Home » রাজনীতি » বিরোধী দলবিহীন বাংলাদেশের আকাঙ্ক্ষায়

বিরোধী দলবিহীন বাংলাদেশের আকাঙ্ক্ষায়

আমীর খসরু

last 2জাপান থেকে ফিরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৩১ মে যে সংবাদ সম্মেলন করলেন, তাতে তার অনেকগুলো মনের কথা বেরিয়ে এসেছে। ইচ্ছাকৃতভাবে হোক কিংবা মনের অজান্তে হোক তিনি জামায়াতের বিচার, র‌্যাবের বিলুপ্তি দাবি, উচ্চতর আদালতের বিচারিক কার্যক্রম সম্পর্কে বক্তব্য রাখলেন। তবে সবচেয়ে বড় যে মনের একান্ত ইচ্ছাটির কথা বেরিয়ে এসেছে, তাহলো বিরোধী দল নিয়ে।

প্রতিনিধিত্বশীল সরকার ব্যবস্থা আসলে কতোটুকু প্রতিনিধিত্বশীল এবং গণতন্ত্রের কতোটা প্রতিফলন ঘটাতে সক্ষম তা নিয়ে বোদ্ধা মহলে নানা তর্কবিতর্ক রয়েছে। কিন্তু যেহেতু এই দেশটি ওই শাসন ব্যবস্থাই অনুসরণ করে, কাজেই সে বিষয়টি আলোচনার দাবি রাখে। শুধু প্রতিনিধিত্বশীল সরকার ব্যবস্থায়ই নয়, যে কোনো জবাবদিহিমূলক সরকার পদ্ধতিতে বিরোধী দলের উপস্থিতি একান্ত জরুরি এবং প্রয়োজনীয়। আর এই প্রয়োজনীয়তার কথা বিবেচনা করে বাংলাদেশ যে ব্রিটিশ পদ্ধতিকে অনুসরণ করছে (বাস্তবে না হলেও সংবিধানের ক্ষেত্রে) সেখানেও অর্থাৎ বৃটেনে ১৮ শতকের মাঝামাঝি সময় থেকেই রাজা বা রাণীর ইচ্ছায়ই প্রথম বিরোধী দল গঠিত হয়েছিল। আর ওই বিরোধী দলকে বলা হতো ‘হিজ বা হার ম্যাজেস্টিস অপজিশন’। এই বিরোধী দল গঠন করিয়ে দেয়া হলো এই কারণে যে, শুধু রাজা বা রাণীর গুণর্কীতন নয়, শাসন ব্যবস্থায় কি দুর্বলতা আছে এবং শাসন কার্যটি ঠিক মতো চলছে কিনা তা নিশ্চিত হওয়ার জন্য। সুইজারল্যান্ডের ইতিহাসের দিকে যদি আমরা তাকাই তাহলে দেখা যাবে, ১৩ শতকের সময় থেকেই পার্লামেন্টে আইন প্রণয়নের ব্যবস্থা চালু হয়। আর আনুষ্ঠানিকভাবে বিরোধী দলীয় নেতাকে যথাযথ মর্যাদা দেয়ার আইনটি প্রণীত হয় ১৮ শতকে। বিশ্বের অন্যান্য অনেক দেশে প্রতিনিধিত্বশীল সরকার ব্যবস্থায় ভারসাম্য আনার জন্য বিরোধী দলকে ‘ছায়া সরকার’ বলেও অভিহিত করা হয়। এসব ইতিহাস প্রধানমন্ত্রীর জানা থাকার কথা। আর জানা না থাকলেও ১৯৭২ সালের সংবিধান প্রণেতারা তা ভালো করেই জানেন।

