Home » আন্তর্জাতিক » আফ্রিকার সম্পদ আর বাজার দখল :: চীন বনাম যুক্তরাষ্ট্র লড়াই

আফ্রিকার সম্পদ আর বাজার দখল :: চীন বনাম যুক্তরাষ্ট্র লড়াই

মোহাম্মদ হাসান শরীফ

last 4দক্ষিণ চীন সাগর, ভারত মহাসাগরে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার উত্তেজনা নিয়ে অনেক লেখালেখি হয়েছে। সেই তুলনায় আফ্রিকায় চীন ও যুক্তরাষ্ট্র যে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে, তা অনেকটাই চাপা পড়ে আছে। অথচ এই মহাদেশে অনেক দিন থেকেই দুটি দেশ মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছে। সময় যত গড়াচ্ছে, তাদের মধ্যকার যুদ্ধের তীব্রতা তত বাড়ছে। লক্ষ্য একটাই, আফ্রিকার সম্পদরাজির ওপর একছত্র আধিপত্য বিস্তার।

তবে চীন ও যুক্তরাষ্ট্র একই পদ্ধতিতে প্রভাব বিস্তারের কাজ করছে না। যুক্তরাষ্ট্র এ কাজে তার সামরিক শক্তিকে কাজে লাগাচ্ছে। আর চীন অর্থনৈতিক কূটনীতির আশ্রয় নিয়েছে। গত দশকে আফ্রিকায় চীনের অর্থনৈতিক সম্পৃক্ততা বিপুলভাবে বেড়েছে। আফ্রিকার সম্পদ নিশ্চিত করতে বেইজিং দীর্ঘ মেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। এজন্য তারা উদারভাবে চীনা সহায়তা, ঋণ, সহজ ঋণের পাশাপাশি রাস্তা, স্কুল, গৃহায়ন, হাসপাতাল, রেলওয়েসহ নানা অবকাঠামোও গড়ে দিচ্ছে চীন। এই শৃঙ্খল থেকে বের হয়ে আসা খুবই কঠিন। অন্যদিকে, আফ্রিকায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য হলো ন্যূনতম ব্যয়ে সর্বোচ্চ পরিমাণ সম্পদ নিয়ে আসা। আর এর জন্য তারা ১৪টি যুদ্ধ বাঁধিয়েছে। বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিল (আইএমএফ) নিয়ে বিশাল পরিকল্পনা করেছে। এর মাধ্যমে নতুন দাস যুগের সৃষ্টি হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র আফ্রিকার ৩৫টি দেশে সৈন্য মোতায়েন করছে। শুরু হয়েছে লিবিয়া, সুদান, আলজেরিয়া ও নাইজার দিয়ে। মার্কিন এই আক্রমণে ‘ইসলামিকরণ’ কোনো বিষয় নয়। বরং খনিজসম্পদ দখল, চীনকে মোকাবিলা করাটাই আসল লক্ষ্য। ইরাক, আফগানিস্তান, পাকিস্তান, ইয়েমেন ও ফিলিস্তিনে যে ধরনের সহিংসতা দেখা গেছে, তো আফ্রিকায় প্রয়োগ করার প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা। আফ্রিকায় প্রভাব বাড়ানোর জন্য যুক্তরাষ্ট্র অনুগত সরকার প্রতিষ্ঠায় সবচেয়ে বেশি নজর দিয়েছে। এ লক্ষ্যে তারা জিবুতি, উগান্ডা, মালি, সেনেগাল, গ্যাবনের সামরিক ঘাঁটিগুলোতে তাদের উপস্থিতি নিশ্চিত করেছে।

২০০৭ সালে গঠিত ইউএস আফ্রিকান কমান্ড (আফ্রিকম) ‘আমেরিকান ঘুষ ও অস্ত্র গ্রহণ করতে আগ্রহী’ শাসকদের একটি নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে। ২০১২ সালে আফ্রিকম মার্কিন সামরিক বাহিনীর নেতৃত্বে ৩৪টি আফ্রিকান দেশকে নিয়ে ‘অপারেশন আফ্রিকান এনডেভর’ আয়োজন করে। এ প্রসঙ্গে মধ্যপ্রাচ্য বিশেষজ্ঞ টনি কারটুলুসি বলেছিলেন, ‘লিবিয়ার সঙ্ঘাত যখন কমছে, তখন উত্তর মালির সঙ্ঘাত বাড়াটা কোনো কাকতালীয় ব্যাপার নয়। লিবিয়ায় (গাদ্দাফিকে) উৎখাতের মধ্য দিয়ে যে ভূরাজনৈতিক পুনর্গঠন শুরু হয়েছিল, এটা তার অংশবিশেষ। পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ীই ন্যাটোর তহবিলে ও সহায়তায় সন্ত্রাসীরা মালি, সিরিয়াসহ বিভিন্ন দেশে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ছে।’ লক্ষ্য হলো, অন্য কোনো দেশ যাতে আফ্রিকার খনিজসম্পদের কাছাকাছিও যেতে না পারে। বিশেষ করে চীন, ভারত, ও রাশিয়াকে এসব সম্পদ থেকে দূরে রাখা।

