Home » বিশেষ নিবন্ধ » ষাটের দশক :: সময়ের মাঝখানের সময়

ষাটের দশক :: সময়ের মাঝখানের সময়

. মীজানূর রহমান শেলী

last threeফিরে দেখা: ফিরে দেখা সহজ নয়। দুই হাজার চোদ্দ সনে দাঁড়িয়ে ষাটের দশকের নৈর্ব্যক্তিক স্মৃতি রোমন্থন এক জটিল এবং প্রায় অসাধ্য কাজ। ষাটের দশকের শুরুতে আমাদের বয়স বিশের কোঠায় পৌঁছায়নি। শাশ্বত তরুণের মত আমাদের জন্যও তাই ঐ সময় ছিল নতুন যুগের ভোর, এক অনন্যপূর্ব ঊষালগ্ন। নিজের ভাষায় বলি – (এই স্বলিখিত ভাষ্য ইতিপূর্বে পত্রান্তরে প্রকাশিত) আমাদের জন্য সেই সময় ছিল “ঈগলের চোখের মত ক্ষুধার্ত এবং নির্ভীক ও উজ্জ্বল অথচ একই সঙ্গে আত্মলীন প্রহরে কাকচক্ষু পানির সায়রের মত নির্জন এবং শান্তিময়। সকল কালের আত্মময় তরুণের মত আমরাও সেদিন জীবনকে অনুভব থেকে এবং অনুভবকে জীবন থেকেআলাদা করে দেখতে পারিনি।

ষাটের দশক আমাদের শেষ কৈশোর আর উদ্ভিন্ন যৌবনের কাল। আমাদের জন্য সেই সময় ছিল সময়ের মাঝখানের সময়। এমন সময়কে বিচার করবার, বিশ্লেষণ করবার অবকাশ ও প্রবণতা ঐ সময়ের তরুণ অধিবাসীদের থাকে না। নতুন যুগের ভোরেকেই বা সময় কাটাতে চায় সময় বিচার করে? যেমন আমাদের জন্য, তেমনি বুঝি আমাদের রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক পরিপার্শ্বের জন্যও ষাটের দশক ছিল দুই সময়ের মধ্যবর্তী এক সময়। আমাদের একক ও সামষ্টিক জীবনে ষাটের দশক ছিল এক তীক্ষ্ণচঞ্চু অগ্নিগর্ভ কাল। ঐ দশকের প্রথম তিনটি বছর (এবং পঞ্চাশের দশকের শেষ বছরটি) ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদের শিক্ষালাভের সময়।

উপত্যকার মত সময়

রাষ্ট্রে, সমাজে, শিক্ষাঙ্গনে সময়টা ছিল উপত্যকার মত একদিকে ১৯৪৭ ছিল অতিক্রান্ত এক দূরস্থিত পর্বত, এবং অন্যদিকে, যদিও তখনও তার বিকশিত রক্তরাঙ্গা গৌরবোজ্জ্বল আবির্ভাব ছিল অনাগত অদূরেই প্রতিক্ষমান অনতিক্রান্ত ১৯৭১। স্থবির পর্বতমালা ও উপত্যকার উপমা বুঝি গতিমান ঐ কালের ষাটের দশকের চরিত্রের সঠিক বর্ণনায় সফল নয়। বলা যায় ৪৭ আর ৭১এর দুই মহাতরঙ্গ শীর্ষের মাঝখানে ষাটের দশক ছিল অমিতসম্ভাবণায় তেজোদ্বীপ্ত এক হিরণ্যগর্ভ সরোবর। আপাতঃদৃষ্টিতে শান্ত ঐ সময়েই বুঝি অতীতের অভিজ্ঞতা সকল চলমান জীবনের বকযন্ত্রে সিদ্ধ হয়। তারপর এগিয়ে যায় এক অমোঘ প্রিয় পরিণতির পথে যার নাম একটি মুক্তি প্রয়াসী জাতির সার্বভৌম স্বাধীনতা।

সাতচল্লিশে ক্রান্তি। প্রায় দুই শতাব্দীর বৃটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান ও উপমহাদেশের বিভক্তি। নবসৃষ্ট পাকিস্তান রাষ্ট্রের পূর্বখণ্ড তখন পূর্ববাংলা, ষাটের দশকের পূর্বপাকিস্তান, আজকের বাংলাদেশ।

