ব্যবধানে ফ্রান্সের কাছে হার মানে। এই শূন্যতা পূরণে রোনালদোর চারটি বছর লাগে। চার বছর পর তিনি ফিফা বিশ্বকাপ আসরে ফাইনালের দুটিসহ মোট আটটি গোল করেন, ‘সোনার জুতা’ লাভ করেন এবং জার্মানিকে ২০ গোলে হারিয়ে ব্রাজিলের ঘরে শিরোপা জেতানোয় অগ্রসৈনিক হিসেবে ভূমিকা পালন করেন। ২০০৬ সালে আগের সেই ধারাবাহিকতায় কিছুটা ছেদ পড়ে। স্বাভাবিকের তুলনায় ওজন একটু বেড়ে যায় এবং বেমানান হয়ে যান। যদিও সেই আসরে দুটি গোল করে বিশ্বকাপ ইতিহাসে গোল তালিকায় শীর্ষ স্থান অধিকারী অগ্রজ জার্মানির গার্ড ম্যুলারের রেকর্ড ভেঙে ফেলেন তিনি। কিন্তু প্রতিযোগিতায় ব্রাজিলকে বেশি দূর নিয়ে যেতে পারেননি। কোয়ার্টার ফাইনালে ফ্রান্সের কাছে হেরে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিতে হয় তার দলকে।

গার্ড ম্যুলার : প্রতি খেলায় গড়ে একটি করে গোল দেয়ার অসামান্য কৃতিত্ব যার দখলে তিনি হচ্ছেন ৫ ফুট ৯.৫ ইঞ্চি উচ্চতার উচ্চমানের এই স্ট্রাইকার। অতি উচ্চ এই আসন নিয়ে গার্ড ম্যূলার অনন্য ছিলেন তার জায়গায়। অসাধারণ ক্ষিপ্রতার সঙ্গে বিপক্ষ দলের প্রাচীর ভেঙে ঢুকে পড়তে পারতেন যখন তখন। প্রতিপক্ষ খেলোয়াড়রা বুঝতেই পারতেন না কখন এই ছোটখাট মানুষটি তাদের মধ্যে এসে জায়গা দখল করে নিয়েছেন ভূতের মতো। অল্প একটু জায়গার মধ্যে এতো দ্রুত বল নিয়ে ঘুরতে পারতেন যা রীতিমতো বিস্ময়কর। ‘সময়মতো ঠিক জায়গায়’ পৌছানোর দক্ষতা তাকে একটি ভিন্ন উচ্চতায় নিয়ে গেছে।

কী জাতীয়, কী আন্তর্জাতিক ফুটবল অঙ্গনে জার্মান ফুটবলারদের মধ্যে কেউ তার রেকর্ড ছুতে পারেনি। ৬২টি আন্তর্জাতিক খেলায় ৬৮ গোল যার মধ্যে ১৪টি করেছেন বিশ্বকাপে। ১৯৭০ সালে ১০টি গোল করে সোনার জুতা ছিনিয়ে নেন। যার মধ্যে ছিল বুলগেরিয়া এবং পেরুর বিরুদ্ধে হ্যাটট্রিক। একটি মহাকাব্যিক খেলায় ইতালিকে ৪৩ গোলের ব্যবধানে পরাজিত করে পশ্চিম জার্মানিকে ১৯৭০এর বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে নিয়ে যান তিনি। তিনি একাই করেন দুটো গোল, তাও আবার অতিরিক্ত সময়ে। ১৯৭৪এ জার্মানি বিশ্বকাপ ঘরে তুলতে পেরেছে যে মূল খেলোয়াড়ের জন্য তিনি হচ্ছেন আসরে ৪টি গোল করা (ফাইনালসহ) এই মাস্টারপিস মানুষটি, গারহার্ড গার্ড ম্যূলার।

মিশেল প্লাতিনি : আন্তর্জাতিক ফুটবল ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলদাতাদের তালিকায় যে কয়জন শীর্ষে অবস্থান করছেন তাদের মধ্যে প্লাতিনি অন্যতম। ৭২টি আন্তর্জাতিক ম্যাচে তার দেয়া গোলের সংখ্যা ৪১। যদিও তিনি দলকে বিশ্বকাপ পাইয়ে দিতে পারেননি তথাপি ফ্রান্সের সর্বশ্রেষ্ঠ ফুটবলার হিসেবে মানুষ তাকে জানান। ১৯৮২তে উত্তেজনাপূর্ণ সেমিফাইনালে পশ্চিম জার্মানির সঙ্গে ৩৩ গোলে সমতা আনার ক্ষেত্রে প্লাতিনির ভূমিকা অনস্বীকার্য। প্রথম গোলটি তিনিই করেন।

দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে প্লাতিনি পরিবর্তিত খেলোয়াড় প্যাট্রিক বাতিস্তাকে লম্বা চমৎকার একটি থ্রো পাস করেন। পশ্চিম জার্মানির গোলরক্ষক হেরাল্ড শুমেখার দিগি¦দিক জ্ঞানশূন্য হয়ে অশোভনভাবে বলটি ছোয়ার আগেই বাতিস্তাকে ধাক্কা দেয়। পেনাল্টি পাওয়ার কথা থাকলেও রেফারি তা দেননি। পরবর্তীতে অতিরিক্ত সময়ে উভয়দলই দুটো করে গোল করে। ১৯৮৬এর বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে আবার গোলের দেখা পান। এবারের প্রতিপক্ষ ব্রাজিল। ১১ গোলে খেলা ড্র হয়। কিন্তু দুর্ভাগ্য তাকে পেছন থেকে টেনে ধরে। পেনাল্টি শুটে তিনি জালে বল ঢোকাতে ব্যর্থ হন। তার বর্ণাঢ্য বিশ্বকাপ জীবনের দুর্ভাগ্যজনক পরিসমাপ্তি ঘটে।

লেভ ইভানোভিচ ইয়াশিন : আন্তর্জাতিক অঙ্গনে রাশিয়ার প্রথমদিককার ফুটবল তারকা। আপাদমস্তক কালো পোশাকের কারণে ‘ব্ল্যাক স্পাইডার’ নামে পরিচিত ইয়াশিন বিখ্যাত, গোলরক্ষক হিসেবে তার চৌকষ ভূমিকার কারণে। গোলরক্ষকরা সাধারণত খুব বেশি স্বীকৃতি পান না। কিন্তু ইয়াশিন সে ধারা ভেঙে ১৯৬৩ সালে ব্যালেন ডিওর পুরস্কার লাভ করেন তার অতুলনীয় দক্ষতার জন্য। তিনি এমন একজন গোলরক্ষক যে কী না তার নির্ধারিত সীমানা ছেড়ে বল প্রতিপক্ষের সীমানায় ফেলতে অহরহই বাইরে চলে আসতেন। বিপক্ষ দলের খেলোয়াড়রা তাকে নিয়ে বড় বেশি আতংকে সময় কাটাতো। কারণ প্রতিপক্ষকে হতচকিত করে দিতে তার জুড়ি মেলা ভার। তিনটি বিশ্বকাপে তিনি অংশগ্রহণ করেন। ১৯৫৮ এবং ১৯৬২এর বিশ্বকাপে রাশিয়া কোয়ার্টার ফাইনালের মুখ দেখে তার ওপর ভরসা করে এবং ১৯৬৬-’র বিশ্বকাপে সেমিফাইনাল পর্যন্ত উতরে যায় তার দুর্ভেদ্য দেয়ালের কারণে।

ববি মুর : রবার্ট ফ্রেডরিক চেলসিয়া ‘ববি’ মুর। ইংল্যান্ডের কিংবদন্তিতুল্য সেন্টার ব্যাক এবং অধিনায়ক। ১৯৬৬এর বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের তুরুপের তাস। তুলনায় কম জনপ্রিয় জ্যাক চার্লটনকে নিয়ে গড়ে তোলেন ইংল্যান্ডের দুর্ভেদ্য প্রাচীর। ইংল্যান্ডের অসহায় মুহূর্তের কান্ডারি মুর সময় সময় ফরওয়ার্ড হয়ে যেতেন। ১৯৬৬এর বিশ্বকাপ ফাইনালে পশ্চিম জার্মানির বিপক্ষে জিওফ হার্টস যে সমতাসূচক গোলটি করেন সে বলটি দ্রুততার সঙ্গে তৈরি করে দেয়ার ক্ষেত্রে মুখ্য ভূমিকা পালন করেন তিনি।

