Home » রাজনীতি » তারেকের বাচালতা প্রধানমন্ত্রীর কূটকৌশল :: আসল ব্যক্তি নিরাপদে

তারেকের বাচালতা প্রধানমন্ত্রীর কূটকৌশল :: আসল ব্যক্তি নিরাপদে

শাহাদত হোসেন বাচ্চু

Dis-1একটি হাইপোথিসিস দিয়ে শুরু করা যাক। হাইপোথিসিসটি তারেক জিয়াকে নিয়ে। একজন উদীয়মান তরুন রাজনীতিক তারেক জিয়া প্রায় সাত বছর আগে বাংলাদেশ ছেড়েছিলেন সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে, ভয়াবহ নির্যাতনের শিকার হয়ে। শর্তাধীন প্যারোলে মুক্তি নিয়ে চিকিৎসার জন্য বিলেত যাত্রা করেছিলেন। সেই থেকে বিলেতেই তার ঘাঁটি, লাভ করেছেন রাজনৈতিক আশ্রয়, সেখান থেকেই দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে দল পরিচালনায় অবদান রাখছেন। দলের তরুন তুর্কীরা তাকে ভাইয়া হিসেবে ঘিরে থাকছেন সব সময়। এই ঘিরে থাকা গ্রুপটি বিলেতে তাদের ভাইয়াকে সম্ভবত বোঝাতে সক্ষম হয়েছেন দেশে না থেকেও কিভাবে রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতে হবে। তারা এও বোঝাতে সক্ষম হয়ে থাকতে পারেন, তারেক এখন বিলেতে বসে যে বাণী দেবেন, সেটিই তার জন্য, দলের জন্য ঐতিহাসিক সত্যি হয়ে ভবিষ্যতে ঠাঁই করে নেবে। এই হাইপোথিসিসের মূল কারনটি হচ্ছে, তারেক জিয়ার সাম্প্রতিক বেশ কিছু অসংলগ্ন বক্তব্য, বিবৃতি, কথাবার্তা, যাই বলি না কেন তার প্রয়াত পিতা বা বিএনপির প্রতিষ্ঠাকালীন নেতৃত্বের মুখ থেকে এসব বক্তব্য কখনই শোনা গেছে বলে মনে করা যাচ্ছে না। যেমন, জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি, শেখ মুজিব কোন রাষ্ট্রনায়ক ছিলেন না এবং অতিসম্প্রতি বলেছেন, জিয়া হত্যার বিচারে শেখ হাসিনাকে রিমান্ডে নেয়ার কথা!

আমরা জানি না, এই হাইপোথিসিসটি কতোটা সত্যি? তবে ঘটনাক্রম যেভাবে এগোচ্ছে এবং রাজনীতির মূল সমস্যাকে পাশ কাটিয়ে দলের অন্যতম প্রধান নেতা হিসেবে তারেক জিয়া যেভাবে অতীতাশ্রয়ী ও ইতিহাসাশ্রয়ী হচ্ছেন, তাতে এ কথা মনে করার যথেষ্ট কারন রয়েছে যে, বিলেতে বসে দেশের মূল রাজনৈতিক সংকটটি তিনি ধরতে পারছেন না অথবা তাকে ধরতে দেয়া হচ্ছে না। এ কারনে তিনি ক্রমাগত বিতর্কিত বক্তব্য দিয়ে চলেছেন এবং আওয়ামী লীগকে সুযোগ করে দিচ্ছেন দেশজুড়ে এসব ইস্যু নিয়ে মাঠ গরম করে তুলতে। অন্যদিকে, বিএনপি নেতৃত্বের বড় অংশটির, এ বিষয়ে তাদের ঐক্যমত্য থাকুক বা না থাকুক, দলের প্রধান নেতার সন্তুষ্টির জন্য তার পক্ষে বক্তব্য দিয়েই যেতে হচ্ছে। দেশের প্রায় অর্ধেক জনগোষ্ঠির সমর্থন থাকা এই দলটির অনেক সমর্থকদের এখন প্রশ্ন হচ্ছে, তারেক জিয়া আসলে কি চাচ্ছেন? জিয়াউর রহমানকে ৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে কার পরিকল্পনায় হত্যা করা হয়েছিল সেটি সারা বাংলাদেশের মানুষ এখন জানে। এই নিয়ে নতুন করে তারেক জিয়া একটি বিতর্কিত বক্তব্য দিলে ক্ষমতাসীনরা সেটি লুফে নেবেন এটিই স্বাভাবিক এবং জিয়া হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী অতীতের মত এটা ভেবে স্বস্তি বোধ করবেন যে, তিনি নিরাপদ থেকেই যাচ্ছেন। যেমন আছেন গত প্রায় পঁচিশ বছর ধরে।

