Home » অর্থনীতি » রাজনৈতিক যোগসাজশে সম্পদের পাহাড় গড়ে তোলার ব্যবস্থা

রাজনৈতিক যোগসাজশে সম্পদের পাহাড় গড়ে তোলার ব্যবস্থা

ইকোনমিস্ট থেকে অনুবাদ: মোহাম্মদ হাসান শরীফ

last 3ইউক্রেনে ভিক্টর ইয়ানুকোভিচ সরকারের পতনের পর পশ্চিম লন্ডনের ধনকুবের এলাকার বিলাসবহুল ভবন ‘ওয়ান হাইড পার্ক’এর সামনে সরকার বিরোধী বিক্ষোভকারীরা সমবেত হয়েছিল। তাদের লক্ষ্য ছিলেন ইউক্রেনের সবচেয়ে ধনী ও বিদায়ী শাসনের সমর্থক রিনাত আখমেটভ। তাদের স্লোগান ছিল ‘তোমার কুকুর সামলাও।’

গোলযোগপূর্ণ ইউক্রেনে ধনিকতন্ত্রের আধিপত্য দীর্ঘদিনের। তবে বিশ্বজুড়ে উদীয়মান রাজনীতি ও ব্যবসার মধ্যকার নিবিড় সম্পর্ক এখন উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এপ্রিল ও মে মাসে অনুষ্ঠিত ভারতের নির্বাচনের অন্যতম বিষয় ছিল ‘ক্রনি ক্যাপিটালিজম’ (এই ব্যবস্থায় ব্যবসায়ে সফলতা নির্ভর করে ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে ব্যবসায়ীদের রাজনৈতিক যোগাযোগ এবং ওই স্বল্পসংখ্যককে কিভাবে সম্পদশালী করা যায় তার ব্যবস্থা। এই ব্যবস্থাকে যোগসাজশভিত্তিক পুঁজিবাদও বলা যায়।) দশক প্রশ্নে গণরায়। আবার তুরস্কে নির্মাণ প্রতিষ্ঠানগুলোর একের পর কেলেঙ্কারিতে প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্রয় রয়েছে সন্দেহ করে ইউটিউবে কোটি কোটি তুর্কিকে সোচ্চার দেখা যায়। গণরোষ প্রশমিত করতে ৫ মার্চ চীনা প্রেসিডেন্ট জি জিনপিং দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘নির্দয়’ ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন বলে ঘোষণা দিয়েছেন। গত বছর শৃঙ্খলা ভঙ্গের জন্য দেশটিতে এক লাখ ৮২ হাজার জনকে শাস্তি দেওয়া হয়েছে। সংখ্যাটি ব্যাপকভাবে বাড়ার প্রমাণ হলো ২০১১ সালে সাজা দেওয়া হয়েছিল ৪০ হাজার জনকে।

বিশ শতকে প্রবেশ লগ্নে আমেরিকার নতুন মধ্যবিত্ত শ্রেণি যেভাবে নিজেদের শক্তি প্রদর্শন করেছিল, এখন সেটাই হচ্ছে বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে। নিজেদের পকেট ভারী করার তালে নেই এমন রাজনীতিবিদ এবং পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়াই প্রতিযোগিতা করতে সক্ষম এমন ধনকুবেরদের পছন্দ করছে জনগণ। পুঁজিপতিদের হাত থেকে পুঁজিবাদকে রক্ষার একটি বিপ্লব দানা বাঁধছে।

যোগসাজশভিত্তিক এজেন্টরা ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে যে ধরনের মাখামাখির স্বপ্ন দেখেন সেটাকে অর্থনীতিবিদেরা বলেন, রাজনৈতিক যোগাযোগের মাধ্যমে অর্থ বানানোর বিশেষ পদ্ধতি। এটা রাজনৈতিক পর্যায়ে সরাসরি ঘুষের মাধ্যমে হতে পারে কিংবা প্রতিযোগিতাহীন ব্যবস্থা, শিথিল নিয়মকানুনের সুযোগ নিয়ে বা কম দামে সরকারি সম্পদ হাতিয়ে নেওয়ার মাধ্যমে হতে পারে। শাসকেরা যখন থেকে তাদের অনুগ্রহভাজনদের লাভজনক লাইসেন্স প্রদান কিংবা পারমিট ও চুক্তি বরাদ্দ দেওয়ার পর্যাপ্ত ক্ষমতা লাভ করলেন, তখন থেকেই যথাযথ জায়গায় বসে থাকা লোকজন ফুলে ফেঁপে ওঠতে শুরু করে। আমেরিকায় এই ব্যবস্থাটি সর্বোচ্চ অবস্থায় পৌঁছে ১৯ শতকের শেষ দিকে। এটা দস্যুজমিদারদের বিরুদ্ধে দীর্ঘ ও আংশিক সফল সংগ্রামের সূচনা করে। কিছু লোককে বিশেষ সুবিধা দেওয়া নীতি বাতিলের ফলে জন ডি. রকফেলারের স্ট্যান্ডার্ড ওয়েলের মতো একচেটিয়া অধিকারের অবসান ঘটায়। সিনেটরদের কাছে ঘুষের প্রবাহ সঙ্কুচিত হয়।

