Home » শিল্প-সংস্কৃতি » বাদল সরকার – মঞ্চ এবং দর্শকের সফল সংযোগকারী

বাদল সরকার – মঞ্চ এবং দর্শকের সফল সংযোগকারী

ফ্লোরা সরকার

last-6লাতিন আমেরিকার “তৃতীয় চলচ্চিত্রের” আদলে বাদল সরকার গড়ে তুলেছিলেন তার “থার্ড থিয়েটার” বা “তৃতীয় থিয়েটার”। লাতিন আমেরিকার তৃতীয় চলচ্চিত্র যেভাবে হলিউডি ছবিগুলিকে দূরে ঠেলে দিয়ে নিজেদের আদলে গড়ে তুলে, একান্তভাবেই নিজেদের অর্থাৎ “লাতিনীয়” হয়ে উঠেছিলো, বাদল সরকারের তৃতীয় থিয়েটারও হয়ে উঠেছিলো দেশীয়। তার দেশীয় নাটক তাই সমাজের সকল শ্রেণীর কাছে বোধগম্য হয়ে উঠতো। গত ১৫ জুলাই ছিলো তার ঊননব্বইতম জন্মবার্ষিকী, প্রয়াত এই নাট্যকারের প্রতি আমাদের সম্মান আর শ্রদ্ধা।

ষাট এর দশকে আধুনিক নাট্যকার হিসেবে মারাঠি ভাষায় বিজয় টেন্ডুলকার, হিন্দিতে মোহন রাকেশ এবং কানাড়ি ভাষায় গিরিশ কার্নাডের পাশাপাশি বাংলায় বাদল সরকারের নামও উঠে আসে। এবং ইন্দ্রজিৎ, পাগলা ঘোড়া, সারারাত্তির, বাকি ইতিহাস সহ প্রায় পঞ্চাশটির মতো নাটক রচনা করেছেন। ১৯৭২ সালে তাকে পদ্মশ্রী পদক প্রদান করা হয়, ১৯৬৮ তে সঙ্গীত নাটক একাডেমি অ্যাওয়ার্ড প্রদান করা হয় এবং ১৯৯৭ সালে সঙ্গীত নাটক অ্যাকাডেমি ফেলোশীপ থেকে ভারত সরকারের সর্ব্বোচ্চ সম্মানিত পুরষ্কার “রত্ন সদস্য” পদকে তাকে ভূষিত করা হয়।

নাট্যকার বাদল সরকারের শিল্পজীবন শুরু হয়েছিল অভিনয় দিয়ে। ১৯৫১ সালে চক্র থিয়েটারের “বড় তৃষ্ণা” নাটকের মধ্যে দিয়ে তার অভিনয় জীবন শুরু। সেই সময়ের পশ্চিম বঙ্গের থিয়েটারে শম্ভু মিত্র, বিজন ভট্টাচার্য এবং উৎপল দত্তের মতো বিখ্যাত সব রিয়ালিস্ট নাটকের দিকপালেরা মঞ্চ কাঁপিয়ে নাটক নির্মাণ করে যাচ্ছেন। ১৯৬৩ সালে নাইজেরিয়া থাকাকালীন সময়েই তার জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নাটক “এবং ইন্দ্রজিৎ” লিখে শেষ করেন, যা ১৯৬৫ সালে প্রথম মঞ্চস্থ হয় কলকাতায়। এর মাঝেই “চক্র” নামে একটি সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান করেন এবং নিয়মিত মঞ্চায়ন ছাড়াই নিয়মিতভাবে নাটকের ওপর আলোচনা,পড়াশোনা এবং রিহার্সাল চালিয়ে যান। ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত তিনি কর্মজীবন চালিয়ে গেলেও ১৯৭০ নাগাদ নাট্যকার হিসেবে তার পরিচিতির প্রসার ঘটতে থাকে। শুধু তাই নয়, তাকে শিক্ষামূলক এবং সামাজিক দায়বদ্ধ নাট্যকার হিসেবে গণ্য করা হয়ে থাকে। তার ‘থার্ড থিয়েটার’ সেরকম একটি চেষ্টার ফল। মূলত যাত্রা এবং দেশীয় ঐতিহ্যের নির্যাস সম্বলিত ভাব থেকে নিয়ে তার এই থার্ড থিয়েটারের যাত্রা যা একান্তই নিজস্ব। থার্ড থিয়েটারের উৎপত্তি সামন্ত সমাজের সেই গুটিকয়েক শিক্ষিতের দ্বারা, যারা ভূস্বামী বা কৃষক কোন শ্রেণীর মধ্যে পড়ে না। বাদল সরকারের নাটকে কোন প্লট থাকে না। চরিত্রের সুনির্দিষ্ট কোন চরিত্রায়ন নেই। অভিনেতাঅভিনেত্রীরা ইচ্ছে মতো চরিত্র বাছাই করতে পারে, নাটকের মাঝখানে চরিত্র বদলও করতে পারে, এমনকি দর্শকেরাও অভিনয়ে অংশগ্রহণ করতে পারে। এই অংশগ্রহণ ঠিক আক্ষরিক অর্থে নয়, এই অংশগ্রহণের অর্থ নাটকে তাদের সংশ্লিষ্টতা খুব জোড়ালোভাবে থাকে। যেমন ‘প্রস্তাব’ নাটকের শেষে একটি দড়ির গিট খুলতে দেয়া হয় দর্শকদের। অর্থাৎ নাটকের চরিত্ররা যেমন শারীরিক কষ্টের দ্বারা নাটক উপস্থাপন করেন, দর্শকরাও সেই কষ্টের কিছুটা অংশভাগী হোক।

