Home » বিশেষ নিবন্ধ » উত্তাল ষাটের দশক (প্রথম পর্ব)

উত্তাল ষাটের দশক (প্রথম পর্ব)

হায়দার আকবর খান রনো

last 3ষাটের দশক একটি বহুল আলোচিত ঐতিহাসিক কাল পর্ব। বিংশ শতাব্দীর ষাটের দশক ১৯৬০ থেকে ১৯৭০ সাল। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই কাল পর্বকে ঠিক কালেন্ডারের সঙ্গে মিলিয়ে ধরবো না। পৃথিবীর সূর্য প্রদক্ষিণের সময়কে বছর ধরে আমরা দশক, শতাব্দী হিসেব করি এবং নিজস্ব হিসেব মতো ক্যালেন্ডার নির্মাণ করি। আমরা সাধারণত গ্রেগরীয় ক্যালেন্ডারকে ধরেই কাল পর্বকে চিহিৃত করি। তবে মানব ইতিহাসের কাল পর্ব ঠিক সুনির্দিষ্টভাবে ক্যালেন্ডার বা পঞ্জিকা মিলিয়ে চলে না। একটু কমবেশি হয়ে থাকে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ষাটের দশক বলতে আমরা ১৯৫৮ সাল থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত ধরবো। এটাকে একটা ঐতিহাসিক যুগ বলেও চিহিৃত করতে পারি। ১৯৫৮ সালে পাকিস্তানে সামরিক শাসন জারি করে গণতন্ত্রের সকল সম্ভাবনাকেই রুদ্ধ করে দেয়া হয়েছিল। সেটা ছিল শাসক শ্রেণীর দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার অংশ। শুধু পাকিস্তানের শাসক শ্রেণীরই নয় এর পেছনে মদদ দাতা ছিল মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ। ষাটের দশকটি ছিল মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের সবচেয়ে তীব্র আক্রমনের সময়কাল। দেশে দেশে ক্যু ও সামরিক শাসন প্রতিষ্ঠা করা তাদের রণনীতির অংশ ছিল।

১৯৫৮ সালের সামরিক শাসন গণপ্রতিরোধের মুখে পড়েছিল। ১৯৬২ সাল থেকেই শুরু হয়েছিল সামরিক শাসন বিরোধী গণআন্দোলন। আমাদের ইতিহাসের এক উজ্জ্বল অধ্যায়ের সূচনা। তারপর ধাপে ধাপে বিকশিত হয় ছাত্র আন্দোলন, শ্রমিক আন্দোলন, কৃষক আন্দোলন ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন এবং সর্বোপরি বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদের সংগ্রাম যার পরিণতি লাভ করেছিল ১৯৭১এর মুক্তিযুদ্ধে। আমরা ষাটের দশক বলতে ১৯৫৮ থেকে ১৯৭১ এই কালপর্বকে বুঝিয়ে থাকি। সমগ্র জাতির ইতিহাসে এই কালপর্বটি চরম রূপ লাভ করেছিল। এই সময়কালকে অনেকটা চার্লস ডিকেন্সের এ টেল টু সিটিজর ভাষায় বর্ণনা করা যায় – ‘সেটা শ্রেষ্ঠ সময়, সেটা নিকৃষ্ট সময়, সেটা বিচক্ষণতার যুগ, সেটা বোকামির যুগ, সেটা বিশ্বাসের যুগ, সেটা অবিশ্বাসের যুগ, সেটা আলোর ঋতু, সেটা আশার বসন্ত, সেটা নৈরাশ্যের শীত, আমাদের সব কিছু ছিল, কিছুই ছিল না, সকলেই আমরা সোজা স্বর্গের দিকে যাচ্ছি, সোজা আমরা উল্টো দিকে হাটছি সেই পথ এ পর্যন্ত আজকের পর্বের মতোই, যেখানে শোরগোল তোলা কর্তৃপক্ষের কেউ কেউ ভালোর জন্যই হোক বা মন্দের জন্যই হোক, চরমতম মাত্রার তুলনার দাবিদার।

ফরাসী বিপ্লবের প্রেক্ষাপটে রচিত ঊপন্যাসের শুরুর লাইনগুলি ছিল এই রকম। বিংশ শতাব্দীর ষাটের দশকের সঙ্গে ফরাসি বিপ্লব অবশ্যই তুলনীয় নয়। ইতিহাসের কোন পর্ব বা ঘটনা আরেকটির সঙ্গে হুবহু এক রকম হয় না। তবে বাংলাদেশের জন্য ষাটের দশকে ছিল ডিকেন্স বর্ণিত দুই বিপরীত চরমের পাশাপাশি অবস্থান।