উন্নয়নশীল বিশ্বে গত সিকি শতাব্দী ছিল ক্ষমতাসীনদের সাথে রাজনৈতিক পর্যায়ে যোগসাজশকারীদের জন্য চরম সুসময়। জমির দাম আকাশ ছুঁতে থাকায় প্রকল্প অনুমোদনের ওপর নির্ভরশীল ডেভেলপারদের সমৃদ্ধি ঘটে। পণ্যদ্রব্যের বেচাকেনা হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় রাষ্ট্রের সঙ্গে ওতপ্রতোভাবে জড়িয়ে থাকা তেলক্ষেত্র ও খনির দাম অযৌক্তিক পর্যায়ে ওঠে পড়ে। কোনো কোনো খাত বেসরকারিকরণের সুযোগটি ধনকুবেররা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় কিংবা পানির দামে লুফে নেয়। রাজনীতি ও সম্পদের মধ্যে সম্পর্ক সাদা চোখেই দেখা যায় চীনে, সেখানে এক তৃতীয়াংশ বিলিয়নিয়ার পার্টি সদস্য।

ব্যবসা বাগানোর জন্য রাজনৈতিক যোগসাজশভিত্তিক পুঁজিবাদ কেবল অন্যায়ই নয়, দীর্ঘ মেয়াদি প্রবৃদ্ধির জন্যও ক্ষতিকর। ভারতের প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এর ফলে সম্পদের অপবরাদ্দ ঘটে, যোগসাজশপুষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো প্রায়ই রাস্তা নির্মাণের কাজটি করে জঘন্যভাবে, প্রতিযোগিতার টুটি চেপে ধরা হয়, মেক্সিকানদেরকে তাদের ফোনের জন্য চড়া দাম দিতে হয়। গতিশীল নতুন নতুন প্রতিষ্ঠানের স্থলাভিষিক্ত হয় ক্ষমতাসীনদের সাথে আরো ভালো যোগাযোগ রক্ষাকারীদের। রাজনৈতিক অর্থায়নের সাথে যোগাযোগ প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেলে যোগসাজশকেন্দ্রিক পুঁজিবাদ নীতিনৈতিকতার বিসর্জন দিয়ে দুর্নীতির ব্যাপক প্রসার ঘটিয়ে দেয়। মন্ত্রী যখন দুর্নীতি করেন, তখন কম বেতনের কর্মকর্তারা তা থেকে বিরত থাকবেন কেন?

প্রভাবশালী সাময়িকী ইকোনমিস্ট সময়ের পরিক্রমায় এবং বিভিন্ন দেশে ক্রনি ক্যাপিটালিজমের অবস্থা নিরূপণ করে একটি সূচক তৈরি করেছে। এতে খনি, তেল ও গ্যাস, ব্যাংকিং ও ক্যাসিনোর মতো সরকারের ওপর বিশেষভাবে নির্ভরশীল খাতগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে, অর্থনীতির আকারের আলোকে ওইসব খাতে বিলিয়নিয়ারদের সম্পদের হিসাবও দেওয়া হয়েছে (ফোর্বস র‌্যাংকিংয়ের ভিত্তিতে)। এটা বিশেষ কোনো দেশকে বিশেষভাবে দুর্নীতিগ্রস্ত হিসেবে শনাক্ত করার উদ্দেশ্যে করা হয়নি। এতে সরকারের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি যোগসাজশ থাকা ব্যক্তিদের অর্থনৈতিক খাতে সৃষ্ট সম্পদের মাত্রাটি দেখানো হয়েছে।

ধনী দেশগুলো তুলনামূলকভাবে ভালো করলেও তাতে আত্মতুষ্টির অবকাশ নেই। ব্যাংকগুলোকে প্রণোদনা প্রদানের সঙ্গে জড়িত থাকছে অর্থ লগ্নিকারীদের কাছে বিপুল অর্থের হস্তান্তর, লবিইস্টদের, বিশেষ করে আমেরিকায়, রয়েছে বিপুল প্রতিপত্তি, আজকের ইন্টারনেট উদ্যেক্তারা আগামী দিনের একচ্ছত্রপতিতে পরিণত হতে পারে। উদীয়মান বিশ্বে আরো বড় সমস্যা নিহিত। এসব দেশে জিপিপিসংশ্লিষ্ট ব্যাপক যোগসাজশকেন্দ্রিক খাতগুলোতে বিলিয়নিয়ারদের সম্পদ ধনী দেশগুলোর চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ বেশি। ইউক্রেন ও রাশিয়ার অবস্থা বিশেষভাবে খারাপ। অনেক বেসরকারিকরণ প্রকল্পের ফায়দা নেয় ক্ষমতাসীনদের আস্থাভাজন নিজস্ব লোকজন। এশিয়ার আকস্মিক ব্যাপক উত্থান যোগসাজশভিত্তিক খাতের ধনকুবেরদের সমৃদ্ধ করেছে।