তার থার্ড থিয়েটারে মুখের অভিব্যক্তির চাইতে শারীরিক অভিব্যক্তি অধিক গুরুত্ব পায়। এখানে একটি কথা বলে রাখা ভালো, চলচ্চিত্রের বড় পর্দায় পারফরমার বা অভিনয় শিল্পীদের মুখের অভিব্যক্তি যতটা প্রয়োজন মঞ্চ নাটকে ততটা প্রয়োজন পড়ে না, আর তাই মঞ্চ নাটকে চরিত্রদের দেহের অভিব্যক্তি অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ। সরকারের নাটকে চরিত্রদের ‘স্পেস’ বা ‘স্থানিক’ স্বাধীনতা প্রচুর। ফলে চরিত্ররা ইচ্ছেমতো ঘুরে ফিরে অভিনয় করেন।

মনিপুরের একটি ওয়ার্কশপে সরকার মনিপুরি ভাষায় যে নাটক উপস্থাপন করেছিলেন সেখানকার স্টেজটি ছিলো উন্মুক্ত। শুধু ওপরে কিছু বাঁশের সারি দিয়ে ছাদ নির্মাণ করা হয়। মাটিতে ম্যাট বা চট বিছিয়ে দর্র্শকের বসার ব্যবস্থা করা হয়। নাটকের আনুষঙ্গিক জিনিসপত্র সীমিত ব্যবহারের কারণে যে কোন জায়গায় যখন তখন তার নাটক মঞ্চায়িত হতে কোন অসুবিধা হতো না। নাটকের গঠন এবং সংলাপ পরিবেশনা কখনো কখনো অভিনয়ের মূল উপজীব্য হয়ে যায়। ছোট ছোট সংলাপ, দৃশ্য সহ ভঙ্গুর সংলাপগুলো কখনো কখনো অর্থহীন অ্যাবসার্ট নাটকের মতো হয়ে ওঠে। কোন নাটকে দেখা যায় একই সংলাপ দুটো চরিত্রকে দিয়ে বলানো হয়েছে। আবার একই পারফরমার ভিন্ন ভিন্ন চরিত্রে রূপদান করে। যেমন তার একটি নাটকে যখন দেখা যায় একই ব্যক্তি পিয়ন এবং বসের চরিত্রে অভিনয় করেন তখন বাদল সরকার এই বিষয়ে বলেন – “ এই দুইজনের মাঝে মূলত কোন পার্থক্য নেই, কারণ দুজনই মানুষ। কাজেই একই ব্যক্তি দুটো চরিত্রে অভিনয় করতে পারে”। অর্থাৎ একই ব্যক্তির দুটো ভিন্ন শ্রেণীর চরিত্র চিত্রায়নের মধ্যে দিয়ে তিনি এক ধরণের শ্রেণীহীন সমাজের উপস্থাপন করার চেষ্টা করেন।

