Home » শিল্প-সংস্কৃতি » স্বৈরাচার কেন ইতিহাস-ঐতিহ্য মুছে দিতে চায়?

স্বৈরাচার কেন ইতিহাস-ঐতিহ্য মুছে দিতে চায়?

ফ্লোরা সরকার

last 5এবারের বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসবের অন্যতম ছবি ‘দ্য মনুমেন্টস মেন’। ছবির ভয়েজ ওভারে ছবির পরিচালক এবং অভিনেতা জর্জ ক্লুনির কন্ঠে শোনা যায় – ‘কোনো দেশের ইতিহাস এবং ঐতিহ্য মুছে ফেলা পৃথিবীর সব থেকে নিকৃষ্টতম পাপকর্ম।’ যে পাপকর্মটি নাৎসি জমানায় জার্মানির হিটলার যা করেছিল, তারই ইঙ্গিত বহন করে এই উক্তি। দ্য মনুমেন্টস মেন নির্মিত হয়েছে ২০০৯ সালে প্রকাশিত রবার্ট এম. এডসেলের বই দ্য মনুমেন্টস মেন, নাজি থিভস্ অ্যান্ড দ্য গ্রেটেস্ট ট্রেজার হান্ট ইন হিসট্রি অবলম্বনে। রবার্ট এম এডসেল ২০০৬ সালে একই বিষয়ের ওপর নির্মিত ‘দ্য রেপ অফ ইউরোপ’ প্রামাণ্যচিত্রের সহকারি প্রযোজক ছিলেন। সে ছবির প্রধান চরিত্র স্টোক্স নাৎসি বাহিনী কর্তৃক আত্মসাৎকৃত পুরাকৃর্তি পুনরুদ্ধারের অভিযানে যাবার প্রাক্কালে বলেন – ‘এসব উদ্ধার না করলে ভবিষ্যতে কে আমাদের নিশ্চয়তা দেবে যে ডেভিড (মিকেলেঞ্জেলো) এখনো দাঁড়িয়ে আছে এবং মোনলিসার (লিওনার্দো দা ভিঞ্চি) হাসি তার ঠোঁট থেকে মুছে যায়নি?’ ছবিতে বার বার একটি প্রশ্ন উত্থাপিত হতে দেখা যায় আর তা হলো মানুষের জীবনের মূল্যের চাইতে শিল্পের মূল্য অধিক কিনা। যে প্রশ্নের উত্তর আমরা কিছুক্ষণের মধ্যেই পেয়ে যাবো। তবে দ্য রেপ অফ ইউরোপের আগে নাৎসি জমানার পাপচার নিয়ে তারও আগে ১৯৬৪ সালে পরিচালক জন ফ্র্যাঙ্ককেনহেইমার ‘দ্য ট্রেন’ নির্মান করেছিলেন। ১৯৬৫ সালের ১৮ মার্চ নিউইয়োর্ক টাইমস এ বোসলে ক্রাউথার ছবিটির ওপর বেশ চমৎকার একটি আলোচনা করেন। ছবির একটি উল্লেখযোগ্য জায়গার আলোচনা প্রসঙ্গে বোসলে ক্রাউথার একটি দৃশ্যের কথা জানান। দৃশ্যটিতে দেখা যায় বার্ট ল্যানসেসটার নামের এক অন্তর্ঘাতক তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সহকর্মীকে বলছেন – ‘তুমি কি জানো, ঐ ট্রেনটি কিসের ইঙ্গিত করছে? জাতীয় ঐতিহ্য ! ফ্রান্সের গৌরব ! বেশ হাস্যকর না বিষয়টি?’ অন্য আরেক সমালোচনায় একই ছবির আরেকটি বিশেষ দিকে দৃষ্টিপাত করা হয়। ছবির আরেক চরিত্র লিবসে ফ্রান্সের এক গ্যালারি থেকে ছবি বাছাইয়ের সময়, যে চিত্রকর্মগুলো জার্মানিতে নিয়ে যাওয়া হবে সে প্রসঙ্গে গ্যালারির নারী দর্শক কিউরেটারকে বলেন – ‘আমার জীবনের মূল্যবান সময় এসব চিত্রকর্মের পেছনে মোটেও সময় নষ্ট করে ব্যয় করতে চাইনা’ উত্তরে কিউরেটার বলেন – ‘মাপ করবেন, এসব সময় নষ্টের বিষয় না। এসব চিত্রকর্ম ফ্রান্সের। জার্মানি প্রথমে আমাদের ভূমি কেড়ে নিলো, তারপর খাদ্য, তারা আমাদের বাড়িতে বসবাস করছে। এখন আমাদের চিত্রকর্ম কেড়ে নিচ্ছে, কেড়ে নিচ্ছে আমাদের সৌন্দর্য, আমাদের বিশ্বাস, যে বিশ্বাসের ওপর দাঁড়িয়ে এসব চিত্রকর্ম নির্মিত হয়েছিলো। যে গৌরব আমরা নির্মাণ করেছিলাম এবং পৃথিবীর বুকে রেখে যেতে চেয়েছিলাম। এসব হারানোর মতো নিকৃষ্ট কিছু আর হতে পারেনা।’ সেই সময় একই ট্রেনে বন্দীদের গাদাগাদি করে নিয়ে যাওয়া হতো, কিন্তু পুরার্কীতি নেয়ার সময় মনে করা হতো এসব মানুষের চাইতে পুরার্কীতি সরিয়ে নিয়ে যাওয়া অধিক জরুরী। কিন্তু কেনো?

