Home » আন্তর্জাতিক » ৫ জানুয়ারির নির্বাচন এবং মিশরে সিসির ক্ষমতা দখল

৫ জানুয়ারির নির্বাচন এবং মিশরে সিসির ক্ষমতা দখল

আবীর হাসান

Dis-2সকল প্রশংসা নতুন সম্রাটেরসুন্দর শিরোনাম, তবে বাংলাদেশ নিয়ে কোন লেখার নয়। শিরোনামটি রবার্ট ফিস্কের মিশরের নির্বাচন নিয়ে। আর তা হবেই বা কেন বাংলাদেশে তো আর রাজতন্ত্র নেই। গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা শুধু নয়, সংসদীয় পদ্ধতির সরকার জারি আছে। যে লেখাটার কথা বলছি সেটা মিশর নিয়ে লেখা। লিখেছেন রবার্ট ফিস্ক ইংল্যান্ডের দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট পত্রিকার মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক দীর্ঘদিনের সংবাদদাতা এবং বর্তমানে ওই একই বিষয়ে বিশ্লেষক। রবার্ট ফিস্ক যথেষ্ট জনপ্রিয়, অভিজ্ঞ এবং সত্য প্রকাশের জন্য খ্যাতিমান। গত ১২ জুন বাংলাদেশের একটি জাতীয় দৈনিকে তার প্রকাশিত ওই লেখাটায় তিনি মিশরের নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট সাবেক ফিল্ড মার্শাল আবদেল ফাত্তাহ আল সিসিকে নতুন সম্রাট বলে অভিহিত করেছেন এবং বলেছেন, আধুনিক আরবের অন্য অবিনাশী দানবদের কাতারে উঠে আসার কথা। বিষয়টার মধ্যে অসত্য কিছু নেই। সিসির অভিষেক অনুষ্ঠানে সৌদি আরবের বাদশাহ, জর্ডানের বাদশাহ, কাতার ছাড়া অন্যান্য রাজতান্ত্রিক দেশগুলোর আমীররা উপস্থিত হয়ে সিসিকে সম্মান জানিয়েছেন। কাতারের ওমরের তোয়াক্কা করেননি। কারণ সাম্প্রতিক তেহরানমার্কিন সখ্য তাদের সঙ্গে মার্কিন প্রশাসনের সম্পর্ককে আপাতঃ শীতল করে রেখেছে। এসব ভিন্ন প্রসঙ্গ। তবে ফিস্ক যেটা বলতে চেয়েছেন, আবদেল ফাত্তাহ আল সিসি দাবি করেছেন, তিনি ৯৩ শতাংশ ভোট পেয়েছেন। কিন্তু সেই ৯৩ শতাংশ হচ্ছে মোট ভোট দাতা ৪৬ শতাংশ ভোটারের দেয়া রায়। অর্থাৎ ৫০ শতাংশ মানুষও যে সিসিকে সমর্থন করেনি সেটাই বোঝাতে চেয়েছেন রবার্ট ফিস্ক। তবে যে কারণে ফিস্ক ব্যাঙ্গ করে সিসিকে নতুন সম্রাট বলেছেন, সে কারণটা হলো সিসি ঘোষণা করেছেন মিশরীয়দের আরও ২০ বছর বহুদলীয় গণতন্ত্রের জন্য অপেক্ষা করতে হবে। অর্থাৎ সহজে ক্ষমতা ছাড়ছেন না সিসি। তবে এক জায়গায় গিয়ে হোচট খেয়েছেন রবার্ট ফিস্ক। তিনি লিখেছেন সিসির প্রতিপক্ষ (অর্থাৎ নির্বাচনে একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বীতাকারী) হামাদিন সাবাহি সত্যিকার অর্থেই একজন ভাগ্য বিড়ম্বিত ব্যক্তি। তিনি মাত্র ৩ শতাংশ ভোট পেয়েছেন এটা আসলেই হাস্যকর। সাবাহি প্রকৃত অর্থেই একজন সাহসী ব্যক্তি, তিনি মোবারকের গুন্ডাদের হাতে মার খেয়েছিলেন, তাকে জেলেও পোড়া হয়েছিল। এটা এক অর্থে সম্মানের বিষয়। কিন্তু তিনি কেন ভোটে দাড়ালেন সেটাই ভেবে পাই না।