দর্শককে সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করানোই বাদল সরকারের নাটকের বৈশিষ্ট। জীবনের মূল্য এবং সামাজিক সম্পর্কের টানাপোড়েন এমন একটি প্রতিকুল পরিবেশে এনে দেখান যেখানে দর্শককে বিস্ময়ের পর বিস্ময় জাগাতে থাকে। যেমন ‘এবং ইন্দ্রজিৎ’ নাটকে সুমন্ত ব্যানার্জি যদি ইন্দ্রজিৎকে প্রশ্ন করে মানুষ কেন বেঁচে থাকবে তাহলে ‘সারা রাত্রি’, ‘বাকি ইতিহাস’‘তৃংশ শতাব্দী’ এবং ‘শেষ নেই’ নাটকগুলোতে তিনি দেখান মানুষের বেঁচে থাকার ব্যর্থতা বা সার্থকতা একান্তভাবেই তার নিজের ওপর নির্ভর করে। অস্তিত্বের শূন্যতা পূরণে ব্যর্থতার কারণেই মানুষ অপরাধ বোধ করে। এবং সেখান থেকেই মানুষের বেঁচে থাকার অপরাধবোধ বা দায়িত্ববোধ শুরু হয়। চলচ্চিত্রকার বার্গম্যানের যদি প্রশ্ন থাকে (উইন্টার লাইট) কেনো আমাদের বেঁচে থাকতেই হবে তাহলে বাদল সরকারের উত্তর মৃত্যুর চেয়ে বেঁচে থাকা অধিক শ্রেয় (শেষ নেই)। তার প্রায় সবগুলো নাটকই ভিন্নভাবে সুদীর্ঘ আলোচনার দাবি রাখে, এই স্বল্প পরিসরে তা সম্ভব নয়। আমরা তার তিনটি নাটক নিয়ে এখানে আলোচনা করবো।

শেষ নেই (১৯৭০)’ নাটকে দেখা যায় নাটকের মূল চরিত্র সুমন্ত জীবনের নানা পছন্দের মাঝে ঘুরে শেষ পর্যন্ত নিজেকে লেখক হিসেবে আবিষ্কার করেন। যে লেখক বড় একটি পুরষ্কার পাবার পরে পরেই তার মা, শিক্ষক, প্রেয়সী, পার্টি কমরেড, তার শিক্ষক, অফিসের বস এর দ্বারা অভিযুক্ত হন। দেখা যায় তাদের অভিযোগের কোন অন্ত নেই। অথচ সে অখণ্ডতার পেছনেই ছুটেছিল। প্রেমিকা মানিকার সাথে তার ঘর বাঁধা হয়নি কারণ সুমন্তর আকাশটা ছিলো বিশাল। সংসারের বদ্ধ ঘরে সে তার জীবনকে গন্ডীবদ্ধ করতে চায়নি। বিপ্লব বন্ধু প্রশান্তকে ছাড়তে হলো, দুজনের মানসিক দূরত্বের কারণে। প্রশান্ত রাজনৈতিক দলের প্রতীক হয়ে আমাদের সামনে এসে দেখা দেয়। দুজন মানুষ কখনো একরকম হয়না। একরকম হলেও তাদের ভেতরকার মানসিক অভাববোধটা থেকেই যায়। এই অভাব কেউ কাউকে দিয়ে পূরণ করতে পারেনা। কাজেই সেখানেও সুমন্ত কোনো সমাধান খুঁজে পায়না। সুমন্ত পড়াশোনা করতে চায়নি, চেয়েছিলো শিখতে। লেখাপড়া করা আর শেখা এক বিষয় না। তাই এম.এস.সি. পাশ করার পর তার শিক্ষক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক অমিয়কুমার মুখোপাধ্যায়ের শত অনুরোধেও গবেষণামূলক কার্যক্রম থেকে নিজেকে বিরত রাখে। শ্রীবাস্তবের অধীনে জুনিয়র এক্সেকিউটিভ পদে মোটা বেতনের চাকরিও ছেড়ে দেয়। পুঁজিবাদের চক্রাকার প্রবাহ মানুষকে কীভাবে অর্থগৃধ্ণু করে তোলে কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে শ্রীবাস্তবকে মাত্র একটি সংলাপ দিয়ে সুমন্ত বলে – “— রক্তে ঘুন ধরিয়ে দিয়েছিলেন আপনারা টাকা দিয়ে। টাকার অভ্যেস করিয়ে দেন আপনারা ঐ আপনাদের পদ্ধতি।” আসলে সুমন্ত নিজের মতো করে বাঁচতে চেয়েছিলো। নিয়মনীতি, আইনআদলত দিয়ে জীবনকে নিজের মতো করে সাজানো যায় না। তাইতো সুমন বলে ওঠে – “আমি যেতে চাই যাওয়া ছাড়িয়ে ।” এই যাওয়া ছড়িয়ে যাবার অভিপ্রায় নিয়ে বিভিন্ন পথ পরিক্রমের পর লেখক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারলেও শেষ রক্ষা করতে পারেনি। লেখক হিসেবে এখানেও তার একটা ফাঁক থেকে গেছে। সমাজের প্রান্তিক মানুষেরা সুমন্তকে অভিযুক্ত করে তাদের সম্পর্কে লেখার বিষয় নিয়ে। সুমন্ত ভয় পায় তাদের নিয়ে লিখতে। প্রান্তিকেরা জানায় ভয় নিয়ে বাঁচা যায় না। ভয়ে মূল্যবোধ চলে যায়। আশা চলে যায়। জীবনের অর্থ চলে যায়। মন পঙ্গু হয়ে যায়। নাটকের শেষে আমরা এই উপলব্ধিতে আসি কেউ যখন কোন আঘাত বা ভীতির মুখোমুখি হয় তখন একান্তভাবেই ব্যক্তির নিজ দায়িত্বে একা তাকেই মোকাবিলা করতে হয়। নাটকের একেবারে শেষে তাই আসামী আর বিচারক একাকার হয়ে যায়। এভাবেই চলে নিজেকে নিরন্তর খুঁড়ে দেখা ও চলার ইতিহাস।