পূর্ববাংলা অর্থাৎ বাংলাদেশের পাকিস্তানভুক্তি মূলতঃ প্রাক ১৯৪৭এর বাংলার বিকাশমান মুসলমান মধ্যবিত্তের আর্থসামাজিক মুক্তিস্বপ্ন ও সংগ্রামেরই ফসল। ইতিহাস বলে যে, এই সংগ্রামে ধর্মীয় সংখ্যাগুরু সমাজের মধ্যবিত্তসমষ্টি উচ্চবর্ণ হিন্দুপ্রধান পশ্চিম বাংলাকে সামিল করতে চেয়েছিল। ১৯৪৭ এর ভারত বিভাগের সময় ভারত ও পাকিস্তানের আওতার বাইরে এক বৃহত্তর, ঐক্যবদ্ধ, সার্বভৌম বাংলা গড়ে তোলার ক্ষীণবল, ব্যর্থ এক প্রচেষ্টায় রত হন মিলিত হিন্দুমুসলিম নেতৃত্বের একাংশ। পশ্চিম বাংলার সমাজের তৎকালীন প্রবল প্রতিনিধিদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ এই আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে একাত্মবোধ করতে পারেনি ফলে তারা ভারত ইউনিয়নে যোগ দেয়ার সচেতন সিদ্ধান্ত নেন। পরিণতিতে বঙ্গদেশ খণ্ডিত হয় ১৯৪৭ সনের মধ্য আগষ্টের ভারতবর্ষে বৃটিশ শাসনের অবসানের সাথে সাথেই পূর্ববাংলা আজকের বাংলাদেশ, মুসলিমপ্রধান রাষ্ট্র পাকিস্তানের ভৌগলিকভাবে বিচ্ছিন্ন অংশ হিসাবে নতুন রূপ লাভ করে।

ষাটের দশক :: মধ্যদিনের সূর্যগ্রাস

ষাটের দশক সূচনায় এবং মধ্যপথে ছিল পূর্ববাংলায় অবিচ্ছিন্ন পাকিস্তানের গৌরবদীপ্ত যৌবনের কাল এবং একই সঙ্গে এই ভূখন্ডে ঐ রাষ্ট্রের বিলুপ্তির প্রক্রিয়ার নকীব। ষাটের দশক ছিল সামরিক শাসনের, সেনাপতি শাসনের কাল। সেই সময়, আরো ছিল, বাংলাদেশের মুসলিমপ্রধান মধ্যবিত্ত শ্রেণীর সম্প্রসারণ, পরিবর্ধন ও আত্মআবিষ্কারের এক বর্ণাঢ্য, সংগ্রামমুখর উৎক্রান্তিক সময়।

১৯৫৮ খৃষ্টাব্দের শরত থেকে ১৯৬৯ খৃষ্টাব্দের বসন্ত পর্যন্ত অবিভক্ত পাকিস্তানের সেনাপতি ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খান দোর্দন্ড প্রতাপে রাজ্যশাসন করেন। তাঁর সামরিক ও আধাসামরিক শাসনামলেই ষাটের দশকেই বাংলাদশের মুসলমানপ্রধান মধ্যবিত্ত শ্রেণী পশ্চিম পাকিস্তানী শাসিত পাকিস্তান রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে গড়ে তোলে সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা ও অর্থনৈতিক মুক্তির সংগ্রাম। ঐ দশকে বাঙালী মধ্যবিত্ত শ্রেণীর অন্তর্লীন বৈশিষ্ট্যগুলোই তাকে পুরোন রাষ্ট্রব্যবস্থা ভেঙ্গেচুরে নতুন রাষ্ট্র ও সমাজ কাঠামো গড়ার প্রেরণা দেয়। প্রথমত, এই শ্রেণীর তুলনামূলক বিস্তৃতি: ঐ দশকে বাংলাদেশী মধ্যবিত্তের কাতার ছিল আগের যে কোন দশকের তুলনায় দীর্ঘ দ্বিতীয়ত, এই শ্রেণীর ধর্মীয় গঠন: এই শ্রেণী প্রধানত ও মূলত বাংলাদেশী মুসলমানের সমন্বয়েই গঠিত ছিল, তৃতীয়ত, এই শ্রেণীর বলিষ্ঠ বিপ্লবীপ্রবণতার অগ্রমুখ ছিল তুলনামূলকভাবে তরুণ মুসলমান মধ্যবিত্ত যাঁদের কাছে বৃটিশ ভারতে হিন্দুপ্রাধান্য ও উচ্চবর্ণের হিন্দু আধিপত্য দুরশ্রুত ভয়াল সঙ্গীতের বিলীয়মান সংকেতের চেয়ে বাস্তব ছিল না কখনও।

