Home » আন্তর্জাতিক » ভারত :: বৃহৎ অস্ত্র উৎপাদনকারী দেশ হওয়ার আকাঙ্ক্ষা

ভারত :: বৃহৎ অস্ত্র উৎপাদনকারী দেশ হওয়ার আকাঙ্ক্ষা

মোহাম্মদ হাসান শরীফ

last 2ভারতের নতুন সরকার উন্নয়নের জোয়ার বইয়ে দিতে চাইছে বলে প্রচারপ্রচারণা চালাচ্ছে। যেসব খাতে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে চাইছে তার একটি হলো বিশ্বের বৃহত্তম অস্ত্র আমদানিকারক দেশ ভারতকে বৃহৎ অস্ত্র উৎপাদনকারী দেশে রূপান্তরিত করা। এ লক্ষ্যে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (ফরেন ডিরেক্ট ইনভেস্টমেন্ট তথা এফডিআই) বর্তমানের সর্বোচ্চ ২৬ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১০০ পর্যন্ত শতাংশ করার চিন্তা করা হচ্ছে। নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী কোনো কোনো সামরিক প্রকল্প সম্পূর্ণ বিদেশী মালিকানায় থাকবে। ভারত সফরে গিয়ে ব্রিটেনের বিদায়ী পররাষ্ট্রমন্ত্রী অস্ত্র চুক্তি করে এসেছেন। দুই দিনের সফরে ২৫০ মিলিয়ন পাউন্ডের ক্ষেপণাস্ত্র চুক্তি করেছেন। এছাড়া ইউরোফাইটার টাইফুন জেটের ব্যাপারে কিছুটা অগ্রগতি হাসিল করেছেন। য্ক্তুরাষ্ট্র, রাশিয়া, ফ্রান্সও পিছিয়ে নেই। তারাও ভারতকে বিশ্বের বৃহত্তম অস্ত্র উৎপাদনকারী এবং তারপর বৃহত্তম রফতানিকারক দেশে পরিণত করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও চায় ভারতের বাজারে ঢুকতে।

প্রতিরক্ষা খাতে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়াটা দারুণ চিন্তা। কিন্তু বাস্তবে তা পূরণ করা খুবই কঠিন কাজ। প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম লাভ, প্রযুক্তিগত উৎকর্ষতা অর্জন, মানসম্পন্ন গবেষণা, লজিস্টিক ও অবকাঠামোগত সুবিধা অর্জন সহজ বিষয় নয়। এ কারণে শক্তিশালী প্রতিরক্ষা শিল্প ভিত্তি গড়ে তোলার স্বপ্নটি অনেক দিন ধরে লালন করলেও এখনো বাস্তবায়িত হতে পারেনি।

১৯৯০এর দশকের মাঝামাঝিতে এ পি জে আবদুল কালামের নেতৃত্বাধীন একটি কমিটি ২০০৫ সালের মধ্যে ভারতের নিজস্ব অস্ত্র উৎপাদন ৩০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৭০ শতাংশ করার প্রস্তাব করেছিল। কিন্তু ২০১৩ সালেও ভারত তার অস্ত্র চাহিদার ৭০ শতাংশ মেটায় আমদানি করে।

ভারতের অস্ত্র প্রতিষ্ঠানগুলো মাথাভারী। এসব প্রতিষ্ঠানে ১৫ লাখ লোক কাজ করে। কিন্তু সাফল্য সেই তুলনায় খুবই কম। এই শিল্প মূলত ব্যর্থতা ও হতাশার প্রতিচ্ছবি। এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, ভারতের যে রণতরী বানাতে লাগে ১১৪ মাস, সেটি যুক্তরাষ্ট্র বা জাপানে লাগে মাত্র ২৯ থেকে ৩০ মাস। আবার ভারত নির্মিত সুখোই ৩০ এমকেআই বানাতে যে খরচ পড়ে, সে ধরনের বিমান রাশিয়া থেকে আমদানি করতে খরচ পড়ে ৮০ কোটি রুপি কম।

আপাত দৃষ্টিতে ভারতের কিছু কিছু সাফল্য চোখ ধাঁধানো। যেমন ভারত এসইউ ৩০ এমকেআই যুদ্ধবিমান ব্রহ্ম ক্ষেপণাস্ত্র এবং সুপারসনিক সাবমেরিনের মতো উচ্চমানের পণ্য উৎপাদন করেছে। সমরাস্ত্রে উন্নত প্রযুক্তির অধিকারী অনেক দেশও এ দিক থেকে পিছিয়ে আছে। তবে নেপথ্য কথা হলো, এগুলো মূলত তৈরি হয় বিদেশে ডিজাইন করা অস্ত্রের উৎপাদন লাইসেন্স বলে, গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলো বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়।

