Home » প্রচ্ছদ কথা » আসুন প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতিগুলো ভুলে যাই

আসুন প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতিগুলো ভুলে যাই

শাহাদত হোসেন বাচ্চু

coverমুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী বাংলাদেশে ক্ষমতাসীন দলের দুর্নীতি, লুটপাট আর অনিয়ম মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানীকে এতটাই ক্ষুব্দ করে তুলেছিল যে, তিনি তৎকালীন আওয়ামী লীগের নামকরন করেছিলেন “নিখিল বাংলা লুটপাট সমিতি”। স্বাধীনতাত্তোর কালে ক্ষমতাসীন দলের একশ্রেনীর নেতাকর্মী মেতে উঠেছিল বেপরোয়া লুন্ঠন ও দুর্নীতিতে। পরিনামে দলীয় প্রধান ও তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবর রহমান আক্ষেপ করে বলেছিলেন, আমার চারপাশে চোরের দল, চাটার দল। রিলিফ চুরির ঘটনায় ক্ষুব্ধ শেখ মুজিব বলেছিলেন, আমার কম্বলটি কোথায়? এসবই ইতিহাস হয়ে থাকতে পারতো যদি না রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুন্ঠনের ক্ষেত্রে গত প্রায় চল্লিশ বছর সামরিক বেসামরিক অথবা গনতান্ত্রিক লেবাসে দলগুলি একের সাথে অপরে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়ে সমস্ত সীমা অতিক্রম না করতো। সম্প্রতি মুন্সিগঞ্জে এক জনসভায় বিএনপি নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া মওলানা ভাসানীর বিখ্যাত ঐ খেদোক্তি স্মরণ করিয়ে দিয়ে বর্তমান আওয়ামী লীগকে তিনিও নিখিল বাংলা লুটপাট সমিতি নামে ডাকার জন্য সকলকে আহবান জানিয়েছেন। বেগম খালেদা জিয়ার এই আহবানের সাথে গোটা দেশের জনগন দলমত নির্বিশেষে একমত হতেই পারেন। সন্দেহ নেই, ২০০৮ সাল থেকে দুই মেয়াদে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের কতিপয় মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও নেতৃবৃন্দ রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুন্ঠন ও দুর্নীতির ক্ষেত্রে অতীতের সকল রেকর্ড অক্ষুন্ন রেখেছেন। এটি অব্যাহত রাখতে তারা এখন নিজেরাই নিজেদের প্রতিপক্ষ।

কিন্তু বেগম খালেদা জিয়া, যিনি তিন মেয়াদে বাংলাদেশের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী, তিনি যখন মওলানা ভাসানীর ঐতিহাসিক খেদোক্তি উদ্বৃত করেন, তখন তিনি কি নিজের সময়ে তাঁর পুত্রের বিখ্যাত হাওয়া ভবন, বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগ এবং দলীয় নেতাকর্মীদের দুর্নীতি, রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুন্ঠন, মাগুরা মডেলের নির্বাচন এবং ’৯৬’র ফেব্র“য়ারির একক নির্বাচনের বিষয়টি কিভাবে দেখেন, এটিও জনগনের কাছে একটি মস্ত প্রশ্ন? তার সৌভাগ্য মওলানা ভাসানীর জীবদ্দশায় তার দলের জন্ম হয়নি। মওলানা বিএনপির একশ্রেনীর নেতাকর্মীদের দুর্নীতি ও লুন্ঠন প্রত্যক্ষ করেননি। এটি দেখলে তিনি আরেকটি নতুন নামকরন করতে পারতেন এবং সম্ভবত: সেটি আগেরটির সাথে মিলিয়ে “বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদী লুটপাট সমিতি”। কারন আমরা তো জানি ব্রিটিশভারত থেকে শুরু করে পাকিস্তান ও বাংলাদেশ আমলে শাসকশোষকদের বিরুদ্ধে সত্য ভাষণ উচ্চারনে মওলানা ভাসানী অন্তত: কখনও পেছপা হননি। দুর্নীতি ও লুন্ঠনের ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির দুর্নীতিবাজদের একটি অদ্ভুত সাদৃশ্য রয়েছে। আর তা হচ্ছে, জনগনের অর্থ লুন্ঠন করে একে অপরের ঘাড়ে দায় চাপিয়ে দেয়া এবং মামলামোকদ্দমা হলে সেটিকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত বলে বর্ননা করা।