গর্ডন ব্যাঙ্কস : পেলে ১৯৭০এর বিশ্বকাপে চারটি গোল করেন। কিন্তু বিপরীতে তিনটি সুযোগ হাতছাড়া হয়ে যায়। যেগুলো পেলের জীবনে একটি দীর্ঘস্থায়ী যন্ত্রণার দাগ রেখে যায়। প্রথমটি গোল লাইন অতিক্রম করার আগ মুহূর্তে ফিরিয়ে দেয়া হয়। দ্বিতীয়টি সামান্য দূরত্বের শূন্যতা পূরণ করে। তৃতীয়টি যেটির জন্যই মূলত ব্রিটিশ ব্যাঙ্কস স্মরণীয় হয়ে থাকবেন অসাধারণ ক্ষিপ্রতায় পেলের শর্ট ফিরিয়ে দিয়ে শতবর্ষের সেরা প্রতিরোধএর খেতাবটি অর্জন করেন।

রাইট উইঙ্গার জেয়ারঝিনহো ইংল্যান্ডের পেনাল্টি সীমানার ওপর দিয়ে বলটি পেলের কাছে আড়াআড়িভাবে পৌছে দেন। ব্যাঙ্কস ছিলেন গোলবারের বা সীমানা ঘেষে। গোলবারের ডান পাশ অরক্ষিত। পেলে চাইলেন সেদিক দিয়েই বলটি জালে ঢুকিয়ে দেবেন। প্রাপ্ত বলটি নিচু করে হেড করলেন। সবাই দেখল, ডান পাশ ফাকা এবং গোল অবধারিত। পেলেও নিশ্চিত গোল। তিনি ঘুরে উল্লাসে চিৎকার করতে গিয়েও থেমে গেলেন। বিধিবাম। সেকেন্ডের এক দশমাংশ সময়ে অসাধারণ দৃষ্টিনন্দন ক্ষিপ্রতায় বা পাশ থেকে অসম্ভব এক ঝাপ দিলেন ডান পাশে। মনে হলো অদৃশ্য কোনো ভৌতিক হাতের আঘাত লেগে বলটি গোল পোস্টের সীমানার বাইরে চলে গেল। সবাই স্তম্ভিত হয়ে তাকিয়ে রইলেন চলে যাওয়া বলটির দিকে। সেই সঙ্গে গোল রক্ষার ইতিহাসে ব্যাঙ্কসের নামটি লেখা হয়ে গেল।

১৯৬৬তে ইংল্যান্ডের শিরোপা অর্জনের পেছনে যার ভূমিকা সর্বাধিক সেই ব্যাঙ্কস হলেন তার সময়ের সেরা গোলরক্ষক। ছয় ফুটের বেশি লম্বা এই মানুষটি শুধু গোলরক্ষক হিসেবেই বিশেষ নন। তিনি তার চটপটে চৌকষভাবের জন্যই বিশেষভাবে পরিচিত। এছাড়া অন্যদের চাইতে তিনি বিশেষ আরো একটি কারণে, তাহলো স্ট্রাইকারের মনের ভাষা তিনি বুঝতে পারতেন। স্ট্্রাইকার কখন, কোথায়, কীভাবে বলটি চাইছেন তা খুব সহজেই তিনি পড়ে ফেলতে পারতেন এবং সেই অনুযায়ী বল ছুড়ে দিতেন বা নিতেন।

ইউসেবিও দ্য সিলভা ফেরেইরা : আফ্রিকার প্রথম ফুটবল তারকা। মোজাম্বিকে জন্ম, পরবর্তীতে পর্তুগিজ উপনিবেশে বেড়ে ওঠা এবং পর্তুগালের হয়ে বহু কৃতিত্ব অর্জন করেছেন। এই কালো মানিকের চটপটে ভাব, ক্ষিপ্রতার সঙ্গে উল্টোদিকে ঘোরার দক্ষতা (যার কারণে ব্ল্যাক প্যান্থার বলেও তাকে ডাকা হতো) ইত্যাদি স্বভাবজাত এবং এসব কারণে তিনি অন্যদের থেকে একটু আলাদা। ব্যালেন ডিওর পাওয়া এবং বেনিফিকার হয়ে ইউরোপিয়ান কাপ জেতার কারণে ১৯৬৬ সালের বিশ্বকাপের আগে থেকেই তিনি সুপারস্টার।