এছাড়া উদাহরণ হিসেবে ভারতের ডিফেন্স রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অর্গ্যানাইজেশনের অর্জুন ট্যাঙ্ক এবং হিন্দুস্তান অ্যারোনটিক্সের তেজ বহুমুখী হালকা বিমান নির্মাণ প্রকল্প দুটির কথা উল্লেখ করা যায়। উভয় প্রকল্পই দীর্ঘসূত্রতার মুখে পড়ে। উভয় অস্ত্রই শেষ পর্যন্ত নির্মিত হয়েছে। কিন্তু প্রতিরক্ষা শিল্প এমন একটি খাত, যেখানে প্রতিনিয়ত আপগ্রেডের প্রয়োজন হয়। অর্জুন ও তেজেরও আপগ্রেড প্রয়োজন। এটাও দীর্ঘসূত্রতার মুখে পড়েছে। আপগ্রেডের প্রয়োজনীয় গতি ও প্রযুক্তি সহায়তার জন্য বিদেশী প্রতিষ্ঠানের সহায়তা অনিবার্য হয়ে পড়েছে।

ভারত অস্ত্র আমদানিতে বা কেনায় বিপুল অর্থ ব্যয় করে। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, ভারত বর্তমানে অস্ত্র ক্রেতা দেশের তালিকায় একেবারেই সামনের দিকে আছে। এই কেনাকাটায় হয় প্রচুর লুটপাট। এটা বন্ধ করার জন্য কিছু করা দরকার মনে করেন অনেকেই। এ ক্ষেত্রে বিজেপি সরকার যুক্তি দেখাচ্ছে যে, এর সহজ পথ হচ্ছে, বিদেশীদের সুযোগ দেওয়া।

অস্ত্র খাত বিদেশীদের হাতে তুলে দেওয়া নিয়েও সমালোচনা হচ্ছে। সবচেয়ে বড় যে আপত্তিটি উঠছে, তা হলো এফডিআই ১০০ শতাংশ হয়ে গেলে ভারতের অভ্যন্তরীণ অস্ত্র শিল্প আর্থিক এবং উৎপাদনের দিক থেকে মারাত্মক সমস্যায় পড়বে। বর্তমানে টাটা গ্রুপ, লারসেন অ্যান্ড ট্রুবো, ভারত ফর্জ, মহিন্দ্র ও পুঞ্জ লয়েড ভারতের অস্ত্র উৎপাদনে জড়িত রয়েছে। এগুলো এখনই নানা সমস্যায় খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে ভুগছে। তাদের উৎপাদন, প্রযুক্তি, মূলধন ও প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন সৃষ্টি হওয়া অতি যৌক্তিক।

আরেকটি হলো অনেকে ভারতের প্রতিরক্ষা খাতকে জাতীয় গর্ব ও দেশপ্রেমের পবিত্র সম্পদ বিবেচনা করে। তারা এই খাতে অবাধ এফডিআইয়ের প্রবাহকে কেবল ঐতিহ্যবাহী নীতির বরখেলাফই মনে করে না, আগ্রাসনও বিবেচনা করে।

তবে অস্ত্র শিল্পে বিদেশী বিনিয়োগ বাড়ানোর চিন্তাভাবনাও অনেক দিনের। ভারতের প্রতিরক্ষা খাতে এফডিআই বাড়ানোর বিষয়টি প্রথমে চিন্তাভাবনা করা হয় ২০১০ সালে ডিপার্টমেন্ট অব ইন্ড্রাস্ট্রিয়াল পলিসি অ্যান্ড প্রমোশন (ডিআইপিপি) ডিসকাশন পেপারে। ২০১৩ সালে তদানিন্তন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের নেতৃত্বে ক্যাবিনেট কমিটি অন সিকিউরিটি (সিসিএস) প্রতিরক্ষা খাতে এফডিআই ২৬ করার (বিশেষ কিছু ক্ষেত্রে ১০০ পর্যন্ত) করার সিদ্ধান্ত নেয়। অর্থাৎ মোদি সরকার যে কাজটি করতে যাচ্ছে, তার ভিত্তি স্থাপন করে গেছে বিগত সরকার।

বিদেশী প্রতিষ্ঠানগুলো এলে ভারতের অভ্যন্তরীণ প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো ধ্বংস হয়ে যাবে বলে যে আশঙ্কা সৃস্টি হয়েছে তা দূর করতে যে পরামর্শটা সবচেয়ে বেশি জোরালোভাবে আসছে তা হলো বৈদেশিক বিনিয়োগে যত পরিমাণ অস্ত্র আসবে, ঠিক তত পরিমাণ দেশীয় অস্ত্র রফতানির ব্যবস্থা করা। এর মাধ্যমে তারা অদূর ভবিষ্যতে বৃহত্তম অস্ত্র উৎপাদনকারী হওয়ার পাশাপাশি বৃহত্তম রফতানিকারকও হয়ে যেতে পারে।

নরেন্দ্র মোদি সরকার ক্ষমতায় আসার পর বিভিন্ন দেশ মনে করছে, তাদের অস্ত্র শিল্পের জন্য সম্ভাবনার নতুন দুয়ার খুলে গেছে। ভারতের সঙ্গে মাল্টিবিলিয়ন ডলারের সামরিক চুক্তির সম্ভাবনায় বিভিন্ন দেশ হুমড়ি খেয়ে পড়েছে। তাদের জানা আছে যে, গত বছরই ভারত অস্ত্র কেনায় ব্যয় করেছে ৬০০ কোটি ডলার। নতুন সরকারের আমলে এটা অনেকগুণ পর্যন্ত বাড়তে পারে।।