তারেক জিয়ার বক্তব্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা লুফে নেবেন এটি তাঁকে যারা ভালভাবে চেনেন তাদের কাছে অস্বাভাবিক বলে মনে হবে না। এর আগেও কি প্রধানমন্ত্রী বা বিরোধী দলীয় নেত্রী হিসেবে শেখ হাসিনা এমন সব বানী দিয়েছেন যা তার পদ বা পদমর্যাদার সাথে শোভন নয়। জিএসপি বাতিল প্রসঙ্গে ওয়াশিংটন পোষ্টে খালেদা জিয়ার কথিত নিবন্ধ নিয়ে সমালোচনা করতে গিয়ে এক পর্যায়ে তিনি যখন প্রতিপক্ষকে উদ্দেশ্য করে বলেন, নালিশ করে বালিশ পেয়েছেনএটা শুনে যে কেউ হতভম্ব হয়ে যেতে পারেনঠিকঠাক্ শুনছি তো, কথা বলছেন প্রধানমন্ত্রী, যিনি সংসদ নেত্রীও বটেন! সুতরাং এই ধারাবাহিকতায় চীন থেকে ফিরে এসে সংবাদ সম্মেলনে তার বক্তব্য, মা চায় সংলাপ, ব্যাটা বলে জিয়া হত্যার ঘটনায় আমাকে রিমান্ডে নেবে। আগে তারাই ঠিক করুক আসলে তারা কি চায়। তারেকের বক্তব্যর জবাব দিতে গিয়ে শেখ হাসিনা বলেই ফেললেন, জিয়া হত্যার ঘটনায় কাউকে রিমান্ডে নিতে হলে তার স্ত্রী খালেদা জিয়া ও ছেলে তারেক জিয়াকে নিতে হবে। সম্পৃক্ততা কতটুকু তা দেখতেই তাদের রিমান্ডে নেয়া উচিত

শেখ হাসিনা বাংলাদেশের তিনতিনবারের প্রধানমন্ত্রী, দুবার বিরোধী দলীয় নেত্রী, একটি সফল ডাইন্যাষ্টির উত্তরাধিকার, যার স্কন্ধে রাষ্ট্র পরিচালনার মত গুরু দায়িত্ব তিনি যখন এসব কথা বলেন তখন তা প্রমান করার দায়িত্বও তার ওপরে বর্তায়। কারন তিনি কথা বলছেন একজন সাবেক রাষ্ট্র প্রধানের হত্যাকান্ড নিয়ে। যেটি এখনও বিচারের আলোয় আসেনি। বিএনপি তিনতিনবার ক্ষমতায় থেকে কেন তাদের দলের প্রতিষ্ঠাতা জিয়া হত্যার বিচার করেনি সেটি নিয়ে রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে শেখ হাসিনা তখনই তাদের অভিযুক্ত করতে পারবেন, যখন নাকি তার সরকার এই বিচারের জন্য পূর্নাঙ্গ তদন্ত শুরু করবেন। কিন্তু জিয়া হত্যাকান্ডের সাথে জড়িত থাকার কথিত অভিযুক্ত ব্যক্তিটি গত ছয় বছর ধরে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অন্যতম অংশীদার এবং সবশেষে তাঁরই নিযুক্ত বিশেষ দূত হিসেবে মন্ত্রীর মর্যাদায়। অন্যদিকে পিতৃহত্যার বিচার চাওয়ার ক্ষেত্রে বা কাউকে অভিযুক্ত করার বিষয়টি নৈতিক অধিকার তারেক জিয়া প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছেন ২০০৬ সাল থেকে। নোংরা রাজনীতির কূটিল খেলায় তিনি দ্বারস্থ হয়েছিলেন যে এরশাদের কাছে, তার বিরুদ্ধেই জিয়া হত্যাকান্ডের যুক্ততার অভিযোগ সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত। সুতরাং এই নৈতিক স্খলন এবং বিচার না করতে পারার ব্যর্থতা তারেক জিয়া শেখ হাসিনার ঘাড়ে চাপাতে গিয়ে প্রকারান্তরে নিজেদের রাজনৈতিক দেউলিয়াত্ব আরো প্রকট করে তুলছেন।

