Home » আন্তর্জাতিক » ভারতে হিন্দি ভাষা-কেন্দ্রীক সাংস্কৃতিক যুদ্ধ

ভারতে হিন্দি ভাষা-কেন্দ্রীক সাংস্কৃতিক যুদ্ধ

আলতাফ পারভেজ

last 5ভারতে রাষ্ট্রীয় কাজে হিন্দিকে অগ্রাধিকার দেয়ার সরকারি সিদ্ধান্তে দেশটির উত্তরদক্ষিণের পুরানো সাংস্কৃতিক বৈরিতা আবারও পুনর্জাগরিত হয়ে উঠেছে। মোদি সরকারের তরফ থেকে গত শুক্রবার সরকারি কর্মকর্তাকর্মচারিদের উদ্দেশ্যে জারি করা এক নির্দেশনায় হিন্দিকে সরকারি কাজে বিশেষ করে যোগাযোগ মাধ্যমে অন্যভাষার বিপরীতে অগ্রাধিকার দেয়ার সিদ্ধান্তের পরপরই দেশজুড়ে তৈরি হয়েছে তীব্র বিতর্ক।

গত ২০ জুনের সরকারি ঐ নির্দেশনায় সরকারি সকল ওয়েব সাইটের ক্ষেত্রেও হিন্দিকে অগ্রাধিকার দেয়ার জন্য বলা হয়। মোদি সরকারের এই নির্দেশের বিরুদ্ধে প্রথম প্রতিক্রিয়া আসে তামিলনাড়ু ও কাশ্মির থেকে। সিপিআইএমও দলগতভাবে তাৎক্ষণিকভাবে এর বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। দক্ষিণের রাজ্যগুলোতে ইতোমধ্যে সরকারের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে মিছিলমিটিং শুরু হয়েছে। আর উত্তরের হিন্দি ব্লকে ধ্বণিত হচ্ছে এই সিদ্ধান্তের ন্যায্যতার বহু ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ।

তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী জয়ললিতা সরকারি সিদ্ধান্তের পরপরই প্রধানমন্ত্রীকে লিখিত চিঠিতে ইংরেজিকে ভারতের সবচেয়ে অগ্রাধিকারমূলক ভাষা হিসেবে ব্যবহারের অনুরোধ জানান। তাঁর মতে, ১৯৬৩ সালে কেন্দ্রীয়ভাবে যে ‘অফিসিয়াল ল্যাংগুয়েজ এক্ট’ হয়েছে তার চেতনার সঙ্গে সরকারের সর্বশেষ নির্দেশনা বিরোধপূর্ণ। জয়ললিতা এও স্মরণ করিয়ে দেন, তামিলনাড়ুর মতো প্রদেশগুলোতে ভাষার প্রশ্নটি অতি স্পর্শকাতর বিষয়। এভাবে তিনি পরোক্ষভাবে সরকারের নির্দেশকে অগ্রহণযোগ্য হিসেবে জানিয়েছেন। উল্লেখ্য, জয়ললিতার দল এআইএডিএমকে এখন লোকসভায় তৃতীয় বৃহত্তম দল।

তামিলনাড়ুর অপর রাজনীতিবিদ করুণানিধির প্রতিক্রিয়া ছিল আরও সরাসরি ও ক্ষোভে ভরা। তিনি বলেন, হিন্দিকে রাষ্ট্রীয় কাজে অগ্রাধিকার দেয়ার নির্দেশের অর্থ হলো যেসব অঞ্চলের প্রধান ভাষা হিন্দি নয় সেসব এলাকার মানুষকে দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক হিসেবে দেখা। তামিলনাড়ুতে বিজেপিআরএসএস পরিবারের নির্বাচনী মিত্র দলগুলোও সামাজিক অস্তিত্বের খাতিরে সরকারের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করে বিবৃতি দিয়েছে।

পর্যবেক্ষকরা অবশ্য বলছেন, মোদি সরকারের আলোচিত এই উদ্যোগ বিতর্ক সৃষ্টি করলেও এটা মোটেই আকস্মিক নয়। কারণ প্রধানমন্ত্রী হিসেবেও মোদি হিন্দিতে শপথ নিয়ে এরূপ পদক্ষেপের ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। পার্লামেন্টেও প্রথম ভাষণ তিনি হিন্দিতেই দিয়েছেন। এসবই ছিল অন্য ভাষাগুলোর জন্য সতর্কবার্তা এবং উস্কানিমূলক।