এবং ইন্দ্রজিৎ’ নাটকটি শেকড়হীন নব্য শহুরে মধ্যবিত্তের কাহিনীকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হওয়ায় তার নাটক শহুরে মধ্যবিত্তের জন্যে রচিত বলে মনে হতে পারে। কিন্তু একটু নিবিষ্ট চিত্তে তার সব নাটক পর্যবেক্ষন করলে বোঝা যায় তার পৃথিবী দৈনন্দিন বাস্তবতাকে ঘিরে আবর্তিত, যে পৃথিবী অনায়কচিত। আর তাই সাধারণ দর্শকের প্রতিই তার প্রাধান্য দেখা যায়। সরকার এই সাধারণ দর্শকদের উদ্দেশ্যেই বলেছিলেন – “এসব দর্শক যারা খুব ভালো পোশাক পরে নাটক দেখতে আসেন না তারা নাটকের ভেতর মূল বিষয়বস্তুর দিকেই কেবল মনোযোগী, আর ভালো পোশাক পরিহিত তথা শহরের মধ্যবিত্ত শ্রেণী নাটকের ভেতর সৌন্দর্যশাস্ত্র বা নন্দনতত্ত্ব খুঁজে বেড়ান।”(মনিপুরের ওয়ার্কশপ)। তার আরেকটি নাটক “ ওরে বিহঙ্গ ” আক্ষরিক ভাবেই সমাজের প্রান্তিক চরিত্রদের এনে, তাদেরকে কেন্দ্র নাটকটি নির্মিত হয়েছে। এই নাটক সমাজের যেকোনো শ্রেণী থেকে উঠে আসা দর্শকের কাছে বোধগম্য। মাত্র তিনটি চরিত্র মোক্ষদা, রাজলক্ষী এবং পাগলদাদা। পাগলদাদা থিয়েটারের দল গড়তে চান নিম্নবিত্তদের নিয়ে। শুধু তাইনা, এই প্রান্তিক শ্রেণীকে অসম্ভবের সম্ভাবনা দেখাতে চান তিনি। নাটকের এক জায়গায়, পাগলদাদা তার নাটকের দলে যোগ দিতে আসা রাজলক্ষীকে জিজ্ঞেস করেন – “সন্ধেরাতে আকাশেতে ছোট্টখাটো চাঁদ উঠলে তাকিয়ে দেখো? — আকাশ থেকে পেড়ে কামড়ে খেতে ইচ্ছে করে? — সন্ধেবেলা লালচেনরম সূয্যিটাকে বল বানিয়ে খেলা করতে ইচ্ছে করে?” শুধু স্বপ্ন দেখা না, স্বপ্নকে জাগিয়ের রাখার এক যাদুকর যেন এই পাগল দাদা। কিন্তু বাস্তবতা বলে ভিন্ন কথা। নাটকের শেষে রাজলক্ষী তাই পাগল দাদাকে প্রশ্নে জর্জরিত করে – “তোমার এটা থেটারের দল, না ওড়া শেখাবার ইস্কুল, বলতে পারো? ওড়া কি শেখানো যায়? শেখা যায়? মানুষ কি ওড়ে? মানুষ উড়লেও উড়তে পারে, কিন্তু মেয়ে মানুষ? তাও যদি ওড়ে, বাসনমাজা ঝি? বাসন মাজা ঝি কি পারবে কখনো পারবে উড়তে?” তবু পাগল দাদার আশা লুপ্ত হয়না, হয়না তার স্বপ্ন দেখা আর স্বপ্নকে জাগিয়ে রাখার বাসনা। তাই বলেন – “এখনি অন্ধ, বন্ধ করোনা পাখা ”।

