Home » আন্তর্জাতিক » ‘ভারতের বামপন্থীরা মধ্যবিত্ত শ্রেণী ও তরুণদের কাছে টানতে পারেনি’ :: সিপিআই (এম) সাধারণ সম্পাদক প্রকাশ কারাত

‘ভারতের বামপন্থীরা মধ্যবিত্ত শ্রেণী ও তরুণদের কাছে টানতে পারেনি’ :: সিপিআই (এম) সাধারণ সম্পাদক প্রকাশ কারাত

last 4ভারতের সাধারণ নির্বাচনে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে বিজিপির নিরঙ্কুশ বিজয় নিয়ে নানা বিশ্লেষণ চলছে। সঙ্গে সঙ্গে বামপন্থীদের বিশাল এক ভরাডুবি নিয়েও চলছে নানা হিসাবনিকাশ। সর্বভারতীয় সিপিআই (এম) সাধারণ সম্পাদক প্রকাশ কারাত, সম্প্রতি প্রভাবশালী ফ্রন্টলাইন সাময়িকীকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে নির্বাচনে বিজেপির বিজয়ের নেপথ্য কারণ এবং বামপন্থীদের ভরাডুবি সম্পর্কে কথা বলেছেন। এই সাক্ষাৎকারটির বাংলায় অনুবাদ করেছেন মোহাম্মদ হাসান শরীফ

লোকসভা নির্বাচনে বিজেপির পক্ষে সিদ্ধান্ত সূচক ফলাফল কংগ্রেসের কার্যকর বিকল্প হিসেবে আত্মপ্রকাশ করার সম্ভাবনাময় বেশ কয়েকটি সেক্যুলার অকংগ্রেসী, বিজেপি দলকে প্রান্তিক অবস্থানে নামিয়ে দিয়েছে। বাম দলগুলোও রয়েছে এদের মধ্যে। নির্বাচনে তাদের ফলাফল হতাশাজনক।

প্রশ্ন: লোকসভা নির্বাচনের এই পর্যায়ের ফলাফলকে আপনি কিভাবে ব্যাখ্যা করবেন? ৩০ বছর পর একটি একক দল সিদ্ধান্তসূচক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেল।

প্রকাশ কারাত: ভারতে কংগ্রেস বিরোধী স্রোত ছিল। জাতীয় পর্যায়ে অকংগ্রেসী সেক্যুলার বিকল্প না থাকায় বিজেপি কংগ্রেসবিরোধী পরিস্থিতিকে কাজে লাগাতে সক্ষম হয়েছে। অসহনীয় দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, কৃষিজ যন্ত্রণা, বেকারত্ব বৃদ্ধি এবং সর্বোপরি ব্যাপক দুর্নীতিসহ ইউপিএ সরকারের পারফরমেন্সে জনসাধারণের মধ্যে ক্রোধের সৃষ্টি করেছিল। কংগ্রেসের বিরুদ্ধে বিরাজমান এই মনোভাব থেকে বিজেপি উপকৃত হয়েছে। তাদের বিপুল জয় প্রমাণ করছে যে তারা নরেন্দ্র মোদিকে উন্নয়ন সহায়ক ব্যক্তি হিসেবে সফলভাবে তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছে। তবে যেটা প্রকাশ পায়নি সেটা হলো, সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ বিশেষ করে উত্তর প্রদেশ, বিহার ও আসাম রাজ্য ফলাফল থেকেও তারা বেশ লাভবান হয়েছে। বস্তুত, উত্তর প্রদেশের দুর্দান্ত ফলাফল আরএসএসনির্দেশিত গণপ্রচারণার সাফল্য।

 

প্রশ্ন: এই ফলাফলের তাৎপর্য কী?