প্রশ্নটির উত্তর নিহিত আছে দ্য মনুমেন্টস মেন ছবির সেই ভয়েজওভারের মাঝে। যেখানে কোনো দেশের ইতিহাসঐতিহ্য মুছে ফেলাকে নিকৃষ্টতম পাপাচার বলে উল্লেখ করা হয়েছে। কোনো দেশের স্থাপত্য, চিত্রকর্ম, পুরর্কীতি মুছে ফেলার অর্থই হলো সে দেশের ইতিহাস ঐতিহ্য মুছে ফেলা। আর ইতিহাস মুছে ফেলার অর্থ সে দেশের অস্তিত্বকে মুছে ফেলা। ইতিহাসের পাতায় কোনোদিন তার অস্তিত্ব ছিলো তা অস্বীকার করা। যেকোনো দেশে ঐতিহ্যসংস্কৃতি ধরে রাখা হয় তার শিল্পস্থাপত্যের মধ্যে। তাই মানুষের জীবনের চাইতেও ঐতিহ্যের মূল্যকে অধিক মূল্য দেয়া হয়। কেননা ইতিহাসঐতিহ্যের বিলুপ্তি মানে সেই মানুষসহ তার সভ্যতা, সংস্কৃতি আর অস্তিত্বের বিলুপ্তি। নাৎসি সময়ে হিটলার বাহিনীর এসব ঐতিহ্যকে নিশ্চিহ্ন করা ছিলো তাদের অন্যতম একটি উদ্দেশ্য। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় প্রায় পঞ্চাশ লক্ষ পুরার্কীতি জার্মানির থার্ড রেইখে নিয়ে যাওয়া হয়। সরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে বাম বা আধুনিক শিল্পীদের তাদের স্ব স্ব পদ থেকে সরিয়ে ফেলা হয়। অধিকৃত দেশের কোনো বাড়িতে তারপিন তেলের গন্ধ পেলে সেই বাড়ির লোকদের জেলে ভরা হতো। আরনেস্ট লুদভিগ ক্রিশনারের প্রায় ছয় শ ছবি বিক্রি বা ধবংস করা হয়। যে শিল্পী পরে ১৯৩৮ সালে আত্মহত্যা করেন। যুদ্ধ শেষে অনেক পুরার্কীতি পুনরুদ্ধার করা গেলেও যুদ্ধকালীন আত্মসাতের ঘটনা নিয়ে এই পর্যন্ত নির্মিত হয়েছে বেশ কয়েকটা ছবি। তারই সর্বশেষ রূপদান ‘দ্য মনুমেন্টস মেন’ যা এবারের চৌষট্টিতম বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হয়। উৎসবের আরো কয়েকটা ছবি নিয়ে আমরা আলোচনা করবো। দ্য মনুমেন্টস মেন নিয়ে প্রথম পর্বে আমরা আলোচনা করলাম। তাছাড়া এই ছবির কারণে বিভিন্ন দেশের পুরার্কীতি ধ্বংসের প্রশ্নটি নতুন করে আবার উঁকি দিয়েছে। ছবিটির গুরুত্ব অস্বীকার করা না গেলেও, যে বিষয়টা আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে তা হলো পশ্চিম কখনোই নিজের দিকে মুখ ঘুরিয়ে তাকায় না। অন্যের দ্বারা নিজেদের ধ্বংসের কাহিনীর বয়ান তাদের মুখ থেকে যতটা সোচ্চার কন্ঠে প্রষ্ফুটিত হয় নিজেদের বেলায় ঠিক ততটাই তারা নিশ্চুপ। নাৎসি কর্তৃক পুরার্কীতি ধ্বংসের ইতিহাসের চিত্র তিনচারবার চিত্রায়িত হয় কিন্তু তারা ভুলে যান ২০০৩ সালের ইরাক আক্রমনের পর সেখানকার ধ্বংসের ইতিহাস। যে ইরাকের পাঁচ হাজার বছরের সভ্যতার পুরার্কীতির প্রায় পঞ্চাশ হাজার আমেরিকা আত্মসাৎ করে নেয় সেই সময়ে। যে পুরার্কীতির ওপর ইরাক সভ্যতার শিল্পসংস্কৃতি দাঁড়িয়েছিলো। তা নিয়ে কোনো চলচ্চিত্র নির্মিত হয়না। আর তাই রলফ রসমেইস, যিনি ‘ রেপ অফ ইউরোপ’ ছবির অন্যতম একজন জার্মান গবেষক, তার মুখে যখন বলতে শোনা যায় – ‘মানবতার জন্যেই শিল্পকর্ম। এছাড়া আমরা পশু ছাড়া আর কিছু না। শিল্পই আমাদের মানুষ হিসেবে গড়ে তোলে’ তখন মানবতার এসব অসাড় বাণী হাস্যকর হয়ে ওঠে। মানবতা চিরকাল যেনো পশ্চিমের একক সম্পত্তি। ভিন্ন দেশের বেলায় ভিন্ন সুর শোনা যায় তাদের মুখে।।