প্রধানমন্ত্রী প্রায়শ: ইতিহাস বিকৃতির দায় চাপিয়ে থাকেন তার প্রতিপক্ষের ঘাড়ে। যেমনটি তিনি উল্লেখিত সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, ১৯৯০ সালে প্রথম খালেদা জিয়া স্বামীর হত্যাকারী বলে এরশাদকে স্বীকার করেন। তাহলে কেন তার কাছ থেকে দুটি বাড়ি, গাড়ি ও নগদ টাকা নিলেন? রহস্য কি?রহস্যটা জানেন শেখ হাসিনা। কারন তার দেয়া এই তথ্যটি একটি বড় ঐতিহাসিক ভুল। তার লেভেলের একজন মানুষ নিশ্চয়ই অনিচ্ছাকৃতভাবে এই ভুল তথ্যটি দেননি। এ কথা সত্য যে, তিনি বাড়ি, গাড়ি, নগদ অর্থ নিয়েছিলেন। তবে সেটা এরশাদের কাছ থেকে না। জিয়া নিহত হবার পরে রাষ্ট্রপতি সাত্তার তৎকালীন জাতীয় সংসদের অনুমোদনক্রমে প্রয়াত রাষ্ট্রপতির পরিবারকে এসব বরাদ্দ দিয়েছিলেন। এটি নিয়ে অন্য বিতর্ক চলতে পারে, কিন্তু এরশাদ এটি বরাদ্দ দিয়েছিলেন, সেটি ঐতিহাসিক সত্যের অপালাপ। ক্ষমতায় থাকতে যিনি নিজের জন্য প্রধানমন্ত্রীর রাষ্ট্রীয় ভবন গনভবন বরাদ্দ দেন, তাকে অন্তত এ সকল বিষয়ে একটু ভেবেচিন্তে কথা বললে জাতির জন্য সহনীয় হবে। রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মান প্রসঙ্গে একই সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, অদ্ভুত চিন্তার কিছু লোক আছে আমাদের দেশে। না জেনে এবং সেখানে না গিয়েই তারা আন্দোলন করছেন। পশুর নদীর তীরে ডোবা জায়গা ভরাট করে এই বিদ্যুৎকেন্দ্র হয়েছে। সেখানেও রাস্তা ঘাট করা হচ্ছে। এই কেন্দ্র নির্মান করায় পরিবেশের খুব একটা ক্ষতি হবে না

