Home » বিশেষ নিবন্ধ » বাংলাদেশ :: ধর্ষণ-যৌন নির্যাতনের এক উপদ্রুত জনপদ

বাংলাদেশ :: ধর্ষণ-যৌন নির্যাতনের এক উপদ্রুত জনপদ

শাহাদত হোসেন বাচ্চু

dis-4প্রয়াত কবিলেখকপ্রাবন্ধিক হুমায়ুন আজাদের “১০,০০০ এবং আরো একটি ধর্ষণ” উপন্যাসটির মুখবন্ধ ছিল এরকম – “বাঙলাদেশ এখন হয়ে উঠেছে এক উপদ্রুত ভূখন্ড; হয়ে উঠেছে ধর্ষণের এক বিশাল রঙ্গমঞ্চ, ৫৬,০০০ বর্গমাইলব্যাপী পীড়নের এক বিশাল প্রেক্ষাগার। ধর্ষিত হচ্ছে মাটি মেঘ নদী রৌদ্র জোৎস্না দেশ, নারীরা”। এ উপন্যাস প্রকাশের পর পেরিয়ে গেছে এক যুগ। পদ্মাযমুনায় জল গড়িয়েছে অনেক। সব্যসাচী লেখক হুমায়ুন আজাদও নিহত হয়েছেন ধর্ম ব্যবসায়ীদের হিংস্র নখরে।

এর মধ্যে রাজা বদল হয়েছে বার তিনেক। কখনো সামরিক লেবাসে, কখনো গণতন্ত্রের লেবাসে। কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট আদৌ বদলায়নি। উপদ্রুত ভূখন্ড হিসেবে বাংলাদেশ হয়ে উঠেছে প্রতিদিন ধর্ষণের এক বিশাল রঙ্গমঞ্চ। পাঠকের মনে পড়বে, ১৯৯৬২০০১ মেয়াদে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকাকালীন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে এক ছাত্রলীগ ক্যাডার মানিক ধর্ষণের সেঞ্চুরী পূরণ করে উৎসব উদযাপন করেছিল। এই সোনর মানিক বিচারের মুখোমুখি হয়নি, যুক্তরাষ্ট্রে চলে গেছে। ২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পরে অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে ক্ষমতাসীন দলের ক্যাডাররা ঝাঁপিয়ে পড়ে নারী ধর্ষণে, বিশেষ করে সংখ্যালঘূ নারীদের ওপরে। এরও কোন বিচার আজ অবধি বাংলাদেশের মাটিতে হয়েছে, এমন দাবি কোন সরকার বা কোন রাজনৈতিক দল করতে পারবে না। এই দফায় ক্ষমতায় এসেও আওয়ামী লীগ ধর্ষণসহ যৌন নির্যাতনকে এক ধরনের দায়মুক্তি প্রদান করেছে। যৌন নির্যাতনের প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে জীবন দিয়েছেন শিক্ষক, মাবাবা, ভাইবোনসহ অনেকে। শত শত ঘটনা ঘটেছে কিন্তু বিচার হয়েছে কতোজনার? আর বিভিন্ন সময়ে বিচারহীনতার কারণেই বাংলাদেশ হয়ে পড়েছে ধর্ষণসহ যৌন নির্যাতনের এক উপদ্রুত জনপদ।