/১১ এর সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে আমাদের হাই প্রোফাইল নেতৃত্বের দুর্নীতির বিষয়গুলি বেরিয়ে আসতে শুরু করলে জনগন স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু ঐ সরকারের রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ এবং একশ্রেনীর কর্মকর্তাদের অর্থলিপ্সুতা, সর্বোপরি এ ধরনের ঘটনায় তদন্ত পরিচালনার ক্ষেত্রে অদক্ষতা বিশাল সব দুর্নীতির বিষয়কে বিচারের জায়গায় পৌঁছোতে ব্যর্থ হয়। ২০০৮ সালে ক্ষমতাসীন হবার পরে আওয়ামী লীগ তার দলীয় নেতাদের মামলাগুলি প্রত্যাহার করে নেয়। অন্যদিকে, বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া ও অন্যান্যদের মামলাগুলি এখন বিচারাধীন। যদি ২০০৮ সালে বিএনপি ক্ষমতাসীন হতো তাহলে চিত্রটি একই রকম হতো, তাদের মামলা প্রত্যাহার করে নেয়া হতো এবং আওয়ামী লীগের মামলাগুলি চালু থাকতো। আজকে মামলাগুলিকে বিএনপি যতোটাই রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত বলুক না কেন, এগুলি দায়ের হয়েছিল সেই সরকারের আমলে, যারা নাকি দুই নেত্রীর মাইনাস থিওরিতে বিশ্বাস করতো। একই উদ্দেশ্যে তারা আওয়ামী লীগ নেত্রী ও অন্যান্য নেতাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছিল। দুর্নীতির মুলোৎপাটন করার বদলে এখানে অন্য উদ্দেশ্য কাজ করার কারনে গোটা অভিযানটিই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে, যে সুযোগটি নিয়ে নেয় দুর্নীতিবাজরা এবং রাজনৈতিক রঙ চড়িয়ে দেয়।

২০০৮ সালে ২৯ ডিসেম্বর আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট তিনচতুর্থাংশ আসনে জয়লাভ করার পরে ৩১ ডিসেম্বর বাংলাদেশচীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে দেয়া শেখ হাসিনার ভাষণটি আমরা মনে করতে পারি। সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেছিলেন, “আমরা প্রতিহিংসার রাজনীতিতে বিশ্বাস করি না,….. দেশে একটি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি উপহার দিতে চাই। আমাদের অনেকেই বিএনপিজামায়াতের প্রতিহিংসার রাজনীতির শিকার হয়েছি, সর্বস্ব হারিয়েছি, কিন্তু যেহেতু আমরা জয়লাভ করেছি, আমাদের ক্ষমা করে দিতে হবে,…. এই বিশাল জয় তখনই সার্থক হবে যখন আইনের শাসন, মানবাধিকার ও সুশাসন নিশ্চিত করা যাবে এবং কষ্টার্জিত স্বাধীনতার চেতনা বাস্তবায়িত করা যাবে”। এক বিদেশী সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা বলেছিলেন, “আমি দুর্নীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করব, কারন এটা আমার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি। আমি জনগনের অধিকার প্রতিষ্ঠায় অঙ্গীকারাবদ্ধ”। ২০১৪ সালের মধ্যভাগে এসে ছয় বছর আগে দেয়া এরকম ভাষণ এবং নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির এত সুবচন কতোটা বাস্তবায়িত হয়েছে এই নিবন্ধে সেটি এখন আর আলোচনার অপেক্ষা করছে না।