মার্কিন প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্র দফতরের উপদেষ্টা ড. জে পিটার ফাম আফ্রিকমের প্রধান উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলেছেন, ‘আফ্রিকার প্রাচুর্যপূর্ণ হাইড্রোকার্বন ও অন্যান্য কৌশলগত সম্পদরাজিতে সুরক্ষিত অধিকার। আর তা করতে গিয়ে চীন, ভারত, জাপান বা রাশিয়ার মতো আগ্রহী তৃতীয় পক্ষের হাতে যাতে এসব সমৃদ্ধ সম্পদ না পৌঁছে তা নিশ্চিত করা।’

আর গ্লোবাল রিসার্চ ওয়েবসাইটে আন্দ্রেই আকুলভ লিখেছেন, এটা এখন ওপেন সিক্রেট যে আফ্রিকম সৃষ্টি হয়েছে আফ্রিকায় চীনের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি মোকাবিলা করতে। আফ্রিকার তেল, গ্যাস, ইউরেনিয়াম, স্বর্ণ বা লোহার জন্য তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলছে। আফ্রিকমের প্রধান লক্ষ্য হলো চীন এবং রাশিয়ার মতো দেশগুলোকে আফ্রিকা থেকে দূরে রাখা।

আর তা করতে গিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনায় সংঘটিত যুদ্ধে অন্তত ৮৫ লাখ লোক নিহত হয়েছে। আর বিশ্বব্যাংক, আইএমএফের নানা পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে গিয়ে আফ্রিকার দেশগুলো আরো গরিব হয়ে পড়ছে। আর্থসামাজিক অনাচারে মারা গেছে আনুমানিক দুই কোটি ১০ লাখ লোক।

অর্থনীতি বা ভূরাজনৈতিক স্বার্থের প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্র বা তার পশ্চিমা মিত্ররা গণতান্ত্রিক নেতা ও স্বৈরাচারের মধ্যে পার্থক্য করে সামান্যই। পাশ্চাত্যে বেশির ভাগ আফ্রিকান দেশের রফতানি হয় কাঁচামাল হিসেবে। যুদ্ধের ফলে এসব পণ্যের দাম কৃত্রিমভাবে অত্যন্ত কম দাম রাখা হয়। কারণ সেনাবাহিনীগুলো অস্ত্র কেনার জন্য টাকা দরকার। তাই তারা কম দামেই তাদের পণ্যরাজি বিক্রি করে দেয়। এসব অস্ত্রের বেশির ভাগই আসে পাশ্চাত্যের কারখানা থেকে। তাই যত যুদ্ধ হবে, যত অস্থিতিশীলতার সৃষ্টি হবে, যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের লাভ তত বেশি।

বর্তমানে তেল নিয়ে চলছে মূল লড়াই। ১৯৭০এর দশকের তেল সঙ্কটের সময় যুক্তরাষ্ট্র তার পেট্রোলিয়ামের একতৃতীয়াংশ আমদানি করত। বর্তমানে তারা প্রতিদিন আমদানি করে প্রায় ১১.৪ মিলিয়ন ব্যারেল। এর একটি বড় অংশ আসে আফ্রিকা ও পারস্য উপসাগরীয় এলাকা থেকে। বিদেশী তেলের ওপর আমেরিকার নির্ভরশীলতা সবচেয়ে বেশি ছিল ২০০৫ সালে। এর পর থেকে তারা নিজেদের তেল ক্ষেত্রগুলো উন্নয়নে জোর দেয়। কিন্তু তারপরও আমদানি লাইনে বিঘ্ন ঘটলে তা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য মারাত্মক বিপর্যয় ডেকে আনবে। এ কারণে তারা সরবরাহ লাইনটি সুরক্ষিত করতে চাইছে। সেইসাথে এক অঞ্চলের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল না থেকে নানা দিক থেকে আমদানি করতে চাইছে। আর এ কারণে আফ্রিকার তেলেও দিকে যুক্তরাষ্ট্রের নজর পড়েছে বেশি করে। কোনো কারণে পারস্য উপসাগরের তেল সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে তারা যেন আফ্রিকার তেল দিয়ে ঘাটতি মেটাতে পারে। তাছাড়া পশ্চিম আফ্রিকা তুলনামূলক কাছাকাছি হওয়ায় এখন থেকে পরিবহন খরচও কম। গিনি উপসাগরের উচ্চমানের তেল মার্কিন বাজারের জন্য অত্যন্ত