আড়াই দশকের বিবর্তনমান বাংলাদেশকাহিনীর অবিসংবাদিত বলিষ্ঠ নায়ক আসলে এক যুথবদ্ধ চরিত্রসমষ্টি: পূর্ববঙ্গীয় মধ্যবিত্ত শ্রেণী। এই নায়ক সাহসী এবং দৃঢ়সংকল্পবদ্ধ। বাস্তব অবস্থা ও পরিপ্রেক্ষিত যদি তার পছন্দ না হয় তাহলে সে তাকে আপন ইচ্ছামাফিক বদলে নেয়। এই শ্রেণীর পূর্ব পথিক, প্রাক১৯৪৭ যুগের ক্ষুদ্রকায় মুসলমান বাঙ্গালী মধ্যবিত্ত শ্রেণী ধর্মীয় স্বাতন্ত্র্যের উপরে ভিত্তি করে উচ্চবর্ণ হিন্দু আধিপত্যের বিরুদ্ধে সফল প্রতিরোধ গড়ে তোলে। কিন্তু ভারতবিভাগউত্তরকালে বিরাটতর বাংলাদেশী মধ্যবিত্ত শ্রেণীর কাছে ধর্মীয় প্রশ্নাবলী, ধর্মীয় ঐক্যের প্রয়োজনীয়তা, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে দাঁড়ায়। পাকিস্তানের কাঠামোর ভিতরে উচ্চবর্ণের হিন্দুর কোন উল্লেখযোগ্য ভূমিকা ছিল না, তাঁদের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ পূর্ব বাংলা ছেড়ে সীমান্তের ওপারে ভারতে চলে যায়। ঐ অবস্থায় তারা আর প্রত্যক্ষ বাস্তব ভীতির আকড় হিসাবে দৃশ্যমান ছিলেন না, এমনকি সম্ভাব্য স্বার্থবিনষ্টকারী প্রতিযোগীও না। যে সত্তরআশি লক্ষ হিন্দু পাকিস্তানঅধীন বাংলাদেশে বসবাস করে আসছিলেন তাঁরা এই শ্রেণীর নিরিখে ছিলেন বড়জোর পাকিস্তান রাষ্ট্রের তৃতীয় শ্রেণীর নাগরিক, যে রাষ্ট্রে বাঙালী মুসলমান নিজেরাই ছিলেন মুলতঃ দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক: এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশী মুসলমান মধ্যবিত্ত শ্রেণীর চোখে প্রধান প্রতিযোগী ও স্বার্থ প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল সেই সব বিত্তশালী ও ক্ষমতাবান অবাঙ্গালী উর্দু ভাষাভাষী, অথবা পাঞ্জাবী মানুষ যারা পাকিস্তান রাষ্ট্রে ক্ষমতা ও অর্থনৈতিক প্রগতির নিয়ামক ও নিয়ন্ত্রক, এ অবস্থায় প্রধানত নিম্নবর্ণ বাংলাদেশী হিন্দুরা বাংলাদেশী মুসলিমশাসিত মধ্যবিত্ত শ্রেণীর চোখে ছিলেন বড়জোর এক অধীনস্থ মিত্র যার এমনকি নিষ্কৃয় নীরবতাও প্রতিপত্তিশালী অবাঙালী পাকিস্তানীর বিরুদ্ধে তাঁদের সংগ্রামকে সহায়তা দিতে পারে।