আওয়ামী লীগ শাসনের দ্বিতিয় মেয়াদে ছয় বছর পরে গত ৩১ মে সংবাদ সম্মেলনে সাম্প্রতিক ঘটনা প্রবাহ নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর অনেকগুলি মন্তব্য গোটা জাতিকে লাজওয়াব করে দিয়েছে। একজন রাষ্ট্রনায়ক, রাজনীতিবিদ, তিনতিনবারের প্রধানমন্ত্রী ঐ সংবাদ সম্মেলনে বিভিন্ন প্রসঙ্গে যা যা বলেছেন সেগুলি স্মরণ করলে বার বার, পূনর্বার হতভম্ব হয়ে যেতে হয়। আমরা কি তাঁর সাথে একমত হবো, তাঁর বক্তব্য মেনে নিয়ে জয়জয়কার করবো! তাঁর কাছ থেকে আমাদের জানতে হচ্ছে, “ মায়ের গহনা বানালেও স্বর্নকার সেখান থেকে একটু সোনা চুরি করে। বিদেশী বন্ধুদের দেওয়া ক্রেষ্টে কতটুকু সোনা ছিল সেটি বড় কথা নয়।….এটা নিয়ে হৈ চৈ করে সম্মান খোয়াবেন না। নিজেদেরকে চোর হিসেবে সাব্যস্ত করবেন না”। আসুন আমরা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সাথে গলা মেলাই, আমরা নিজেদেরকে চোর হিসেবে সাব্যস্ত করবো না, হৈ চৈ করবো না। কারন তাতে আমাদের মানসম্মান চলে যেতে পারে! আমরা এও ভুলে যাব ২০০৮ সালে এই প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, “আমরা দুর্নীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করব, কারণ এটা আমার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি”এ বাক্যটিও আমরা ভুলে যাব! আমরা নিশ্চয়ই মনে করব না, প্রধানমন্ত্রীর এ বক্তব্য দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেয়ার সামিল এবং দুর্নীতিবাজদের উৎসাহিত ও একপ্রকার দায়মুক্তি প্রদান করা!

সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী যে ফরমালিন তত্ত্ব হাজির করেছেন তাতে ফরমালিন ব্যবহারকারী অসাধু ব্যবসায়ীরা উদ্বুদ্ব হবেন, উজ্জীবিত হবেন বলে আশা করা যায়! যদিও তিনি রূপক অর্থে এটি ব্যবহার করেছেন, তারপরেও বলতে হবে দল হিসেবে শুধু বিএনপিতে পচন ধরেছে তা নয়, নিজের দলের দিকে তাকালে দেখবেন কিভাবে সর্বাঙ্গে পচন ছড়াচ্ছে! এই সর্বগ্রাসী পচনের কারনে তার দলের অর্ন্তকোন্দল তৃনমূল থেকে ছড়িয়ে পড়ছে মন্ত্রীসংসদ সদস্য পর্যন্ত। দলের মধ্যে গজিয়ে ওঠা ক্ষুদে মাফিয়া প্রধানরা গুম, খুন, দখলবাজি, টেন্ডারবাজি,চাঁদবাজির সাথে নিজেদের নাম সুপ্রতিষ্ঠিত করে তাঁর সরকারের সকল অর্জন পচিয়ে নষ্ট করে দিচ্ছে সেখানে তিনি ফরমালিনের বিকল্প হিসেবে কি ভাবছেন? অবশ্য এসব প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বরাবরের মত তাঁর বক্তব্যে অনড়। তিনি মনে করেন, বিএনপিজামায়াত, জাতীয় পার্টি থেকে তাঁর দলে যোগ দিয়ে অনুপ্রবেশকারীরা এসব ঘটনা ঘটাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর কাছে একটি সবিনয় প্রশ্ন ঃ শামীম ওসমান, জয়নাল হাজারি ও তার একসময়ের বডিগার্ড নিজাম হাজারি, লক্ষ্মীপুরের আবু তাহেরতারা কি আওয়ামী লীগে অনুপ্রবেশকারী? অথবা দলীয় নামধারী কথিত অনুপ্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে কখনো ব্যবস্থা নেয়া হয়না কেন? বিভিন্ন দল থেকে অনুপ্রবেশ করে বছরের পর বছর ধরে কার ছত্রছায়ায় তারা ভয়ংকর সব অপরাধ করে নিরাপদ থাকছে? অবশ্য প্রধানমন্ত্রীসহ সরকারের সবার মুখ থেকে শোনা একটি বাক্য গোটা জাতির মুখস্ত হযে গেছে এদের কাউকেই ছাড় দেয়া হবে না!

