Home » অর্থনীতি » উত্তাল ষাটের দশক (চতুর্থ পর্ব)

উত্তাল ষাটের দশক (চতুর্থ পর্ব)

আইয়ুবের স্বৈরাচার আর ৬২’র ছাত্র আন্দোলন

হায়দার আকবর খান রনো

last 5পুরো ষাটের দশক ছিল পাকিস্তানি সেনা শাসনের বিরুদ্ধে জনগণের বহু সাহসী লড়াইয়ে ভরা। তার মধ্যে অন্যতম ’৬২এর সামরিক শাসন বিরোধী ছাত্র আন্দোলন, ’৬৬ সালে ছয় দফার আন্দোলন এবং ’৬৮৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান।

১৯৫৮ সালে আইয়ুব খান মার্শাল ঘোষণা করে সব ধরনের রাজনৈতিক কার্যক্রম ও রাজনৈতিক দল, নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন। ছাত্র সংগঠন, ট্রেড ইউনিয়নসহ সব ধরনের গণসংগঠনও নিষিদ্ধ ছিল। সরাসরি সামরিক শাসন ছিল ’৫৮ অক্টোবর থেকে ’৬২এর মার্চ মাস পর্যন্ত। সরাসরি মার্শাল ল’ উঠে গেলেও কার্যত আইয়ুবের শাসনকাল ছিল অপ্রত্যক্ষভাবে সেনা শাসনকাল। ১৯৬৯এর গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে আইয়ুব খান ক্ষমতা সরে যেতে বাধ্য হলেও আবার সামরিক শাসন এলো। দ্বিতীয় দফার সামরিক শাসন। সেই শাসনকালেই শুরু হলো মহান মুক্তিযুদ্ধ ১৯৭১ সালে।

আইয়ুবের সামরিক শাসন জারির আগেও যে এই দেশে গণতন্ত্র ছিল তা মনে করার কোন কারণ নেই। পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মহম্মদ আলী জিন্নাহ নিজেও গণতান্ত্রিক ছিলেন না। তাই তিনি পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠের ভাষা বাংলা ভাষাকে অস্বীকার করে উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্র ভাষা হিসাবে আমাদের উপর চাপিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। মুসলিম লীগ বরাবর ইংরেজের দালালি করে এসেছিল এবং দলটি ছিল সাম্প্রদায়িক ও হাড়ে হাড়ে প্রতিক্রিয়াশীল। তাই পাকিস্তানে কখনই গণতান্ত্রিক ঐতিহ্য তৈরি হয়নি। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার অল্প দিন পরই শাসন ক্ষমতার কেন্দ্রে চলে এসেছিল পশ্চিম পাকিস্তান কেন্দ্রীক সামরিক ও বেসামরিক আমলারা। তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানকে তারা কার্যত কলোনী হিসাবে বিবেচনা করতো। ফলে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ গণতান্ত্রিক স্বাদ কখনই পায়নি।

আইয়ুবের সামরিক শাসন ছিল খুবই নিষ্ঠুর প্রকৃতির। এই সামরিক শাসন এসেছিল মার্কিন প্রশাসন বিশেষ করে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার বিশ্ব পরিকল্পনার অংশ হিসেবে। আইয়ুবের সামরিক সরকার আসার আগেই পাকিস্তান মার্কিন নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট সিয়াটো ও সেন্টোর অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। পাকমার্কিন সামরিক চুক্তিও হয়েছিল আগেই। আইয়ুব সরকারের আমলে পেশওয়ারের নিকটবর্তী মার্কিন সামরিক ঘাটি থেকে উড়ে আসা মার্কিন গোয়েন্দা বিমান সোভিয়েত ভূখন্ডে ভূপাতিত করা হয়েছিল। এ নিয়ে তখন খুব হৈ চৈ হয়েছিল। আইয়ুব সরকার ছিল মার্কিন নির্ভরশীল প্রতিক্রিয়াশীল সরকার।

আইয়ুব তার প্রতিক্রিয়াশীল চরিত্র কখনই গোপন করেননি। ১৯৫৮ সালে সামরিক শাসন জারির সাথে সাথে গ্রেফতার হলেন মওলানা ভাসানী। কমিউনিস্ট ও ন্যাপ নেতা ও কর্মীদের দিয়ে জেল ভরে উঠলো। যারা গ্রেফতার এড়াতে সক্ষম হয়েছিলেন তাদের বিরুদ্ধে হুলিয়া জারি হলো। মনিসিংহ, খোকা রায়, সুখেন্দ্র দস্তিদার, মহম্মদ তোয়াহা, আবদুল হক, মোজাফফর আহমেদসহ বহু নেতা ও কর্মী হুলিয়া মাথায় নিয়ে গোপনে রাজনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত রাখেন।

প্রথমদিকে আওয়ামী লীগ নেতারা গ্রেফতার হননি। আওয়ামী লীগের তদানীন্তন প্রধান নেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী প্রকাশ্যেই ছিলেন এবং করাচী ও ঢাকা আইন পেশায় ব্যস্ত ছিলেন। সাধারণ সম্পাদক শেক মুজিবুর রহমানের বিরুদ্ধে আইয়ুব সরকার একটি দুর্নীতির মামলা দিয়েছিল। জজ কোর্টে সাজা হলেও হাইকোর্ট তাকে মুক্তি দিয়েছিল।