এভাবেই ষাটের দশকে পূর্ববাংলার রাজনীতিতে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির ও ঐক্যের প্রত্যক্ষ সম্পর্ক ও প্রাসঙ্গিকতা পশ্চাৎপটে সরে যায়। ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক একাত্মতার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা আধুনিক অঞ্চলভিত্তিক বা ভৌগলিক জাতীয়তাবাদ, “সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতিইত্যাকার ব্যবস্থাই ষাটের দশকের বাংলাদেশী মধ্যবিত্ত সমাজের রাজনৈতিক নেতৃত্বের কাছে কালোপযোগী এবং সে জন্যই গ্রহণীয় বলে মনে হয়। সম্ভবতঃ এই কারণেই ঐ আমলে, যখন বাংলাদেশের অক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন মানুষের সংখ্যা ১৭ শতাংশের বেশি ছিল না তখনও বাংলাদেশী শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সম্প্রদায় বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির সূক্ষ্মতর বিষয়গুলো নিয়ে এমন এক রাজনৈতিকভাবে প্রবল আন্দোলন গড়ে তোলেন যা খুৎপীড়িত, অভাগ্রস্থ, অশিক্ষিত সাধারণ চাষী মজদুর জনগণের পক্ষে যতই দূরস্থিত বা অবাস্তব হোক না কেন, পাকিস্তানী রাষ্ট্রকাঠামো ও শাসনব্যবস্থার ভিত্তির মূল নাড়িয়ে চুরমার করে দেয়। মূলতঃ উঠতি মুসলমান বাংলাদেশী মধ্যবিত্তের নতুন পাওয়া বাংলা সাহিত্য, সংস্কৃতি ও সঙ্গীতপ্রিয়তা, পূর্ববঙ্গীয় পাকিস্তানীদের ও পশ্চিম পাকিস্তানীদের মধ্যকার বিপুল তফাৎ অনস্বীকার্যরূপে স্পষ্ট করে তুলতে সাহায্য করে।

বাংলাদেশের গণজীবনে ষাটের দশকের উন্নয়নের যুগেও বিস্তৃত দারিদ্র্যে এবং তুলনামূলক অর্থনৈতিক অনগ্রসরতা ছিল বাস্তব এবং সহজ নিরীক্ষ সত্য। এই ধুমায়িত গণদুস্থতার ও তার ফলে সৃষ্ট গণঅসন্তোষের প্রেক্ষিতে বাংলাদেশের উঠতি মধ্যবিত্ত শ্রেণীর কৃত্রিম পাকিস্তানী সংস্কৃতির বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ বিদ্রোহ ঘোষণা করা ও বাঙালী সংস্কৃতির পক্ষে কাতার বাঁধা স্বতন্ত্র এক জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের উন্মেষের পথে এক শক্তিশালী হাতিয়ার হিসাবে কাজ করে। সেকালের পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠী সামাজিক প্রকৌশলীর যথার্থ ভূমিকা পালনে ব্যর্থ হয়। সংকটকালে তারা স্থিরতা ও ধীশক্তি হারিয়ে নির্মম কসাইয়ের ভূমিকায় নামে। তাদের এই অমোঘ অক্ষমতা এবং আন্তর্জাতিক শক্তিনিচয়ের ক্রিয়াশীলতা উভয়েই বাংলাদেশের মধ্যবিত্তের পাকিস্তান বিরোধী সংগ্রামকে জোরদার করে। ষাটের দশকে জীবনের শিক্ষা বাংলাদেশের উঠতি ও ক্রমসম্প্রসারণশীল মধ্যবিত্ত সমাজকে স্পষ্টতঃ উপলব্ধি করতে শেখায় যে, প্রায়সামন্ততান্ত্রিক, সামরিক ও অসামরিক পশ্চিম পাকিস্তানী আমলাশাসিত, অবাঙালী পুঁজিপতি ও ব্যবসায়ী নিয়ন্ত্রিত পাকিস্তানী রাষ্ট্রীয়, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কাঠামোর ভিতরে পূর্ববাংলার মধ্যবিত্ত ও স্বল্পবিত্ত বা বিত্তহীন শ্রেণীর মুক্তির কোন পথই আর খোলা নেই।

আমরা যারা সেকালের কিশোরকিশোরী, তরুণতরুণী তারা একাধারে যেমন ইতিহাসের মঞ্চে অবশ্য প্রয়োজনীয় পার্শ্বচরিত্রে অভিনয় করেছি, তেমনি বিপর্যয়, বিদ্রোহ, সশস্ত্র সংঘাতের অনন্যপূর্বকালের গ্রাম উজাড়ের সাক্ষীহয়ে এখনও প্রায়তরুণ অস্তিত্বে জীবনের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সংবদ্ধ হয়ে আছি।

