Home » অর্থনীতি » দুই ভারত দুই বাংলাদেশ (পর্ব – ৩)

দুই ভারত দুই বাংলাদেশ (পর্ব – ৩)

অর্থনৈতিক সংস্কারের ধরন

আনু মুহাম্মদ

last 2বর্তমান পুঁজিবাদী বিশ্বব্যবস্থায় মূলধন সংবর্ধন প্রক্রিয়া সংঘটনে দখল লুন্ঠন অপরাধ সন্ত্রাস খুবই শক্তিশালী ভূমিকা পালন করছে। মার্কসের ‘মূলধনের আদিম সংবর্ধন’ (primitive capital accumulation)ধারণা তাই বর্তমান সময়েও খুবই প্রাসঙ্গিক দেখা যাচ্ছে। বর্তমান বিশ্ব পরিপ্রেক্ষিতে এই ধারণার পুনসূত্রায়ন করেছেন ডেভিড হার্ভে ‘উচ্ছেদের মাধ্যমে সংবর্ধন’ (accumulation by disposession)নামে। ভারত ও বাংলাদেশে পুঁজির আগ্রাসনের এই রূপ তৈরি করছে নতুন ছিন্নমূল মানুষ, সাধারণ সম্পত্তির ব্যক্তিকরণ, বন ও পরিবেশ বিপর্যয়, নদীবিনাশ এবং দীর্ঘমেয়াদে জনবিপন্নতা। ()

নয়া উদারতাবাদী (বা নয়া সংরক্ষণবাদী) দর্শন এই ধারাকেই প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়েছে। এই দর্শন অনুযায়ী বিশ্বব্যাংক আইএমএফ এডিবির ‘সংস্কার কর্মসূচি’র সারকথাই হল জগতের সকল ক্ষেত্রকে পুঁজির অধীনস্ত করা, শিক্ষা চিকিৎসা, পানিসহ সর্বজনের সবকিছু বাণিজ্যিকীকরণ করা। নদী নালা খাল বিল পাহাড় বন জঙ্গলসহ সর্বজনের সম্পত্তি ব্যক্তির মালিকানায় বা নিয়ন্ত্রণে মুনাফামুখি তৎপরতায় নিযুক্ত করা। এই ধারাতেই বিরাষ্ট্রীয়করণ, বিদেশী বিনিয়োগ সহজীকরণ এবং বাণিজ্য উদারীকরণ। ’৮০ দশক থেকে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানে এবং ’৯০ দশক থেকে ভারতে এই উন্নয়ন ধারা অনেক জৌলুস তৈরি করেছে আর ভীড় বেড়েছে উন্মুল মানুষের। বাংলাদেশে এসব সংস্কার রফতানিমুখি খাতের বিকাশ ঘটিয়েছে কিন্তু বাংলাদেশে বৃহৎ ও মৌলিক শিল্পভিত্তি ও তার সম্ভাবনা ধ্বংস করেছে, প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতা বৃদ্ধির বদলে তা তছনছ করেছে, দেশকে আমদানিমুখি করেছে, উৎপাদনমুখিতা থেকে দোকানদারি অর্থনীতির প্রসার ঘটিয়েছে, শিক্ষা ও চিকিৎসার ক্ষেত্রকেও বাজারের মধ্যে নিক্ষেপ করেছে। সবদেশেই চোরাই কোটিপতি আর দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বেড়েছে।

দক্ষিণ এশিয়া জুড়ে অর্থনীতির এই সংস্কারের ধরনে সবচাইতে লাভবান হয়েছে ভারতের বৃহৎ পুঁজি। ভারতের বৃহৎ পুঁজির ক্রমবর্ধমান আধিপত্য তাই বাংলাদেশের অর্র্থনৈতিক সংস্কার বা বিদ্যমান উন্নয়ন ধারার অবধারিত ফলাফল।

