Home » অর্থনীতি » বিকল্প বিশ্বব্যাংক আর বিকল্প আইএমএফ

বিকল্প বিশ্বব্যাংক আর বিকল্প আইএমএফ

মোহাম্মদ হাসান শরীফ

last 1বিশ্বব্যবস্থায় কি ব্যাপক ধরনের পরিবর্তন আসন্ন? আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সিরিয়া, ইউক্রেন, ইরাককে কেন্দ্র করে সৃষ্ট ঘটনা প্রবাহ নতুন সমীকরণের কথা বলছে। রাজনৈতিক এই পরিবর্তনের ডামাডোলে অর্থনৈতিক বিশ্বেও হিসাবনিকাশ শুরু হয়ে গেছে। বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ), এশিয়ান উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র এতদিন বিশ্বব্যাপী অর্থব্যবস্থায় নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছিল। এই ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ জানাতে দুটি বড় আকারের অর্থ প্রতিষ্ঠানের নাম শোনা যাচ্ছে। একটি হলো এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (এআইআইবি), অপরটি ব্রিকস ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক। দুটি প্রতিষ্ঠানের নেপথ্যেই আছে চীন। এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (এআইআইবি) গঠিত হচ্ছে মূলত চীনের উদ্যোগেই। আর ব্রিকস ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক হতে যাচ্ছে ব্রিকসভুক্ত (ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত ও চীন) দেশগুলো নিয়ে। এখানেও চীনের অংশগ্রহণ অপর তিন দেশের চেয়ে বেশি।

চীনসহ অনেক দেশই অভিযোগ করে আসছে, বিশ্বব্যাংক ও এডিবি খুব বেশি মাত্রায় যুক্তরাষ্ট্র ও এর মিত্রদের প্রভাবিত। এ থেকে উদ্ধার পাওয়ার লক্ষ্যে এশিয়ার ২২টি দেশকে নিয়ে চীন এআইআইবি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছে। এসব দেশের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কয়েকটি সম্পদশালী রাষ্ট্রও রয়েছে। প্রাথমিকভাবে এর কাজ হবে ইউরোপের সাথে চীনকে সংযোগকারী প্রাচীন ‘সিল্ক রোডের’ নতুন সংস্করণ তৈরির উদ্যোগে অর্থ যোগানো।

এই ব্যাংকের বেশির ভাগ তহবিল আসবে চীনের কাছ থেকে। আর ব্যয় হবে বেইজিং থেকে বাগদাদ পর্যন্ত সরাসরি ট্রেন যোগাযোগ প্রতিষ্ঠাসহ অবকাঠামো নির্মাণে। এটাকেই বলা হচ্ছে একুশ শতকের ‘সিল্ক রোড’। এটাই পরে বিশ্বব্যাংকের বিকল্প হিসেবে গড়ে ওঠতে পারে, এমন ইঙ্গিত ভালোভাবেই পাওয়া যাচ্ছে।

চীনের এই উদ্যোগের পেছনে রয়েছে বহুজাতিক সংস্থাগুলোতে পাশ্চাত্যের প্রাধান্য। চীনা নেতারা দীর্ঘ দিন ধরে বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, এডিবিতে তাদের বৃহত্তর ভূমিকা দাবি করে আসছিল। ইতোমধ্যেই চীনের অর্থনৈতিক গুরুত্ব বেড়ে গেলেও বেইজিংয়ের দাবিকে পাত্তা দেওয়া হয়নি।

এআইআইবি প্রতিষ্ঠার সাথে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত এক ব্যক্তি বলেন, ‘চীন মনে করছে, যেহেতু সে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফে কিছুই করতে পারবে না, তাই সে তার নিয়ন্ত্রণে থাকবে এমন একটি বিশ্বব্যাংক প্রতিষ্ঠা করতে চায়। এ ব্যাপারে এশিয়াজুড়ে বিপুল আগ্রহ দেখা যাচ্ছে। তবে অন্য কেউ এতে যোগদান না করলেও চীন এ নিয়ে এগিয়ে যাবে।’

সাম্প্রতিক সময়ে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো ক্রমবর্ধমান হারে বিভিন্ন দেশে বিনিয়োগ করে যাচ্ছিল। এমনকি তা অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগকেও ছাড়িযে যেতে পারে বলে জাতিসংঘের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে এআইআইবি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এআইআইবি’র প্রথম চ্যালেঞ্জটি হবে ম্যানিলাভিত্তিক এডিবি। চীন মনে করে, এডিবি অনেক বেশি তার আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বি জাপান প্রভাবিত। বেইজিং এই ব্যাংকটির মূলধন প্রস্তাব করেছে ১০০ বিলিয়ন ডলার। এটা বাস্তবায়িত হলে তা হবে ১৬৫ বিলিয়ন ডলারের এডিবির প্রায় দুইতৃতীয়াংশের সমান।