একথা তো সত্যি যে, পাকিস্তান আমলের প্রথম ও পরম ভীতির আকড় সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে যারা দুর্বিনীত আন্দোলনে মাথা উঁচু করে দাঁড়ায় তারা আমাদেরই কালের তরুণ ও তরুণী, আমরাই। ১৯৫৮ সনে আইয়ুবের সামরিক শাসন আরোপিত হয়, আর ষাট সনের মধ্যেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা, আমাদের কালের তরুণ মানুষেরা বুলেটবেয়নেট, কারাগারের ভয়ে তথা অপরীক্ষিত সামরিক শাসনের সন্ত্রাসে ভীত না থেকে স্বতঃস্ফূর্ত, বলিষ্ঠ প্রতিবাদ সভা, মিছিল, ধর্মঘটে ঢাকা তথা সারা বাংলাদেশকে অত্যাচারী, একনায়কআরোপিত নির্জীবতার শৃংখল ভেঙ্গে এগিয়ে যেতে উৎসাহিত করে।

১৯৬২ সনে বঙ্গীয় নেতা হুসেইন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মুক্তির দাবীতে ষাটের দশকের তরুণরাই আবার সামরিক শাসকদের বিরুদ্ধাচরণ করে সফল হয়ে ওঠে। একই সনে আমাদের সহযোগী সতীর্থরা আইয়ুবের গণবিরোধী শিক্ষা কমিশন রিপোর্টের বিরুদ্ধে বিপুল আন্দোলন গড়ে তোলে। ফলে ঐ রিপোর্টও প্রত্যাহৃত হয়। এই আন্দোলনে যারা প্রধান ভূমিকা পালন করেন তাঁদের মধ্যে ছিলেন তৎকালীন অখন্ড ছাত্র ইউনিয়ন দলের নেতা সর্বজনাব মরহুম ফরহাদ (পরবর্তীকালে ৮৬তে জাতীয় সংসদ সদস্য ও বাংলাদেশের কমিউনিষ্ট পার্টির নেতা), কাজী জাফর আহমেদ (১৯৯০এ বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী), রাশেদ খান মেনন (বর্তমানে বামপন্থী জোটের নেতা ও সাংসদ এবং মন্ত্রী) প্রমুখ; তৎকালীন ছাত্রলীগ (পরবর্তীকালে যুবলীগ) নেতা মরহুম শেখ ফজলুল হক (মণি), তার সহযোগী সাবেক পানি সম্পদ মন্ত্রী আব্দুর রাজ্জাক, ছাত্রশক্তি নেতা হিসেবে আমি (তৎকালীন সভাপতি) এবং তৎকালীন সাধারণ সম্পাদকদ্বয় মরহুম আতাউর রহমান খান কায়ছার (পরে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা) এবং মরহুম ছাত্র নেতা মিয়া মোহাম্মদ নূরুজ্জামান, এন এস এফ দলের নেতৃস্থানীয় প্রতিনিধিদের মধ্যে ছিলেন (পরবর্তীকালে মন্ত্রী ও মেয়র) ব্যারিষ্টার আবুল হাসনাত এবং তার সহযোগীরা।

১৯৫৮৬২ :: অগ্নিগিরির জ্বালামুখ

উনিশশো আটান্ন থেকে ঊনিশশো একশট্টিবাষট্টির মধ্যে পরিপূর্ণতা পায় আরেক ক্রান্তিকাল। আটান্নতে সূচিত হয় প্রথম সামরিক শাসন। একষট্টিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হিসেবে আমরাই শুরু করি সেই স্বৈরতান্ত্রিক, অগণতান্ত্রিক শাসনের বিরুদ্ধে প্রথম সংগ্রাম। বাষট্টিতে সেই প্রতিরোধ হয়ে ওঠে আরো প্রবল ও সরব। একষট্টিতে সেনাপতি রাষ্ট্র প্রধান আইয়ুব খানের আইন মন্ত্রী মঞ্জুর কাদির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বক্তৃতা করতে আসেন। সম্মিলিত ছাত্র সমাজ তাঁর বিরুদ্ধে দারুণ বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। তখনও বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা অনুষদ অবস্থিত ছিল আজকের ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের পূর্বাংশের প্রান্ত খন্ডে। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের গৌরবোজ্জ্বল স্মৃতিমণ্ডিত ঐতিহাসিক আমতলাই ছিল ছাত্র সমাবেশের মহামঞ্চ। ঐ আমতলায় যাঁরা সেদিন জ্বালাময়ী বক্তৃতায় আইয়ুবের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে বক্তব্য রাখেন তাঁরা ছিলেন: ছাত্র ইউনিয়নের মরহুম জিয়াউদ্দীন মাহ্মুদ (পরে যুক্তরাজ্য প্রবাসী), ছাত্র লীগের মরহুম শেখ ফজলুল হক মণি, ছাত্রশক্তির মরহুম মিয়া মোহাম্মদ নূরুজ্জামান এবং বস্তুত: অগণতান্ত্রিক শাসনের বিরুদ্ধে সেই প্রথম প্রতিরোধের সূচনালগ্নে আমাদের প্রজন্মের সকলেই প্রতিবাদী ও বিপ্লবী হয়ে ওঠে।