ষাটের দশক বিশ্ব ইতিহাসেও একটা বিশেষ অবস্থান রেখেছিল। এই সময়টিই ছিল জাতীয় মুক্তি সংগ্রামের বিজয়ের যুগ। এশিয়াআফ্রিকায় পুরাতন উপনিবেশবাদের পতন ঘটছে। কৃষ্ণ আফ্রিকায় নানা মাত্রায় সশস্ত্র মুক্তি সংগ্রাম তীব্র হয়ে উঠেছিল ষাটের দশকেই। আফ্রিকার অধিকাংশ দেশ ১৯৫৭ থেকে ১৯৬২ সালের মধ্যে স্বাধীনতা অর্জন করেছিল। তবু পরাধীন ছিল উত্তরে আলজেরিয়া, দক্ষিণে নমিবিয়িা, এঙ্গোলা, মোজাম্বিকসহ দক্ষিণ আফ্রিকা। আলজেরিয়ায় মুক্তি সংগ্রাম সেই সময় আমাদেরকেও উজ্জীবিত করতো। নেত্রী জামিলার নাম তখন আমাদের মুখে মুখে ছিল। আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেস ও দক্ষিণ আফ্রিকার কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবাদী শাসনের বিরুদ্ধে সশস্ত্র যুদ্ধ শুরু হয়েছিল দক্ষিণ আফ্রিকায় ষাটের দশকেই। এঙ্গোলামোজাম্বিকের মতো পর্তুগীজ কলোনীতেও তখন চলছে সশস্ত্র মুক্তি সংগ্রাম।

বেলজিয়াম মুক্তি সংগ্রামের তীব্র চাপের কারণে ছেড়ে যেতে বাধ্য হয় কঙ্গো। এটাও ষাটের দশকে। একই সময় শুরু হয় কঙ্গোকে নিয়ে বীভৎস ষড়যন্ত্র। সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রগুলো লুমুম্বাকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করে কঙ্গোকে কার্যত পুনর্দখলের চেষ্টা চালায় দালাল মুবুতুকে ক্ষমতায় বসিয়ে। লুমুম্বার হত্যাকান্ড সারা বিশ্বে প্রচঘৃণা ও আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। এখানে উল্লেখ্য ঠিক সেই সময় কঙ্গোর বিপ্লবে অংশ নিতে কিউবা থেকে ছুটে এসেছিলেন চে গুয়েভারা ও তার কিউবার কমরেডরা। প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখযোগ্য যে, কিউবার বিপ্লবের নেতা চে এরপরে বলিভিয়ায় গিয়েছিলেন বিপ্লবকে সাহায্য করতে। সেখানেই তিনি রণক্ষেত্রে আহত হন ও ধরা পড়েন। এবং সরাসরি মার্কিন প্রশাসন ও সিআইএএর নির্দেশে তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। সেটাও ষাটের দশকে। ১৯৬৭ সালের ৯ অক্টোবর।

আফ্রিকার মুক্তি সংগ্রামের প্রতীকে পরিণত হয়েছিলেন প্যাট্রিস লুমুম্বা। সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়ন তারই নামে প্রতিষ্ঠা করলো আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়। পৃথিবীর প্রায় সকল দেশের শিক্ষার্থীদের জন্য উন্নতমানের বিশ্ববিদ্যালয়।

মনে পড়ে সেই সময় আমারই বন্ধু, একই বর্ষের ছাত্র তরুণ কবি আসাদ চৌধুরী লিখেছিলেন এক অসাধারণ কবিতা ইতিহাসের আরেক নায়ক।এটি ছাপা হয়েছিল ভাসানী ন্যাপ কর্মী ও কমিউনিস্ট আজাদ সুলতান কর্তৃক সম্পাদিত আফ্রিকার হৃদয়ে সূর্যোদয়শীর্ষক এক সংকলনে। ১৯৬১ সালে। এতেই বোঝা যায়, আফ্রিকার মুক্তি সংগ্রাম বাংলাদেশেও নতুন প্রজন্মকে কতোটা স্পর্শ করেছিল। সেই সময় পণ্ডিত ও কমিউনিস্ট নেতা রণেশ দাস গুপ্ত দৈনিক সংবাদের সম্পাদকীয় বিভাগে কাজ করতেন। তিনি আসাদের কবিতাটি পড়ে এতই মুগ্ধ হয়েছিলেন যে, তিনি কবিতাটি উপসম্পাদকীয়ের জায়গায় ছাপানোর ব্যবস্থা করেছিলেন।

