Home » অর্থনীতি » দুই ভারত দুই বাংলাদেশ (পর্ব – ৭)

দুই ভারত দুই বাংলাদেশ (পর্ব – ৭)

দক্ষিণ এশিয়ায় বাণিজ্য চিত্র

আনু মুহাম্মদ

last 3দক্ষিণ এশিয়ার সবগুলো দেশই গত কয়েক দশকে বিশ্ব অর্থনীতির সাথে অনেক বেশি যুক্ত হয়েছে, বিশ্বে বাণিজ্য অংশগ্রহণ বেড়েছে বহুগুণ। তবে সেই তুলনায় এই অঞ্চলের দেশগুলোর নিজেদের মধ্যেকার অর্থনৈতিক যোগাযোগ অন্যান্য যেকোন অঞ্চলের তুলনায় অনেক কম, রাজনৈতিক সম্পর্ক জটিল বা সংঘাতময়। নির্দিষ্টভাবে ১৯৯০ এর সাথে তুলনা করলে দেখা যায়, দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর নিজেদের মধ্যে বাণিজ্য অবশ্যই বেড়েছে কিন্ত বিশ্ববাণিজ্যের বৃদ্ধি ঘটেছে তুলনায় অনেক বেশি।

বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ ও আংকটাডের বাণিজ্য ডাটা থেকে দেখা যায়, বিশ্ব বাণিজ্যের তুলনায় দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের বাণিজ্য শতকরা ১০ ভাগ, ভারতের শতকরা ২ ভাগ, আফগানিস্তানের শতকরা ৭ ভাগ, নেপালের শতকরা ৫৫ ভাগ, পাকিস্তানের শতকরা ৫ ভাগ, শ্রীলংকার শতকরা ১৮ ভাগ সংঘটিত হয়। সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ায় মোট বাণিজ্যের মধ্যে শতকরা ৪ ভাগ মাত্র এই অঞ্চলের মধ্যে। আংকটাডের হিসাব অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ায় বিদেশি বিনিয়োগের শতকরা ৯০ ভাগ ভারতে আসে, দক্ষিণ এশিয়া থেকে বাইরে যে বিনিয়োগ যায় তার পরিমাণ ১৪.৯ বিলিয়ন ডলার, এর মধ্যে ভারতের অংশ ১৪.৮ বিলিয়ন ডলার।

পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যসূত্র ভিত্তি করে করা বিশ্লেষণ অনুযায়ী ভারতের সাথে পাকিস্তানের বাণিজ্যের হ্রাসগতি দেখা গেলেও গত কয় বছরে শ্রীলংকা ও বাংলাদেশের সাথে পাকিস্তানের বাণিজ্যের উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। ২০০৫ সালে বাংলাদেশ ও ভারতের সাথে পাকিস্তানের বাণিজ্য ছিলো যথাক্রমে ১৫ মিলিয়ন ও ৩৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, ২০১১ সালে তা দাঁড়ায় যথাক্রমে ৭৭ মিলিয়ন ও ১৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।

দক্ষিণ এশিয়ায় পারস্পরিক সহযোগিতা, সংহতি, মুক্ত বাজার, মুক্ত বাণিজ্য, ইত্যাদি বিষয়গুলো সরকার, আন্তর্জাতিক সংস্থা, ব্যবসায়িক গ্রুপ প্রভৃতির সভা সম্মেলনে প্রায়ই শোনা যায়। তবে এসব আলোচনা গবেষণা ও বিশ্লেষণে যেহেতু কেন্দ্রীয় বিবেচনা থাকে কর্পোরেট স্বার্থ ও বাণিজ্যিক মুনাফা সেহেতু জনস্বার্থ কেন্দ্রে রেখে আঞ্চলিক উন্নয়ন, সংহতি, পারস্পরিক সহযোগিতার কোন পথনির্দেশনা সেখান থেকে পাওয়া যায় না। উপরন্তু, ভারতের একাধিপত্যের জন্য একদিকে যেমন একটি বৃহৎ অর্থনীতিতে অন্যদেশগুলোর প্রবেশাধিকার নানাভাবে বাধাগ্রস্ত, অন্যদিকে অঞ্চলে উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়ে বহুপাক্ষিক সংলাপ ও পরিকল্পনার সুযোগ এখনও অনেক সীমিত। বস্তুত কতিপয় গোষ্ঠীর বাণিজ্যিক স্বার্থ এবং বৃহৎ রাষ্ট্রের অনমনীয়তা থেকে মুক্ত হলে প্রাপ্ত সম্পদ ও জনশক্তি দিয়ে সমগ্র অঞ্চল মানুষকে অনেক সমৃদ্ধ জীবন নিশ্চিত করতে সক্ষম।