ভারত এমনকি সমগ্র উপমহাদেশের রাজনীতিতেই ১৯৪৭এর পর থেকে এইরূপ উস্কানি জারি আছে। যে সমাজে বহু ভাষার মানুষ বাস করে সেখানে কোন একটি ভাষাকে অগ্রাধিকার প্রদান বিতর্কমূলক এবং স্বাভাবিকভাবেই অগ্রহণযোগ্য। কিন্তু আধিপত্যবাদী মনোভাব থেকে একদল রাজনীতিবিদ বরাবরই তা করে থাকেন। কারণ এটাই ‘রাজনীতি।’ ভারতের ক্ষেত্রে এর একটা সমাধান করা হয়েছিল এইভাবে যে, হিন্দির পাশাপাশি ইংরেজিও রাষ্ট্রীয় ভাষা হিসেবে ব্যবহৃত হবে। এতে অহিন্দি ভাষীদের ক্ষোভ কিছুটা লাঘব হয়। সাংবিধানিক আপোষ ফর্মূলায় এও ছিল যে, ভারতের প্রধান প্রধান ভাষা যার সংখ্যা প্রায় ২২টি সংশ্লিষ্ট প্রদেশের সরকারি কাজে ব্যবহৃত হবে। সংবিধানের আট নং শিডিউলে উল্লিখিত ২২টি ভাষার একটি তালিকাও যুক্ত রয়েছে।

বহুভাষী অস্তিত্বের কারণে স্বাধীনতার পর ভারতে কোন ‘জাতীয় ভাষা’ বিষয়ক সিদ্ধান্ত নেয়া হয়নি। হিন্দি ও ইংরেজিকে রাষ্ট্রীয় ভাষা হিসেবে গ্রহণের পাশাপাশি আট নং শিডিউলের ২২টি ভাষাকে ‘জাতীয় ভাষা’ হিসেবে পরোক্ষে মেনে নেয়া হয়। যদিও দেশটিতে ১৯৬১ সালের শুমারিতে ১৬৫২টি ভাষার অস্তিত্ব পাওয়া গিয়েছিল। ২০১১ সালের শুমারিতে ভারতে ভাষার অস্তিত্ব রয়েছে অন্তত ১৬৩৫টি। এর মধ্যে ১০ লাখের বেশি মানুষ কথা বলে এমন ভাষা রয়েছে দেশটিতে অন্তত ৩০টি। স্বাভাবিকভাবেই সরকারের সর্বশেষ সিদ্ধান্ত এসব ভাষাভাষিদের ক্ষুব্দ করার জন্য যথেষ্ট।

তবে ১৯৪৭ পরবর্তী সময়ে হিন্দি ও ইংরেজিকে সামনে রেখে ভাষাকেন্দ্রীক আপোষফর্মূলা তৈরিকালে হিন্দিপ্রেমিক ভারতের শাসকশ্রেণীর ধারণা ছিল ধীরে ধীরে হিন্দি পুরো দেশের উচ্চশ্রেণীর ভাষা হয়ে উঠবে এবং ক্রমে তা রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকার স্বাভাবিকভাবেই পেয়ে যাবে। যদিও কালক্রমে ঘটেছে উল্টোটি। ভারতের এলিটরা এখন পুরোপুরি ইংরেজি আসক্ত হয়ে পড়েছে। যদিও রাজনীতির জন্য তাদের ‘ব্রাহ্মণ্যবাদ’ প্রয়োজন যার ফল হিন্দিপ্রেম।

মোদি সরকারের হিন্দিভাষাকেন্দ্রীক সর্বশেষ সিদ্ধান্তের প্রধানতম রাজনৈতিক তাৎপর্য আবশ্যিকভাবেই হিন্দুত্ববাদের সাথে সম্পর্কিত। মোদি ও তাঁর মূল সংগঠন আরএসএস মনে করে সমগ্র ভারতকে হিন্দুত্ববাদের প্রশ্নহীন আনুগত্যে আনতে হলে হিন্দিকে সর্বগ্রাসী একটা রূপ দিতে হবে এবং মোদির মাধ্যমেই সেটা সম্ভব। আরএসএস পরিবারের ইংরেজি বিদ্বেষ বহু প্রাচীন। তারা মনে করে ইংরেজির প্রাধান্য ভারতের উপনিবেশিক অতীতের প্রতি সম্মানের স্মারক। ১৮৩৫ সালে মেকলে ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থায় যখন ইংরেজি যুক্ত করেছিলেন, তখন স্বদেশী হিন্দুত্ববাদীরা তার ঘোর বিরোধী ছিল তার। যদিও এটা এক বড় কৌতুক যে, যেসব যুক্তিতে তারা তখন ইংরেজির বিরোধিতা করেছিলেন একই যুক্তি আজকের হিন্দি আগ্রাসনের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হতে পারে। কারণ ভারতের বহু অঞ্চল রয়েছে যেখানে হিন্দি মোটেই উচ্চারিত নয়।