শান্তি আর আনন্দ কখনোই পাশাপাশি বসবাস করতে পারেনা। শান্তি হলো গৃহকোণ আর আনন্দ হলো ভালোবাসা। সেই ভালোবাসা যা কারণহীন, যুক্তিহীন, বুদ্ধিহীন নির্বোধ এক একমুখী ভালোবাসা। এক সর্বত্যাগী, সর্বগ্রাসী, সর্বাঙ্গিক চাওয়া। একটা স্বপ্ন বা দুঃস্বপ্ন যে স্বপ্ন রক্তমাংসের মানুষের মাঝে মেলেনা, কোনোদিন মিলবে না তার স্বপ্নের সঙ্গে বাদল সরকারের অন্যতম আরেকটি নাটক “ সারারাত্তির ” এভাবেই দর্শকের কাছে পৌঁছে দিতে চায় মানুষের গভীরে থাকা নিভৃত বাসনা। একটি মাত্র বৃষ্টিররাতে সাত বছর একসঙ্গে বসবাস করেও স্বামীস্ত্রী আবিষ্কার করে দুজনকে। শুধু ভালোবাসাই সব নয়। দুজন দুজনকে জানার মধ্যে দিয়েই গড়ে ওঠে প্রকৃত ভালোবাসা। অথচ এই জানার বিষয়টি ছাড়াই দুজন দুজনকে এতোকাল ভালোবেসে এসেছে।

বাদল সরকার মানুষের হৃদয়ের অভ্যন্তরে নৃতাত্ত্বিকের মতো ফুঁড়ে বের করতে চান প্রকৃত মানুষটাকে। তাই দেখা যায় কোনো এক বৃষ্টি ভেজা রাতে দুই স্বামীস্ত্রী একটা ভাঙ্গা বাড়িতে এসে হাজির হয় আশ্রয়ের জন্যে, যেখানে এক বৃদ্ধ অনেক কাল বসবাস করে এসেছে। চমৎকার মেটাফোর দিয়ে সাজিয়েছেন নাটকটি নাট্যকার। বাড়িটা যেমন অদ্ভূত তেমনি অদ্ভূত সেই বৃদ্ধ। আরো অদ্ভূত সেই বৃদ্ধের সঙ্গে অদ্ভূতভাবে নারীর ভালোবাসা আর চাওয়াপাওয়া একাকার হয়ে যায়। অন্ধকারে দুজনে এক হয়ে যায়। দুজনে যেন একটি অন্ধকার হয়ে হয়ে যায়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত শান্তির জয় অনিবার্য। বৃদ্ধের একটি সংলাপই সেজন্যে যথেষ্ট – “ঘর ভাসে না। অতি বড় দুর্যোগেও ভাসে না।” ঘর বাঁধা মানুষের এমনই এক চিরন্তন আর অনিবার্য এক অভ্যাস, যে অভ্যাস থেকে মানুষ উঠে আসতে পারেনা। আর তাই ভোরের আলো ফুটে ওঠার আগে নারীকে অনিবার্য ভাবে স্বামীর সঙ্গে চলে যেতে হয়। পেছনে পড়ে থাকে একটি রাত, মাত্র একটি জেগেথাকা রাত, অসম্ভব একটা ঘরে অসম্ভব একটা জেগেথাকা রাত যাকে শুধু স্মরণে থাকে গ্রহণ করা যায় না। এভাবেই বাদল সরকার তার নাটকের মধ্যে দিয়ে আমাদের অস্পষ্ট মুখাবয়ব স্পষ্ট করে তোলেন। জে.ভি. প্রসাদ তাই চমৎকার করে বলেন – “দর্শক এবং মঞ্চের মাঝে দূরত্ব সৃষ্টির চাইতে তার উদ্বেগ নাটককে দর্শকের সামনে জীবন্ত করে কাছে নিয়ে আসা।”