Home » অর্থনীতি » ফিফায় দুর্নীতি-রাজনীতি :: ফুটবল সাম্রাজ্যের রাজাধিরাজ

ফিফায় দুর্নীতি-রাজনীতি :: ফুটবল সাম্রাজ্যের রাজাধিরাজ

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন

last 4তিনি ১৬ বছর ধরে সাম্রাজ্য চালাচ্ছেন। বিশাল তার সাম্রাজ্য। কোনো দেশ তো দূরের কথা, জাতিসংঘ মহাসচিবের চেয়ে তার প্রভাব অনেক বেশি। জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রের সংখ্যা যেখানে ১৯৩ (এছাড়া দুটি পর্যবেক্ষক রাষ্ট্র আছে। সার্বজনীন স্বীকৃতি পায়নি, এমনগুলো নিয়েও রাষ্ট্র সংখ্যা ২০১), সেখানে ফিফার ২০৯। নিঃসন্দেহে ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা। টেলিভিশন, ওয়েবসাইট, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এর গতি অপ্রতিহত।

মনে করা হচ্ছিল, এবার গদি ছাড়বেন। তিনিও স্পষ্টভাবে সে কথা বলেছিলেন। কিন্তু না। ‘জনগণ যেহেতু তাকে চায়’ তাই তিনি প্রজাদের স্বার্থেই শাসনকাজ অব্যাহত রাখবেন। ইতোমধ্যেই বিপুল সমর্থন পেয়ে গেছেন। ফলে আগামী বছর পঞ্চম মেয়াদের জন্য নির্বাচিত হতে কোনো সমস্যা হবে না। আর সেটা হবে সম্পূর্ণভাবে ‘গণতান্ত্রিকভাবে’। তাহলে অনেক দেশের প্রেসিডেন্ট যখন ৯৯.৯ শতাংশ ভোট পেয়ে বারবার নির্বাচিত হন, তাদেরকে আমরা কেন স্বৈরাচার বলি?

তার নাম যোশেফ সেপ ব্লাটার। সেই ১৯৯৮ সাল থেকে তিনি বিশ্ব ফুটবলের পরিচালনা সংস্থা ফিফার সভাপতি। ২০১১ সালে চতুর্থবারের মতো সভাপতি নির্বাচিত হয়ে তিনি ঘোষণা করেছিলেন, এবারই শেষ। কিন্তু না। সম্প্রতি সাও পোলোতে এশিয়া, আফ্রিকা ও দক্ষিণ আমেরিকার প্রতিনিধিদের এক সভায় তিনি বলেন, ‘আমার ভেতরে এখনো আগুন আছে।’ অর্থাৎ ওই আগুন না নেভা পর্যন্ত তিনি ‘সেবা’ করে যাবেন।

ওই আগুন দিয়ে ব্লাটার এখন পর্যন্ত কী করেছেন? একটি কাজ করেছেন, তিনি তার ব্যক্তিগত, ব্যবস্থাপনাগত ও ফিফার পরিচালনা সংস্থার ব্যয় বাড়িয়েছেন। ১৯৯৯ থেকে ২০০২ সাল পর্যন্ত ব্যয় ছিল ১৭ শতাংশ, ২০১৩ সালে সেটা দাঁড়িয়েছে ১৭ শতাংশে। ফিফার মোট রাজস্বের ১৪ শতাংশ ব্যয় হয় তথাকথিত ‘উন্নয়ন’ খাতে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে জাতীয় ফুটবল সংস্থাগুলোকে সাহায্য করা, প্রমিলা ফুটবল, দাতব্য ও শিক্ষা প্রকল্প। ফিফা পরিচালিত হচ্ছে দেশের মতো করে, যেখানে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও গরিবদের জন্য ভর্তুকির চেয়ে বেশি প্রয়োজন হয় আমলাতন্ত্রের ভরণপোষণ। আর ছড়িয়ে পড়ছে দুর্নীতি, নির্মম মুনাফা, করপোরেটকরণ।