রবার্ট ফিস্ক প্রমুখ পশ্চিমা সাংবাদিকদের সত্য উদঘাটন এবং প্রকাশের জন্য যেমন সুনাম আছে তেমনি তাদের কিছু সীমাবদ্ধতাও আছে। তাদের মূল্যবোধ পশ্চিমা গণতন্ত্রের আপাতঃ সুবোধ চরিত্রটার প্রতি প্রচন্ড রকমের দায়বদ্ধ যদিও তারা বৃটেনমার্কিন পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে সমালোচনামুখর। আর ঠিক এ কারণেই তিনি হামাদিন সাবাহির নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বীতা করার কারণ খুজে পাননি। সাবাহির প্রকৃত পরিচয়টাও তিনি তুলে ধরেননি। সাবাহির পরিচয় হলো তিনি সাবেক সোভিয়েতপন্থী বামঘরানার রাজনীতিবিদ। সেক্ষেত্রে মধ্যপ্রাচ্যের রাজতান্ত্রিক দেশগুলোর কাছ থেকে পেট্রো ডলার খেয়ে নির্বাচনে দাড়িয়েছিলেন এমন স্খলনের কথা ভাবা যায় না। সেক্ষেত্রে অন্য একটা ফ্যাক্টর কাজ করেছে যেটা অনেকটাই নিশ্চিত। হামাদিনের দল স্যোসালিস্ট মুভমেন্ট এখনো পর্যন্ত মস্কোর সঙ্গে তো বটেই বেইজিংএর সঙ্গেও সম্পর্ক রক্ষা করে চলেছে। আর এটাই পরিস্কার বোঝা যাচ্ছে যে, এই নতুন উত্থিত শক্তি হামাদিনকে দাড় করিয়েছিল। সেটা তার বা তার দলের আদর্শ রক্ষার জন্য নয় বরং সিসিকে নির্বাচিত হওয়ার ব্যাপারে গ্রহণযোগ্যতা দেয়ার জন্য। কারণ বাজার এবং অক্ষ শক্তি হিসাবে উত্থানের জন্য মিশর বা এ ধরনের কিছু উন্নয়নশীল ও স্বল্পোন্নত দেশের সমর্থন তাদের প্রয়োজন। আর এর বিনিময়ে সিসি অদূর ভবিষ্যতে যেটা করবেন তাহচ্ছে, আরবের রাজতন্ত্রগুলোর সঙ্গে মস্কোবেইজিংএর একটা সুসম্পর্কের ভিত্তি তৈরি। রবার্ট ফিস্ক মিশরের স্বৈরশাসকদের একটা তালিকা দিয়েছেন যাতে দেখা যায়, নাসের, আনোয়ার সাদাত, হোসনি মোবারক সবার নামই আছে। তবে এটা তিনি উল্লেখ করেননি যে, এরা সবাই তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের মিত্র ছিল। আসলে ফিস্ক যেটা নিয়ে হাহাকার করছেন সেটা হলো, ৪৩ শতাংশ ভোটার ভোট দিল আর তার ৯৩.৩ শতাংশ ভোট সিসি পেয়ে গেলেন এটা এক মহাজালিয়াতি আর ওই নির্বাচনের পর তিনি ক্ষমতায় কতদিন থাকবেন তাও কোন ঠিক ঠিকানা নেই। আপাতত ২০ বছর বলেছেন সিসি। তারপরেও তিনি অব্যাহত ভাবে ক্ষমতা ধরে রাখবেন এটাই ফিস্ককে ভাবাচ্ছে। এর বিপরীতে ইঙ্গমার্কিন শক্তি কিছুই করতে পারছে না কেন এই প্রশ্নও তিনি করেছেন।