প্রতিনিধিত্বশীলতা এবং বিরোধী দলের ক্ষেত্রে ভালো ভালো কথা ১৯৭২ সালে প্রণীত সংবিধানে থাকলেও দুর্ভাগ্যের বিষয় হচ্ছে, এর অল্প কয়েক মাসের মধ্যেই তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার সংবিধানে নিবর্তনমূলক পদ্ধতি চালুসহ জরুরি অবস্থা জারির বিধান সন্নিবেশিত করেছিল। রক্ষীবাহিনীসহ নানা বাহিনী দিয়ে বিরোধী দলকে নির্মূলের যাবতীয় ব্যবস্থাদি সম্পন্ন করেছিল তৎকালীন সরকারটি। ৩০ হাজারেরও বেশি বামপন্থী নেতাকর্মীকে ওই সময়কালে হত্যা করা হয়েছিল আনুষ্ঠানিক এবং অনানুষ্ঠানিক নানা বাহিনী দিয়ে। অত্যাচারনির্যাতন, দুর্ভিক্ষ অভাব, লুটপাট, লুণ্ঠন চরম পর্যায়ে পৌছেছিল। এতেও তৎকালীন সরকার সন্তুষ্ট না হয়ে বিরোধী পক্ষ বিনাশ করার সবশেষ চেষ্টা হিসেবে শেষমেষ একদলীয় শাসন ‘বাকশাল’ কায়েম করেছিল। এর মধ্যদিয়ে চারটি বাদে সব সংবাদপত্র বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল। ওই সংবাদপত্রগুলো নিয়ে নেয়া হয়েছিল সরকারী মালিকানায়। বাধ্য করা হয়েছিল, সব সরকারী চাকুরেদের এক দলে যোগ দেয়ার জন্য।

এর পরের সরকারগুলোর কার্যক্রম যে রাতারাতি উল্টে গিয়েছিল তা নয়, দীর্ঘকালীন সামরিক শাসন আর কথিত বেসামরিক শাসন চলেছে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত। ১৯৯০এর পরে গণতন্ত্র চর্চার সুযোগ এলেও সংসদীয় গণতন্ত্রের নামে প্রধানমন্ত্রীর একনায়কত্ব এবং অসম্ভব কেন্দ্রীভূত ক্ষমতার কারণে গণতন্ত্র চর্চা সঠিকভাবে চলেছে বা চলতে পেরেছে তা বলা যাবে না। কমবেশী আঘাত সব সময়ই ছিল। আর এ কারণে আন্দোলনসংগ্রাম গড়ে তুলতে হয়েছে এদেশের মানুষকেই।

তবে এই দফায় অর্থাৎ ২০০৯এর পরে আওয়ামী লীগের চেহারাটি যে একেবারেই পাল্টে যাবে তা অনেকেই ভাবতে পারেননি। বিশেষ করে তরুণ সমাজ তো নয়ই। ২০০৯এর আগের আওয়ামী লীগের আচারআচরণ, বক্তৃতাবিবৃতি, প্রতিশ্রুতির সঙ্গে নির্বাচন পরবর্তী আওয়ামী লীগের কোনো মিলই খুজে পাওয়া যায় না। মনে হয়, এক ভিন্ন আওয়ামী লীগকে দেখতে মানুষ। তবে স্বাধীনতার পরে আওয়ামী লীগের সঙ্গে এই আওয়ামী লীগের অনেক মিল পাওয়া যায়।