আগামী বছর যখন ফিফা সভাপতি পদে নির্বাচন হবে তখন তার বয়স হবে ৭৯ বছর। পদে থাকতে যা যা করা দরকার, তা প্রায় করে ফেলেছেন। তৃতীয় বিশ্বের দুর্নীতিবাজ ফুটবল ফেডারেশনগুলো ব্লাটারের সবচেয়ে বড় ঘাঁটি। তিনি জানেন, এসব ফেডারেশনকে খুশি রাখতে পারলে কোনো বাধাই তার সামনে আসতে পারবে না। তাই এসব সংস্থাকে তিনি নানা সহায়তা দিয়ে হাতে রাখার নীতি অনুসরণ করে আসছেন। ফল পাচ্ছেন হাতে হাতে।

এখন সবচেয়ে বেশি বিরোধিতা আসছে ইউরোপ থেকে। তবে তিনি হিসাব করে দেখেছেন, সেখানকার ৫৩টি ভোটের একটাও যদি না পান, তবুও তার কোনো ধরনের সমস্যা হবে না। এশিয়া, আফ্রিকা, আমেরিকা, প্রশান্ত মহাসাগরীয় ভোটে তিনি আনায়াসেই জিতে যাবেন।

মাঝখান থেকে কপাল পুড়তে পারে মিসেল প্লাতিনির। একসময় তিনি ছিলেন ব্লাটারের একান্ত অনুগত। কিন্তু এখন বিরোধ তুঙ্গে।

অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা গেছে, ব্লাটারের বিরোধিতা করে কেউ টিকতে পারে না। যেমন টিকতে পারেননি মোহাম্মদ বিন হাম্মাম। দুজনের জুটি ছিল বেশ মানানসই। মোহাম্মদ বিন হাম্মাম ১৫ বছর ছিলেন ফিফায়। রাশিয় ও কাতারে বিশ্বকাপ নিয়ে যেতে বড় ভূমিকা পালন করেছিলেন। কিন্তু যখনই তিনি ব্লাটারের প্রতিদ্বন্দ্বি হিসেবে আবির্ভূত হলেন, তখনই তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ আনা হলো। ফিফা থেকেই সরে যেতে বাধ্য হলেন। অনেক দিন ধরেই ব্লাটারের উত্তরসূরি হওয়ার লড়াইয়ে আছেন উয়েফা সভাপতি মিসেল প্লাতিনি। তিনি অবশ্য এখনো প্রার্থিতার কথা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেননি। আগামী সেপ্টেম্বরে জানাবেন বলেছেন।

১৯৯৮ সালে ভোট বেচাকেনার লড়াইয়ে লেনার্ট জোহানসনকে হারিয়ে ফিফার প্রধান পদটি দখল করেন। তবে এর আগে থেকেই তিনি ফিফার অন্দরমহলের ব্যবস্থাপনা তিনি রপ্ত করে ফেলেছিলেন। তার গুরু ছিলেন তারই পূর্বসুরি ব্রাজিলের জোয়াও হ্যাভেলাঞ্জ। ব্লাটার ফিফায় কাজ করছেন ১৯৭৫ সাল থেকে। হ্যাভেলাঞ্জএর এক বছর আগে ফিফার সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন।

সুইটজারল্যান্ডের ব্লাটার ক্যারিয়ারের প্রথমে ছিলেন গণযোগাযোগ কর্মকর্তা। শৌখিন ফুটবল খেলতেন একসময়ে। টেকনিক্যাল ডিরেক্টর পরিচালক হিসেবে ফিফায় যোগ দেন। ১৯৮১ সালে হন সাধারণ সম্পাদক। ১৯৯০ সালে প্রধান নির্বাহী। হ্যাভেলাঞ্জের কাছে তিনি ঋণী। তবে ওই ঋণ তিনি শোধ করেছেন বেশ ভালোভাবেই।