ষাটের দশক ািছল মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের হিং¯্র আক্রমণের কালপর্ব। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরপরই শুরু হয়েছিল যে শীতল যুদ্ধ, তা ষাটের দশকে চরমে উঠেছিল। তাছাড়া এই সময়েই শুরু হয়েছিল পুরাতন ঊপনিবেশগুলোকে পুনর্দখলের পায়তারা। বস্তুত পঞ্চাশের দশক থেকেই শুরু। পুনর্দখলের প্রক্রিয়া ও চেহারাটা অবশ্য ছিল ভিন্নতর। সরাসরি দখল নয়, কিন্তু দালাল বসিয়ে, প্রয়োজনে সৈন্য পাঠিয়ে এবং সামরিক ঘাটি বানিয়ে নতুন ভাবে দখলে নেয়ার ঘৃণ্য প্রয়াস। যাকে বলা হয় নয়া উপনিবেশবাদ। আগে প্রধানত বৃটিশ ও ফরাসী এবং তার সঙ্গে স্পেন, পর্তুগাল, নেদারল্যান্ড প্রভৃতি বনেদী সাম্রাজ্যবাদের দখলে ছিল প্রাচ্যের প্রায় সমগ্র ভূখন্ড। এখন তার বদলে আরও হিং¯্র চেহারা নিয়ে এলো মার্কিন। একদিকে সমাজতান্ত্রিক শিবিরকে ধ্বংস করার মতলবে সোভিয়েত ও চীনকে ঘিরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে সামরিক ঘাটি বিশেস করে সদ্য মুক্তিপ্রাপ্ত লাল চীনকে ধ্বংস করার বদমতলব অব্যাহত রয়েছে, অপরদিকে সদ্য স্বাধীনতা প্রাপ্ত দেশগুলোকে নয়া কায়দায় পুনর্দখলের প্রচেষ্টা। এই দুই লক্ষ্যকে সামনে রেখে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এক আগ্রাসী রাষ্ট্র রূপে আবির্ভূত হল। ষাটের দশকে তার চরিত্র বীভৎস আকার ধারণ করেছিল। বিশেষত ভিয়েতনাম তথা ইন্দোচীনে।

গোটা ষাটের দশক জুড়েই ভিয়েতনাম ছিল বিশ্বব্যাপী প্রতিদিনের খবরের কাগজের প্রথম পাতার সংবাদ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভিয়েতনামে যে ধ্বংসলীলা চালিয়েছিল, তা ইতিহাসের বর্বরতম ঘটনাসমূহের অন্যতম। ভিয়েতনামকে কেন্দ্র করে বিশ্বব্যাপী প্রতিবাদের ঝড় উঠেছিল। এমনকি খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। প্রতিবাদের ঝড় উঠেছিল বাংলাদেশেও। মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানীর কণ্ঠে ছিল ভিয়েতনামের প্রতি সংহতি এবং মার্কিন প্রশাসনের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদের আওয়াজ। আইয়ুব সরকার সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী সংগ্রামকে কমিউনিস্ট উস্কানি বলে আখ্যায়িত করে নির্মমভাবে দমন করতে চেয়েছিল। এখানে উল্লেখ্য যে, সেই সময় আওয়ামী লীগ বা ছাত্রলীগ এই সংগ্রামের সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে চায়নি। মনে পড়ে, আমরা সেই সময় শ্লোগান দিতাম, ‘আমার নাম তোমার নাম ভিয়েতনামভিয়েতনাম।ছাত্রলীগের কর্মীরা এ নিয়ে ঠাট্টা করতো। মাও মাও হো হোএ ধরনের মসকরা করতেও তাদের তখন বাঁধতো না। মাও মানে চীন বিপ্লবের নেতা মাও সেতুঙ এবং হো মানে ভিয়েতনাম বিপ্লবের নেতা হো চিন মিন। বাংলাদেশসহ সারাবিশ্বের বিপ্লবীদের কাছে মাও সেতুঙ এবং হো চি মিন মহান আদর্শ। পরম শ্রদ্ধার সঙ্গে আমরা তাদের নাম উচ্চারণ করতাম। শুধু তাইই নয়, মাও সেতুঙ আর হো চি মিন আমাদের শরীরে ও মনে প্রবল আবেগ তৈরি করতো।