বিশ্বকাপে সব মিলিয়ে ৯টি গোল করে সোনার জুতা লাভ করেন ইউসেবিও। যার মধ্যে ৪টি উত্তর কোরিয়ার বিপক্ষে, পর্তুগাল জেতে ৫৩ ব্যবধানে। প্রথমে ৩০ গোলে এগিয়ে ছিল উত্তর কোরিয়া। সেখানে থেকে একাই ৪ গোল করে দলকে টেনে নিয়ে যান সেমিফাইনালে। সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ৮৩ মিনিটের মাথায় ১টি গোল করেন ইউসেবিও। তা সত্ত্বেও পর্তুগাল হেরে যায় ২১ গোলের ব্যবধানে। মাঠে নবি স্টাইলসের সার্বক্ষণিক পাহারার কারণে খুব একটা সুবিধা করে উঠতে পারেননি সেই ম্যাচটিতে।

জিনেদিন জিদান : দুই বিশ্বকাপ ফাইনালে তিন গোল এবং ২০০২এর চ্যাম্পিয়ন্স লীগ ফাইনালে দৃষ্টিনন্দন ভলির একটি গোল জিদানকে নিয়ে যায় অন্য এক উচ্চতায়। গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচগুলোতে ফ্রান্সের হালে পানি পেতে জিদানের কোনো বিকল্প ছিল না। ১৯৯৮ বিশ্বকাপে প্রথম অংশগ্রহণ করে গ্রুপের দ্বিতীয় ম্যাচে লাল কার্ড পেয়ে মাঠ থেকে বহিস্কৃত হন। পরবর্তী ম্যাচে ফেরেন আবার ভালোভাবেই। ফাইনালে ব্রাজিলের বিরুদ্ধে ২টি গোল করেন কর্নার থেকে পাওয়া বলকে টাক মাথা দিয়ে ছুয়ে। ২০০২এর বিশ্বকাপের দুটো ম্যাচ তিনি খেলতে পারেননি উরুর আঘাতের কারণে যার কারণে ফ্রান্সও এই দুই ম্যাচে গোলের দেখা পায়নি এই তালিসমানকে ছাড়া। কিন্তু ২০০৬ বিশ্বকাপে তিনি আবার আবির্ভূত হন স্বমূর্তিতে।

এই ফ্রান্স দলপতি গোল্ডেন বল পুরস্কার লাভ করেন তার দৃষ্টিনন্দন ক্রীড়াশৈলীর জন্য। নিজ দলের সতীর্থদেরসহ দর্শকদের পামাথা দুটো দিয়েই ভোলাতেন এবং দোলাতেনও বটে। দ্বিতীয় রাউন্ডে তিনি স্পেনের বিরুদ্ধে গোল করেন। কোয়ার্টার ফাইনালে প্রিয় বিপক্ষ দল ব্রাজিলের বিরুদ্ধে থিয়েরি হেনরির করা একমাত্র গোলের কারণে ফ্রান্স পরবর্তী ধাপে পৌছে যায়, যে বলটি ফ্রি কিকের মাধ্যমে তিনি বানিয়ে দেন হেনরিকে। পরের খেলায় পর্তুগাল আসর থেকে বিদায় নেয় জিদানের পেনাল্টি গোলের কারণে। ফাইনাল ম্যাচের প্রথমার্ধে ইতালির বিরুদ্ধে ফ্রান্স এগিয়ে ছিল তার করা গোলের বদৌলতে। যদিও দ্রুতই ইতালি গোল দিয়ে সমতা আনে। কিন্তু ইতালির মার্কো ম্যাটারাজ্জিকে মাথা দিয়ে গুতো দেয়ার কারণে লাল কার্ড পেয়ে বহিস্কৃত হন মাঠ থেকে। পেনাল্টিতে ইতালি ৫৩ ব্যবধানে হারায় ফ্রান্সকে, ফ্রান্স হারায় তার মূল্যবান সম্পদ জিদানকে। বর্ণাঢ্য খেলোয়াড়ি জীবনের ইতি টানেন জিনেদিন ইয়াজিদ জিদান।।

(চলবে…)