রবার্ট ফিস্ক যদি বাংলাদেশের বিষয়টা বুঝতেন তাহলে এতোটা হাহাকার তার ঝরে পড়তো না। এ যুগে যে মিশরের চেয়ে জঘন্য নির্বাচন হতে পারে এবং সেই ক্ষমতা বলে সরকার অব্যাহত রাখার আবদার ক্ষমতাসীনরা কিসের জোরে করতে পারে সেটাও বুঝতেন। বাংলাদেশে ফিস্কের নিজের দেশ বৃটেনমার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের কূটনৈতিকদের সরব উপস্থিতি দৃশ্যমাণ যেমন ছিল মুরসির শাসন শুরুর আগে মিশরেও। কিন্তু মুরসি পশ্চিমাদের কাচকলা দেখিয়ে ইসলামী জান্ডা উড়িয়ে মুসলিম ব্রাদারহুডকে আরও শক্তিশালী করার চেষ্টা করে পুরো ব্যবস্থাকেই লন্ডভন্ড করে দিয়েছিলেন। আর তার পর পর লিবিয়ায় মার্কিন রাষ্ট্রদূত নিহত হওয়ার পর এখন পর্যন্ত দম ধরা অবস্থায় আছে পশ্চিমারা। হিলারিব্লেয়ার পরিকল্পিত আরব বসন্তের ভেস্তে যাওয়াও এর একটা কারণ। আর এই শূন্যতার সুযোগই নিয়েছে সমাজতন্ত্র বিসর্জন দেয়া নয়া বাজার সাম্রাজ্যবাদী মস্কোবেইজিং। গণতান্ত্রিক নির্দেশনায় ধার না ধেরে এরা চায় কঠোর স্বৈরশাসক। যেমন তাদের পক্ষপুট থেকেই উদ্ভব ঘটেছিল ইরাকের সাদ্দাম হোসেনের সিরিয়ায় হাফেজ আল আসাদের মিশরে নামের থেকে হোসনি মোবারক পর্যন্কত সব স্বৈরশাসকের। পশ্চিমাদের গণতন্ত্র রফতানির বিষয়টাকে এরা চ্যালেঞ্জ করেছে প্রকাশ্যে এবং উদ্ভট নির্বাচনের যতো জায়গায় স্বৈরশাসক ক্ষমতা পোক্ত করেছে তাদের সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে নির্বিকার চিত্তে। বাংলাদেশ সফরে আসছেন কম্বোডিয়ার প্রেসিডেন্ট হুনসেন। গত বছর কম্বোডিয়ার নির্বাচনে তার জালিয়াতির কথা তো সারা বিশ্ব জানে। অন্য কোন গণতান্ত্রিক দেশের চেয়ে বাংলাদেশকে যে তার পছন্দ হবে এটাই স্বাভাবিক আর বাংলাদেশের বর্তমান ক্ষমতাসীনদেরও তাকে পছন্দ হওয়াটাও বিচিত্র কিছু না।