এই দফায় আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার প্রথমদিন থেকেই আওয়ামী লীগ সরকার এমন পথ এবং পদ্ধতি গ্রহণ করে যাতে বিরোধী দল তো দূরের কথা, বিরোধী মত, পথ বা পক্ষের কেউ যেন মাথা তুলে না দাড়াতে পারে। সবাই যেন এক সুরে গান গায়, একই সুরে গুণর্কীতন করে, একই ভাষায় কথা বলে এটাই হচ্ছে এর মূল কথা। প্রথমে নিজ ছাত্র সংগঠন, যুব সংগঠনকে ব্যবহার করে এবং পরবর্তীকালে এর সঙ্গে যুক্ত করা হয় পুলিশর‌্যাবসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনীকে। প্রথমদিন থেকেই বিরোধী দল, মত, পক্ষ এমনকি ব্যক্তির মতামতকে নিশ্চিহ্ন করণের কৌশল হিসেবে কোনো সভাসমাবেশ করতে দেয়া হয়নি। এটা শুধু বিএনপিই নয়, অপরাপর দলগুলোও এর ভুক্তভোগী। শুধু দলই নয়, কোনো নাগরিক উদ্যোগ পর্যন্ত তাদের সহ্য হয়নি। তেলগ্যাস বন্দর রক্ষা কমিটির একাধিক সমাবেশে বার বার আক্রমণ চালানো হয়েছে। আক্রমণ চালানো হয়েছে যারাই বিদ্যুতের ব্যাপারে, দেশীয় সম্পদ রক্ষার ব্যাপারে সোচ্চার হয়েছেন তাদের ক্ষেত্রেই। নাগরিক উদ্যোগকে সমূলে বিনাশের জন্য শুধু আক্রমণই নয়, অধ্যাপক আনু মুহা¤ম্মদের পা ভাঙাসহ অনেককেই লাঞ্ছিত হতে হয়েছে। কিন্তু ‘তাদের অন্যায়টি ছিল’তারা দেশের স্বার্থে, মানুষের পক্ষে কথা বলেছেন। বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের সভাসমাবেশ, মানববন্ধন পর্যন্ত ভন্ডুল করা হয়েছে। আড়িয়াল বিল, রূপগঞ্জ, রামপালে কথিত উন্নয়নের নামে জমি দখলের প্রতিবাদে যখন স্থানীয়রা সোচ্চার হলেন, তখন তাদের হত্যা করার ঘটনাও তো ঘটেছে। সর্বজন শ্রদ্ধেয় অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীকেও আসামী করা হয়েছিল আড়িয়াল বিল ঘটনায়। বিদ্যুৎ, পানির ন্যায্য দাবিতে আন্দোলন করতে গিয়ে খোদ রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সাধারণ মানুষকে পুলিশ আর দলীয় সন্ত্রাসীদের হামলার শিকার হতে হয়েছে। তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হুমকি দিয়েছিলেন গ্যাসবিদ্যুৎ, পানির দাবিতে তার ভাষায় ‘কোনো গোলযোগ হলে’ কঠিনকঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। অত্যাচারনির্যাতন, নিপীড়নের জন্য নানা পথ, কৌশল বেছে নেয়া হয়। দিনেদুপুরে উপজেলা চেয়ারম্যানকে হত্যা, বিশ্বজিত হত্যাসহ অসংখ্য মানুষের জীবন কেড়ে নেয়া হয়, অথচ সরকার সব সময়ই নির্বিকার থাকে। হত্যার অবৈধ অধিকার দিয়ে দেয়া হয় একদিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনীকে, অন্যদিকে দলীয় সন্ত্রাসীদের। এতে দিনে দিনে বেড়েছে বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ড, গুম, খুন, অপহরণ। অন্যদিকে বেড়েছে দলীয় বাহিনীর তান্ডব। উদ্দেশ্য বিরোধী দল, মত, পথকে বিনাশ এবং উচ্ছেদ। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে গিয়েছে যে, এখন তারা নিজেরা নিজেরাই হত্যা, খুন বিবাদে লিপ্ত। আর মানুষ অসহায় দর্শক। সাম্প্রতিক নারায়ণগঞ্জ, লক্ষ্মীপুর, ফেনীসহ অসংখ্য জনপদ এর সাক্ষী।

এমন ঘটনাও তো ঘটেছে যে, কথিত নাশকতার অভিযোগে ঢাকাসহ সারাদেশে দফায় দফায় দিনের পর দিন সভাসমাবেশ নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল। এখনও সে ব্যবস্থা চালু আছে। এখন ঘরের মধ্যে বসেও আলোচনা সভা কিংবা সেমিনার করা যায় না। তালা ঝুলিয়ে দেয়া হয়, র‌্যাবপুলিশ, জলকামান, রায়টকার মোতায়েন করে ‘যুদ্ধ যুদ্ধ পরিস্থিতি’র সৃষ্টি করা হয়। কিন্তু এ যুদ্ধটি কার বিরুদ্ধে? এভাবে হাজার উদাহরণ আছে এবং সবাই সে সম্পর্কে অবগত। এর উদ্দেশ্য বিরোধী পক্ষ দমন এবং নিজেদের শাসনকে দীর্ঘমেয়াদী করার অবিরাম প্রচেষ্টা।

কোনো নির্বাচনেও বিরোধী দলকে সহ্য করা হয়নি। তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বাতিল করার মধ্যদিয়ে সবচেয়ে বড় আঘাতটি আসে সব রাজনৈতিক দলের উপরে। আর ওই ব্যবস্থার মাধ্যমেই ৫ জানুয়ারির নির্বাচনটি করিয়ে একটি নির্জীব পছন্দ মতো গৃহপালিত বিরোধী পক্ষ রাখা হয়েছে ঠিকই, কিন্তু ওই বিরোধী দলও নিজেদের বিরোধী দল বলতে ‘লজ্জা’ পায়। অথচ এমন একটি বিরোধী দলই প্রধানমন্ত্রীর পছন্দ। উপজেলা নির্বাচনেও বিরোধী পক্ষকে কিভাবে মাঠ ছাড়া করা হয়েছে তার ভয়াল চিত্র সবাই দেখেছেন।