রাষ্ট্র নির্দেশিত পুঁজিবাদ বিকাশে এই ভারত একটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত। স্বাধীনতার পর কয়েক দশকে রাষ্ট্রীয় পরিকল্পিত উন্নয়ন ধারায় ভারতে একটি শক্ত শিল্পভিত্তি নির্মিত হয়। কিন্তু পুঁজিবাদের আভ্যন্তরীণ বিকাশ গতি অনুযায়ী শিল্পখাত ও দক্ষ জনশক্তির বিস্তার হয়েছে খুবই অসম এবং ভারসাম্যহীন অঞ্চলগত এবং খাতওয়ারি দুভাবেই। সোভিয়েত সমর্থনে রাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে ভারতে পুঁজিবাদের বিকাশ এক পর্যায়ে বেসরকারি খাতে একচেটিয়া গোষ্ঠীর উদ্ভব ও বিকাশ সম্ভব করেছে। ()পুঁজির পুঞ্জিভবনের অনিবার্য প্রক্রিয়ায় ভারত রাষ্ট্র ক্রমে একচেটিয়া গোষ্ঠীগুলোর প্রধান বাহনে পরিণত হয়েছে। ভারতের বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী যখন সর্বাধুনিক প্রযুক্তির ওপর দখল এনেছে তখন একই সঙ্গে দুর্বল প্রযুক্তি নির্ভর ক্ষুদ্র শিল্পে আটকে আছে বিশাল জনগোষ্ঠী। কৃষিখাতের একদিকে যখন বাণিজ্যিকীকরণ ঘটে, উচ্চ প্রযুক্তির ব্যবহার চলে অন্যদিকে খরা, বন্যাসহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং অন্যদিকে জেনেটিক প্রযুক্তির আগ্রাসনে বিপর্যস্ত হন বিশাল সংখ্যক কৃষক। পানি আর বন, জমি আর জনজীবন সবই এখন মুনাফার সন্ধানে পুঁজির নির্বিচার আগ্রাসনের মুখে, দেশি বিদেশি একাকার।

ভারতে এই নয়া উদারতাবাদী সংস্কার ধারার প্রধান চালিকা শক্তি দেশের ভেতরের বৃহৎ শিল্প ও ব্যবসায়িক গোষ্ঠী। কেননা, এর মধ্য দিয়ে অর্থনীতির উপর বৃহৎ বেসরকারি শিল্প ও ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর আধিপত্যই সম্প্রসারিত হচ্ছে। তবে আমদানি উদারীকরণ ক্ষেত্রে তাদের দিক থেকে প্রতিরোধও ছিল। তারফলে আমদানি উদারিকরণে বাংলাদেশ যেভাবে নির্বিচার আমদানী বৃদ্ধির পথ নিয়েছে, ভারত সেরকম উৎসাহ দেখায়নি। বরঞ্চ বাংলাদেশের নির্বিচার আমদানির পথ ভারতের এসব শিল্পগোষ্ঠীর জন্য সুবিধাজনক হয়েছে।

বাংলাদেশে রাষ্ট্রায়ত্ত্ব প্রতিষ্ঠানসমূহ ভেঙেচুরে বিলিয়ে দেয়া বা নষ্ট করা, এসব প্রতিষ্ঠানের জমি কতিপয় ব্যক্তির হাতে লীজ দেবার নামে তুলে দেয়া, ভূমি দখলকে আইনীরূপ দান ইত্যাদি সরকারের বরাবরের নীতি। ভারতে চিত্রটি মাত্রার দিক থেকে একইরকম নয়। এখানে ৯০ দশকে এসব সংস্কারের সময়ও কিছু রাষ্ট্রীয় খাত গুরুত্বের সঙ্গে রক্ষা করা হয়। এসময়ে ভারত সরকার ১১টি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানকে নবরত্ন হিসেবে ঘোষণা করে, সেগুলোর নবায়ন ও স্বায়ত্তশাসন দিয়ে সম্প্রসারণের কর্মসূচি নেয়। এগুলোকে নিজেদের বিনিয়োগ, যৌথ বিনিয়োগ ও অন্যদেশে সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিনিয়োগ ইত্যাদি সম্পর্কে সিদ্ধান্ত গ্রহণের সম্পূর্ণ অধিকার দেয়া হয়। বাংলাদেশে নানা পশ্চিমা বিনিয়োগেও সহযোগী হিসেবে এখন এসব প্রতিষ্ঠানের অনেকগুলোর নাম শোনা যায়।।

. কীভাবে বাংলাদেশের মতো দেশগুলোতে মূলধন সংবর্ধন প্রক্রিয়া কাজ করছে সে সম্পর্কে একটি গবেষণার জন্য দেখুন: Shapan Adnan, 2013. “Land grabs and primitive accumulation in deltaic

Bangladesh: interactions between neoliberal globalization, state interventions, power relations and peasant resistance”, The Journal of Peasant Studies, 40:1, 87-128

. ভারতের বৃহৎ বুর্জোয়ার উদ্ভব ও ধরন নিয়ে এই গ্রন্থটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ; Suniti Kumar Ghosh, 1985. The Indian Big Bourgeoisie, Subarnarekha, Calcutta.এই গ্রন্থ নিয়ে পার্থ চ্যাটার্জির পর্যালোচনাও বিশেষ গুরুত্বের দাবি রাখে, যেটি পরে Partha Chatterjee, 1997. A Possible India, OUP, New Delhi.গ্রন্থে সংকলিত হয়।