গত ১১ জুন বাংলাদেশের জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক গোলটেবিল আলোচনা সভায় দেশের সাত বিশিষ্ট নাগরিক বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, গণতন্ত্র থেকে বিচ্যুতি জনগণ কখনো মেনে নেয়নি। ৫ জানুয়ারির নির্বাচন এবং তার ধারাবাহিকতায় সরকারকে চলমান রাখাই ছিল তাদের উদ্বেগের কারণ। এছাড়া ওই সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপক রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রওনক জাহান বলেছেন, দেশের উচ্চ পর্যায়ের ব্যক্তিরা বলছেন উন্নয়ন প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখার জন্য, দেশের শাসন ব্যবস্থায়ও সরকারকে অব্যাহত রাখার প্রয়োজন রয়েছে। এই বিষয়টিকেই উদ্বেগজনক উল্লেখ করে তিনি বলেছেন একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে জনগণই ভোটের মাধ্যমে ঠিক করবেন তারা কোন সরকারকে অব্যাহত রাখবেন না পরিবর্তন করবেন। রওনক জাহান আরও পরিষ্কারভাবে বলেছেন দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো প্রধান দলগুলোর অংশগ্রহণে আর একটি সংসদ নির্বাচন। আর এক বিশিষ্ট নাগরিক ড. আকবর আলি খান বলেছেন বর্তমান সমস্যার সমাধান না হলে অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে। তা আজ হবে না কাল হবে তা জানি না। তিনি আরও বলেছেন, উদ্ভুত সমস্যার সমাধান গণতন্ত্রের পথেই খুজতে হবে। অন্য এক বক্তা হিসাবপত্র উত্থাপিত করে বলেছেন ৫৩ শতাংশ ভোটার সরাসরি ভোট দিতে পারেননি। আর ক্ষমতাসীনরা এমন ব্যবস্থাই কায়েম করেছিল যাতে ১৫৩ আসনে তাদের প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বীতায় নির্বাচিত হয়। বাকি যে ১৪৭ আসনে ভোট হয়েছে তাতে সারাদেশে মোট ভোটারের মধ্যে মাত্র ১৮ দশমিক ৬ শতাংশ ভোটার ভোট দিয়েছে। এর ফলে সরকারের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন আছে। এ রকম একটি নির্বাচন গ্রহণযোগ্যতা পেয়ে গেলে আগামীতে এ ধরনের ঘটনা আরও ঘটবে, তার চেয়ে রাজতন্ত্র হলে ক্ষতি কি?

এগুলো কি কেবল রবার্ট ফিস্কের মতো কেবল সত্য উৎঘাটনের পর ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ নকি হাহাকার। অবশ্য ব্রিটিশদের তত্ত্বাবধানে রাজা নির্বাচনের নজিরও পৃথিবীতে আছে। ৯৩ বছর আগে ইরাকে ব্রিটিশরা গণভোট করিয়ে ৯৩ শতাংশ ভোট পাইয়ে দিয়ে রাজা নির্বাচিত করেছিল। একবার ও রকম শুরু হলে ঘটনা আরও ঘটে ২০০২ সালে সাদ্দাম হোসেন ১০০ ভাগ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছিলেন। মিশরে সিসি ৪৬ শতাংশের কম ভোট পেয়ে দেশের উন্নতির স্বার্থে ২০ বছর গণতন্ত্রের কথা বলতে না করে দিয়েছেন। আমাদের দেশে ১৯ শতাংশেরও কম ভোট পেয়ে নির্বাচিত সরকার বলছে, উন্নয়নের ধারাবাহিকতার জন্য এই সরকারই অব্যাহত রাখা হবে, মধ্যবর্তী বা আর একটি নির্বাচনের সম্ভাবনা নাকচ! রাজতন্ত্রের কথা আজকাল আবার কেউ কেউ বলছেন, ১৯৭৪৭৫ সালের মতো। এখন পর্যন্ত ওই প্রতিক্রিয়াকে ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ বলেই ধরে নিতে হবে। তবে ক্ষমতাসীনরা চাইলে সংবিধানে কিছু সংশোধনী আনলে ঘটনাটা ঘটে যেতে পারে। এমনিতে ৭০ অনুচ্ছেদ সরকার প্রধানকে যে ক্ষমতা দিয়েছে তাতেই আর কিছু লাগে না। কাজেই গণতন্ত্রের মৃত্যুর জন্য আর বিলাপ না করে এখন হয়তো রবার্ট ফিস্কের মতো প্রশংসা করে যাওয়াই শ্রেয়।।