প্রকাশ কারাত: বিজেপি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করেছে। এর একটি বড় ধরনের প্রতিক্রিয়া থাকবে। হিন্দুত্ববাদ বা হিন্দুৎভা মতাদর্শভিত্তিক একটি দল বিজেপির পক্ষে মাত্র ৩১ শতাংশ সমর্থন নিয়ে এ ধরনের সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে। বিপদ হলো আরএসএস এবং হিন্দুৎভা শক্তি এটাকে তাদের সাম্প্রদায়িক মতাদর্শের গণতান্ত্রিক বৈধতা হিসেবে বিবেচনা করবে এবং রাষ্ট্র ও সরকারের প্রতিষ্ঠানগুলোর আকারে এর প্রয়োগ করতে চাইবে। অধিকন্তু, গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে নরেন্দ্র মোদির রেকর্ড এবং বিজেপির ডানপন্থী অর্থনৈতিক এজেন্ডার বিষয়টি বিবেচনা করে ধরে নেওয়া যেতে পারে যে, নব্যউদার মতাদর্শের আরো আগ্রাসী পন্থা অবলম্বন করা হবে। ‘উন্নয়ন’এর মতাদর্শকে উন্নয়নের বৃহৎ ব্যবসাপরিচালিত মডেল হিসেবে ব্যাখ্যা করা হবে। এর পরিণতিতে কেবল অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্যই বাড়বে। এসবই ভারতীয় রাজনীতিতে ডানমুখী হওয়ার প্রতিনিধিত্ব করছে।

 

প্রশ্ন: গরিব, সাধারণ মানুষের জন্য সুশাসন, শ্রমিকদের সমস্যা সুরাহা নিয়ে কথা বলছেন নরেন্দ্র মোদি। তিনি নিজেকে ‘মজদুর নম্বর ১’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।

প্রকাশ কারাত: এটা যদি করতে হয়, তবে মোদি সরকারকে গুজরাট মডেল (তারা অবশিষ্ট ভারতেও এটা প্রয়োগ করতে চায়) থেকে সর্বোচ্চ দূরত্ব সৃষ্টি করতে হবে। অনেক অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ইতোমধ্যেই সমাজকল্যাণ স্কিম বাতিল কিংবা হ্রাস করে পুনঃবণ্টন নীতিমালা প্রণয়নের সুপারিশ করেছেন। তাদের অনেকে এমজিএনআরইজিএ (মহাত্মা গান্ধী ন্যাশনাল রুরাল এমপ্লয়মেন্ট গ্যারান্টি অ্যাক্ট, সরকার পরিচালিত বিশ্বের বৃহত্তম জনকল্যাণমূলক কর্মসূচি) এবং খাদ্য নিরাপত্তা অ্যাক্ট বাতিল করতে চাইতে পারেন।

 

প্রশ্ন: আপনি বামপন্থীদের অবস্থা কিভাবে মূল্যায়ন করবেন? সিপিআই (এম) এবং অন্যান্য বামপন্থীদের ফলাফল ছিল হতাশাজনক।

প্রকাশ কারাত: এই নির্বাচনে সিপিআই (এম) ও বাম দলগুলো খুবই খারাপ করেছে। এটা হয়েছে প্রধানত পশ্চিমবঙ্গের বিপর্যয়ের কারণে। পশ্চিমবঙ্গে খারাপ ফলাফলের পেছনে অনেক কারণ রয়েছে। একদিকে ব্যাপক সহিংসতা ও ভোট কারচুপি হয়েছে, অন্যদিকে কয়েকটি ক্ষেত্র থেকে বিলীন হয়ে যাওয়ার ফলে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল, তা থেকে উৎরাতে পারেনি। বিজেপির বেশ বড় ধরনের ভোট বাড়াটা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে রাজ্যটিতে সাম্প্রদায়িক রাজনীতি শেকড় গাড়ছে। এটা বামপন্থীদের জন্য মারাত্মক উদ্বেগের কারণ হওয়া উচিত। সেইসঙ্গে আমাদের এটাও পরীক্ষা করে দেখা উচিত, কেরালায় আমরা কেন আরো ভালো করতে পারলাম না। সেখানে এলডিএফ ২০টি আসনের মধ্যে মাত্র ৮টি পেয়েছে। কেবল ত্রিপুরায় ৬৪ ভাগ পাওয়ায় লেফট ফ্রন্ট নিরঙ্কুশ বিজয় পেয়েছে। নির্বাচনী পারফরমেন্স নিয়ে বামদের আত্মসমালোচনা করা উচিত। ইউপিএ সরকারের অর্থনৈতিক নীতির বিরুদ্ধে গণসংগ্রাম ও প্রতিরোধকে সিপিআই (এম) ও বামপন্থীরা কেন নির্বাচনী সমর্থনে রূপান্তরিত করতে পারল না? আমি মনে করি, বামপন্থীরা মধ্যবিত্ত শ্রেণী ও তরুণদেরকে কাছে টানতে পারেনি। আমাদের উচিত আমাদের রাজনৈতিক প্লাটফর্মকে পুনঃগঠন করা এবং আমাদের সাংগঠনিক কাজে পরিবর্তন আনা।।