প্রধানমন্ত্রীর বিপক্ষে যায় এমন কোনো সত্য কথাও তিনি পছন্দ করতে রাজি নন বলেই উচ্চতর আদালত সম্পর্কেও মন্তব্য করেন। এটা অবশ্য নতুন নয়। উচ্চতর আদালতে বস্তি বসিয়ে দেয়া, ওই আদালতের বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণার পরিপ্রেক্ষিতে আদালত কি মতামত দিয়েছিলসে কথাও মানুষ ভুলে যায়নি।

সত্য কথা তিনি সহ্য করতে পারেন না বলেই টেলিভিশনের টকশোতে অংশগ্রহণকারীদের বার বার তিনি আক্রমণ করেছেন। সর্বজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিদেরও তিনি কটূক্তি করেছেন। সংবাদ মাধ্যম বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। বন্ধ করা হয়েছিল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বিভিন্ন ব্যবস্থাকেও।

প্রধানমন্ত্রী সংবাদ সম্মেলনে রক্ষীবাহিনী গঠনের যৌক্তিকতা তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। একই সঙ্গে বলেছেন, ২০০৪ সালে খালেদা জিয়া র‌্যাব গঠন করে এক হাজার মানুষকে হত্যা করেছে। তিনি এও বললেন যে, র‌্যাব এখন একটি বাস্তবতা। এখানে সাধারণ মানুষের প্রশ্ন, কে বা কারা র‌্যাব গঠনের জন্য বা তাদের হত্যাকান্ডের জন্য তৎকালীন সরকারকে প্রশংসা করেছে বা সমর্থন জানিয়েছে? অতীতের কোনো সরকার খারাপ কাজ করলে বা জনবিরোধী অন্যায় কার্যক্রম চালালে তাই জায়েজ হয়ে যায়? এটা বৈধ হয়ে গেছে এবং ওই অবৈধ বিষয়কে বৈধতার মাপকাঠি বলে গণ্য করতে হবে এটা তো যুক্তির কথা নয়? মনে রাখতে হবে, অন্যায় এবং জনবিরোধী কর্মকাণ্ড নিয়ে কোনো প্রতিযোগিতা চলে না। এটা কোনো যুক্তির বিষয়ও নয়, সুস্থতার লক্ষণও নয়। অবশ্য যুক্তি আর সুস্থতা দিয়ে দেশ চলছে না।

বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার আগে এবং পরে যুদ্ধাপরাধের বিচার বা জামায়াতের বিচারের কথা উচ্চস্বরে বলা হতো। অথচ এখন বলা হচ্ছে, এ নিয়ে অস্থিরতার কি আছে? প্রধানমন্ত্রী এই বিচার নিয়ে নানা কথা বললেন এবং কৃতিত্বও নিলেন। তাই যদি সত্যি হবে, তাহলে শাহবাগে তরুণরা জড়ো হয়েছিলেন কেন? কিভাবে তখন আতাত রুখে দেয়া হয়েছিল? সে কথাও মানুষ জানে। আর বিচারিক কাজ করবে আদালত, নির্বাহী বিভাগ নয়। নির্বাহী বিভাগ যদি কোনো নির্দেশনা দেয় তাহলে সুষ্ঠু বিচার সম্ভব নয়।

প্রধানমন্ত্রী সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, বিএনপিকে তিনি ফরমালিন দিয়ে বাচিয়ে রেখেছেন। এখানে একটি বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন এবং তাহলো এটি তার মনোজগতে গভীর ভাবনা এবং আকাক্সক্ষারই প্রতিফলন। কারণ এমন একটি বিরোধী দলই তিনি কামনা করেন। কায়মনোবাক্যে কামনা করেন, – যদি বিরোধী দল থাকেই, তবে সেটি যেন এ রকম হয়। সচলসজীব গণতন্ত্রের জন্য শক্তিশালী বিরোধী দল প্রয়োজন। আর এর বিপরীতে সব স্বৈরাচারী সরকারের কাছে কোনো বিরোধী দল, বিরোধী মত, পক্ষ পছন্দের নয়। বিরোধী মত, পক্ষ তাদের জন্য সীমাহীন ভীতির কারণ। যুগে যুগে এমনটাই দেখা গেছে।।