ফিফাকে তিনি অর্থ উপার্জনের হাতিয়ার হিসেবে ভালোভাবেই গড়ে ফেলেছেন। তিনি যখন ফিফায় যোগ দিয়েছিলেন, তখন বিশ্ব সংস্থাটির জনবল ছিল ১২ জন। এখন দাঁড়িয়েছে ৪৫২এ। তাদের জন্য ব্যয় হচ্ছে বছরে ৭৫.৬ মিলিয়ন ডলার।

ফোর্বস সাময়িকী অনুযায়ী, চলতি বছর তার নিজের সম্পদের পরিমাণ ৪ বিলিয়ন ডলারের বেশি। তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির নানা অভিযোগ এসেছে। সভাপতি হওয়ার পরে নয়, আগেও তিনি নানাভাবে দুর্নীতিতে মজে ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। কিন্তু যেহেতু তিনি ক্ষমতাসীন চক্রের শিরোমনি, ফলে কোনো অভিযোগই প্রমাণ হয় না।

রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতি ঢুকে আছে ফিফায়। এই দুর্নীতি উৎসাহিত করা হয় এবং প্রয়োজন মতো ব্যবহারের জন্য প্রস্তুতও রাখা হয়। এই যেমন এখন মিসেল প্লাতিনির বিরুদ্ধে প্রচারণা চলছে। তিনি ব্লাটারের প্রতিদ্বন্দ্বি হিসেবে মাথা তুলতে চাচ্ছেন, এখন বলা হচ্ছে তিনি কাতারের বিশ্বকাপ আয়োজনের বিড সফল করতে আর্থিক সুবিধা নিয়েছেন। কাতার ১০ মিলিয়ন ডলার প্রত্যক্ষভাবে ঘুষ দিয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।

ফিফার বড় দুর্নীতির একটি উৎস বিশ্বকাপ আয়োজন। আয়োজক দেশ হওয়ার লড়াই চলাকালে তাতে আন্তর্জাতিক রাজনীতি পর্যন্ত ঢুকে যায়। নানা ধরনের লেনদেন চলে অবাধে। তার পর বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণ নিয়ে আছে দুর্নীতি।

এ প্রেক্ষাপটেই ইংলিশ ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক প্রধান ডেভিড ট্রিসম্যান মারিও পুজোর সুবিখ্যাত মাফিয়া কাহিনি ‘দ্য গডফাদার’ অনুসরণ করে বলেছেন, ফিফা হলো এক ধরনের ‘মাফিয়া পরিবার’, যার ‘ডন করলিওনে’ হলেন সেপ ব্লাটার।

ব্রাজিলের বিশ্বকাপজয়ী ফুটবলার ও দেশটির কংগ্রেসম্যান রোমারিও ফিফার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন। তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, ফিফা সভাপতি সেপ ব্লাটার ‘চোর’, আর সংস্থাটির মহাসচিব জেরম ভালকে ‘ব্ল্যাকমেইলকারী’। আর্জেন্টাইন ফুটবল কিংবদন্তি ডিয়াগো ম্যারাডোনা তো প্রায়ই ফিফা, ফিফা সভাপতি সম্পর্কে এ ধরনের মন্তব্য করে থাকেন।

অবশ্য কেবল সেপ ব্লাটার নন। আরো অনেকেই আছেন। তারা হয়তো রাজাধিরাজ নন। কিন্তু নিজ বনে তারাই রাজা। যেমন রিকার্ডো টেক্সাইরা ১৯৮৯ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত ব্রাজিল ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি ছিলেন। তিনি ক্ষমতা হস্তান্তর করেছিলেন তার মেয়ের জামাইয়ের হাতে। তিনি অবশ্য ততটা চতুর ছিলেন না। ফলে দুর্নীতির অভিযোগে তাকে সরে যেতে হয়েছিল। নয়তো আরো অন্তত ১০টা বছর তিনিই ব্রাজিল ফুটবলের দন্ডমূন্ডের কর্তা থাকতেন। আর্জেন্টিনায় জুলিও গ্রনডোনা ১৯৭৯ সাল থেকে দায়িত্বে রয়েছেন।

তবে সবই হচ্ছে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে। কেবল কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতা নেই।।