হিন্দি কবি অশোক বাজপায়ি বিষয়টি বলেছেন এভাবে, ‘ভারতের সমাজ হলো বহুত্ববাদী সমাজ। এই বহুত্ববাদের ভিত্তি হলো ধর্ম ও ভাষাভিত্তিক বহুত্ববাদ। উপরন্তু এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আবেগ। রাষ্ট্রীয় কাজে হিন্দিকে যে যুক্তিতে বেশি ব্যবহার করতে বলা হচ্ছে সেই একই যুক্তি অন্যান্য প্রধান ভাষার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। অন্য ভাষাকে অবদমিত করে হিন্দিকে বিকশিত করা গ্রহণযোগ্য হবে না।

প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী চিদাম্বরামের প্রতিক্রিয়া আরও উদ্বেগজনক। তিনি মনে করছেন কেন্দ্রে হিন্দি চাপিয়ে দেয়া মাত্র অহিন্দিভাষী প্রদেশগুলোতে হিন্দি বিরোধী মনোভাব তীব্র হবে এবং সেখানে প্রাদেশিক সরকারি কাজে বর্তমানে হিন্দিকে যতটুকু ব্যবহার করা হয় ততটুকুও বন্ধ হয়ে যাবে।

আর সিপিআইএমএর পলিটব্যুরো এক বিবৃতিতে সরকারের সিদ্ধান্তকে ভাষাভিত্তিক সাম্যতার পরিপন্থী হিসেবে অভিহিত করেছে। তাদের মতে এটা অন্যান্য প্রধান ভাষার প্রতি অন্যায্য আচরণ।

কাশ্মীরের মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লাহ সরাসরি জানিয়ে দিয়েছেন তাঁদের প্রদেশে হিন্দিকে অগ্রাধিকার দেয়ার কোন অবকাশই নেই কারণ সেখানে উর্দু ও ইংরেজি সরকারি ভাষা হিসেবে স্বীকৃত।

এসব প্রতিক্রিয়ার পর মোদি সরকারের পক্ষ থেকে পরে আরেক ঘোষণায় বলা হয়েছে, ভাষা বিষয়ক সর্বশেষ সিদ্ধান্তটি মূলত হিন্দিভাষী প্রদেশগুলোর জন্য কার্যকর হবে।

তবে বিজেপি ও আরএসএস পরিবার যে হিন্দিকে নিয়ে পরিকল্পিতভাবেই সর্বশেষ রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত নিয়েছে তার প্রমাণ হলো হিন্দিকে অগ্রাধিকার দেয়ার সিদ্ধান্তের পাশাপাশি সরকার আরেকটি সার্কুলারে সরকারি কর্মচারির জন্য প্রাইজ মানি ঘোষণা করেছে যারা তাদের কাজে সবসময় হিন্দিকে ব্যবহার করে। এইরূপ সিদ্ধান্ত বিশেষভাবে আক্রমণাত্মক। অনেকেই একে ‘সাংস্কৃতিক যুদ্ধ’ হিসেবে অভিহিত করেছে। এইরূপ মত পোষণকারীদের ধারণা হিন্দিভাষা সংক্রান্ত নির্দেশনা দিয়ে বিজেপিআরএসএস নেতৃত্ব মোদি সরকারকে সামনে রেখে তাদের দীর্ঘ সাংস্কৃতিক পরিকল্পনার সূচনা ঘটালো মাত্র। ধীরে ধীরে এই প্রকল্পের আরও অনেক অধ্যায় থেকে ভারত।

তবে অন্যান্য দেশের ক্ষেত্রে যেমনটি ঘটেছে ভারতেও তার ব্যত্রিকম ঘটছে না। উগ্র জাতীয়তাবাদ সবসময় তার আগ্রাসী পরিকল্পনার একটা সমাজতান্ত্রিক আবরণ দেয়ার চেষ্টা করে। আরএসএস পন্ডিতরা সরকারের ভাষা নির্দেশনাকে এই বলে অভিনন্দন জানাচ্ছেন যে, এর ফলে ভারত রাষ্ট্রের কাজে সাধারণ জনগণের সম্পৃক্তি আরও বাড়বে। কারণ জনগণ ইংরেজির চেয়ে হিন্দিতে বেশি অভ্যস্ত। তারা মোদিকে এই বলেও অভিনন্দন জানিয়েছেন যে, জীবনের শুরুতে তিনি যে চায়ের দোকান চালাতেন সেই থেকে সমাজের নিচুতলার প্রতি তাঁর বিশেষ অনুরাগ থেকে গেছে এবং ইংরেজির পরিবর্তে হিন্দিকে রাষ্ট্রীয় কাজে অগ্রাধিকার দেয়ার ঘোষণা তারই স্মারক। বিজেপি পন্ডিতরা তাদের এইরূপ ব্যাখ্যার আড়ালে অন্যভাষার প্রতি সরকারের অবজ্ঞার বিষয়টি পুরো আড়াল করে যাচ্ছেন।।