নারী ধর্ষণের ভয়াবহ চিত্রটি বাংলাদেশে এখনও অপরিবর্তিত। আমরা যদি ২০১৩২০১৪ সালের পরিসংখ্যানটি দেখি, পাঠক দেখবেন এ সময়কালে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ১০২১ জন নারী। এর মধ্যে চলতি বছরের মাত্র ৬ মাসে ৩০৯ জন এবং গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৯৮ জন। ২১ জন নারীকে ধর্ষনের পর খুন করা হয়েছে, ৭ জন আত্মহত্যা করেছেন আর ৪৪ জন নারীর ক্ষেত্রে ধর্ষণ চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের ওয়েবসাইট থেকে এসব তথ্য জানা গেছে। তারা মূলত: সংবাদপত্র ও নিজ সংস্থার উদ্যোগে এসব তথ্য সংগ্রহ করেছেন। কিন্ত এই পরিসংখ্যানটি যথেষ্ট নয়, কারন বাংলাদেশে ধর্ষণ এক নীরব অধ্যায়। অনেক ক্ষেত্রে সেগুলি প্রকাশ্্েয আসে না, মামলা হয় না, সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয় না, প্রতিদিন ঘটে এসব ঘটনা। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানী হানাদারদের হাতে ৯ মাসে প্রায় ২ লাখ নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছিলেন। সেটি ছিল শত্রু কবলিত দেশে, একটি বর্বর বাহিনীর হাতে নারীরা এরকম মানবতাবিরোধী অপরাধের শিকার হয়েছিলেন। স্বাধীন বাংলাদেশে চিত্রটি কি খুব পাল্টেছে? উত্তর কোন সরকার বা কোন রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ বিচ্ছিন্ন দু’একটি ঘটনা ছাড়া ধর্ষণের বিরুদ্ধে বা ধর্ষকদের বিরুদ্ধে কার্যকর কোন প্রতিরোধ আজ অবধি গড়ে তুলতে পারেননি।

চার দশক যোগ চার বছর আগে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটি ভূমিষ্ঠ হয়েছিল। সশস্ত্র একটি যুদ্ধের মাধ্যমে জন্ম নেয়ার প্রসব বেদনাটি থাকে কঠিন, প্রচন্ড যন্ত্রনা তার মধ্যে থাকে জায়মান। যে কোন সশস্ত্র যুদ্ধের প্রথম শিকার হয় মানবতা, দ্বিতীয় হচ্ছে শালীনতা; যা প্রকাশিত হয় শোধ আর বদলা নেয়ার আকাঙ্খায়। শোনিতাক্ত বর্বরতা এবং যুদ্ধের অনিবার্যতায় হত্যা, নির্যাতনসহ বীভৎস সব ঘটনা পরম্পরায় বাঙালী জাতিকে কাটাতে হয়েছে নয় মাস। যুদ্ধ প্রকৃতিগতভাবে হত্যাভিলাষী। প্রতিরোধের যুদ্ধ শুরু হয় ঠিক উল্টো পথে। এখানে স্বপ্নের বীজ বপন করতে হয় এবং স্বপ্নকে টেনে নিয়ে যাওয়ার আগ্রহে মানুষ অবিরাম লড়াই চালিয়ে যায়। যা যুদ্ধোত্তীর্নকালে শানিত চেতনায় রূপ নেয়। ১৯৭১ সালের বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের জনসংখ্যা ছিল সাড়ে সাত কোটি, যার মধ্যে তিন কোটি নারী। যুদ্ধের শিকার এসব নারীরা একসময় এ রাষ্ট্রের দায় হয়ে পড়েছিল এবং রাষ্ট্র তাদের চরম নির্মমতায় ছঁড়ে ফেলেছিল। কর্মদক্ষতা ও প্রচেষ্টায় এই নারীরাই এখন রাষ্ট্রের সম্পদ এবং দিগন্তে তাদের সম্মেলিত সাফল্যের জন্য তারা আলোচিতও বটে। তারপরেও ঘরেবাইরে নারী কোথাও কি নিরাপদ? স্বাধীনতার তেতাল্লিশ বছর পরে পরিস্থিতি কি আদৌ পাল্টেছে? নারীর প্রতি সংঘটিত সহিংসতা এবং অপরাধের পরিসংখ্যান অন্তত: সে রকম কোন আশা জাগায় না।