১৯৬২ সনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে সারা পূর্ববাংলায় দানা বেঁধে ওঠে সেনা শাসক আইয়ুব সরকার প্রদত্ত শিক্ষা কমিশন রিপোর্টের বিরুদ্ধে। ঐ আন্দোলনের চূড়ান্ত লগ্নে ১৭ই সেপ্টেম্বর ঢাকায় পুলিশের গুলিতে শহীদ হন ওয়াজিউল্লাহসহ আরো কয়েকজন। শাসককুল দৃশ্যতঃ ভীত হয়ে পিছু হটে। প্রত্যাহৃত হয় শিক্ষা কমিশনের রিপোর্টের প্রস্তাবাবলী। ১৯৬১৬২ সনের সামরিক স্বৈরতন্ত্রবিরোধী ছাত্রগণআন্দোলন এবং পূর্ব বাংলার স্বাধীকার প্রতিষ্ঠার পক্ষেও কমিশনের অন্যায্য সুপারিশসমূহের বিরোধী আন্দোলনের কালে প্রায় আট মাস আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা ক্লাশ করা থেকে বিরত থাকি। এই পর্যায়ের সমাপ্তি টানি আমরা ছাত্ররাই। সে কালের প্রধান ছাত্র নেতৃবৃন্দ এক হয় পল্টন ময়দানে (আজ ঢাকা আউটার ষ্টেডিয়ামের চত্বরে বিলুপ্ত) প্রথম ছাত্রজনসভায়। এর আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা কোনদিন এভাবে পল্টনে জনসভার আয়োজন করেনি। ঐ ময়দান ছিল রাজনৈতিক দলসমূহের একচেটিয়া চারণভূমি। সেই ঐতিহাসিক জনসভায় ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে বক্তব্য রাখেন মরহুম শেখ ফজলুল হক মণি, ছাত্রশক্তির পক্ষ থেকে বক্তৃতা করি আমি এবং ছাত্র ইউনিয়ন ও এন.এস.এফ. –এর পক্ষে বক্তব্য রাখেন যথাক্রমে কাজী জাফর আহমেদ ও মোঃ আবুল হাসনাত।

বস্তুতঃ ষাটের দশকের প্রথমভাগেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক প্রবল ছাত্র আন্দোলন সে কালের পাকিস্তানের স্বৈরশাসনের ভিত্তিমূল কাঁপিয়ে তোলে, প্রখর করে বাংলাদেশের বাঙ্গালীর আত্মসচেতনতা ও স্বাধিকারবোধ এবং মজবুত করে গড়ে এ অঞ্চলের জনগণের আর্থসামাজিক ন্যায়বিচার দাবীর ভিত।

সেকালের ছাত্র রাজনীতি আবহসংগীতের প্রধান সুর ছিল সহিষ্ণুতা, সৌহার্দ্য ও প্রীতি। মতপার্থক্য সত্ত্বেও বিভিন্ন ছাত্র দলের মধ্যে একটা বোঝাপড়া ছিল। সংঘাত ও সংঘর্ষ হলেও তা রক্তাক্ত সহিংসতায় পরিণত হত না। মারপিট কখনও হলেও তা শুধু হাতে অথবা চেয়ারের ভাংগা হাতল, লাঠি, বড়জোড় হকি ষ্টিক সহযোগে। পিস্তল, বন্দুক ক্বচিৎ ব্যবহৃত হয়েছে বলে শোনা যায় ছুরি, চাকুও। তবে সশস্ত্র সহিংসতা শিক্ষাঙ্গন বা বিশ্ববিদ্যালয়ে মধ্যষাটের দশকে এবং তার আগে প্রায় অনুপস্থিত ছিল বললে অত্যুক্তি হবে না। অস্ত্রসহ সহিংস কার্যকলাপ ছাত্রদের ক্ষুদ্র এক অংশের মধ্যে যে বিস্তার লাভ করে তার পিছনে ক্ষমতাসীন সরকারী ব্যাক্তি ও দলের একাংশের হাত ছিল বলে অভিযোগ শোনা যায়।