ধান ও চিংড়ি সমৃদ্ধ রামপাল উপজেলার গৌরম্ভা ইউনিয়নে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মানে প্রস্তাবিত ১৮ হাজার একরের মধ্যে ইতিমধ্যেই ১৮৩৪ একর জমি অধিগ্রহন করা হয়েছে। এর মধ্যে খাস জমি মাত্র ৮৬.১৬ একর, বাকী সবটাই ব্যক্তি মালিকানাধীন জমি। সুতরাং মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যে তথ্যটি দিয়েছেন পশুর নদীর ডোবা ভরাট করে এই বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মান হচ্ছে সেটি মোটেই সঠিক নয়। অথচ তিনিই আবার বলছেন, অদ্ভুত কিছু লোকের কথা যারা সেখানে না গিয়ে আন্দোলন করছে। তিনি বোধহয় জানেন না, অথবা তাকে জানানো হয়নি বা জানার দরকার মনে করছেন না, সহস্রাধিক মানুষের বাপদাদার ভিটেবাড়িজমি অধিগ্রহন করে এই বিদ্যুৎকেন্দ্রটি নির্মিত হচ্ছে। আর এই আন্দোলনটি কৃষি জমি ও পরিবেশ বাঁচাতে সুন্দরবন রক্ষার আন্দোলন। তার সরকারইতো ইতিমধ্যেই জেল জরিমানার বিধান রেখে কৃষি জমি সুরক্ষা ও ভূমি জোনিং আইন তৈরি করেছে। আইনে কৃষি জমিতে বসতবাড়ি বা শিল্প কারখানাসহ যেকোন প্রতিষ্ঠান স্থাপনে সরকারের অনুমতি বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। আইন অমান্যকারীর বিরুদ্ধে দুবছরের কারাদন্ড এবং ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত আর্থিক দন্ডের বিধান থাকছে।

প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে সারাদেশের জনগন অত্যন্ত দায়িত্বশীল বক্তব্য আশা করে। কারন তিনি রাষ্ট্রের ও সরকারের সর্বোচ্চ নির্বাহী এবং আমাদের প্রচলিত ব্যবস্থায় সীমাহীন ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের অধিকারী। জনগন বিশ্বাস করে যে, জনগনকে সঠিক তথ্য প্রদান তার সাংবিধানিক দায়িত্ব এবং শপথের অংশ। সেজন্যই তিনি যে কোন জায়গায় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে যে কোন বক্তব্য দেবেন সেটি অবশ্যই প্রমানিত সত্য অথবা তা প্রমানের দায় তার ওপরেই বর্তাবে। তিনি কোন মেঠো রাজনীতিবিদ নন, যে চাইলেই যে কারো বক্তব্যে প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করে নালিশ করে বালিশ পেয়েছেন বা খালেদা জিয়া ও তারেক জিয়াকে রিমান্ডে নেয়া উচিত গোছের লোক হাসানো বক্তব্য দিতে পারেন না। যতক্ষণ তিনি প্রধানমন্ত্রীর চেয়ারে রয়েছেন ততক্ষণ পর্যন্ত তাকে দায়িত্বশীল বক্তব্যই দিতে হবে কারন তাঁর যে কোন বক্তব্য সরকার ও জাতির জন্য দিক নির্দেশনা। জাপান ও চীন সফরের পর আয়োজিত দুটি সংবাদ সম্মেলনে প্রতিপক্ষের বক্তব্যর জবাব দিতে গিয়ে যে সব কথা তিনি বলেছেন, তা রাজনীতিবিদ হিসেবে পরস্পরের প্রতি বিষোদগার হতে পারে, কিন্তু কোনক্রমেই দায়িত্বশীল প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য বলে ধরে নেয়া যায় না।

এই নিবন্ধের শেষটি করতে চাই, রবীন্দ্রনাথের পথ ও পাথেয় প্রবন্ধ গ্রন্থ থেকে তাঁর কিছু বাণী উদ্বৃত করে। লোকের চিত্ত উত্তেজিত হইয়া আছে। উত্তেজনা এতই তীব্র যে সকল সাংঘাতিক ব্যাপার আমাদের দেশে অসম্ভব বলে মনে করা যাইত, তাহাও সম্ভবপর হইয়াছে। বিরোধবুদ্ধি এতই গভীর এবং সুদৃঢ়বিস্মৃতভাবে ব্যাপ্ত যে, কর্তৃপক্ষ ইহাকে বলপূর্বক কেবল স্থানে স্থানে উৎপাটিত করিতে চেষ্টা করিয়া কখনই নি:শেষ করিতে পারিবেন না, বরঞ্চ ইহাকে আরো প্রবল ও প্রকান্ড করিয়া তুলিবেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, দেড়শ বছর পরেও রবীন্দ্রনাথ আমাদের জন্য এখনও কতই না প্রাসঙ্গিক!