গত এক দশকে সামাজিক সূচকসমূহে বাংলাদেশের বিষ্ময়কর সাফল্যের পেছনে নারীর অনেক বড় অবদান থাকলেও পরিবারসমাজরাষ্ট্রীয় পর্যায়ে নারীর অবস্থা এবং অবস্থানের উলে#খযোগ্য কোন বদল হয়নি। দেশের বিবাহিত নারীদের ৮৭ শতাংশ পরিবারে এখনও নানাধরনের নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। এর মধ্যে ৬৫ শতাংশ শারীরিকভাবে নির্যাতিত হচ্ছেন, ৩৬ শতাংশ যৌন নির্যাতন, ৮২ শতাংশ মানসিক নির্যাতন এবং ৫৩ শতাংশ নারী স্বামীর মাধ্যমে অর্থনৈতিক নিপীড়নের শিকার হচ্ছেন। এক্ষেত্রে যে তথ্যটি সবচেয়ে বিষ্ময়কর তা হচ্ছে, ৭৭ শতাংশ নারী পরিবারে সবরকম নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। এদের মধ্যে একটি বড় অংশই নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধেও স্বামীর যৌনাকাঙ্খা চরিতার্থ করার শিকারে পরিনত হচ্ছেন। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) এই প্রথম সারাদেশে নারী নির্যাতন নিয়ে পরিচালিত জরীপে এইসব তথ্য তুলে নিয়ে এসেছে। ভায়োলেন্স এগেইনষ্ট উইমেন সার্ভে ২০১১ নামে এই জরীপের আগে বিভিন্ন সংস্থার এ বিষয়ে আলাদা আলাদা রিপোর্ট প্রকাশ করেছিল। তবে সরকারের এই জরীপ জানাচ্ছে, দেশে নারী নির্যাতনের হার বেড়েছে, ধরন পাল্টাচ্ছে এবং নারীরা ক্ষেত্রবিশেষ চরম বর্বরতার শিকার হচ্ছেন। গত ৩০ ডিসেম্বর ২০১২ এটি প্রকাশিত হয়। প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী গ্রামীন নারীরা নির্যাতনের শিকার হন বেশি। এক্ষেত্রে অবিবাহিতরা যৌন নির্যাতনের ঝুঁকির মধ্যে বেশি থাকলেও বিবাহিত নারীরা বেশিরভাগ শিকার শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের।

জরীপে চার ধরনের নির্যাতনের কথা উঠে এসেছে, এগুলি হচ্ছে, শারীরিক, যৌন, মানসিক ও অর্থনৈতিক নির্যাতন। শারীরিক নির্যাতনের মধ্যে ৪৫ শতাংশ নারীকে স্বামীরা চড় বা ঘুষি মেরে আহত করেছেন, ১৫ শতাংশ লাথি বা নিষ্ঠুর মারধরের শিকার হয়েছেন, যৌন নির্যাতনের ক্ষেত্রে ২৬ শতাংশ নারী ইচ্ছের বিরুদ্ধে স্বামীর সংগে শারীরিক মিলনে আহত হয়েছেন। আর ৩০ শতাংশ নারী স্বামীর ভয়ে অনিচ্ছা সত্বেও শারীরিক মিলনে বাধ্য হচ্ছেন। জানা গেছে, বিগত এক বছরে একচতুর্থাংশ নারী, যাদের বয়স ২০৩৪ বছরের মধ্যে তারাই এক্ষেত্রে বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন। এই পরিসংখ্যানটি গত এক বছরের মধ্যে সংগঠিত নির্যাতনের। ধারনা করা হয়, ঘরের ভেতরে নারীরা নিরাপদ, তবে এ জরীপ জানাচ্ছে উল্টো তথ্য। ঘরের ভেতরে স্বামী ও আপনজনের কাছে নারী সবচেয়ে ঝুঁকির মধ্যে থাকেন এবং নির্যাতনের শিকার হয়ে থাকেন। বিয়ের আগের চিত্রটিও নারীর জন্য ভয়াবহ। প্রায় ৪২ শতাংশ নারী জানাচ্ছেন, তারা ১৪ বছর বয়সের আগেই জোরপূর্বক যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, আর ৩৫ শতাংশ নারীর এ অভিজ্ঞতা হয় ১৯ বছর বয়সে পা দেবার আগেই।

হুমায়ুন আজাদের “১০,০০০ এবং আরো একটি ধর্ষণ” উপন্যাসটির সমাপ্তি ঘটে এভাবেধর্ষনের শিকার ময়নাকে দাঁড়াতে হয় বিজ্ঞ জজের সামনে। তিনি তাকে জিজ্ঞেস করেন, তুমি রেপিষ্টদের বিরুদ্ধে মামলা করনি? ময়না বলে না, করিনি।

বিজ্ঞ জজ: তুমি তাগো চিনতে পারছিলা।

ময়না: , চিনতে পারছিলাম।

জজ: তাহলে মামলা কর নাই ক্যান।

ময়না: মামলা কইর‌্যা কি অইব? এই হুয়ুরের দ্যাশে হুয়ুরগো বিরুদ্ধে মামলা কইর‌্যা কি অইবো।

জজ: তুমি এইটা কি বলতেছ!

