Home » রাজনীতি » মানুষের স্মৃতি ছিনতাই

মানুষের স্মৃতি ছিনতাই

ফারুক আহমেদ

http://www.dreamstime.com/royalty-free-stock-image-image34080156গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বহুদলীয় ব্যবস্থা অত্যবশ্যক। আবার রাজনৈতিক দলগুলোও জনগণের কাছে দায়বদ্ধ। রাষ্ট্র পরিচালনার ব্যাপারে এবং জনগণের জন্য ওই রাজনৈতিক দলের কর্মসূচি কি তা জানানোও অপরিহার্য। কাজেই জনগণের সাথে রাজনৈতিক দলের সম্পর্কটি এমন হতে হবে যাতে কিনা জনগণ সার্বক্ষণিকভাবে রাজনৈতিক দলগুলোর কর্মসূচির ব্যাপারে অবহিত থাকে। এই রাজনৈতিক দলই যখন নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় যায় তখন জনগণকে দেয়া প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়ন করতে হয়। এটা হচ্ছে একটি সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক সমাজের মূল চালিকা শক্তি। কিন্তু বাংলাদেশের দুর্ভাগ্য হচ্ছে, এখানে কখনই তা সামরিক হোক কিংবা বেসামরিক শাসনই হোক জনগণের কাছে জবাবদিহিতার প্রশ্নটি অনুপস্থিত। কারণ হচ্ছে, এ দেশটিতে কখনই পরিচ্ছন্ন গণতান্ত্রিক চর্চা হয়নি। বর্তমানে যে পরিস্থিতি চলছে তা এই বিচারে ভয়ংকর। জনগণ দেখছে ক্ষমতায় থাকলেই বল প্রয়োগ করে ক্ষমতা ধরে রাখার সংষ্কৃতি। জনগণকে দেয়া প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের সংস্কৃতি। ক্ষমতাসীন দলের লুন্ঠন, দখল, চাঁদাবাজি, হত্যা, সন্ত্রাস সহ জনগণের ওপর সব ধরনের জুলুম নির্যাতনের সংষ্কৃতি। একটি অবিশাস্য ঘটনা ঘটার পর আরেকটি ঘটনা আরো বেশি অবিশাস্যভাবে ঘটে। এর মধ্যদিয়ে আগের ঘটনাটি ঢাকা পড়ে যায় বা চাপা পড়ে যায়। একটি ঢেউ যেমন আগের ঢেউটিকে মুছে দেয়, ঠিক তেমনই শাসক দল জনগণের স্মৃতির উপরেও আধিপত্য বজায় রাখতে চায়। তারা চায়, জনগণের স্মৃতি দখলে রাখতে। কারণ তারা জনগণের স্মৃতি শক্তিকে ভয় পায় তাদেরই অপকর্মের জন্য। কিন্তু মানুষের স্মৃতি মুছে ফেলা বা দখলে নেয়া সম্ভব নয়।

বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে এমন সব ঘটনা ঘটছে যা রীতিমতো ভয়ংকর এবং আতকে ওঠার মতো। ২০১২ সালের ৯ ডিসেম্বর বাংলাদেশের মানুষ এক অবিশাস্য হিংস্র বর্বরতা প্রত্যক্ষ করে বিশ্বজিৎ হত্যাকাণ্ডের মধ্যদিয়ে। এই নির্মম ঘটনার মধ্যদিয়ে চাপা পড়ে যায় শেয়ার বাজার কেলেংকারিতে হাজার হাজার মানুষের সবকিছু হারিয়ে পথে বসার ঘটনা। আবার তখনই হলমার্ক কেলেংকারিতে সর্বশান্ত হওয়া সেই সব মানুষের মুখগুলো আড়াল করে দেওয়া হলো। তার সাথে সাথে আড়াল করে দেওয়া হলো যারা এই কেলেংকারীর মধ্যদিয়ে হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাট করে নিয়েছিল তাদেরকেও। এরপর সাগররুনির হত্যাকান্ডের বিচারের দাবি জনগণের স্মৃতিপটে যতটুকু ধরে রেখেছিল নানা ঘটনায় তাও উধাও হয়ে যায়। ২০১৩ সালের ১৯ জানুয়ারীতে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের তান্ডবে গুলিতে নিহত হয় ১০ বছর বয়সের শিশু রাব্বি। শিশু রাব্বির মৃত্যুর ঘটনা ঘটার সাথে সাথেই ছাত্রলীগের মধ্যযুগীয় তান্ডবে ১০ জানুয়ারিতে রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের ওপর এসিড সন্ত্রাস, ১২ জানুয়ারীতে কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের ওপর হামলা এবং নির্যাতন। চাপা পড়ে যায় ৯ জানুয়ারীতে রংপুর মেডিকেল কলেজে ছাত্রী হোস্টেলে ৫০৬০ জন ছাত্রলীগ কর্মীর সশস্ত্র হামলার মধ্যদিয়ে ছাত্রী নির্যাতন এবং শ্লীলতাহানির ঘটনা। রানা প্লাজার ধ্বংসস্তুপের নীচে শুধু সেখানকার অসংখ্য নিহত, নিখোঁজ আর আহত শ্রমিক এবং তাদের স্বজনদের আহাজারিতে চাপা পড়ে যায় তাজরিন ফ্যাশনে জীবন্ত দগ্ধ হয়ে প্রাণ হারানো এবং নিখোঁজ শ্রমিকের দগদগে স্মৃতি। ঘটনার তান্ডবে মানুষের স্মৃতিপট থেকে মুছে ফেলা হয়েছে জমি কেড়ে নেওয়ার বিরূদ্ধে রুখে দাঁড়ানো রুপগঞ্জের মানুষের ওপর নির্যাতন, হত্যা এবং গুম করে দেওয়ার স্মৃতি, আড়িয়াল বিলের জমি রক্ষার আন্দোলনে নামা মানুষের উপর নির্যাতনের স্মৃতি সহ সারা দেশের অসংখ্য নির্মম ঘটনার স্মৃতি। এরই ধারাবাহিকতায় একের পর এক ঘটতে থাকা ঘটনার এক পর্যায়ে চলে আসে নারায়ণগঞ্জ, লক্ষ্মীপুর, ফেনীর ঘটনা।

আর এসব ঘটনার মধ্যদিয়ে ঘটনার আকস্মিকতায় চাপা পড়ে যায় ক্রমাগত বাড়তে থাকা নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য, গ্যাস, বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি, হত্যা, গুম, খুন, সন্ত্রাস, অপহরণ, দখল, টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, যৌন সন্ত্রাস, সীমান্ত হত্যা, ট্রানজিটসহ সবকিছু। মানুষকে ভুলিয়ে দেয়ার চেষ্টা হচ্ছে ৫ জানুয়ারির নির্বাচন, তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বিলোপসহ সবকিছু।

কারণ স্বৈরাচার সবকিছুকে ভুলিয়ে দিতে চায়। ছিনতাই করতে চায়, দখলে নিতে চায় মানুষের স্মৃতি। কিন্তু এটা সত্য যে, মানুষের স্মৃতি ছিনতাই করা যায় না, দখলে নেয়া যায় না।।