অবশ্য ১৯৬৯ সালে ১১ দফা রচনার পর থেকে ছাত্রলীগের মনোভাবের পরিবর্তন লক্ষ্য করা গিয়েছিল। তারা চীন বা ভিয়েতনাম বিপ্লবের প্রতি নমনীয় মনোভাব দেখাতে শুরু করে।

১৯৬৭ সালে চীনপন্থী বলে পরিচিত পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের মেনন গ্রুপের একটি মিছিল বের হয়েছিল ভিয়েতনামে মার্কিন আগ্রাসনের প্রতিবাদে। তোপখানা রোডে প্রেস ক্লাবের সামনে আইয়ুব প্রশাসনের পুলিশ বেধড়ক লাঠিচার্জ করে। মিছিল থেকে গ্রেফতার হলেন রাশেদ খান মেনন, অচিন্ত সেন ও আবদুস সামাদ। ঠিক একই জায়গায় পুলিশ গুলি করেছিল ১৯৭৩ সালের পহেলা জানুয়ারি। সেবারও ছিল ভিয়েতনামে আগ্রাসনের বিরুদ্ধে মিছিল। মস্কোপন্থী বলে পরিচিত বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের মিছিল। তখন গুলি করেছিল শেখ মুজিব প্রশাসনের পুলিশ। শহীদ হয়েছিলেন মতিউল ও কাদের নামের দুই তরুণ।

ভিয়েতনামের যুদ্ধ বিরোধী আন্দোলন গড়ে উঠেছিল খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। লক্ষ লক্ষ নরনারী রাস্তায় নেমে মিছিল করেছিল ভিয়েতনামে সামরিক আগ্রাসন বন্ধ করার জন্য। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী, দার্শনিক, কবি, লেখক, শিল্পী তারাও ভিয়েতনামের জনগণের সঙ্গে সংহতি জ্ঞাপন করেছিলেন। মার্কিন দেশে ষাটের দশকে একটা নতুন প্রগতির জোয়ার তৈরি হয়েছিল। ষাটের দশকের একটা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হলো কালো মানুষের বর্ণবাদ বিরোধী সংগ্রাম। এর আগে মার্কিন মুলুকে ঘৃণ্য বর্ণবাদ ছিল খুবই বীভৎস আকারে। কালো মানুষের ভোটাধিকার ছিল না। ষাটের দশকের এই সংগ্রাম না হলে আজ বারাক ওবামা প্রেসিডেন্ট হতে পারতেন না। ষাটের দশকেই আইন করে বর্ণবাদ প্রথা উঠিয়ে দিতে বাধ্য হয় মার্কিন প্রশাসন। তার আগে সেই দেশে সাদা ও কালো মানুষদের জন্য ছিল পৃথক আবাসস্থল, রেস্টুরেন্ট ও সিনেমা হলে পৃথক বসার জায়গা, পৃথক ট্যাক্সি ইত্যাদি। এমনকি কালো মানুষকে ধরে সাদা চামড়ার খুনিরা প্রকাশ্যে গাছের সঙ্গে বেধে ছাগলের চামড়া ছেড়ার মতো করে চামড়া ছিড়ে হত্যা করতো। এই প্রক্রিয়ায় হত্যাকে বলা হয় লিনচিং। কোন বিচার হতো না। এতটাই অসভ্য ও বর্বর ছিল মার্কিন দেশটি। এ জন্য বিখ্যাত মানবতাবাদী লেখক মার্ক টোয়াইন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নাম দিয়েছিলেন United Lynching State.