ময়না: বিজ্ঞ জজ সাব, আপনে কি জানেন, আমারে থানায় আইন্যা চাইর দিন ওসি আর দারোগাপুলিশে ধর্ষণ করছে।

জজ: তুমি কও কি?

ময়না: আহেন, আপনেও আমারে ধর্ষণ করেন………

উপন্যাসটির শেষের অংশটি খুবই তাৎপর্যপূর্ণ, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট এখনো সেরকমই আছে। ময়নারা ধর্ষণের শিকার হচ্ছেন কোন না কোনভাবে প্রতিদিনই। তাদের পক্ষে কেউ দাঁড়াচ্ছেন না। প্রতিবাদ করছে না। সমাবেশ, মিছিল, সভা, করছে না। ধর্ষণ অভিযোগে মামলা হয় সবচেয়ে কম, মামলা হলে বিচার প্রক্রিয়া অপরাধীদের দণ্ড কার্যকরের দৃষ্টান্ত আরো কম, আবার মামলা প্রমান করার ক্ষেত্রে ধর্ষনের শিকার নারী আইনী ও সামাজিক সহায়তাগুলিও ঠিকঠাক মতো পান না। সবচেয়ে ট্রাজেডি হচ্ছে, প্রমানের অভাবে ধর্ষনের দায়ে অভিযুক্তরা অনেকক্ষেত্রেই খালাস পেয়ে যান। এর সাথে যুক্ত হয় অন্য ট্রাজেডি, আমাদের রাষ্ট্রসমাজব্যক্তি ধর্ষককে ঘৃনার চোখে দেখে না, বদলে ধর্ষণের শিকার নারীকে পরিবারসমাজ সর্বত্রই হতে হয় বিগ্রহের শিকার। অনেক সময় শারীরিক ও মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়া ঐ নারী করুণ মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যেতে থাকেন। বাংলাদেশে নাগরিক সমাজ যে ক’টি ধর্ষণের ঘটনায় স্বোচ্চার হতে পেরেছিলেন, সেক্ষেত্রে কোনটিই কি বিচারের আলোয় এসেছে, নাকি ধর্ষকরা সাজা পেয়েছে? মোট কথা, বিচারহীনতার একটি স্থায়ী কালচার গড়ে ওঠার কারনে অন্যান্য ভয়াবহ অপরাধের পাশাপাশি নারী ধর্ষণের মত মানবতাবিরোধী অপরাধ কমছে না, বেড়েই চলেছে।

এই বাংলাদেশে এখন জননিরাপত্তা বলতে প্রায় কিছুই অবশিষ্ট নেই। আর এই সাধারন জনগনের মধ্যে আরও দুর্বলতম অবস্থানের মানুষ নারীর নিরাপত্তাহীনতার কথা তো উল্লেখই করার দরকার নেই। দেড় বছরে যদি এক হাজারেরও বেশি নারী ধর্ষণের শিকার হয় একটি দেশে তাহলে নিরাপত্তাহীনতার যে চিত্রটি ফুটে ওঠে সে সম্পর্কে দেশের দুই প্রধান নেত্রীর বক্তব্য জনগনের জানতে ইচ্ছে করে। ক্ষমতা আর শুধুই ক্ষমতার মোহে আকন্ঠ নিমজ্জিত এইসব রাজনীতিবিদদের কাছে মানুষের কোন মূল্য আছে বলে মনে হয় না। মুখে যতই তারা ন্যায় বিচারের কথা বলুন না কেন, বিচারহীনতার কালচারটিকে তারাই স্থায়ীত্বের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। ৭১’র মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নকারী অথবা স্বাধীনতার ঘোষক বা মুক্তিযুদ্ধের অংশীদারযাই দাবি করুন না কেন, একাত্তরে পাক হানাদারদের বর্বরতা থেকে শিক্ষা নিয়ে ন্যায় বিচারের সংস্কৃতি বা ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার কোন পদক্ষেপই আমাদের রাজনীতিকরা কখনও কি ভেবেছেন? এই প্রশ্নের জবাব আজ হোক, কাল হোকজনগনের কাছে তাদের দিতেই হবে।।