প্রধানমন্ত্রীর এসকল বক্তব্য দেশে রাজনীতি ও সরকার ব্যবস্থায় আরো কত নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে তা এখনি বলা না গেলেও তাদের মনোজমিনে লালিত বিশ্বাস ভয়াবহ পরিনতি ডেকে আনতে পারে। প্রধান প্রতিপক্ষ বিএনপি সংসদীয় ব্যবস্থার বাইরে থাকায় ক্ষমতাসীন দলটির অগনতান্ত্রিক ও আইন বহির্ভূত আচরন জনগনের সামনে তুলে ধরার কেউ নেই। অর্š—কোন্দলে ক্ষতিগ্রস্থ বিএনপির এই মুহুর্তে সাংগঠনিক শক্তির ঘাটতি থাকায় তারা ক্ষমতাসীনদের আরো পচে যাওয়ার অপেক্ষা করছে! এ কারণে সরকারি দলের একশ্রেনীর নেতা কর্মীরা আরো বেপরোয়া হয়ে উঠছে এবং নিজেরা খুনোখুনিতে লিপ্ত হয়েছে। ক্ষমতার এককেন্দ্রীকরণে প্রধানমন্ত্রী এই সত্যটি বুঝতে পারলে সংবাদ সম্মেলনে জাতি তার কাছ একটি দিক নির্দেশনামূলক বক্তব্য পেত, যা তাদেরকে কিছুটা হলেও আশ্বস্ত করতে পারত। তিনি নিশ্চয়ই জানেন, আইনী পোষাক পরে বা আইনসভার পদ নিয়ে গুমখুন, রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুন্ঠনে লিপ্ত হলে এবং তাদের পক্ষে কোনরকম সাফাই গাইলে, আশ্রয়প্রশ্রয় দিলে গনতন্ত্রসুশাসনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানো হয়। শাসনব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়ে। মহামারির মত কুশাসন ছড়িয়ে পড়ে। আর সেই মহামারিই রাষ্ট্রের শাসন স্তম্ভে পচন ধরায়। এই পচন ছড়িয়ে পড়ে সব জায়গায়। দেবালয়ও রক্ষা পায় না। দায়িত্বহীন ক্ষমতা হয়ে দাঁড়ায় নিজেদের বিলোপের কারণ।

পাদটীকাঃ এই নিবন্ধটির একটি পাদটীকা থাকা প্রয়োজন। সম্প্রতি দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) একজন কমিশনার একটি অনুষ্ঠানে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) মুখোশ খুলে দেয়ার হুমকি দিয়েছেন। আমরা তো দুদকের সাবেক চেয়ারম্যান গোলাম রহমানের ভাষ্যে জানি, দুদক একটি নখদন্তহীন প্রতিষ্ঠান। তাহলে কি দুদক বর্তমানে নখদন্ত ফিরে পেয়েছে? আমরা আমজনতা কি আশাবাদী হতে পারি যে, দুদক এবার দুর্নীতিবাজদের মুখোশ উন্মেচন করে রাঘববোয়ালদের বিচারের আওতায় নিয়ে আসবে? তাহলে টিআইবির বিরুদ্ধে হুমকিধামকি কেন? তাদের পক্ষে সাফাই গাইছি না। তারা নিশ্চয়ই জবাবদিহিতার উর্ধে নয়, যেমনটি নয় দুদকও। দুদকের ব্যর্থতার বড় সমালোচক হিসেবে টিআইবির বিরুদ্ধে এই হুমকি না দিয়ে, যদি সকল দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে হুমকি ও কার্যক্রম অব্যাহত থাকত তাহলে জনগন কিঞ্চিত স্বস্তি পেতে পারত।।