ষাটের দশকে কেবল তৃতীয় বিশ্বে সশস্ত্র সংগ্রামের জোয়ার ওঠেনি, উন্নত বিশ্বে অর্থাৎ খোদ সাম্রাজ্যবাদী জগতেও প্রগতির উত্তাল ধারা তৈরি হয়েছিল। সেই ধারা ছিল সাম্রাজ্যবাদ ও পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে। আমেরিকার বর্ণবাদ বিরোধী ও ভিয়েতনাম যুদ্ধ বিরোধী আন্দোলনের কথা তো বলা হয়েছে। এছাড়াও পুঁজিবাদ বিরোধী সংগ্রামের জোয়ার উঠেছিল বনেদি সাম্রাজ্যবাদের দেশ ইউরোপে, ইংল্যান্ড, ফ্রান্স ও জার্মানিতে। বিশেষ করে ফ্রান্স ও জার্মানিতে ছাত্র বিদ্রোহের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল শ্রমিক শ্রেণী। ১৯৬৮ সালের এই অভ্যুত্থান ছিল ইতিহাসের এক বিরাট মাইলফলক। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আমেরিকা ও পশ্চিম ইউরোপে কমিউনিজম বিরোধী প্রচার ছিল তুঙ্গে। আমেরিকায় কমিউনিজমের নামে যে সন্ত্রাস চালানো হয়েছিল তা ম্যাকার্থারিজম নামে পরিচিত। পঞ্চাশের দশকে যুক্তরাষ্ট্রে সম্পূর্ণ মিথ্যা অভিযোগে বিজ্ঞানী রোজেনবার্গ দম্পতিকে গ্যাস চেম্বারে বসিয়ে হত্যা করা হয়েছিল। কারণ তারা কমিউনিস্ট ভাবাপন্ন ছিলেন। সেই সময় এমনকি মহাবিজ্ঞানী আইনস্টাইনকেও কমিউনিস্ট সন্দেহে পুলিশের নজরদারিতে রাখা হয়েছিল।

পশ্চিম ইউরোপে ব্যাপারটা সে রকম ছিল না। অবশ্য পশ্চিম জার্মানিতে কমিউনিস্ট পার্টি বেআইনি ছিল। সমাজতন্ত্র মানে যেন রাষ্ট্রদ্রোহিতামূলক অপরাধ। তবে একই সঙ্গে সমাজতন্ত্রের প্রভাবকে প্রতিহত করার জন্য পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলোতে তথাকথিত কল্যাণ রাষ্ট্রের কর্মসূচি নেয়া হয়। এতে সমাজতন্ত্রের মতো না হলেও কিছুটা সামাজিক নিরাপত্তার ব্যবস্থা নেয়া হয়েছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর তাই একদিকে পুঁজিবাদী জগতে প্রবৃদ্ধি, অন্যদিকে শ্রমিকদের কিছুটা সুবিধা প্রদানের মাধ্যমে এক ধরনের শ্রেণী সমন্বয়ের পরিবেশ গড়ে উঠেছিল। প্রতিষ্ঠিত ট্রেড ইউনিয়নগুলো এ্যাসটাবলিশমেন্টের অংশে পরিণত হয়েছিল। কর্পোরেট পুঁজির জন্য বেশ সুখকর অবস্থা তৈরি হয়েছিল। তারই মাঝে হঠাৎ করে ১৯৬৮ সালের শ্রমিকছাত্র বিস্ফোরণ ছিল রীতিমতো বিস্ময়কর। ষাটের দশকের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। ফ্রান্স ও জার্মানিতে পুরাতন কমিউনিস্ট পার্টি সংশোধনবাদীতে পরিণত হয়েছিল। শ্রেণী সংগ্রামের বদলে শ্রেণী সমঝোতায় তারা অধিক মনোযোগী ছিলেন। ক্রুশ্চেভের পর থেকে পশ্চিম জার্মানির সেই বেআইনি পার্টি ও অবিপ্লবী এবং পূর্ব জার্মানীর শাসক পার্টির উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিল। ১৯৬৮এর অভ্যুত্থান নতুন করে অনেকগুলো বিপ্লবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ কমিউনিস্ট গ্রুপের জন্ম দিয়েছিল। তার অনেকগুলোই এখন অস্তিত্বহীন। আবার জার্মানির মাকসবাদীলেনিনবাদী পার্টি (MLPI)-এর জন্ম ও বিকাশ ঘটেছিল ১৯৬৮এর অভ্যুত্থানের পরিপ্রেক্ষিতেই।

১৯৬৮এর ইউরোপীয় অভ্যুত্থান দীর্ঘমেয়াদী কোন প্রভাব না রাখতে পারলেও তখন ইউরোপীয় সমাজকে বেশ নাড়া দিয়েছিল। বিশেষ করে চিন্তার জগতে যে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল এবং পুঁজিবাদ বিরোধী বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণ যেটা ঘটেছিল তার ঐতিহাসিক মূল্য কম ছিল না।।

(চলবে…)