Home » অর্থনীতি » দুই ভারত দুই বাংলাদেশ (পর্ব – ২)

দুই ভারত দুই বাংলাদেশ (পর্ব – ২)

ভিন্ন রাষ্ট্র :: অভিন্ন যাত্রা

আনু মুহাম্মদ

last 3ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিদায়ের পর এই উপমহাদেশে দীর্ঘস্থায়ী সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ এবং দেশত্যাগের রক্তাক্ত অধ্যায় তৈরি করে ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটো রাষ্ট্রের উদ্ভব ঘটে। এভাবে দেশভাগের পরিপ্রেক্ষিত, দায়ী রাজনীতি ও মানবিক বিপর্যয় নিয়ে অসংখ্য লেখা, গান চলচ্চিত্র তৈরি হয়েছে। বিতর্ক এখনও চলছে। আর এখনও এর বোঝা টানছে এই অঞ্চলের মানুষ। ‘স্বাধীনতা’ অর্জনের পর ভারত সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে সক্ষম হলেও পাকিস্তান প্রথম থেকেই শাসন সংকটে পতিত হয় এবং অচিরেই সামরিক শাসনের কবলে পড়ে।

১৯৭১ সালে সশস্ত্র যুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ স্বতন্ত্র রাষ্ট্র হিসেবে আবির্ভূত হলেও ৩ বছরের মাথায় আবার সামরিক শাসনে আটকে যায়। ৭০ দশকের শুরুতে বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তান সমাজতন্ত্র, রাষ্ট্রীয়করণ, গরীবী হঠাও ইত্যাদি শ্লোগান দ্বারা ভারাক্রান্ত ছিল। তিন দেশেই এই সময়ে নেতৃত্ব দেন স্ব স্ব দেশের সবচাইতে জনপ্রিয় তিন নেতা, শেখ মুজিব, ইন্দিরা গান্ধী এবং জুলফিকার আলী ভুট্টো। সোভিয়েত ইউনিয়নের অধনবাদী বিকাশ তত্ত্ব দ্বারা সমর্থিত হয়ে অনেক জনতুষ্টিমূলক কথা উচ্চারণ করলেও, ঘোষিত লক্ষ্য ও রাজনীতির বৈপরীত্যের কারণে, এদের ব্যর্থতা ছিলো অনিবার্য এবং করুণ। ১৯৭৫ সালে বাংলাদেশে একদলীয় শাসন চালু হয়, ১৯৭৭ সালে ভারতে জরুরী অবস্থা জারী হয়। তিন নেতাই কয়েকবছরের ব্যবধানে নিহত হন। শেখ মুজিব ও ভুট্টোর নিহত হবার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ ও পাকিস্তান দীর্ঘমেয়াদী সামরিক শাসনে প্রবেশ করে।

৮০ দশকে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ এর কাঠামোগত সমন্বয় কর্মসূচি বাস্তবায়নে বাংলাদেশে জেনারেল এরশাদ ও পাকিস্তানে জেনারেল জিয়াউল হকের নেতৃত্বে সামরিক শাসন খুবই কার্যকর ভূমিকা পালন করে। দুদেশেই রাজনীতির ইসলামীকরণ ও বিশ্বপুঁজির সপক্ষে অর্থনীতির উন্মুক্তকরণ একই সঙ্গে চলতে থাকে। ভারতে একই সংস্কার শুরু হয় ‘৯০ দশকের শুরুতে, ভারতেও হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির প্রসার তখন থেকেই। পুঁজির আগ্রাসন ও ধর্মীয় ফ্যাসিবাদী শক্তির সমান্তরাল বিস্তার খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। বিদ্যমান উন্নয়ন দর্শন, সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বায়ন ও সংস্কারের সাথে সাথে এসব শক্তির বিস্তার ঘটায় অর্থনৈতিক নীতিদর্শন থেকে বিচ্ছিন্ন করে এই সমস্যা যথাযথভাবে অনুধাবন করা সম্ভব নয়।

দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সবচাইতে দীর্ঘসময় সামরিক শাসন চলে মায়ানমারে। এই সামরিক শাসনকালে পশ্চিমা বিশ্বের অবরোধের কথা শোনা গেলেও খনিজসম্পদমুখি বহুজাতিক পুঁজির বিনিয়োগ অব্যাহতই ছিলো। নেপালে ছিলো রাজতন্ত্র, মাওবাদীদের সশস্ত্র সংগ্রামের দৃষ্টিগ্রাহ্য ফলাফল রাজতন্ত্রের পতন। অর্থনীতিতে ভিন্ন কোন যাত্রা সম্ভব করবার মতো রাজনৈতিক পরিবর্তন এখনও দৃষ্টিগ্রাহ্য নয়। আফগানিস্তান কার্যত মার্কিন দখলে আছে। বিশ্বজুড়ে ইসলামপন্থীদের নিজেদের রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে এক সময় ব্যবহার, অন্য সময়ে তাদের সন্ত্রাসী পরিচয় দিয়ে বিশ্বব্যাপী নিজেদের দখল নিশ্চিত করবার মার্কিন কৌশল খেলার জন্য আফগানিস্তান সবসময়ই বিশেষ মনোযোগ দাবি করে। যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন বিশ্ব দখলদারিত্বের নতুন আওয়াজ ‘সন্ত্রাস বিরোধী যুদ্ধ’ এই আফগানিস্তান ধরেই শুরু হয়, যে অভিযান পাকিস্তানের মাধ্যমেই কার্যকর হয়। ক্রমে ভারত, বাংলাদেশও এই মডেল গ্রহণ করে।

এই অঞ্চলে মায়ানমার ছাড়া আর কোন দেশেই এখন প্রত্যক্ষ সামরিক শাসন নেই, কিন্তু সবদেশেই সামরিকীকরণ বেড়েছে। প্রায় সবগুলো দেশেই নির্বাচিত সরকারের অধীনে একের পর এক ‘নিরাপত্তা আইন’, ‘নিরাপত্তা ব্যবস্থা’, আর দমনমূলক নানা ব্যবস্থার সম্প্রসারণ দেখা যাচ্ছে।

পুরো দক্ষিণ এশিয়ার উন্নয়ন ও মূলধন সংবর্ধনের ধরন, বিশ্ব পুঁজি ও সাম্র্রাজ্যবাদের সাথে তার যুক্ততা, কর্পোরেট স্বার্থে মানুষ ও প্রকৃতি বিরোধী আগ্রাসন ইত্যাদিতে রাষ্ট্রের সাথে রাষ্ট্রের ঐক্য আছে। ঐক্য আছে নিপীড়নমুখি রাষ্ট্রের শক্তিবৃদ্ধির অবিরাম চেষ্টায়। মার্কিন নেতৃত্বাধীন সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বব্যবস্থায় কমবেশি অঙ্গীভূত সবগুলো দেশই। ‘সন্ত্রাস বিরোধী যুদ্ধ’ এখন সবদেশের শাসকদেরই নিজ দেশের জনগণের বিরুদ্ধে সন্ত্রাস বিস্তারে প্রিয় কৌশলসূত্র।।