গুরুত্বপূর্ণ। সাব সাহারীয় এলাকার নাইজেরিয়া ও অ্যাঙ্গোলা হলো বৃহত্তম দুটি তেল উৎপাদনকারী দেশ। আমেরিকায় এ দুটি দেশের তেলও বেশ প্রয়োজন মেটায়।

অন্যদিকে চীন তার তেল চাহিদার (দৈনিক ২.৬ মিলিয়ন ব্যারেল) অর্ধেক আমদানি করে এবং এর একতৃতীয়াংশ আসে আফ্রিকান দেশগুলো থেকে। ২০১১ সালে আফ্রিকার সাথে চীনের বাণিজ্য ছিল ১৬৬.৩ বিলিয়ন ডলারের। গত ১০ বছরে চীনে আফ্রিকার রফতানি ৫.৬ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ৯৩.২ ডলারে দাঁড়িয়েছে। ২০১২ সালে আফ্রিকার দেশগুলোকে চীন ২০১২২০১৫ মেয়াদের জন্য ২০ বিলিয়ন ডলার ঋণ দিয়েছে, যা আগের তিন বছরের তুলনায় দ্বিগুণ।

তিনটি কারণে আফ্রিকার দিকে নজর দিতে হয়েছে চীনের। প্রথমত তাদের বর্তমান ৭.৪ শতাংশ জিডিপি অব্যাহত রাখতে হলে তেলের নির্বিঘ্ন সরবরাহ রাখতে হবে। আর সেক্ষেত্রে আফ্রিকার সরবরাহ হতে পারে নির্ভরযোগ্য। আফ্রিকা থেকে আমেরিকার চেয়ে চীন বেশি তেল আমদানি করে থাকে যথাক্রমে ২০ ভাগ ও ৩০ ভাগ। এই নির্ভরশীলতা বাড়বেই। ২০২০ সাল নাগাদ আফ্রিকা থেকে চীনের তেল আমদানি মোট আমদানির ৬৫ ভাগ হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ভূরাজনৈতিক স্বার্থে চীনের পক্ষে আফ্রিকাকে এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব হবে না। চীন এখন পরাশক্তি হতে চায়। আর আফ্রিকাকে বাদ দিয়ে সেটা সম্ভব নয়। চীন প্রভাব বিস্তার করতে নমনীয় শক্তি তথা বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক হাতিয়ার কাজে লাগায়। ২০০৯ সালে আমেরিকাকে ছাড়িয়ে চীন হয়ে পড়ে আফ্রিকার বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার। ২০০০ সালের ১০ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য গত বছর দাঁড়ায় ২১০ বিলিয়ন ডলার। তাছাড়া বিশেষ কয়েকটি দেশের দিকেও তারা নজর দিয়েছে। এ কারণেই তানজানিয়া, লাইবেরিয়া, গণপ্রজাতান্ত্রিক কঙ্গোতে চীনের নানা ধরনের উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে।

আফ্রিকায় পাশ্চাত্যের লুণ্ঠন নতুন কিছু নয়। ঊনিশ শতক পর্যন্ত প্রায় ৪০০ বছর ধরে ব্রিটেন, পর্তুগাল, ফ্রান্সসহ পাশ্চাত্যের দেশগুলো আফ্রিকার লোকদের দাস হিসেবে বিক্রি করেছে। ইউরোপ ও আমেরিকান অর্থনীতি চাঙ্গা করতে গিয়ে ৫০ কোটি আফ্রিকানকে জীবন দিতে হয়েছে। ওই রেশ এখনো চলছে, তবে তা ভিন্ন আকারে। ফলে আফ্রিকান জনগণের মধ্যে পাশ্চাত্যকে নিয়ে যে ভয় আছে, চীনের ব্যাপারে তা নেই। চীন এই সুযোগকে কাজে লাগাতে চাইছে।

চীন বা যুক্তরাষ্ট্র কেউই সত্যিকার অর্থে আফ্রিকার কল্যাণ চায় না, চাওয়ার কথাও নয়। সবাই নিজ নিজ স্বার্থই বেশি দেখে। কিন্তু পরাশক্তিগুলোর স্বার্থসিদ্ধির বলি হচ্ছে আফ্রিকার সাধারণ মানুষ। তাদের হয়তো এ থেকে মুক্তিও নেই, যতোক্ষণ না আফ্রিকাবাসী এসবের বিরুদ্ধে রুখে দাড়ায় একযোগে।।