বাংলাদেশের এখন এরকম ধারণা বেশ জোরদার যে, ভারত সরকার বাংলাদেশের অর্থনীতি ও রাজনীতির ওপর তার প্রভাব ও আধিপত্য বৃদ্ধি করতে সর্বতোভাবে সক্রিয়। এই অবস্থা নিশ্চিত করতে তারা বর্তমান সরকারকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখতে সকল সমর্থন প্রদান করেছে। সেকারণে সরকার একতরফা নির্বাচন করতে সক্ষম হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনারকথা বলে, এবং জামায়াত সম্পর্কে সমাজের যুক্তিযুক্ত ভীতি কাজে লাগিয়ে সরকার বস্তুত উন্নয়নেরপুরনো পথেই হাঁটছে। দুর্নীতি, দখল, লুন্ঠন এবং জাতীয় স্বার্থবিরোধী বিভিন্ন চুক্তির ক্ষেত্রে বিএনপি জামায়াত সরকারের সাথে এই সরকারের কোন তফাৎ নেই।

বাংলাদেশের কাছে ভারতের অন্যতম দাবি ট্রানজিট। এটি ভারতের জন্য অর্থনৈতিকভাবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। একটি গবেষণা পত্রে দেখানো হয়েছে, () নয়াদিল্লী থেকে ঢাকায় ২০ ফুট একটি কনটেইনার সমুদ্রপথে নিয়ে যেতে (মুম্বাই, সিঙ্গাপুর অথবা কলম্বো হয়ে চট্টগ্রাম এবং পরে ট্রেণে ঢাকা) সময় লাগে ৩০ থেকে ৪০ দিন, এবং খরচ লাগে ২৫০০ মার্কিন ডলার। এটি যদি সরাসরি দিল্লী থেকে ট্রেনে পরিবহণ করা হয় সময় লাগবে ৪৫ দিন, খরচ হবে ৩ ভাগের ১ ভাগ, ৮৫০ মার্কিন ডলার। () ভারতের পাঞ্জাব থেকে পাকিস্তানের পাঞ্জাবে পণ্য পরিবহণে ট্রেন সীমিত থাকায় তা মুম্বাই করাচী হয়ে প্রায় ৩০০০ কিমি ঘুরে যায়। সড়কপথে গেলে দূরত্ব হবে ৩০০ কিমি। () ভারতের অনুমতি না থাকায় ঢাকা থেকে লাহোরে পণ্য পরিবহণ স্থলপথে না করে করতে হয় মুম্বাই করাচী হয়ে সমুদ্রপথে, তাতে দূরত্ব ২৩০০ কিমি থেকে প্রায় ৩ গুণ বেড়ে হয় ৭১৬২ কিমি। () বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে পণ্য পরিবহণ করলে আগরতলা থেকে কলকাতা বা আসাম থেকে কলকাতা দূরত্ব যথাক্রমে ৬ ভাগের ১ ভাগ ও ৪ ভাগের ১ ভাগ দাঁড়াবে।

(P Kharel (2009). Case for South Asian Transit Arrangement. Brifieng Paper No 11, Kathmandu: SAWTEE)

ভারতের দাবি অনুযায়ী বাংলাদেশ ট্রানজিটের সব ব্যবস্থা করছে। কিন্তু এতে বাংলাদেশের ক্ষতি কী কী দাঁড়াচ্ছে তার কোন হিসাব সরকার জনগণের কাছে পরিষ্কার করছে না।

অসম বাণিজ্যের চাপ বাড়ছেই। পাশাপাশি বাংলাদেশে সবচাইতে বড় শিল্প গার্মেন্টস খাতে এখন ভারতের প্রভাব বাড়ছে, চার শতাধিক বায়িং হাউজ ভারতেরই। শিক্ষা, চিকিৎসা, মিডিয়া, বিনোদন জগতেও তাদের প্রভাব অনেক, তথ্যপ্রযুক্তি খাতে তাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার নানা আয়োজন চলছে। ভূমি ও বসতি বাণিজ্যেও অনেক প্রস্তাব আছে। বিদ্যুৎ খাতে নিয়ন্ত্রণ আনার নানা প্রকল্প কাজ করছে। সুন্দরবন বিপন্ন কিংবা ধ্বংস করে রামপাল কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার কাজ করছে ভারতেরই রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান এনটিপিসি। সুন্দরবন ভারতেও বিস্তৃত। বাংলাদেশের সুন্দরবন যদি ক্ষতবিক্ষত হয়, ভারতেও সুন্দরবন অক্ষত থাকবে না।।

(চলবে…)