অবশ্য তিনটি কারণে রাজনৈতিক যোগসাজশকারীদের জন্য এটাই সর্বোচ্চ বিন্দুতে পৌঁছার সময় বিবেচিত হতে পারে। প্রথমত, যথেচ্ছ আইন লঙ্ঘন অব্যাহত রাখার বদলে এখন কিছুটা হলেও রাশ টেনে ধরা হচ্ছে। যেসব সরকার তাদের দেশকে ধনী ও জনগণকে খুশি করতে চাইছে তারা জানে যে, তাদের বাজারগুলোকে আরো ভালোভাবে কাজ করতে দিতে হবে এবং সেগুলো নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করতে হবে। ব্রাজিল, হংকং ও ভারত বিশেষ কিছু লোককে সুযোগ দেওয়ার নীতির অবসান ঘটাতে বিধিবিধান জোরদার করা হচ্ছে। মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ইনরিক পেনা নাইটো তার দেশের টেলিকম ও মিডিয়া সিন্ডিকেট ভেঙে দিতে চান। চীন রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন তালুকদারিব্যবস্থা দমন করতে আন্তরিকভাবে আগ্রহী।

দ্বিতীয়ত, ব্যবসায় আর্থিক পৃষ্ঠপোষকতা বদলে যেতে পারে। উদীয়মান বাজারগুলোয় রাজনৈতিক যোগসাজশপূর্ণ শিল্পগুলোতে বিলিয়নিয়ারদের সম্পদ হ্রাস পাচ্ছে, ২০০৮ সালের ৭৬ শতাংশ থেকে কমে বর্তমানে ৫৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এর আংশিক কারণ সহজাত বিবর্তন। অর্থনীতি যত সমৃদ্ধ হচ্ছে, অবকাঠামো, পণ্যদ্রব্যের প্রাধান্য তত কমে যাচ্ছে। আমেরিকায় ১৯০০ থেকে ১৯৩০ সাল পর্যন্ত নতুন সম্পদ রেলওয়ে বা তেলের মাধ্যমে নয়, এসেছে খুচরা বিক্রি এবং গাড়ি থেকে। চীনে বর্তমানে মোটা অঙ্কের মুনাফা আসছে ইন্টারনেট থেকে, পার্টি যোগাযোগের মাধ্যমে পাওয়া ভূমিতে ভর্তুকিকৃত ঋণে স্থাপিত ভারী শিল্পপ্রতিষ্ঠান থেকে নয়। তবে এটা বিনিয়োগকারীদের সতর্কতাও প্রতিফলিত করছে : ভারতে ভয়াবহ দুর্নীতির একটি দশক অতিক্রম করার পর প্রযুক্তি ও ওষুধ শিল্পের মতো উন্মুক্ত ও উদ্ভাবনমুখী শিল্পপতিদের আবার উত্থান দেখা যাচ্ছে।

আশাবাদী হওয়ার শেষ কারণটি হলো রাজনীতিবিদদের পৃষ্ঠপোষকতাও বদলে গেছে। প্রবৃদ্ধি দ্রুতগতিতে মন্থর হয়ে যাওয়ায় অর্থনীতি উন্মুক্ত করার সংস্কার সাধন অতি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে পড়েছে। মেক্সিকোর মতো যেসব দেশের সরকার সংস্কার সাধন করছে এবং কায়েমি স্বার্থবাদী মহলগুলোকে দমন করার চেষ্টা করছে তারা অর্থ বাজারে তাদের ভীতিকর অবস্থা থেকে ভালোভাবে সুরক্ষা পাচ্ছে।

তবে আরো কিছু করার অবকাশ আছে। সরকারগুলোকে একচেটিয়ার কারবার নিয়ন্ত্রণ করা, প্রতিযোগিতার বিকাশ এবং সরকারি দরপত্র ও সম্পদ কেনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে এবং ঘুষ গ্রহণকারীদের শাস্তি দিতে আরো আন্তরিক ও কঠোর হতে হবে। যে তেজি পরিস্থিতি নতুন শ্রেণির ধনকুবের সৃষ্টি করেছে, সেটাই তার বিনাশকারী শত্রুও সৃষ্টি করেছে। সেটা হলো একটি নতুন শিক্ষিত নগরকেন্দ্রিক করদাতা মধ্যবিত্ত শ্রেণি। তারা পরিবর্তনের জন্য চাপ দিচ্ছে। আর স্বৈরতান্ত্রিক ও নির্বাচিত নেতারা ঝুঁকি নিয়েই এটা এড়িয়ে যাচ্ছেন।।