এডিবির দুই বৃহত্তম শেয়ারহোল্ডার হচ্ছে জাপান ও যুক্তরাষ্ট্র। ৬৭টি সদস্য দেশের মধ্যে এই দেশ দুটির শেয়ার যথাক্রমে ১৫.৭ শতাংশ ও ১৫.৬ শতাংশ। চীনের শেয়ার মাত্র ৫.৫ শতাংশ। ১৯৬৬ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে ব্যাংকটির প্রেসিডেন্ট হিসেবে রয়েছেন জাপানিরা। প্রতিষ্ঠার সময় জাপানের অর্থনীতি ছিল বেশ শক্তিশালী। কিন্তু এখন চীন অনেক বেশি শক্তিশালী। ডলারের হিসাবে ২০১০ সালেই জাপানকে হটিয়ে চীন হয়ে গেছে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি।

ওয়াকিবহাল সূত্র জানায়, চীন এআইআইবি প্রতিষ্ঠা নিয়ে দক্ষিণপূর্ব এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ এবং অস্ট্রেলিয়া এবং এমনকি যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, চিরপ্রতিদ্বন্দ্বি জাপানের সাথে আলোচনা করেছে। তবে চীন ভেতরে ভেতরে চায় যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা যাতে এতে যোগ না দেয় কিংবা দিলেও যাতে তাদের প্রভাব থাকে খুবই কম।

গত বছর বিষয়টি নিয়ে চীন তিনটি দীর্ঘ বৈঠক করেছে। একটি বৈঠক হয়েছে গত জুনে। প্রায় ১০টি দেশের মধ্যে সমঝোতা স্মারকও স্বাক্ষরিত হয়েছে।

এডিবির হিসাব অনুযায়ী, ২০২০ সাল পর্যন্ত বিনিয়োগ খাতে এশিয়ার ৮০০ বিলিয়ন ডলারের প্রয়োজন পড়বে। এডিবি বছরে দিতে পারবে মাত্র ১০ বিলিয়ন ডলার। ফলে তাত্ত্বিকভাবে দেখা যাচ্ছে, এআইআইবির ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। অর্থাৎ ব্যাংকটির টিকে যাওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে।

এর পাশাপাশি ব্রিকসভুক্ত দেশগুলো আইএমএফের বিকল্প প্রতিষ্ঠান গড়ায় মনোযোগী হয়েছে। তাদের প্রতিষ্ঠানের নাম রাখা হয়েছে ব্রিকস ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক। আশা করা হচ্ছে, ২০১৫ সাল নাগাদ এর কার্যক্রম শুরু হবে। রাশিয়ার অ্যাম্বাসেডর অ্যাট লার্জ ভাদিম লুকভ এ কথা বলেছেন। ব্রাজিল ইতোমধ্যেই ব্রিকস ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের খসড়া প্রণয়ন করেছে। নতুন ব্যাংকটির জন্য অনুমোদিত মূলধন হিসেবে প্রতিটি দেশ ১০০ বিলিয়ন ডলার করে দিতে রাজি হয়েছে। এখন ব্যাংকটির সদরদপ্তর এবং ৫০ বিলিয়ন ডলার করে প্রাথমিক মূলধন নিয়ে আলোচনা চলছে। ব্রিকসভুক্ত সব দেশই চায় তাদের দেশেই যেন সদরদপ্তরটি স্থাপিত হয়। ধারণা করা হচ্ছে, কারেন্সি রিজার্ভ পুলে চীনের ৪১ বিলিয়ন ডলার, ব্রাজিল, ভারত ও রাশিয়া ১৮ বিলিয়ন ডলার করে এবং দক্ষিণ আফ্রিকা ৫ বিলিয়ন ডলার দেবে প্রতিটি দেশের অর্থনীতির আলোকে এই চাঁদা ধরা হয়েছে।

বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফএ আমেরিকা ও তার মিত্রদের যে আধিপত্য রয়েছে তা থেকে বের হওয়ার জন্যই ব্রিকস উন্নয়ন ব্যাংক গঠনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে বলে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন। এখন পর্যন্ত এই ব্যাংক থেকে নিজেদের নয়, অন্য দেশগুলোকে সহায়তা দেওয়ার ওপরই গুরুত্বারোপ করা হচ্ছে।

ব্রিকস দেশগুলোর এই উদ্যোগ ফলপ্রসূ হলে ডলারের আধিপত্যও শেষ হয়ে যাবে। চীন বা রাশিয়ার মুদ্রা তখন গুরুত্ব বাড়বে। আর্থিক বিষয়ে এককেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থার অবসান হয়ে যাবে।।