আইয়ুব সরকার সাম্প্রদায়িকও ছিল। হিন্দু রাজনৈতিক নেতা ও কর্মীদের প্রতি সরকারের বিদ্বেষ ও নির্যাতন অন্যদের তুলনায় বেশি ছিল। পশ্চিম পাকিস্তানের আইয়ুব সরকারের নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন কমিউনিস্ট কর্মীরা। লাহোর জেলে নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছিল কমিউনিস্ট নেতা হাসান নাসিরকে। পূর্ব পাকিস্তানে আত্মগোপনকারী কমিউনিস্ট পার্টির কর্মী কাজী বারির হাতে পাওয়া গিয়েছিল কমিউনিস্ট পার্টির গোপন ইশতেহার। তাই তাকে সামরিক আদালত বেত্রাঘাতের আদেশ দিয়েছিল। এমনই বর্বর এই সেনা শাসন। জেলখানায় বেত্রাঘাতের কারণে কাজী বারী সারা জীবনের জন্য বধির হয়েছিলেন।

১৯৬১ সালের দিকে আইয়ুব খান ঘোষণা করেছিলেন যে, তিনি পাকিস্তানকে একটি সংবিধান উপহার দেবেন। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার নয় বছর পর ১৯৫৬ সালে প্রথম সংবিধান রচিত হয়েছিল। সেই সংবিধানে প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের দাবিকে অগ্রাহ্য করা হয়েছিল। মওলানা ভাসানী ’৫৬এর সংবিধানকে কখনই মেনে নিতে চাননি। ১৯৫৮ সালে সামরিক আইন ঘোষণার সাথে সাথে ১৯৫৬এর সংবিধানকেও বাতিল করা হয়েছিল। এবার সামরিক ডিকটেটর নিজেই একটা সংবিধান দেবেন বলে জানালেন। ১৯৬২ সালের ২৩ মার্চ এই সংবিধান দেয়া হবে বলেও জানানো হয়েছিল। কোন নির্বাচিত সংসদ নয়। একক ব্যক্তি এই সংবিধান ঘোষণা করেছিলেন। সেটাই ছিল পাকিস্তানের দ্বিতীয় সংবিধান। ১৯৬২ সালের সংবিধান। এই সংবিধানের মুখবন্ধে এই ভাবে লেখা ছিল – ‘আল্লাহর নামে আমি ফিল্ড মার্শাল মহম্মদ আইয়ুব খান এই সংবিধান ঘোষণা করছি’। এতেই বোঝা যায় পাকিস্তানে গণতন্ত্র কতোটা ছিল।

গোপন কমিউনিস্ট পার্টি সামরিক শাসন বিরোধী আন্দোলনের পরিকল্পনা করেছিল। সে জন্য পার্টির দু’জন আত্মগোপনকারী নেতা গোপনে তদানীন্তন আওয়ামী লীগের দুইজন প্রভাবশালী নেতা শেখ মুজিবুর রহমান ও ইত্তেফাকের সম্পাদক তোফাজ্জেল হোসেন মানিক মিয়ার সাথে আলোচনা করেছিলেন। সেই আলোচনা অবশ্য বেশি দূর যায়নি। ইতোমধ্যে শুরু হলো ছাত্রদের সামরিক শাসন বিরোধী ঐতিহাসিক আন্দোলন। ১৯৬২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে।

গোপন কমিউনিস্ট পার্টি অবশ্য ছাত্রদেরকেও আন্দোলনের জন্য প্রস্তুত করছিল। সে জন্য ১৯৬১ সালের শেষ দিকে ছাত্র ইউনিরয়নের কয়েকজন নেতাকর্মী কমলাপুরের একটি বাসায় গোপনে মিলিত হয়েছিল। সেই সভায় আমি নিজেও উপস্থিত ছিলাম। উদ্যোক্তাদের মধ্যে আমিও ছিলাম। তবে পেছন থেকে উদ্যোগ নিয়েছিল গোপন কমিউনিস্ট পার্টি।

আমরা সভায় বসে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম যে, আগামী বছর (১৯৬২ সালে) একুশে ফেব্রুয়ারির প্রভাবফেরীর মিছিল থেকে সামরিক শাসন বিরোধী আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটানো হবে। এখানে উল্লেখ্য যে, সামরিক সরকার সকল তৎপরতা বন্ধ করলেও একুশের প্রভাতফেরী বন্ধ করা সম্ভব ছিল না। ১৯৬১ সালের একুশের মিছিলে কয়েকটি সামরিক শাসন বিরোধী স্লোগান দেয়া হয়েছিল। Down with Martial law। তখন একুশে ফেব্রুয়ারি পালনের বিষয়টিই ছিল অন্য রকম। এখনকার মতো নয়। একুশের মিছিল সেই বছর একটিই বের হয়েছিল। আমরা কয়েকজন ছাত্র সেটা সংগঠিত করেছিলাম। মিছিলে যোগ দিয়েছিলেন দুই শতের মাত্র ছাত্র। সকলেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র।

এখানে আরও উল্লেখ্য যে, তখনো পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের বা ছাত্রলীগের কোন সাংগঠনিক কাঠামো ছিল না। আমরা কিছুসংখ্যক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নিজেদের ছাত্র ইউনিয়ন বলে মনে করতাম। মহম্মদ ফরহাদ, কাজী জাফর আহমদ, রাশেদ খান মেনন, মহিউদ্দিন আহমদ, আইয়ুব রেজা চৌধুরী, বদরুল হক, সাইফুদ্দিন আহমদ মানিক, রেজা আলী, আবদুল হালিম এবং আমি। মূলত এই কয়জন (আরও কয়েকজন ছিলেন, সবার নাম মনে পড়ছে না) বসে সিদ্ধান্ত নিতাম। আমরাই ১৯৬২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারিকে টার্গেট করে আন্দোলনের প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। এমন সময় হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর গ্রেফতার কেন্দ্র করে ১৯৬২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারির আগেই শুরু হয়ে গেল সেই ঐতিহাসিক ’৬২এর সামরিক শাসন বিরোধী ছাত্র আন্দোলন।।

(চলবে…)