অনিঃশেষ সময়ের গান

সময় আসলে অবিচ্ছিন্ন। তার সুর ও সংগীত তাই বিরামহীন। যতি দিয়ে তাতে বিভক্তি টানায় তাই কৃত্রিমতা জড়িয়ে থাকে। তবু ক্ষণজীবী মানুষ আমরা দিন, কাল, দশক বা যুগ ভাগ না করেই বা আমাদের উপায় কি? ষাটের দশকের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আজকের ঐ প্রতিষ্ঠান থেকে কিভাবে আলাদা, তার চুলচেরা বিচার করতে গেলে দীর্ঘ গবেষণার প্রয়োজন। কিন্তু এ কথা তো ঠিক যে, সময়ের সংগে সংগে মানুষের যেমন, তেমনি প্রতিষ্ঠানেরও পরিবর্তন ঘটে, যদিও মূল চরিত্র বা ঐতিহ্যের মধ্যে সংযোগসূত্র থাকে বহমান সুরের মত এক ও অটুট।

এই রচনার পরিসরে ঐ সময়কে পূর্ণাঙ্গভাবে চিত্রায়িত করা সম্ভব নয়। তবু মনে হয় সেই বিস্ময়কর সময়টিকে আমাদের সমাজ এখনও সঠিকভাবে মূল্যায়ন করতে পারেনি। যে কোন কারণেই হোক বাংলাদেশের ইতিহাসকে পঞ্চাশের দশক (বিশেষতঃ বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন) থেকে সরাসরি সত্তরের দশকে (যার শুরুতে সংঘটিত হয় একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ) নিয়ে যাওয়ার প্রবণতা ইতিহাসকার ও বিশ্লেষকদের মধ্যে প্রবল। মূল রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বে দেখা গেছে সাম্প্রতিককালের আগে পঞ্চাশ দশকের কুশীলবদের সক্রিয় পদচারণা। ঊনিশ শএকানব্বই এ বেগম খালেদা জিয়ার প্রধানমন্ত্রিত্ব লাভের পর থেকে বলা যায় যে, ষাটের দশকের যাঁরা তরুণতরুণী তাঁদের মধ্যে কেউ কেন্দ্রে এলেন। সাবেক প্রধান মন্ত্রী (১৯৯৬২০০১) শেখ হাসিনা ষাটের দশকের ছাত্রছাত্রী সমাজের প্রতিনিধি বলা চলে। হয়ত এই সময়ে তাই ষাটের দশকের মূল সফলতা ও ব্যর্থতা স্পষ্ট আলোকে ফুটে উঠবে। ষাটের দশকের স্মৃতিচারণ করতে গেলে যে কথাটি বার বার মনে হয় তা হচ্ছে এই যে, পঞ্চাশ এবং সত্তর ও তার পরবর্তী দশকগুলোর মধ্যে এই সময় এক অনন্য, বলিষ্ট যোগসূত্র। শুধু তাই নয়, সেই সংগ্রামী কাল ছিল বলেই আজকের বর্তমান এতটা প্রাণময় এবং ভবিষ্যত সংশয়ের কুয়াশার মধ্যে থেকেও সার্থক ভবিষ্যৎ জীবনের আশায় ও বিশ্বাসে মণ্ডিত।।

(লেখক চিন্তাবিদ, সমাজ বিজ্ঞানী ও সাহিত্যিক ড. মীজানূর রহমান শেলী, সেন্টার ফর ডেভেলপমেন্ট রিসার্চ, বাংলাদেশ (সিডিআরবি)-র প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান এবং আর্থসামাজিক ত্রৈমাসিক ‘এশিয়ান অ্যাফেয়ার্সেরসম্পাদক।)